(পূর্ব প্রকাশের পর)
দুই.
কমলা খাতুন খড়ের ওম দেওয়া একটা কাঠের চৌকিতে এতক্ষণ কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে ছিল। সকাল থেকে সে কিচ্ছু খায়নি। ঘরে যে খাবার কিছু নেই, তা নয়। গতকালের কড়কড়া ভাত আছে। টাকিমাছের ঝোল রান্না করা আছে। ছিক্কায় একটা পাতিলে চিড়া আছে, অন্য আরেকটা পাতিলে গুড়। কিন্তু তার কিছুই খেতে ইচ্ছে করছে না। তার শরীরটা তেমন ভালো না। শরীরে জ্বর নেই, কিন্তু নাক টানছে।
গত কয়েক দিন ধরে শীতটা পড়ছে বেশ। দুই-তিন দিন তো কোনো রোদ ওঠেনি। এছাড়া তার বাড়িটা শ্বশুরের আমলের পুরোনো বাড়ি বলে ঘরের চারিদিকে বড় বড় গাছ ঝোপ করে দাঁড়িয়ে আছে। এতে গরমকালে আরামবোধ হলেও শীতকালে বেশ শীত পড়ে। তার ঘরটাও বেশ পুরোনো। টিনের চাল ও টিনের বেড়ার হলেও বেড়ার স্থানে স্থানে জং ধরে ফোঁকর হয়ে গেছে। এতে উত্তরের বাতাস অনায়েসে ঘরে ঢোকে। মাঝেমধ্যে রাতবিরাতে উত্তরের বাতাস বেড়ে গেলে শিস্ দেওয়ার শব্দ আসে। সাপের ফোঁস ফোঁস শব্দের মতো শিস্।
কমলা খাতুন শরীরটা ঠেলে শোয়া থেকে উঠল। পা দুটো চৌকি থেকে ঝুলিয়ে বসল ঠিকই, কিন্তু গায়ের কাঁথাটা সরালো না। সে বসল কুঁজো হয়ে। ঘরের সদর দরজা হাট করে খোলা। সে-ই সকালে উঠে দরজাটা খুলে আবার শুইতে চলে এসেছে। ঘরে সে বাদে আর দ্বিতীয় কোনো মানুষ নেই। আড়াই বছরের ওপরে হয়ে গেছে সেতারা বেগম গোমতীর জলে ডুবে মারা গেছে। পুলিশ সন্দেহ করেছে, তার ছেলে মনসুর পাগলা সেতারা বেগমকে নদীর জলে চুবিয়ে মেরেছে।
আড়াই বছর ধরে কমলা খাতুন ঘরে একাই থাকে। কিছু ক্ষেতকামলা আর বর্গা জমির ধানের ভাগ দিতে আসা দু-একজন চাষি বাদে পাড়ায় কেউ এ বাড়িতে পা ফেলে না। অবশ্য সে এ বাড়িতে কারও পা ফেলার অপেক্ষায় থাকে, তা নয়। সে মানুষটা এমনই, কারও সঙ্গে পারতে কথা বলে না। এ জন্য শুধু দক্ষিণ পাড়া নয়, পুরো আঁধারিয়া গ্রামের মানুষ বলে, সে একটা ঠ্যাঁটা পড়া বুড়ি।
কমলা খাতুন বাড়ি থেকে তেমন বের হয় না। সে চাল-ডাল এসব তো জমি থেকেই পায়। সে একলা মানুষ, খোরাকের চিন্তা কখনই করতে হয় না। বুইদ্দার বিলে তাদের জমিজমা কম নয়। মা’র প্রতি মনসুর পাগলার তেমন টান না থাকলেও জমিজমার প্রতি বেশ টান। জেলে যাওয়ার আগে নিজ থেকে গিয়ে জমিজমার হালচাষ দেখাশোনা করত।
