কাজী নজরুল ইসলামের নাট্যচর্চা ঐশ্বর্যের প্রাতিস্বিকতায় অনন্য। তাঁর রচিত কয়েকটি নাটিকা ও গীতিনাটক রয়েছে। নাটিকা সংকলন ‘ঝিলিমিলি’তে রয়েছে— ‘ঝিলিমিলি’, ‘সেতুবন্ধ’ ও ‘শিল্পী’। ‘আলেয়া’ নজরুল রচিত গীতিনাট্য, কলকাতার পেশাদার রঙ্গমঞ্চে এ নাটকটি অভিনীত হয়েছিল। তাঁর ‘মধুমালা’ নাটকটিও তখন কলকাতার রঙ্গমঞ্চে মঞ্চস্থ হয়েছিল। ছোটদের জন্য লিখিত নজরুলের প্রধান নাটক ‘পুতুলের বিয়ে’। ভালোবাসার মাধ্যমে সকল বন্ধনকে ছিন্ন করার প্রয়াস লক্ষ্যণীয় ‘ঝিলিমিলি’ নাটকে। ব্যক্ত ও অব্যক্ত উভয় প্রেমের দেখা মেলে এ নাটকে। রূপকধর্মী ‘সেতুবন্ধ’ নাটকে যন্ত্রযুগের হুঙ্কারের প্রকাশ করা হয়েছে। যে হুঙ্কারে আকাশ-পাতালে যুদ্ধ বাঁধে; যে যুদ্ধে মানবতা ও যন্ত্র দু’পক্ষ। অ্যাবসার্ডধর্মী এ নাটকে যন্ত্রের করাল গ্রাসের নগ্নরূপ উদ্ভাসিত হয়েছে। মিথের ব্যবহারও লক্ষ্যণীয় এ নাটকে। জন্ম-মৃত্যুর মাঝে মানবজীবনের নানারঙ একজন শিল্পীর ক্যানভাসকে যেরকম রঙিন ও আলোকিত করতে পারে তা আর কোনো কিছুতে সম্ভব নয়। তারই দেখা মেলে ‘শিল্পী’ নাটকে। জীবনের রঙ আর জীবন ধর্মের কাছে পরাজিত চিত্রকরের হাহাকার মেশানো এ নাটকটি। সোনালি প্রভাত কিংবা অস্তগামী সূর্যের রঙকেও ম্রিয়মাণ করে দেয় জীবনরঙ— ‘শিল্পী’ নাটকে এ কথাটি বারবার ধ্বনিত হয়েছে।
বিশ শতকের অসম্ভবের সম্ভাবনার যুগে জন্ম কাজী নজরুল ইসলামের। সত্যের এ তূর্য বাদকের কণ্ঠে ছিলো মিথ্যার সাথে আপোসহীনতার সুর। সাম্প্রদায়িকতার শিকলকে ভেঙে অসাম্প্রদায়িকবোধসম্পন্ন এক ভারতবর্ষের সুর দৃপ্তকণ্ঠে। সামাজিক যূথবদ্ধতা, ধর্মীয় গোঁড়ামি আর দারিদ্র্যের পথকে সমতায় নিয়ে আসার প্রয়াস ছিলো তাঁর মধ্যে। দ্রোহের সঙ্গে প্রেম, ভালোবাসার গানও গেয়েছেন নজরুল। কারণ সাম্যের সুর তখনই বাজবে যখন ভালোবাসার কণ্ঠে তাকে ধারণ করা যাবে। কবিতা, উপন্যাস, গান, ছোটগল্পের পাশাপাশি নজরুল নাটকও রচনা করেছেন। প্রকৃতি, প্রেম, দ্রোহ, বিদ্রোহ আর মানবমনের ঐশ্বর্য দিয়ে নজরুল রচনা করেছেন তাঁর কাব্যভুবনকে আর বাঁধ ভাঙার অনন্য স্বর দিয়ে রচনা করেছেন তাঁর নাট্যভুবনকে। নজরুলের শিল্পীহৃদয়ে নাটক চর্চার আগ্রহ উল্লেখযোগ্য। নাটক রচনায় আগ্রহী নজরুল নাট্যকার মণ¥থ রায়কে লিখেছিলেন—
“এক বুক কাদা ভেঙে পথ চলে এক দিঘি পথ দেখলে দু’চোখে আনন্দ যেমন ধরে না, তেমনি আনন্দ দু’চোখ পুরে পান করেছি আপনার লেখায় কিংবা আমার মনে হয়, তাজমহল সৃষ্টির কল্পনাকে কেন্দ্র করে লেখা আপনার হাত দিয়ে যা বেরুবে তা সত্যিকার তাজমহলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে।” (মন্মথ রায়, উদার নজরুল স্মৃতি কথায় নজরুল)
নজরুলের নাটকের ভাষায় কাব্যের ছোঁয়া পাওয়া যায়, ফলে শ্রবণে ও দর্শনে নাটকগুলো হয়ে উঠেছে অনন্য। লেটো গানের দল নজরুলকে নাট্যকার করে তুলেছিল। বাংলার প্রাণের সুরকে সংলাপে ধারণ করে নজরুল বাংলা সাহিত্যে যুক্ত করেছেন অনন্য মাত্রা। পনেরো শতকের পূর্বকালে মেলা-উৎসবাদিতে সঙ চরিত্র কথা নাট্যের মাধ্যমে বিভিন্ন সামাজিক বিষয়কে উপস্থাপন করতো। এরপর ‘নাটগীত’ প্রচলিত হয়, যা থেকে ‘লেটো’-র জন্ম। নজরুলের নাট্যচর্চা ‘লেটো’ থেকেই শুরু হয়।
কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ঝিলিমিলি নাটকটি সাংকেতিক নাটক। সমাজের নির্মম বাস্তবতা ও প্রেম-ভালোবাসার অনন্য উদ্ভাসন রয়েছে এ নাটকে। হালিমা এবং মির্জা সাহেবের অসুস্থ ষোড়শী মেয়ে ফিরোজা। যাকে আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে অন্তঃপুরে। কেননা, ডাক্তার বলেছে বাইরের আবহাওয়া তার জন্য অনুকূল নয়। এমনকি সে জোরে পর্যন্ত কথা বলতে পারবে না। কেননা, জোরে কথা বললে অসুস্থতা বৃদ্ধি পায়। এটা শুধু আমাদের গ্রামীণ কুসংস্কারই নয়, বরং আরোপিত কুসংস্কার। ধর্মীয় আবহে কথিত রয়েছে, মেয়েদের নিম্ন স্বরে কথা বলতে হবে। তাই তার মা হালিমা বলেন— “লক্ষ্মী মা আমার! অত জোরে কথা কয়ো না। ওতে অসুখ বেশি হয়।” (কাজী নজরুল ইসলাম, ঝিলিমিলি)
ফিরোজা অসুস্থ শরীর নিয়ে তার মায়ের কাছে আবদার করে একটি গান শোনানোর জন্য, কিন্তু, তার মা তাকে বারবার নিষেধ করে যে, গান সে করবে না। কেননা, তার বাবা (মির্জা সাহেব) একজন রক্ষণশীল ব্যক্তি। সে শরীয়তের সব বিধিবিধান মেনে চলে। গান শুনলে তিনি রাগ করেন। কাজী নজরুল ইসলামের মৃত্যুক্ষুধা উপন্যাসের গজালের মার মেঝো ছেলে মারা যায়। তার মেজো বৌ খুব সুন্দর গান গাইতে পারে। কিন্তু, ধর্মের নিগঢ়ে আবদ্ধ মেঝো বৌয়ের গান গাইতে নিষেধ। ফিরোজার বদ্ধ ঘরে ভালো লাগে না। তার নিঃশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসে। শ্রাবণের গভীর গোপন ধারা যেমন ঝরঝর করে ঝরে তেমনি তার গোপন হিয়া গুমরিয়ে ওঠে প্রিয় বিরহে। তাই সে পুবের দিকের জানালা খুলে দিতে বলে। তার বাবা নিষেধ করে সেই জানালা খুলতে। কেননা ওদিকে বসবাস করে যুবক প্রেমিক হাবিব যে ফিরোজাকে ভালোবাসে। কিন্তু তার বাবা যুবকটিকে পছন্দ করে না।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অচলায়তন নাটকের মহাপঞ্চকের সাথে মির্জা সাহেবের মিল রয়েছে। পঞ্চক বারবার উত্তর দিকের জানালা না খোলার জন্য বলে। কেননা, ওখানে একটা দেবী থাকে কিন্তু শুভদ্র নামের একছাত্র জানালাটি খুলে দেয় এবং সে বাইরের নির্মল প্রকৃতি দেখতে পারে।
রবীন্দ্র নাটকে দাদা ঠাকুর যেমন মুক্তির প্রতীক; তেমনি নজরুলের ঝিলিমিলি নাটকে হাবিব মুক্তির প্রতীক। তাই সে শত অপমান সত্ত্বেও তার প্রেমিকা ফিরোজার কাছে ফিরে আসে তাকে মুক্তির আনন্দ দেওয়ার জন্য।
ডাকঘর নাটকের অমল মৃত্যুবরণ করে যেমন বিশ্বের সাথে মিলে গিয়েছে, তেমনি ফিরোজাও মৃত্যুর মধ্য দিয়ে নিখিল বিরহীদের মাঝে মিশে গিয়েছেন। অর্থাৎ ফিরোজার প্রেম সর্বব্যাপ্তিতা লাভ করেছে মৃত্যুর মাধ্যমে। জীবনে যে সাধ পূর্ণ হয়নি, যে প্রেমের তৃষ্ণা মেটেনি, মিলন না ঘটলে সে অপূর্ব সাধের মৃত্যু নেই। অনন্তলোকে অনন্তরূপে প্রেমিক-প্রেমিকার আঁখি তাঁরা হয়ে আকাশে জেগে থাকে।
ঝিলিমিলি’তে বাস্তব ও স্বপ্নলোকের দেখা পাওয়া যায়। হাবিব ও ফিরোজার ভালোবাসার আমিত্ব উদার বিশ্বের জয়গান গেয়েছে। অতীন্দ্রিয়লোকের উন্মেষে প্রেম পায় মিলন। এ সম্পর্কে—
বাস্তবধর্মী একটি আখ্যানকে এই নাটকে নাট্যকার সাংকেতিকতায় মণ্ডিত করতে চেয়েছেন এবং ‘ঝিলিমিলি’তে ফিরোজা ও হাবিবের হৃদয়ের বিনিময় ঘটে, কিন্তু সামাজিক জীবনে তাদের মিলন হয়নি। নাট্যকার সম্ভবত এই বলতে চেয়েছেন, সংসাররূপ ঝিলিমিলি অতিক্রম করেই স্বপ্নলোকে তাদের মিলন ঘটতে পারে। (মোবাশ্বের আলী, নজরুল প্রতিভা : নাট্যকার নজরুল)
