মনে পড়ে
মহাদেব সাহা
এখন শুধু মনে পড়ে আর মনে পড়ে
মনে পড়ে মেঘ, মনে পড়ে চাঁদ,
জলের ধারা কেমন ছিলো—
সেসব কথাই মনে পড়ে;
এখন শুধু মনে পড়ে, নদীর কথা মনে পড়ে,
তোমার কথা মনে পড়ে,
এখন এই গভীর রাতে মনে পড়ে
তোমার মুখ, তোমার ছায়া,
তোমার বাড়ির ভেতর-মহল,
তোমার উঠোন, সন্ধ্যাতারা
এখন শুধু মনে পড়ে, তোমার কথা মনে পড়ে;
তোমার কথা মনে পড়ে
অনেক কথা মনে পড়ে,
এখন শুধু মনে পড়ে, এখন শুধু মনে পড়ে;
এখন শুধু মনে পড়ে আর মনে পড়ে
আকাশে মেঘ থেকে থেকে
এখন বুঝি বৃষ্টি ঝরে।
পূর্ণিমার মধ্যে মৃত্যু
নির্মলেন্দু গুণ
একদিন চাঁদ উঠবে না, সকাল দুপুরগুলো
মরীচিকায় স্থির হয়ে রবে;
একদিন অন্ধকার সারাবেলা প্রিয় বন্ধু হবে,
একদিন সারাদিন সূর্য উঠবে না।
একদিন চুল কাটতে যাবো না সেলুনে
একদিন নিদ্রাহীন চোখে পড়বে ধুলো।
একদিন কালো চুলগুলো খ’সে যাবে,
কিছুতেই গন্ধরাজ ফুল ফুটবে না।
একদিন জনসংখ্যা কম হবে এ শহরে,
ট্রেনের টিকিট কেটে
একটি মানুষ কাশবনে গ্রামে ফিরবে না।
একদিন পরাজিত হবো।
একদিন কোথাও যাবো না, শূন্যস্থানে তুমি
কিংবা অন্য কেউ বসে থেকে বাড়াবে বয়স।
একদিন তোমাকে শাসন করা অসম্ভব ভেবে
পূর্ণিমার রাত্রে ম’রে যাবো।
একদিন সারাদিন কোথাও যাবো না।
জ্যোৎস্নাঝারি
ফারুক মাহমুদ
শরতের চোখ থেকে যখন কুয়াশা ঝরে পড়ে
ওকে বলি জ্যোৎস্নাঝারি। ওর হেসে থাকা হাসিগুলো
ছুঁয়ে দেখে শেফালির মৃদু মুখ, আরো বেশি ঝরে
সরলরেখার মতো কিছু কথা— শুভ উপাচার
শিশির ভিজেছে নিজে, সকালের গল্পগুলো শোনে
নির্জন চোখের মতো হেসে থাকে রোদের চিবুক
লোভের সামান্য কাজ! প্রাপ্যতাকে যারা দীর্ঘ গোনে
তাদের শান্তির পাশে উগ্র-উঁচু বেদনার মুখ...
শরতের চোখ থেকে আমাকেও দূরে ডেকে রাখে
আমাদের জ্যোৎস্নাঝারি— দূরত্বে কি খুঁজে পাবে তাকে
২.
জ্যোৎস্নাঝারি, কোন মুখে তোমাকে যে সেই কথা বলি!