অবশ্য বাজার সদাইর জন্য কমলা খাতুনকে মাঝেমধ্যে সমস্যায় পড়তে হয়। তবে তা কখনও কখনও ছুটা ক্ষেতকামলাদের দিয়ে করিয়ে নেয়। এর বিনিময়ে ক্ষেতকামলারা বাড়তি দু-চার পয়সা পায়। মাঝেমধ্যে সে নিজেও বোরকা পরে মীরবহরি বাজারে চলে যায়। প্রয়োজনীয় বাজারসদাই করে নিয়ে আসে। তবে সে মীরবহরি বাজারে যায় সুদিনে হেঁটে হেঁটে। বর্ষার মওসুমে নৌকা চড়ে যায় না। নৌকায় চড়তে গেলেই তার মধ্যে একটা ভয় কাজ করে। এই ভয়টা কাজ করে তার স্বামী আসমত আলী বেপারির মৃত্যুর পর থেকে। তখন মমিনাকে মীরবহরি বাজারে পাঠায়।
শুধুমাত্র মমিনাই কমলা খাতুনের কাছে একটু ব্যতিক্রম। মমিনা তাকে সম্মান দিয়ে চলে, সবসময় খোঁজখবর নেয়। দিনে একবার হলেও এ বাড়িতে আসে। বিয়ের পরপর কিছুদিন তার আসাযাওয়া কমে গিয়েছিল। আজকাল আবার সে ঘনঘনই আসে।
কমলা খাতুন জানে, তার প্রতি মমিনার টানবোধ বেশ। যদিও এই টানবোধের কোনো কার্যকারণ নেই, তারপরও সে বোধ করে কোথাও একটা মায়া জড়িয়ে আছে এই মেয়েটার প্রতি। আঁধারিয়া গ্রাম, বেপারিবাড়ি, ভুঁইয়াবাড়ি, এমনকি তার আত্মীয়স্বজনদের কেউ তো তাকে এতটুকু সম্মান দিয়ে চলে না। সে অন্য মানুষের কথা আর কী ভাববে? তার নিজের ছেলে মনসুর পাগলার কথাই ধরা যাক। ডাঙর হয়ে কোনো দিন সে একটু ভালোভাবে কথা বলেনি। কথায় কথায় অপমান করে, উঠতে-বসতে তেড়ে আসে। কী আজব তার জীবনটা। একই ঘরের বাসিন্দা হয়ে যেন দূরের মানুষ তার ছেলে।
ছেলে মনসুর পাগলা ঠিক তার বাপের চরিত্রটাই পেয়েছে। বিয়ের পরপর স্বামী আসমত আলী বেপারি ঠিক একইরকম অপমান, লাঞ্ছনা ও মারধোর করত। বছরের অর্ধেকটা সময় থাকত দূরে, ব্যবসার কাজে। বাকি সময়টা যখন বাড়ি থাকত, তখন নিজের চাহিদা বাদে ঠিকমতো কথাও বলত না। কমলা খাতুন ভাবল, শরীরের আধাআধি চাহিদাই কি সব? মনের চাহিদা বলতে কিছু নেই? আর সেই মনের চাহিদার জন্যই তো সে গোপনে সুন্দর ভুঁইয়ার হাতটা ধরেছিল। কিন্তু সেই হাত ধরাও ছিল অনির্দিষ্ট। সুন্দর ভুঁইয়া তার জন্য নিজ সংসার ছাড়েনি। সব পুরুষরাই মনে হয় একরকম!