কাজী নজরুল ইসলামের সেতুবন্ধ নাটেক তিনি নির্জীব পদার্থের ভিতরেও প্রাণ সঞ্চার করেছেন। এখানে, ইট, কাঠ, পাথর, যন্ত্র, সেতু, মেঘ, বৃষ্টির ধারা প্রভৃতিগুলো তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে বিদ্রোহ করেছে। যেমনটি আমরা দেখি মরিস মেটার লিংকের নীল পাখি নাটকে। যেখানে, রুটি, কুকুর, আলো, চিনি প্রভৃতি চরিত্রগুলো সাহায্য করেছে তিলতিল এবং মিতিলকে নীল পাখি অনুসন্ধান করতে। যেমন— “কোন যুক্তি নেই,... আমি মানুষকে ভালোবাসি, এই ই যথেষ্ট!” (মরিস মেটারলিংক, ব্লু বার্ড, অনুবাদক: আতাউর রহমান, নীল পাখি)
এই নাটকে পদ্মার ওপর একটি সেতু নির্মাণের চিন্তা করেন যান্ত্রিক সভ্যতার ব্যক্তিবর্গ অর্থাৎ যন্ত্রপতিরা। তাই দেখে প্রকৃতির রাজা মেঘ ভয়াবহ দুশ্চিন্তায় পড়ে। কেননা, পরিবেশের ভারসাম্য বলে একটি কথা, যাকে বলা হয় ইকো ক্রিটিসিজম, কিন্তু যন্ত্ররাজ প্রকৃতির ভারসাম্যকে ব্যাহত করছে।
যান্ত্রিক সভ্যতা মানুষকে যন্ত্রে পরিণত করে, পৃথিবীকে করে বস্তুময়। যেমনটি আমরা রক্তকরবী নাটকে দেখি, যে যন্ত্রসভ্যতায় মানুষকেও যান্ত্রিক করে তোলে। তাই মানুষের নামের পরিবর্তে ব্যবহৃত হয় সংখ্যা। বিশু যেমন বলেন— “আমি ৬৯ ঙ। গাঁয়ে ছিলুম মানুষ। এখানে হয়েছি দশ-পঁচিশের ছক বুকের ওপর দিয়ে জুয়াখেলা চলছে।” (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রক্তকরবী)। তেমনি সেতু বন্ধ নাটকে ইট, পাথর, কংক্রিট বিশ্বকে যান্ত্রিক করে তুলেছে। বিশ্বের ভেতরে কেনো আত্মিকতার ছোঁয়া নেই। সবকিছু যেন যন্ত্রপা গ্রাস করছে। যেমন—
নমো হে নমো যন্ত্রপতি নমো নমো অশান্ত,
তন্ত্রে তব এতে ধরা, সৃষ্টি পথভ্রান্ত
বিশ্ব হল বস্তুময়
মন্ত্রে তব হে
নন্দ-আনন্দে তুমি
গ্রাসিলে মহাধবান্ত।
(কাজী নজরুল ইসলাম, সেতুবন্ধ)
পরাজিত হয়েও যন্ত্রের গর্বের শেষ নাই। একধরনের পৈশাচিক লোভ তার সর্বত্র। কেননা, তাকে সমূলে উৎপাটন করা যাবে না। তার ভারে পৃথিবীর মানুষ বিপন্ন।
তিন অঙ্কবিশিষ্ট এ নাটকে রূপকের মধ্য দিয়ে ধনতন্ত্র ও যন্ত্রবাদের করাল গ্রাসকে লেখক অভিনব শিল্পকুশলতায় ফুটিয়ে তুলেছেন। প্রথম দৃশ্যে গান্ধর্বলোকের পদ্মাদেবী ও যন্ত্রপাতির ষড়যন্ত্র, দ্বিতীয় দৃশ্যে যন্ত্রপাতির সৈন্যসামন্তের দাপটকে নানাভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সেতুবন্ধ নাটকে মানবশক্তি ও প্রকৃতিশক্তির দ্বন্দ্ব উপস্থাপিত হয়েছে নানাভাবে। এ সম্পর্কে—
সেতুবন্ধ এ প্রকৃতিবাদী নজরুল, পরিবেশবাদী নজরুল, মানবতাবাদী নজরুল, বৈজ্ঞানিক নজরুলের যথার্থ দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি সেতুর গুরুত্ব অনুধাবন করেছিলেন। তবে প্রবলভাবে বিরোধিতা করেছিলেন পদ্মা নদীর স্বাভাবিক স্রোতধারা বন্ধের কারণে মানুষ ও পশুর অস্তিত্ব বিনাশী আয়োজনের। (অনুপম হায়াৎ, নাট্যকার নজরুল)
অপরাধ যত বড় হয় সমাধানের রাস্তা ততই সরল হয়। তাই পৃথিবীতে যখন অন্যায় অরাজকতায় ভরে যায়, তখনি দুষ্টের দমনের জন্য কেউ না কেউ আবির্ভূত হয়।