তবু বলি: ঊর্ধশ্বাস শহরের গলিঘুঁচি দালানের ফাঁকে
ওঠে বটে শীর্ণ চাঁদ। এমন শরৎ যায়, জ্যোৎস্না শুধু নেই
রূপ রূপান্তর
আবদুর রাজ্জাক
কোনো ভুল নেই, তুমি যখন প্রথম মিথ্যে বলেছিলে, বিশ্বাস করেছি।
দ্বিতীয়বারও করেছি, তৃতীয়বার! থমকে গিয়েছি।
বাবা বলতেন মিথ্যা বলিও না। মা বলতেন কদাচ মিথ্যা বলিও না।
মিথ্যার পাহাড় ডিঙ্গিয়ে এই যে আমি সেভেনটি ফাইভ—
আমার সেই আত্মবিশ্বাস— যেন কেউ ভেঙেচুরে গুঁড়িয়ে দিয়েছে।
সেদিন শরতের নরম কুয়াশাকে বললাম: তুমি মিথ্যা।
‘হেই! তুমি আমাকে স্পর্শ ক’রো না, তুমি নিজেই একটা মিথ্যা।’
শুনে আমি স্তম্ভিত হয়ে যাই, আরো বলে: একটা ইতর তুমি,
মিথ্যার বেসাতি করো।
‘আমি সত্য, নিঃশর্ত সত্য, অমেয় সত্য, অপবাদ দিও না, বলে: কুয়াশা।
একদিন সেই কুয়াশায় আগুন দিলাম, কুয়াশা পুড়ে ছাই হয়ে গেলো,
দুধের মতো শাদা ধবধবে ছাই।
আরেক দিন পাথুরে পাহাড়ে আগুন ধরিয়ে দিলাম, পাহাড় বললো:
আমাকে পুড়িয়ে কোনো কাজ হবে না, যদি তুমি অন্ধকার পুড়িয়ে ছাই করে
দিতে পারো, সেটাই হবে কাজের কাজ।
আমি পাহাড়ের কাছে নতজানু হয়ে বললাম, ‘এও কি সম্ভব?’
‘মিথ্যা যদি সত্যে পরিণত হয়, অন্ধকার পুড়িয়ে কেনো ছাই করা যাবে না?
প্রেম-প্রার্থনাকেও তো আগুনে পুড়িয়ে শরৎ-শিশিরের সাথে
মিশিয়ে দিয়েছো। এবার অন্ধকার পুড়িয়ে দাও।’
ধন্যবাদ তোমাকে, পারবো। আমি মিথ্যাকেই শিরোধার্য করেছি।
শরতের দিনে
হাইকেল হাশমী
আমার ভাবনাগুলো উড়ে বেড়ায়
স্বচ্ছ শরতের আকাশে।
নীলের পর নীল,
যতদূর চোখ যায়।
মনে হয়, আকাশের নীল শামিয়ানা
নিজেকে আরও সরিয়ে নিয়েছে
আরও উঁচু নতুন কোনো উচ্চতায়।
এই ভ্যাপসা দিনগুলোতে,
সূর্যের কাছ থেকে সরাসরি
পৃথিবীর বুকে নেমে আসে তাপ;
আর রাতে,
পৃথিবী তার সঞ্চিত উত্তাপ
ফিরিয়ে দেয় আকাশকে।
আর এরই মাঝে,
আমি, এক অস্থির আত্মা— ভাবি:
কোথায় যাব আমি
একটু ছায়ার খোঁজে?
হয়তো সেই বৃক্ষের নিচে
যার ছায়ার মাঝেও উত্তাপ,
সে তার সকল শীতলতা বিলিয়ে দিয়েছে
শরতের বেদিতে,
অপেক্ষা করছে ধৈর্য ধরে,
বসন্ত ফিরে আসবে— কিছু দিনের মধ্যে।
এদিকে,
তুষার-সাদা কাশবনের নিচে
ছায়ারা এসে বিশ্রাম করে।
আমার ভাবনাগুলো উড়ে বেড়ায়
নীল আকাশের শেষ প্রান্তে,
খুঁজতে থাকে—
শীতল দিন রাত কোথায় হারিয়ে গেল?