মনসুর পাগলা আড়াই বছরের ওপরে হলো জেলে পড়ে আছে। মাঝেমধ্যে তাকে জেল থেকে বের করে কোর্টে তোলা হয়। কিন্তু আজ পর্যন্ত তার জামিন হয়নি। ছেলের জামিনের জন্য তোড়জোড় কোনো চেষ্টা হয়েছে কি না, কমলা খাতুনের জানা নেই। সে শুনেছে, তার ছেলের জন্য আনিস প্রথম থেকেই একটা উকিল রেখেছে। উকিলের টাকাপয়সা আনিসই দিচ্ছে।
কমলা খাতুন এই আড়াই বছরে মনসুর পাগলাকে জেলে একবারও দেখতে যায়নি। এমনকি কোর্টে তোলার সময়ও না। তার যে যেতে ইচ্ছে করেনি, তা নয়। বেশ ইচ্ছে করেছে। পেটপোছা একমাত্র ছেলে তার। তার এই জীবনে ছেলেটা বাদে আর কে আছে? কিন্তু সে যায়নি। সে যায়নি ভয়ে। সে দেখা করতে গেলে জেলে বা কোর্টে সবার সামনে ছেলে যদি তাকে অপমান করে, তেড়ে মারতে আসে? নিজের ভেতর নিজের অসম্মানটা সহ্য করা যায়। কিন্তু অন্যের সামনে তা সহ্য করা যায় না।
কমলা খাতুন কুঁজো হয়ে বসা ছেড়ে আবার শুইবে বলে ভাবল। তার শরীরটা আবার ভেঙে আসছে। এখন মনে হয় একটু একটু জ্বর আসছে। সে শরীরটা চৌকিতে কাঁত করতে যাবে ঠিক তখনই দেখল, মমিনা পাটাতন পেরিয়ে ঘরে ঢুকছে।
কমলা খাতুন আবার বসল। তবে এবার কুঁজো হয়ে নয়, শরীর টানটান করে।
মমিনা সাধারণত ঘরে ঢুকেই হাঁকডাক দেয়, কেমন অধিকার খাটিয়ে কথা বলে। আজ এর কিছুই করল না। আস্তে করে চৌকিতে কমলা খাতুনের পাশে বসতে বসতে জিজ্ঞেস করল, ‘বড়চাচি, এই বেলায়ও খ্যাতা মুড়াইয়া আছো, শরীল খারাপ?
কমলা খাতুন মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘মনে হয়। নাক টানতাছে। শরীলডাও ম্যাজ ম্যাজ করতাছে।’
‘কও কী, ওষুধপাতি কিছু আছে?’
‘ওষুধপাতি থাকব কই থাইকা?’
‘ও, হেইডাও কথা। দাঁড়াও, আমি ওষুধপাতির ব্যবস্থা করমুনে। মীরবহরি বাজারে কাউরে পাঠাইমু।’
‘তা পরে পাঠাইস। অখনও তো জ্বরটর আসে নাই।’
‘ক্যামনে বুঝলা জ্বর আসে নাই?’— বলেই মমিনা কমলা খাতুনের কপালে হাত রাখল।
কমলা খাতুন বলল, ‘হাছাই কইতাছি। তুই এত উতালা হইস না।’
মমিনা বলল, ‘জ্বর ঠিক বুঝা যাইতাছে না। তবে গাও গরম হইয়া আইতাছে।’
কমলা খাতুন বলল, ‘আরে বাদ দে। বয়স হইছে। কত্ত কিছু হইব। আইচ্ছা শোন, বিহানবেলা তোগো বাড়ি থাইকা চিল্লাচিল্লি শুনলাম? কী হইছে?’
মমিনা মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেল। তারপর আস্তে করে বলল, ‘বড়চাচি, আমার কপাল। আমার কপাল পুইড়াছে।’
‘ক্যান, এই কথা ক্যান? জামাইর কিছু হইছে?’
‘জামাইর কিছু হয় নাই। জামাই গজব কাম করেছে।’
‘কী কস, কী কাম করেছে?’
‘গরু চুরি করেছে।’
কমলা খাতুন বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, ‘গরু চুরি, তোর জামাই?’
মমিনা মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘হ, বড়চাচি।’
‘ধ্যাত, কী আবোলতাবোল কস?’
‘আবোলতাবোল না। একদম হাছা।’
‘কার গরু চুরি করেছে?’
‘আমাগো দুইডা গরু আছে না, হেই দুইডা।’
কমলা খাতুন মাথা নেড়ে বলল, ‘না না, আমার মনে হয় না। মনে হয় তোর ভুল হইতাছে।’
মমিনা আবার চুপ হয়ে গেল। তারপর ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল।
কমলা খাতুন মমিনাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘কান্দে না মমিনা। তুই তো জানিস, তোর কান্দন আমি সহ্য করতে পারি না।’
মমিনা কান্না চাপাতে চাপাতে বলল, ‘আমি হাছাই কইতাছি, বড়চাচি। আমি হাছাই কইতাছি।’
কমলা খাতুন তবুও অবিশ্বাসের গলায় বলল, ‘তোর জামাই তো এমুন না। হেয় ক্যামনে গরু চুরি করল?’