শিল্পী নাটকের চিত্রকরের স্ত্রী লায়লি শয্যা-শায়িত। সে তার স্বামীকে সর্বদা কাছে পেতে চায়। কিন্তু, তার স্বামী তার চিত্রকর্ম নিয়েই ব্যস্ত থাকে। তাই চিত্রকর্মকে তার সতীন মনে হয়। লায়লি অনেক স্বপ্ন নিয়ে চিত্রকরকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিল। কিন্তু বিয়ে করার পর তার স্বপ্ন আর বাস্তবতার দ্বন্দ্ব দেখা যায়। দ্বন্দ্ব দেখা যায় শিল্পী সিরাজ আর মানুষ সিরাজকে নিয়ে। কেননা, তার কাছে শিল্পী সিরাজ থেকে মানুষ সিরাজ কাম্য বেশি। নাটকটির ক্লাইম্যাক্স-এর ঘনঘটা এ দ্বন্দ্ব থেকেই জন্ম নিয়েছে। যেমন—
দূর থেকে তুমি ভালোবেসেছিলে শিল্পীকে, কাছে এসে পেতে চাও সিরাজকে, মানুষকে।... এটাই তোমাদের নারীর ধর্ম তোমার আকাশের জ্যোতিষ্ক হতে চাও না— হতে চাও মাটির ফুল। (কাজী নজরুল ইসলাম, শিল্পী)
শিল্পীর কাছে মানুষের সুখ, দুঃখ, হাসি-কান্নার কোনো মূল্য থাকে না। তারা সত্য, সুন্দর, মঙ্গলের পূজারী। তাদের যৌবন চিরজীবন, কখনো বার্ধক্য উঁকি মারে না তাদের অন্তর্লোকে।
একজন শিল্পীর মন প্রাতিস্বিকতায় উদ্ভাসিত থাকে। তাই সে প্রেমিক এবং স্ত্রীকে মনে ঠাঁই দিতে পারে ভিন্ন ভিন্ন রূপে। রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসে অমিত যেমন তার স্ত্রী এবং লাবণ্যকে মনের অধিকার দিয়েছিলো, তেমনি সিরাজ চিত্রাকে। চিত্রার সাথে তার মানসিক সম্পর্ক, যে সম্পর্ক সুন্দর নয় অপূর্ব— হয়তো হবে, তবে মনে হয় তুমি সুন্দর, চিত্রা অপূর্ব।
সিরাজ তার সমস্ত বন্ধন ছিন্ন করে চলে যাওয়ার পূর্ব মুহূর্তে জানতে পারে তার স্ত্রীও একজন শিল্পী। সে তিলতিল করে তার স্বামীর চিত্র অঙ্কন করেছে। তবে লায়লা জীবন ধর্মে বিশ্বাসী আর সিরাজ শিল্পধর্মে বিশ্বাসী। কিন্তু এ ভুল তার একদিন ভাঙ্গে। কেননা, শিল্পধর্ম জীবনধর্মের সাথে মিশ্রিত হলেই যথার্থ শিল্পী হওয়া যায়, অন্যথায় নয়। কারণ জীবনের চেয়ে বড় শিল্প পৃথিবীতে আর কিছু হতে পারে না।
নজরুল এ নাটকে নারীর চিরন্তন ধর্মের উন্মেষ ঘটিয়েছেন। নারীর কান্না, পুরুষ ধ্যান, নারীর অভিসম্পাত মিলে যে আনন্দ শিল্প পৃথিবীর বুকে সৃষ্টি হচ্ছে যুগ যুগে তার জয়গান করেছেন কাজী নজরুল। আত্মমগ্ন সিরাজ আর শিল্পের পূজারী লায়লীর জয়ী আর পরাজয়ী হওয়ার কথা রয়েছে এ নাটকে। বিমুক্ত শিল্পীসত্তা ও সংসার নির্ভর মানসিক বন্ধন এই দ্বন্দ্বের পটভূমিতে শিল্পী’র কাহিনী নির্মিত হয়েছে।
ঝিলিমিলি গ্রন্থে নিবন্ধিত তিনটি নাটকে নজরুলের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত হয়েছে। সকল অমানবিক ও প্রেমহীন সম্পর্কের সমাপ্তি ঘটিয়েছেন তিনি। সাম্য, প্রেম, প্রতিবাদ ও আত্মমর্যাদায় নজরুলের নাটকত্রয়ী শাশ্বতকালের স্বরকে অবলম্বন করেছে। ব্যক্তিগত আবেগকে ছাপিয়ে মুক্তির ব্যঞ্জনা ধ্বনিত হয়েছে তাঁর নাটকে। বাঙালির শাশ্বতকালের স্বরকে খুঁজে পাওয়া গেলেও বাংলা নাট্যসাহিত্যে নজরুলের নাটকগুলো বহুল চর্চিত নয়; যেটা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তাঁর নাট্যসাহিত্য পুনঃপাঠ ও মঞ্চায়নের মাধ্যমে নজরুলের সাহিত্যিক সত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নতুনভাবে আবিষ্কার করা সম্ভব।

বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কাজী নজরুল ইসলামের নাট্যচর্চা ঐশ্বর্যের প্রাতিস্বিকতায় অনন্য। তাঁর রচিত কয়েকটি নাটিকা ও গীতিনাটক রয়েছে। নাটিকা সংকলন ‘ঝিলিমিলি’তে রয়েছে— ‘ঝিলিমিলি’, ‘সেতুবন্ধ’ ও ‘শিল্পী’। ‘আলেয়া’ নজরুল রচিত গীতিনাট্য, কলকাতার পেশাদার রঙ্গমঞ্চে এ নাটকটি অভিনীত হয়েছিল। তাঁর ‘মধুমালা’ নাটকটিও তখন কলকাতার রঙ্গমঞ্চে মঞ্চস্থ হয়েছিল। ছোটদের জন্য লিখিত নজরুলের প্রধান নাটক ‘পুতুলের বিয়ে’। ভালোবাসার মাধ্যমে সকল বন্ধনকে ছিন্ন করার প্রয়াস লক্ষ্যণীয় ‘ঝিলিমিলি’ নাটকে। ব্যক্ত ও অব্যক্ত উভয় প্রেমের দেখা মেলে এ নাটকে। রূপকধর্মী ‘সেতুবন্ধ’ নাটকে যন্ত্রযুগের হুঙ্কারের প্রকাশ করা হয়েছে। যে হুঙ্কারে আকাশ-পাতালে যুদ্ধ বাঁধে; যে যুদ্ধে মানবতা ও যন্ত্র দু’পক্ষ। অ্যাবসার্ডধর্মী এ নাটকে যন্ত্রের করাল গ্রাসের নগ্নরূপ উদ্ভাসিত হয়েছে। মিথের ব্যবহারও লক্ষ্যণীয় এ নাটকে। জন্ম-মৃত্যুর মাঝে মানবজীবনের নানারঙ একজন শিল্পীর ক্যানভাসকে যেরকম রঙিন ও আলোকিত করতে পারে তা আর কোনো কিছুতে সম্ভব নয়। তারই দেখা মেলে ‘শিল্পী’ নাটকে। জীবনের রঙ আর জীবন ধর্মের কাছে পরাজিত চিত্রকরের হাহাকার মেশানো এ নাটকটি। সোনালি প্রভাত কিংবা অস্তগামী সূর্যের রঙকেও ম্রিয়মাণ করে দেয় জীবনরঙ— ‘শিল্পী’ নাটকে এ কথাটি বারবার ধ্বনিত হয়েছে।
বিশ শতকের অসম্ভবের সম্ভাবনার যুগে জন্ম কাজী নজরুল ইসলামের। সত্যের এ তূর্য বাদকের কণ্ঠে ছিলো মিথ্যার সাথে আপোসহীনতার সুর। সাম্প্রদায়িকতার শিকলকে ভেঙে অসাম্প্রদায়িকবোধসম্পন্ন এক ভারতবর্ষের সুর দৃপ্তকণ্ঠে। সামাজিক যূথবদ্ধতা, ধর্মীয় গোঁড়ামি আর দারিদ্র্যের পথকে সমতায় নিয়ে আসার প্রয়াস ছিলো তাঁর মধ্যে। দ্রোহের সঙ্গে প্রেম, ভালোবাসার গানও গেয়েছেন নজরুল। কারণ সাম্যের সুর তখনই বাজবে যখন ভালোবাসার কণ্ঠে তাকে ধারণ করা যাবে। কবিতা, উপন্যাস, গান, ছোটগল্পের পাশাপাশি নজরুল নাটকও রচনা করেছেন। প্রকৃতি, প্রেম, দ্রোহ, বিদ্রোহ আর মানবমনের ঐশ্বর্য দিয়ে নজরুল রচনা করেছেন তাঁর কাব্যভুবনকে আর বাঁধ ভাঙার অনন্য স্বর দিয়ে রচনা করেছেন তাঁর নাট্যভুবনকে। নজরুলের শিল্পীহৃদয়ে নাটক চর্চার আগ্রহ উল্লেখযোগ্য। নাটক রচনায় আগ্রহী নজরুল নাট্যকার মণ¥থ রায়কে লিখেছিলেন—
“এক বুক কাদা ভেঙে পথ চলে এক দিঘি পথ দেখলে দু’চোখে আনন্দ যেমন ধরে না, তেমনি আনন্দ দু’চোখ পুরে পান করেছি আপনার লেখায় কিংবা আমার মনে হয়, তাজমহল সৃষ্টির কল্পনাকে কেন্দ্র করে লেখা আপনার হাত দিয়ে যা বেরুবে তা সত্যিকার তাজমহলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে।” (মন্মথ রায়, উদার নজরুল স্মৃতি কথায় নজরুল)
নজরুলের নাটকের ভাষায় কাব্যের ছোঁয়া পাওয়া যায়, ফলে শ্রবণে ও দর্শনে নাটকগুলো হয়ে উঠেছে অনন্য। লেটো গানের দল নজরুলকে নাট্যকার করে তুলেছিল। বাংলার প্রাণের সুরকে সংলাপে ধারণ করে নজরুল বাংলা সাহিত্যে যুক্ত করেছেন অনন্য মাত্রা। পনেরো শতকের পূর্বকালে মেলা-উৎসবাদিতে সঙ চরিত্র কথা নাট্যের মাধ্যমে বিভিন্ন সামাজিক বিষয়কে উপস্থাপন করতো। এরপর ‘নাটগীত’ প্রচলিত হয়, যা থেকে ‘লেটো’-র জন্ম। নজরুলের নাট্যচর্চা ‘লেটো’ থেকেই শুরু হয়।
কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ঝিলিমিলি নাটকটি সাংকেতিক নাটক। সমাজের নির্মম বাস্তবতা ও প্রেম-ভালোবাসার অনন্য উদ্ভাসন রয়েছে এ নাটকে। হালিমা এবং মির্জা সাহেবের অসুস্থ ষোড়শী মেয়ে ফিরোজা। যাকে আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে অন্তঃপুরে। কেননা, ডাক্তার বলেছে বাইরের আবহাওয়া তার জন্য অনুকূল নয়। এমনকি সে জোরে পর্যন্ত কথা বলতে পারবে না। কেননা, জোরে কথা বললে অসুস্থতা বৃদ্ধি পায়। এটা শুধু আমাদের গ্রামীণ কুসংস্কারই নয়, বরং আরোপিত কুসংস্কার। ধর্মীয় আবহে কথিত রয়েছে, মেয়েদের নিম্ন স্বরে কথা বলতে হবে। তাই তার মা হালিমা বলেন— “লক্ষ্মী মা আমার! অত জোরে কথা কয়ো না। ওতে অসুখ বেশি হয়।” (কাজী নজরুল ইসলাম, ঝিলিমিলি)
ফিরোজা অসুস্থ শরীর নিয়ে তার মায়ের কাছে আবদার করে একটি গান শোনানোর জন্য, কিন্তু, তার মা তাকে বারবার নিষেধ করে যে, গান সে করবে না। কেননা, তার বাবা (মির্জা সাহেব) একজন রক্ষণশীল ব্যক্তি। সে শরীয়তের সব বিধিবিধান মেনে চলে। গান শুনলে তিনি রাগ করেন। কাজী নজরুল ইসলামের মৃত্যুক্ষুধা উপন্যাসের গজালের মার মেঝো ছেলে মারা যায়। তার মেজো বৌ খুব সুন্দর গান গাইতে পারে। কিন্তু, ধর্মের নিগঢ়ে আবদ্ধ মেঝো বৌয়ের গান গাইতে নিষেধ। ফিরোজার বদ্ধ ঘরে ভালো লাগে না। তার নিঃশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসে। শ্রাবণের গভীর গোপন ধারা যেমন ঝরঝর করে ঝরে তেমনি তার গোপন হিয়া গুমরিয়ে ওঠে প্রিয় বিরহে। তাই সে পুবের দিকের জানালা খুলে দিতে বলে। তার বাবা নিষেধ করে সেই জানালা খুলতে। কেননা ওদিকে বসবাস করে যুবক প্রেমিক হাবিব যে ফিরোজাকে ভালোবাসে। কিন্তু তার বাবা যুবকটিকে পছন্দ করে না।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অচলায়তন নাটকের মহাপঞ্চকের সাথে মির্জা সাহেবের মিল রয়েছে। পঞ্চক বারবার উত্তর দিকের জানালা না খোলার জন্য বলে। কেননা, ওখানে একটা দেবী থাকে কিন্তু শুভদ্র নামের একছাত্র জানালাটি খুলে দেয় এবং সে বাইরের নির্মল প্রকৃতি দেখতে পারে।
রবীন্দ্র নাটকে দাদা ঠাকুর যেমন মুক্তির প্রতীক; তেমনি নজরুলের ঝিলিমিলি নাটকে হাবিব মুক্তির প্রতীক। তাই সে শত অপমান সত্ত্বেও তার প্রেমিকা ফিরোজার কাছে ফিরে আসে তাকে মুক্তির আনন্দ দেওয়ার জন্য।
ডাকঘর নাটকের অমল মৃত্যুবরণ করে যেমন বিশ্বের সাথে মিলে গিয়েছে, তেমনি ফিরোজাও মৃত্যুর মধ্য দিয়ে নিখিল বিরহীদের মাঝে মিশে গিয়েছেন। অর্থাৎ ফিরোজার প্রেম সর্বব্যাপ্তিতা লাভ করেছে মৃত্যুর মাধ্যমে। জীবনে যে সাধ পূর্ণ হয়নি, যে প্রেমের তৃষ্ণা মেটেনি, মিলন না ঘটলে সে অপূর্ব সাধের মৃত্যু নেই। অনন্তলোকে অনন্তরূপে প্রেমিক-প্রেমিকার আঁখি তাঁরা হয়ে আকাশে জেগে থাকে।
ঝিলিমিলি’তে বাস্তব ও স্বপ্নলোকের দেখা পাওয়া যায়। হাবিব ও ফিরোজার ভালোবাসার আমিত্ব উদার বিশ্বের জয়গান গেয়েছে। অতীন্দ্রিয়লোকের উন্মেষে প্রেম পায় মিলন। এ সম্পর্কে—
বাস্তবধর্মী একটি আখ্যানকে এই নাটকে নাট্যকার সাংকেতিকতায় মণ্ডিত করতে চেয়েছেন এবং ‘ঝিলিমিলি’তে ফিরোজা ও হাবিবের হৃদয়ের বিনিময় ঘটে, কিন্তু সামাজিক জীবনে তাদের মিলন হয়নি। নাট্যকার সম্ভবত এই বলতে চেয়েছেন, সংসাররূপ ঝিলিমিলি অতিক্রম করেই স্বপ্নলোকে তাদের মিলন ঘটতে পারে। (মোবাশ্বের আলী, নজরুল প্রতিভা : নাট্যকার নজরুল)