আমি তাদের ডেকে বলি:
ফিরে এসো—
ফিরে এসো এই উত্তপ্ত পৃথিবীর কাছে।
এদিকে,
তুষার-সাদা কাশবনের ভেতর দিয়ে
গরম হাওয়া বয়ে যায়,
শিস দিতে দিতে।
মেঘান্তক
মাসুদ খান
এই সেই শরৎ, যা মরণের জন্য
সবচেয়ে যুতসই মৌসুম।
এবং বিসর্জনের জন্য সবথেকে খাঁটি, উপযুক্ত ঋতু।
নির্বাণেরও।
আকাশ এখন সূক্ষ্ম রুপালি জরির পাড়ে গড়া
স্বচ্ছ মসলিন শাড়ি, বৈধব্যধবল।
এবং নিঃশব্দ সব অশ্রুতে সজল
আদিগন্ত শোকাবহ সমতল।
থেমে গেছে শ্রাবণের তুমুল বর্ষণ, রয়ে গেছে শুধু প্রকৃতির নীরব অন্তঃক্ষরণ
আর
তিলে তিলে বিজলি-জাগানো সাদা রূপচাঁদা মেঘের মরণ...
সমর্পণ
রাজা হাসান
না, বন্ধ করিনি। আবারও তোমার সঙ্গে দেখা হবে।
আমি নিশ্চিত, তা হবে কোলাহলের প্রান্তে,
যদিও সেখানে ঘিরে থাকবে দুর্গের গাম্ভীর্য।
তখন তুমি আমার সঙ্গোপন বুঝবে?
জানি, ফিরে দেখায় অনেক জঞ্জাল চোখে পড়ে।
পাড়ে থাকা নৌকা ঠেলে নদীতে নামানোর পরে,
পিছনের কাদামাটিতে ঘসটানো দাগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সেটা কি উচ্ছিষ্ট? প্রান্তিক?
তবে কি পিছন ফিরে তাকাবো না?
প্রগলভতার শেষে যে দাঁড়িয়ে—
আমি তাকে চিনি না, তুমি চেনো?
ঘুমহারা গান
হাফিজ রশিদ খান
তুমি আকাশের ওই মসৃণ মেঘলা পথ
হরিৎপাতার ঘনিষ্ঠ পরগনায় বাতাসের হৃষ্ট মার্চপাস্ট
উঠোনে ঝকমকিয়ে হাসা বৃষ্টিবাদিকের জলকেলি
এই শরতের উজল পহরে শুরু হলো তবে আজ
পরিপাটিরূপে সাজা ভুবনের ঘরে-ঘরে আমার চোখের
ঘুমহারা গান আর অক্লান্ত প্রব্রজ্যা...
সাদা-কালো
খোরশেদ বাহার
রং নিয়ে আড়ম্বরের সময় এটি নয়
সব রং ধুয়ে গেছে মহাকালের খেয়ায়
এখানে কেবলই সাদা আর কালোর মিছিল
ঋতুচক্র বাঁক ঘুরিয়ে চলে গেছে অন্য কোথাও।
এখানে নদীর জল কৃষ্ণকালো
বাতাস বেঁধেছে বাসা কালো ধোঁয়ার ঘরে।
এখানে মলাটবিহীন বইয়ের সারি ড্রইংরুমে অন্ধকারে
ভেতরটা তার নিরেট সাদা
ভাঙা জানালার গ্রিল ধরে জোড়া বৃক্ষের আদলে
সাদাকালো আভরণে দুটি অবয়ব
তাদের রক্তশূন্য সাদা সাদা চোখ।
সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে আসার অনেক আগেই
কালোর মিছিলে শিহরন জাগে ফুলার রোডে
ধবল রমণীসকল রাত্রির সাথে পাল্লা দিয়ে
নিজেকে মুড়িয়ে ফেলে কালোর আভরণে।
উচ্চকণ্ঠ তরুণ লাফিয়ে বেড়ায় সাদা মোড়কের আড়ালে
এখানে সর্বত্রই সাদা আর কালোর খেলা
কাশবনে জেঁকে বসেছে কালো বাতাসের মেলা
সাদা দালানটি ঘিরে আজ অসংখ্য কালো কঙ্কের সরব সমাবেশ।
শরতের খাতায় সোনালি হেম
মাহফুজ আল-হোসেন
জানি না কেন যে তোমরা অযথাই
ঘাসের ডগায় নুয়ে-পড়া স্বচ্ছ হীরক-দ্যুতিকে শিশির বলো।
অথচ, আমি দেখি শিউলি ঝরা সকালে কিশোরীর
অশ্রুসজল চোখে নিষ্ঠুর রোদের ঝিলিক;
ভুল প্রেমের চোরাগলিতে যে ফেলে এসেছে
হন্তারক বিশ্বাসের এক নীলাম্বরী নিষিক্ত রুমাল।
বলো তবে কোন অর্বাচীন বলছে হাল্কা বৃষ্টির চাদর
মুড়ি দিয়ে এবার এসেছে শরৎ?