মমিনা বলল, ‘দেনা, বড়চাচি, দেনা। পাওনাদাররা আমাগো বাড়িত আইসা ট্যাকার লাইগা অপমান করে। কারু কাছে ট্যাকা না পাইয়া চুরি করছে। আমি তো তারে জানি। হেয় এমুন কাম করত না। কিন্তুক কইরা তো ফালাইছে।’
‘তোর বাপের কাছেও ট্যাকাপইসা পাইল না?’
‘না, আমার বাপরে তো তুমি চিনো। হেয় কাউরে ট্যাকা দেওয়ার মানুষ?’
কমলা খাতুন মাথা ঝাঁকাল। বলল, ‘এমুন কিপ্টা মানুষ আমি এই জীবনে দেখি নাই।’
মমিনা বলল, ‘বড়চাচি, হেয় হুধা কি বাপের কাছে চাইছে, আমার বড়ভাইয়ের কাছেও চাইছে।
‘শওকতও না কইরা দিছে?’
‘হ, বড়চাচি। বড়ভাইয়ের কামাই-রোজগার তো তুমি জানোই। অইদিকে নাকি সংসারই চালাইতে পারে না। হেয় ট্যাকা দিবো কই থাইকা?’
‘তা বুঝতে পারি। কিন্তুক তোর জামাই...!’
মমিনা বলল, ‘অসহায় আছিল। আমি জানি, আমার নাক কাইট্টা গেছে। কিন্তুক আমি কী করমু, কও?’
কমলা খাতুন চুপ হয়ে গেল। সে কী সান্ত্বনা দিবে বুঝতে পারল না। তারপরও বলল, ‘বুঝতে পারতাছি, ঠেকায় পইড়া করছে রে মমিনা, ঠেকায় পইড়া করছে। কথায় আছে না, অভাবে পড়লে স্বভাবটা নষ্ট হইয়া যায়। তোর জামাইর হইছে হেইডা।’
মমিনা বলল, ‘আমার চিন্তা যে অন্যখানে।’
‘অন্যখানে মানে, কোনখানে?’
‘হেয় যদি ফিরা না আসে?’
‘ক্যান ফিরা আসব না?’
‘এত্তবড় একটা বদনাম কামাই কইরা গেছে। গরু চুরি!’
‘সময় হইলে সব ঠিক হইয়া যাইব, মমিনা।’
‘আমি জানি। কিন্তু হেয় এমুন ক্যান?’
‘হেয় মানে, কেডা, তোর জামাই তো?’
‘হ, বড়চাচি।’
‘তোর জামাইরে আমার খুব পছন্দ হইছিল। সহজ-সরল। তোরে খুব ভালা পায়। সংসারধর্ম একটুখানি কম বোঝে। এর লাগি তোর নিজে তারে আগলাইয়া রাখতে হইব।’
‘তা না হয় রাখলাম। হেয় ফিরা আইলেই হয়।’
‘আইব, আইব, তোর টানেই আইব।’
‘হেয় আইলে কি আমার বাপে তারে জায়গা দিব?’
‘তোর বাপের জায়গা দেওয়নের দরকার আছে কি? না খাইয়া থাকবি, তয় বাপের বাড়িত থাকবি না। তোর জামাইর অন্তত একখান ঘর তো আছে। দরকার হইলে দুইজনে মিইলে মাইনসের বাড়িত কামলা দিবি। তারপরও জামাইর বাড়ির মাটি কামড়াইয়া পইড়া থাকবি।’
মমিনা কমলা খাতুনের হাতটা চেপে ধরে বলল, ‘আমি হেইডাই করমু, বড়চাচি। আমি হেইডাই করমু।’ (ক্রমশ...)

বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
(পূর্ব প্রকাশের পর)
দুই.
কমলা খাতুন খড়ের ওম দেওয়া একটা কাঠের চৌকিতে এতক্ষণ কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে ছিল। সকাল থেকে সে কিচ্ছু খায়নি। ঘরে যে খাবার কিছু নেই, তা নয়। গতকালের কড়কড়া ভাত আছে। টাকিমাছের ঝোল রান্না করা আছে। ছিক্কায় একটা পাতিলে চিড়া আছে, অন্য আরেকটা পাতিলে গুড়। কিন্তু তার কিছুই খেতে ইচ্ছে করছে না। তার শরীরটা তেমন ভালো না। শরীরে জ্বর নেই, কিন্তু নাক টানছে।
গত কয়েক দিন ধরে শীতটা পড়ছে বেশ। দুই-তিন দিন তো কোনো রোদ ওঠেনি। এছাড়া তার বাড়িটা শ্বশুরের আমলের পুরোনো বাড়ি বলে ঘরের চারিদিকে বড় বড় গাছ ঝোপ করে দাঁড়িয়ে আছে। এতে গরমকালে আরামবোধ হলেও শীতকালে বেশ শীত পড়ে। তার ঘরটাও বেশ পুরোনো। টিনের চাল ও টিনের বেড়ার হলেও বেড়ার স্থানে স্থানে জং ধরে ফোঁকর হয়ে গেছে। এতে উত্তরের বাতাস অনায়েসে ঘরে ঢোকে। মাঝেমধ্যে রাতবিরাতে উত্তরের বাতাস বেড়ে গেলে শিস্ দেওয়ার শব্দ আসে। সাপের ফোঁস ফোঁস শব্দের মতো শিস্।
কমলা খাতুন শরীরটা ঠেলে শোয়া থেকে উঠল। পা দুটো চৌকি থেকে ঝুলিয়ে বসল ঠিকই, কিন্তু গায়ের কাঁথাটা সরালো না। সে বসল কুঁজো হয়ে। ঘরের সদর দরজা হাট করে খোলা। সে-ই সকালে উঠে দরজাটা খুলে আবার শুইতে চলে এসেছে। ঘরে সে বাদে আর দ্বিতীয় কোনো মানুষ নেই। আড়াই বছরের ওপরে হয়ে গেছে সেতারা বেগম গোমতীর জলে ডুবে মারা গেছে। পুলিশ সন্দেহ করেছে, তার ছেলে মনসুর পাগলা সেতারা বেগমকে নদীর জলে চুবিয়ে মেরেছে।
আড়াই বছর ধরে কমলা খাতুন ঘরে একাই থাকে। কিছু ক্ষেতকামলা আর বর্গা জমির ধানের ভাগ দিতে আসা দু-একজন চাষি বাদে পাড়ায় কেউ এ বাড়িতে পা ফেলে না। অবশ্য সে এ বাড়িতে কারও পা ফেলার অপেক্ষায় থাকে, তা নয়। সে মানুষটা এমনই, কারও সঙ্গে পারতে কথা বলে না। এ জন্য শুধু দক্ষিণ পাড়া নয়, পুরো আঁধারিয়া গ্রামের মানুষ বলে, সে একটা ঠ্যাঁটা পড়া বুড়ি।
কমলা খাতুন বাড়ি থেকে তেমন বের হয় না। সে চাল-ডাল এসব তো জমি থেকেই পায়। সে একলা মানুষ, খোরাকের চিন্তা কখনই করতে হয় না। বুইদ্দার বিলে তাদের জমিজমা কম নয়। মা’র প্রতি মনসুর পাগলার তেমন টান না থাকলেও জমিজমার প্রতি বেশ টান। জেলে যাওয়ার আগে নিজ থেকে গিয়ে জমিজমার হালচাষ দেখাশোনা করত।