কাজী নজরুল ইসলামের সেতুবন্ধ নাটেক তিনি নির্জীব পদার্থের ভিতরেও প্রাণ সঞ্চার করেছেন। এখানে, ইট, কাঠ, পাথর, যন্ত্র, সেতু, মেঘ, বৃষ্টির ধারা প্রভৃতিগুলো তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে বিদ্রোহ করেছে। যেমনটি আমরা দেখি মরিস মেটার লিংকের নীল পাখি নাটকে। যেখানে, রুটি, কুকুর, আলো, চিনি প্রভৃতি চরিত্রগুলো সাহায্য করেছে তিলতিল এবং মিতিলকে নীল পাখি অনুসন্ধান করতে। যেমন— “কোন যুক্তি নেই,... আমি মানুষকে ভালোবাসি, এই ই যথেষ্ট!” (মরিস মেটারলিংক, ব্লু বার্ড, অনুবাদক: আতাউর রহমান, নীল পাখি)
এই নাটকে পদ্মার ওপর একটি সেতু নির্মাণের চিন্তা করেন যান্ত্রিক সভ্যতার ব্যক্তিবর্গ অর্থাৎ যন্ত্রপতিরা। তাই দেখে প্রকৃতির রাজা মেঘ ভয়াবহ দুশ্চিন্তায় পড়ে। কেননা, পরিবেশের ভারসাম্য বলে একটি কথা, যাকে বলা হয় ইকো ক্রিটিসিজম, কিন্তু যন্ত্ররাজ প্রকৃতির ভারসাম্যকে ব্যাহত করছে।
যান্ত্রিক সভ্যতা মানুষকে যন্ত্রে পরিণত করে, পৃথিবীকে করে বস্তুময়। যেমনটি আমরা রক্তকরবী নাটকে দেখি, যে যন্ত্রসভ্যতায় মানুষকেও যান্ত্রিক করে তোলে। তাই মানুষের নামের পরিবর্তে ব্যবহৃত হয় সংখ্যা। বিশু যেমন বলেন— “আমি ৬৯ ঙ। গাঁয়ে ছিলুম মানুষ। এখানে হয়েছি দশ-পঁচিশের ছক বুকের ওপর দিয়ে জুয়াখেলা চলছে।” (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রক্তকরবী)। তেমনি সেতু বন্ধ নাটকে ইট, পাথর, কংক্রিট বিশ্বকে যান্ত্রিক করে তুলেছে। বিশ্বের ভেতরে কেনো আত্মিকতার ছোঁয়া নেই। সবকিছু যেন যন্ত্রপা গ্রাস করছে। যেমন—
নমো হে নমো যন্ত্রপতি নমো নমো অশান্ত,
তন্ত্রে তব এতে ধরা, সৃষ্টি পথভ্রান্ত
বিশ্ব হল বস্তুময়
মন্ত্রে তব হে
নন্দ-আনন্দে তুমি
গ্রাসিলে মহাধবান্ত।
(কাজী নজরুল ইসলাম, সেতুবন্ধ)
পরাজিত হয়েও যন্ত্রের গর্বের শেষ নাই। একধরনের পৈশাচিক লোভ তার সর্বত্র। কেননা, তাকে সমূলে উৎপাটন করা যাবে না। তার ভারে পৃথিবীর মানুষ বিপন্ন।
তিন অঙ্কবিশিষ্ট এ নাটকে রূপকের মধ্য দিয়ে ধনতন্ত্র ও যন্ত্রবাদের করাল গ্রাসকে লেখক অভিনব শিল্পকুশলতায় ফুটিয়ে তুলেছেন। প্রথম দৃশ্যে গান্ধর্বলোকের পদ্মাদেবী ও যন্ত্রপাতির ষড়যন্ত্র, দ্বিতীয় দৃশ্যে যন্ত্রপাতির সৈন্যসামন্তের দাপটকে নানাভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সেতুবন্ধ নাটকে মানবশক্তি ও প্রকৃতিশক্তির দ্বন্দ্ব উপস্থাপিত হয়েছে নানাভাবে। এ সম্পর্কে—
সেতুবন্ধ এ প্রকৃতিবাদী নজরুল, পরিবেশবাদী নজরুল, মানবতাবাদী নজরুল, বৈজ্ঞানিক নজরুলের যথার্থ দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি সেতুর গুরুত্ব অনুধাবন করেছিলেন। তবে প্রবলভাবে বিরোধিতা করেছিলেন পদ্মা নদীর স্বাভাবিক স্রোতধারা বন্ধের কারণে মানুষ ও পশুর অস্তিত্ব বিনাশী আয়োজনের। (অনুপম হায়াৎ, নাট্যকার নজরুল)
অপরাধ যত বড় হয় সমাধানের রাস্তা ততই সরল হয়। তাই পৃথিবীতে যখন অন্যায় অরাজকতায় ভরে যায়, তখনি দুষ্টের দমনের জন্য কেউ না কেউ আবির্ভূত হয়।