কোথায় লুকালো সে রৌদ্রে শুকাতে দেয়া শাদা শাদা
পেঁজা তুলোর ভেজা লেপ?
আর কাশবনের শাদা উৎসবই-বা কীভাবে হারালো
ইটভাটার আকাশছোঁয়া ধূম্রকুণ্ডলির জমজমাট কনসার্টে?
অথচ, মাথার উপরে ঝুঁকে রয়েছে এক পৌরাণিক
বইপড়া ড্রাগন আর তার বিদগ্ধ নিঃশ্বাস;
যে কিনা উপসাগরীয় ড্রোন ছুঁড়ে মুহূর্তেই পুড়িয়ে দিতে চায়
ঋতুচক্রের আজন্ম লালিত বিশ্বাস।
তবু এই রাতকানা শহরে শারদ সন্ধ্যায়
ভাঁজ-ভাঙা পাঞ্জাবিতে জমে উঠুক কথামৃত কসমোপলিটান প্রেম;
আবারো নতুন উৎপ্রেক্ষায় লেখা হোক
ফসলের মাঠজুড়ে সেলাই করা ধানগন্ধী সোনালি হেম...
বিরক্তি ভরা প্রেম
আব্দুল্লাহ জামিল
কিছু কিছু সময় বিরক্তিতে ভরে যায় মন
কী কারণে তা? জানা হয়নি কখনো।
একদিকে জঙ্গী জঙ্গী ভাব-সম্পন্ন পাখির দল
অন্যদিকে তুখোড় তার্কিক জিহ্বার পদলেহন।
বাতসের আর্দ্রতা নিংড়ে বৃষ্টি ঝরে পড়ে মাটিতে
হৃদয় নিংড়ে পাওয়া যায় কি একটু ভালোবাসা?
দীর্ঘ অন্ধকার রাতে হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত ভালোবাসা
অজানা দেশে এক পাহাড়ের পাদদেশে ঘুমায়।
শরতের সাদা মেঘগুলো স্থবির নীল আকাশে
স্বার্থের কাছে পরাজিত প্রেম পড়ে থাকে পদমূলে।
আমার শরৎকাল
মাসুদার রহমান
বৃষ্টি লিখেছিলাম, তুমি ছাতা হাতে বাইরে এসেছ
বর্ষাকাল ব্যর্থ হলে নাম উল্টে শরৎ হয়ে যায়
রাঙামাটি খাগড়াছড়ি বান্দরবন পাহাড়ে পাহাড়ে
এবারও যে বর্ষা নেমেছিল
সেই বর্ষার বৃষ্টিতে কি গাছেরা ভিজেনি?