অবশ্য বাজার সদাইর জন্য কমলা খাতুনকে মাঝেমধ্যে সমস্যায় পড়তে হয়। তবে তা কখনও কখনও ছুটা ক্ষেতকামলাদের দিয়ে করিয়ে নেয়। এর বিনিময়ে ক্ষেতকামলারা বাড়তি দু-চার পয়সা পায়। মাঝেমধ্যে সে নিজেও বোরকা পরে মীরবহরি বাজারে চলে যায়। প্রয়োজনীয় বাজারসদাই করে নিয়ে আসে। তবে সে মীরবহরি বাজারে যায় সুদিনে হেঁটে হেঁটে। বর্ষার মওসুমে নৌকা চড়ে যায় না। নৌকায় চড়তে গেলেই তার মধ্যে একটা ভয় কাজ করে। এই ভয়টা কাজ করে তার স্বামী আসমত আলী বেপারির মৃত্যুর পর থেকে। তখন মমিনাকে মীরবহরি বাজারে পাঠায়।
শুধুমাত্র মমিনাই কমলা খাতুনের কাছে একটু ব্যতিক্রম। মমিনা তাকে সম্মান দিয়ে চলে, সবসময় খোঁজখবর নেয়। দিনে একবার হলেও এ বাড়িতে আসে। বিয়ের পরপর কিছুদিন তার আসাযাওয়া কমে গিয়েছিল। আজকাল আবার সে ঘনঘনই আসে।
কমলা খাতুন জানে, তার প্রতি মমিনার টানবোধ বেশ। যদিও এই টানবোধের কোনো কার্যকারণ নেই, তারপরও সে বোধ করে কোথাও একটা মায়া জড়িয়ে আছে এই মেয়েটার প্রতি। আঁধারিয়া গ্রাম, বেপারিবাড়ি, ভুঁইয়াবাড়ি, এমনকি তার আত্মীয়স্বজনদের কেউ তো তাকে এতটুকু সম্মান দিয়ে চলে না। সে অন্য মানুষের কথা আর কী ভাববে? তার নিজের ছেলে মনসুর পাগলার কথাই ধরা যাক। ডাঙর হয়ে কোনো দিন সে একটু ভালোভাবে কথা বলেনি। কথায় কথায় অপমান করে, উঠতে-বসতে তেড়ে আসে। কী আজব তার জীবনটা। একই ঘরের বাসিন্দা হয়ে যেন দূরের মানুষ তার ছেলে।
ছেলে মনসুর পাগলা ঠিক তার বাপের চরিত্রটাই পেয়েছে। বিয়ের পরপর স্বামী আসমত আলী বেপারি ঠিক একইরকম অপমান, লাঞ্ছনা ও মারধোর করত। বছরের অর্ধেকটা সময় থাকত দূরে, ব্যবসার কাজে। বাকি সময়টা যখন বাড়ি থাকত, তখন নিজের চাহিদা বাদে ঠিকমতো কথাও বলত না। কমলা খাতুন ভাবল, শরীরের আধাআধি চাহিদাই কি সব? মনের চাহিদা বলতে কিছু নেই? আর সেই মনের চাহিদার জন্যই তো সে গোপনে সুন্দর ভুঁইয়ার হাতটা ধরেছিল। কিন্তু সেই হাত ধরাও ছিল অনির্দিষ্ট। সুন্দর ভুঁইয়া তার জন্য নিজ সংসার ছাড়েনি। সব পুরুষরাই মনে হয় একরকম!