শিল্পী নাটকের চিত্রকরের স্ত্রী লায়লি শয্যা-শায়িত। সে তার স্বামীকে সর্বদা কাছে পেতে চায়। কিন্তু, তার স্বামী তার চিত্রকর্ম নিয়েই ব্যস্ত থাকে। তাই চিত্রকর্মকে তার সতীন মনে হয়। লায়লি অনেক স্বপ্ন নিয়ে চিত্রকরকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিল। কিন্তু বিয়ে করার পর তার স্বপ্ন আর বাস্তবতার দ্বন্দ্ব দেখা যায়। দ্বন্দ্ব দেখা যায় শিল্পী সিরাজ আর মানুষ সিরাজকে নিয়ে। কেননা, তার কাছে শিল্পী সিরাজ থেকে মানুষ সিরাজ কাম্য বেশি। নাটকটির ক্লাইম্যাক্স-এর ঘনঘটা এ দ্বন্দ্ব থেকেই জন্ম নিয়েছে। যেমন—
দূর থেকে তুমি ভালোবেসেছিলে শিল্পীকে, কাছে এসে পেতে চাও সিরাজকে, মানুষকে।... এটাই তোমাদের নারীর ধর্ম তোমার আকাশের জ্যোতিষ্ক হতে চাও না— হতে চাও মাটির ফুল। (কাজী নজরুল ইসলাম, শিল্পী)
শিল্পীর কাছে মানুষের সুখ, দুঃখ, হাসি-কান্নার কোনো মূল্য থাকে না। তারা সত্য, সুন্দর, মঙ্গলের পূজারী। তাদের যৌবন চিরজীবন, কখনো বার্ধক্য উঁকি মারে না তাদের অন্তর্লোকে।
একজন শিল্পীর মন প্রাতিস্বিকতায় উদ্ভাসিত থাকে। তাই সে প্রেমিক এবং স্ত্রীকে মনে ঠাঁই দিতে পারে ভিন্ন ভিন্ন রূপে। রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসে অমিত যেমন তার স্ত্রী এবং লাবণ্যকে মনের অধিকার দিয়েছিলো, তেমনি সিরাজ চিত্রাকে। চিত্রার সাথে তার মানসিক সম্পর্ক, যে সম্পর্ক সুন্দর নয় অপূর্ব— হয়তো হবে, তবে মনে হয় তুমি সুন্দর, চিত্রা অপূর্ব।
সিরাজ তার সমস্ত বন্ধন ছিন্ন করে চলে যাওয়ার পূর্ব মুহূর্তে জানতে পারে তার স্ত্রীও একজন শিল্পী। সে তিলতিল করে তার স্বামীর চিত্র অঙ্কন করেছে। তবে লায়লা জীবন ধর্মে বিশ্বাসী আর সিরাজ শিল্পধর্মে বিশ্বাসী। কিন্তু এ ভুল তার একদিন ভাঙ্গে। কেননা, শিল্পধর্ম জীবনধর্মের সাথে মিশ্রিত হলেই যথার্থ শিল্পী হওয়া যায়, অন্যথায় নয়। কারণ জীবনের চেয়ে বড় শিল্প পৃথিবীতে আর কিছু হতে পারে না।
নজরুল এ নাটকে নারীর চিরন্তন ধর্মের উন্মেষ ঘটিয়েছেন। নারীর কান্না, পুরুষ ধ্যান, নারীর অভিসম্পাত মিলে যে আনন্দ শিল্প পৃথিবীর বুকে সৃষ্টি হচ্ছে যুগ যুগে তার জয়গান করেছেন কাজী নজরুল। আত্মমগ্ন সিরাজ আর শিল্পের পূজারী লায়লীর জয়ী আর পরাজয়ী হওয়ার কথা রয়েছে এ নাটকে। বিমুক্ত শিল্পীসত্তা ও সংসার নির্ভর মানসিক বন্ধন এই দ্বন্দ্বের পটভূমিতে শিল্পী’র কাহিনী নির্মিত হয়েছে।
ঝিলিমিলি গ্রন্থে নিবন্ধিত তিনটি নাটকে নজরুলের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত হয়েছে। সকল অমানবিক ও প্রেমহীন সম্পর্কের সমাপ্তি ঘটিয়েছেন তিনি। সাম্য, প্রেম, প্রতিবাদ ও আত্মমর্যাদায় নজরুলের নাটকত্রয়ী শাশ্বতকালের স্বরকে অবলম্বন করেছে। ব্যক্তিগত আবেগকে ছাপিয়ে মুক্তির ব্যঞ্জনা ধ্বনিত হয়েছে তাঁর নাটকে। বাঙালির শাশ্বতকালের স্বরকে খুঁজে পাওয়া গেলেও বাংলা নাট্যসাহিত্যে নজরুলের নাটকগুলো বহুল চর্চিত নয়; যেটা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তাঁর নাট্যসাহিত্য পুনঃপাঠ ও মঞ্চায়নের মাধ্যমে নজরুলের সাহিত্যিক সত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নতুনভাবে আবিষ্কার করা সম্ভব।

আপনার মতামত লিখুন