একপাল ভেড়া নিয়ে বাড়ি পথে মারমা মেয়েটি
হঠাৎ বৃষ্টি এলে ভিজে গিয়েছিল
পেশাদার ফটোজার্নালালিস্ট সেই ছবি
দৈনিক পত্রিকার শেষের পাতায় ছেপে বৃষ্টি উদযাপন
করেছে তুমুল
সবুজ চুড়িদার পরা এক গাছ মাথার উপরে
ডালপালার মতো ছাতা মেলে হেঁটে গেছে
একটুও ভিজেনি
এইভাবে ছাতার প্রভাবে আমার বর্ষাকাল
এ বছরও শরতে মিশেছে
কাশফুলের মরমী রূপে
কামরুল ইসলাম
তুমি তো খড়কুটো দিয়ে বাসা বাঁধতে পারো,
যে বাসার চারদিকে দূর বনের সংগীত এসে
বুনে যায় অন্তঃনীল বেদনার ঘোর,
একদিন তুমিও দুলবে বসে ঘুম ঘুম চোখে
শরতের অবকাশে, ধুন্দুল পাতার ঔরসে—
আকাশ ও সমুদ্র তোমার উদাস ডানায় তুলে দেবে
যাদুর রুমাল, তুমি হবে সেই স্বর্গীয় পাখি, যে
তার নিজস্ব আলোয় দেখে নিতে পারে জঙ্গলের
অধীর তৃষ্ণা, পশু-পাখির চরম প্রস্থান—
কাশফুলের মরমি রূপে খোলো তোমার শুভ্র সিন্দুক
অজ্ঞাতনামা কাদার গন্ধে যখন ঘুমিয়ে পড়ছে জগৎ—
প্রলাপ
জুনান নাশিত
পুড়ে যেতে যেতে সূর্যটা বিলীন হলো অন্ধকারে।
আমি মিটিংয়ে। তৃতীয় বিশ্বের ছোট্ট একটি দেশের ততোধিক ছোট্ট প্রতিষ্ঠানের পাহাড়সম সমস্যা সাঁতরিয়ে কীভাবে আমরা তীরে পৌঁছাতে পারি তা নিয়ে গভীর আলোচনা চলছিল।
শরতের আকাশে চাঁদ, শান্ত লয়ে পেখম মেলছিল।
আমি রাস্তায়। পল্টন লেন ধরে হেঁটে যেতে মনে হচ্ছিল কে যেন হাঁটছে মাথা গুঁজে, পাশে। চেনা লাগল ভীষণ।
‘ভালোবাসতে বাসতে ফতুর করে দেবো’ বইটি উঁকি দিচ্ছে তাঁর ঝোলা থেকে। ও মা! ত্রিদিব দা, আপনি? কবি ত্রিদিব দস্তিদার। কতো কতো দিন হেঁটে গেছেন তিনি এই রাস্তা ধরে, তার হিসেব কে জানে। পাশ ফিরতেই দেখি কেউ নেই, আমি হাঁটছি-একা।
মনে পড়লো ভীষণ কবি বেলাল চৌধুরীর কথা। তিনিও পল্টনের। দাঁড়িয়ে আছেন আজাদ প্রোডাক্টসের গলির মুখে। হেসে এগিয়ে গিয়ে সালাম দিতেই বললেন, জুনান কবিতা দিও। ঠিকাছে বেলাল ভাই, দেবো।
ত্রিদিব দা নেই, বেলাল ভাই নেই। আরো কতো কতো জন আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। কোথায় গেছেন? কোথায় আছেন তারা? কেউ বলতে পারেন?
শরতের পূর্ণিমা ভেঙে শান্তিবিন্দুগুলো উড়ে যাচ্ছিল দূর দিগন্ত ধরে। ডানা ঝাপটিয়ে ফিসফাস করছিল তারা।
বলছিল, কে বড়ো? ভালোবাসা নাকি প্রেম? বন্ধুত্ব নাকি মানবিকতা? কাক বড়ো প্রেমিক নাকি কোকিল?
কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করতে করতে মনে পড়লো আজ ১৬ ভাদ্র, ১৪৩৩। মোবাইল স্ক্যালেন্ডারে চোখ রাখতেই দেখি ১৬ ভাদ্র, ১৪১৩। কী আশ্চর্য ২০ বছরের গরমিল! কীভাবে হলো? এই ২০ বছরে পৃথিবী কতোটা উত্তপ্ত আর অমানবিক হলো? আর আমি কতোটা নিঃস্ব?