মনসুর পাগলা আড়াই বছরের ওপরে হলো জেলে পড়ে আছে। মাঝেমধ্যে তাকে জেল থেকে বের করে কোর্টে তোলা হয়। কিন্তু আজ পর্যন্ত তার জামিন হয়নি। ছেলের জামিনের জন্য তোড়জোড় কোনো চেষ্টা হয়েছে কি না, কমলা খাতুনের জানা নেই। সে শুনেছে, তার ছেলের জন্য আনিস প্রথম থেকেই একটা উকিল রেখেছে। উকিলের টাকাপয়সা আনিসই দিচ্ছে।
কমলা খাতুন এই আড়াই বছরে মনসুর পাগলাকে জেলে একবারও দেখতে যায়নি। এমনকি কোর্টে তোলার সময়ও না। তার যে যেতে ইচ্ছে করেনি, তা নয়। বেশ ইচ্ছে করেছে। পেটপোছা একমাত্র ছেলে তার। তার এই জীবনে ছেলেটা বাদে আর কে আছে? কিন্তু সে যায়নি। সে যায়নি ভয়ে। সে দেখা করতে গেলে জেলে বা কোর্টে সবার সামনে ছেলে যদি তাকে অপমান করে, তেড়ে মারতে আসে? নিজের ভেতর নিজের অসম্মানটা সহ্য করা যায়। কিন্তু অন্যের সামনে তা সহ্য করা যায় না।
কমলা খাতুন কুঁজো হয়ে বসা ছেড়ে আবার শুইবে বলে ভাবল। তার শরীরটা আবার ভেঙে আসছে। এখন মনে হয় একটু একটু জ্বর আসছে। সে শরীরটা চৌকিতে কাঁত করতে যাবে ঠিক তখনই দেখল, মমিনা পাটাতন পেরিয়ে ঘরে ঢুকছে।
কমলা খাতুন আবার বসল। তবে এবার কুঁজো হয়ে নয়, শরীর টানটান করে।
মমিনা সাধারণত ঘরে ঢুকেই হাঁকডাক দেয়, কেমন অধিকার খাটিয়ে কথা বলে। আজ এর কিছুই করল না। আস্তে করে চৌকিতে কমলা খাতুনের পাশে বসতে বসতে জিজ্ঞেস করল, ‘বড়চাচি, এই বেলায়ও খ্যাতা মুড়াইয়া আছো, শরীল খারাপ?
কমলা খাতুন মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘মনে হয়। নাক টানতাছে। শরীলডাও ম্যাজ ম্যাজ করতাছে।’
‘কও কী, ওষুধপাতি কিছু আছে?’
‘ওষুধপাতি থাকব কই থাইকা?’
‘ও, হেইডাও কথা। দাঁড়াও, আমি ওষুধপাতির ব্যবস্থা করমুনে। মীরবহরি বাজারে কাউরে পাঠাইমু।’
‘তা পরে পাঠাইস। অখনও তো জ্বরটর আসে নাই।’
‘ক্যামনে বুঝলা জ্বর আসে নাই?’— বলেই মমিনা কমলা খাতুনের কপালে হাত রাখল।
কমলা খাতুন বলল, ‘হাছাই কইতাছি। তুই এত উতালা হইস না।’
মমিনা বলল, ‘জ্বর ঠিক বুঝা যাইতাছে না। তবে গাও গরম হইয়া আইতাছে।’
কমলা খাতুন বলল, ‘আরে বাদ দে। বয়স হইছে। কত্ত কিছু হইব। আইচ্ছা শোন, বিহানবেলা তোগো বাড়ি থাইকা চিল্লাচিল্লি শুনলাম? কী হইছে?’
মমিনা মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেল। তারপর আস্তে করে বলল, ‘বড়চাচি, আমার কপাল। আমার কপাল পুইড়াছে।’
‘ক্যান, এই কথা ক্যান? জামাইর কিছু হইছে?’
‘জামাইর কিছু হয় নাই। জামাই গজব কাম করেছে।’
‘কী কস, কী কাম করেছে?’
‘গরু চুরি করেছে।’
কমলা খাতুন বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, ‘গরু চুরি, তোর জামাই?’
মমিনা মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘হ, বড়চাচি।’
‘ধ্যাত, কী আবোলতাবোল কস?’
‘আবোলতাবোল না। একদম হাছা।’
‘কার গরু চুরি করেছে?’
‘আমাগো দুইডা গরু আছে না, হেই দুইডা।’
কমলা খাতুন মাথা নেড়ে বলল, ‘না না, আমার মনে হয় না। মনে হয় তোর ভুল হইতাছে।’
মমিনা আবার চুপ হয়ে গেল। তারপর ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল।
কমলা খাতুন মমিনাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘কান্দে না মমিনা। তুই তো জানিস, তোর কান্দন আমি সহ্য করতে পারি না।’
মমিনা কান্না চাপাতে চাপাতে বলল, ‘আমি হাছাই কইতাছি, বড়চাচি। আমি হাছাই কইতাছি।’
কমলা খাতুন তবুও অবিশ্বাসের গলায় বলল, ‘তোর জামাই তো এমুন না। হেয় ক্যামনে গরু চুরি করল?’