শরৎ সকাল কিংবা বিকেল যতই মায়াবী হোক গরমিলের এই আঁচড় ঘিরে রাখে আমাদের জীবনভর। তবু, টেনে টেনে আমরা ফেরাতে চাই যাবতীয় উৎসসুখ।
বিস্তীর্ণ হাওড়— জলে ভেঙে খান খান কৌমুদি রাত হেসে বলে, ফেরাবে কী করে? সে তো শুধু শূন্যতার অতল।
শরৎ এবং বর্ষার কদম
নভেরা হোসেন
পথে পথে হীরার টুকরো, শ্বাপদ,
প্রেমিকের ঠোঁট, আপেলের গোলাপি আভা
তোমার মনে খুব গাঢ় কোনো রঙের স্তূপ—
ছড়ানো ছিটানো রেশমি চুল
পায়ে রোদের চিহ্ন
চোখে অনির্ণীত বায়োস্কোপ—
কালকেতু এবং ফুল্লরা তোমাকে নিয়ে যাচ্ছে অমৃতনগরে
সেখানে নটরাজ, বেহুলা লখিন্দর
কত স্বপ্ন-বাসর ভাসে অগাথ জলে—
এইসব লোকালয়, ফুলের মুকুট তোমার নয়—
তুমি শরৎ এবং বর্ষার কদম
নুয়ে থাকো জলের আড়ালে
মেহগনির কালো শরীর
রাতের মধ্যমায়
শারদীয় মুখ
হাদিউল ইসলাম
উঠি উঠি সূর্যটাকে
দুহাতের আঁজলায় পৃথিবীর সম্মুখে ধরে আছো
যেন হাসি, আগুনের নরম ঘিলু ডিমের কুসুমের
মতো আঁজলা চুয়ে পড়তে লাগলো এমন প্রণয়
কিংবা শিশুর প্রথম হাসি টোল পড়া গাল বেয়ে
পড়তে লাগলো অন্তর্গত নিভৃত নির্জনে
অপার বিস্ময়ে, শিরাময় শিরশির চতুর্দিকে মায়া
দেখলাম—
দুহাতের আঁজলার কিঞ্চিৎ উপরে একটা সুখ
মন থেকে উদয়রে ভানু পৃথিবীতে এ তোমার মুখ
মায়াটান
আফরোজা সোমা
পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব
৩ লাখ ৮৪ হাজার কিলোমিটার;
অত দূরত্ব থেকেও চাঁদের টানে
পৃথিবীতে রোজ জোয়ার-ভাটা হয়।
পরস্পর থেকে তোমরা আর
কতটুকুই-বা দূরে থাকো, বলো?
একই ধরণীর পরে তো দু’জনেই নিচ্ছ শ্বাস;
অতএব তোমার মহাকর্ষ বলে যদি তার,
অথবা তার কথা মনে হলে যদি তোমার
হঠাৎ কান্না পায়, বুঝে নিও—
তোমাদের ভালোবাসা হয়ে গিয়েছিলো।
শরৎ ঠিকুজি
হাবিবা রোজী
পাখির গালের মতো নরম সাদা রোদে সূর্য ভাসে
ভাদ্র আশ্বিনের শরতের পেলব আকাশে।
বাউরি দিগন্তে বৈঠা বায় হাওয়ার সাম্পান,
পশ্চিমে পেজা তুলট জলহারা নীলমেঘের গান।
শিশিরে পা রেখে ঘাসে এসে শুয়ে পড়ে
সাদা শাড়ি কমলা পেড়ে সলাজ শিউলি।
হাসে পদ্ম, জুই, কেয়া, কামিনী ফুলগুলি।
স্বচ্ছতোয়া জলাঙ্গীর ঢেউ এ নোলক শাপলা শালুক,
অঘ্রানে ঘ্রাণ, চাঁদ রাতে রূপারঙা জ্যোৎস্না আলো জ্বালুক।
ছাতিম ছাওয়া শরৎ আনুক কাশ সাদা অন্ন
কিষাণী আঁচল পেতে সাজাবে সোনালু নবান্ন।
শিশিরে শিশিরে হৈমন্তী স্বপ্নের বীজ বোনে,
বালুচরে কলকাকলিতে আনমনে দিন গোনে।
মাটি, হাওয়া জলমাখা স্বপ্নে আনমনে চেয়ে।
ভাদর কাটানি শেষে বাড়ি ফিরুক শরৎ মেয়ে।
শালিক, মাছরাঙা, টিয়া, ময়না পাখির ঝাঁক
পুরাতন পথে রেখা মুছে দিক, সবুজ বাঁক।
শরৎ লিখুক বুকে এবার নতুন কোষ্ঠি ঠিকুজি,
পৃথিবীর প্রান্তিক পান্থ, পাক নিজ নীড় খুঁজি।
সুলতানা বিবিয়ানা , লাস্যময়ী, হাস্যময়ী শরৎ রানি,
কাশবন হাওয়ায় উড়িয়ে দিক, মায়াবাসি বাণী।
দূরগামী মেঘ
জয়নাল আবেদীন শিবু
আমার বাড়ি আর উঠোন, খুব সাদাসিদে
পথটা আরো সরু— তুমি তবু হেঁটে আসো পথের ভেতর
হারিয়ে গেছে যে পথ দূর গন্তব্যে...