মমিনা বলল, ‘দেনা, বড়চাচি, দেনা। পাওনাদাররা আমাগো বাড়িত আইসা ট্যাকার লাইগা অপমান করে। কারু কাছে ট্যাকা না পাইয়া চুরি করছে। আমি তো তারে জানি। হেয় এমুন কাম করত না। কিন্তুক কইরা তো ফালাইছে।’
‘তোর বাপের কাছেও ট্যাকাপইসা পাইল না?’
‘না, আমার বাপরে তো তুমি চিনো। হেয় কাউরে ট্যাকা দেওয়ার মানুষ?’
কমলা খাতুন মাথা ঝাঁকাল। বলল, ‘এমুন কিপ্টা মানুষ আমি এই জীবনে দেখি নাই।’
মমিনা বলল, ‘বড়চাচি, হেয় হুধা কি বাপের কাছে চাইছে, আমার বড়ভাইয়ের কাছেও চাইছে।
‘শওকতও না কইরা দিছে?’
‘হ, বড়চাচি। বড়ভাইয়ের কামাই-রোজগার তো তুমি জানোই। অইদিকে নাকি সংসারই চালাইতে পারে না। হেয় ট্যাকা দিবো কই থাইকা?’
‘তা বুঝতে পারি। কিন্তুক তোর জামাই...!’
মমিনা বলল, ‘অসহায় আছিল। আমি জানি, আমার নাক কাইট্টা গেছে। কিন্তুক আমি কী করমু, কও?’
কমলা খাতুন চুপ হয়ে গেল। সে কী সান্ত্বনা দিবে বুঝতে পারল না। তারপরও বলল, ‘বুঝতে পারতাছি, ঠেকায় পইড়া করছে রে মমিনা, ঠেকায় পইড়া করছে। কথায় আছে না, অভাবে পড়লে স্বভাবটা নষ্ট হইয়া যায়। তোর জামাইর হইছে হেইডা।’
মমিনা বলল, ‘আমার চিন্তা যে অন্যখানে।’
‘অন্যখানে মানে, কোনখানে?’
‘হেয় যদি ফিরা না আসে?’
‘ক্যান ফিরা আসব না?’
‘এত্তবড় একটা বদনাম কামাই কইরা গেছে। গরু চুরি!’
‘সময় হইলে সব ঠিক হইয়া যাইব, মমিনা।’
‘আমি জানি। কিন্তু হেয় এমুন ক্যান?’
‘হেয় মানে, কেডা, তোর জামাই তো?’
‘হ, বড়চাচি।’
‘তোর জামাইরে আমার খুব পছন্দ হইছিল। সহজ-সরল। তোরে খুব ভালা পায়। সংসারধর্ম একটুখানি কম বোঝে। এর লাগি তোর নিজে তারে আগলাইয়া রাখতে হইব।’
‘তা না হয় রাখলাম। হেয় ফিরা আইলেই হয়।’
‘আইব, আইব, তোর টানেই আইব।’
‘হেয় আইলে কি আমার বাপে তারে জায়গা দিব?’
‘তোর বাপের জায়গা দেওয়নের দরকার আছে কি? না খাইয়া থাকবি, তয় বাপের বাড়িত থাকবি না। তোর জামাইর অন্তত একখান ঘর তো আছে। দরকার হইলে দুইজনে মিইলে মাইনসের বাড়িত কামলা দিবি। তারপরও জামাইর বাড়ির মাটি কামড়াইয়া পইড়া থাকবি।’
মমিনা কমলা খাতুনের হাতটা চেপে ধরে বলল, ‘আমি হেইডাই করমু, বড়চাচি। আমি হেইডাই করমু।’ (ক্রমশ...)

আপনার মতামত লিখুন