তোমার তো জানাই আছে— শরতের সকল মেঘমালা থেকে
বৃষ্টি ঝরে না সচরাচর... সব বৃক্ষও পায় না পরিণত বয়স;
মানুষ তবু বৃষ্টির প্রার্থনা করে করে বৃক্ষের বয়স বাড়াতে চায়!
এই বদলে যাওয়া সময়ে অনেক কিছুই খোলে খোলে ঝরে পরছে—
লক্কর-ঝক্কর রেললাইনের মতোন। আমিও দ্বিধায় ভুগি
বৃক্ষ আর বৃষ্টি নিয়ে... তুমি এত কিছু জেনেও নিতে আসো
ভিটের খতিয়ান! হারিয়ে ফেলা কতো কী হিসেব...
আমলকির গুণাগুণ নিয়ে অলস দুপুর কাটে— অনেক ভালো,
শরতের পেজাতুলো মেঘ যায় দূরদেশে সীমানা পেরিয়ে—
হয়তোবা নিজ গন্তব্য খুঁজে নেবে নিজস্ব নিয়মে
ঘরচ্যুত মানুষও যেভাবে নাড়িপোঁতা ভিটেয় ফিরে একদিন
সম্পর্কের সুর তোলে...
আমিতো হারিয়ে ফেলেছি কতোকিছু, নামজপতপ
বয়স বাড়ানো আড়িয়াটিলা পথ, বৃষ্টিকামী ভোর
কী দিয়ে ফেরাবে তুমি দূরগামী মেঘ?
শরৎ এক কুয়াশা কুহক
অদ্বৈত মারুত
ডানাহীন আকাশ— ঈগলের মৃত চোখ;
মেঘের কঙ্কাল;
বুকপকেটে দুপুরের ধারালো কাচরোদ,
জানালাজুড়ে উদাসীন ধুলো-কফিন।
কাশবন কোথাও একাকী থাকে না,
না হৃদয়ে, না নদীতীরে—
নুয়ে পড়া বাতাস আলগা হাসে।
ভোরে বিবাগী শেফালী ঝরে পড়ে—
ঘাসের পাতাজুড়ে মায়াগন্ধ,
অচেনা কবরের কর্পূর।
শরৎ এক কুয়াশা কুহক।
শুভ্র সুকুমার তুমি
এলিজা খাতুন
মেঘের ঘুড়ির গায়ে ঝুলে আছে শৈশব
একসময় আকাশে ঘুড়ি ওড়াতে গিয়ে লাটাই সুতো টান দিলেই
হুড়মুড় করে নেমে পড়তো অজস্র খণ্ড সাদা মেঘ
অব্যহতভাবে এখনো আকাশ ছিঁড়ে নেমে আসে হয়তো
ঝিরি ঝিরি ধারার ঝরে পড়া উপক্রমে উঁকি দেয়
একতারা টুংটাং, পাতার বাঁশি, সলতের আলোয় পুঁথির আসর;
যেন তোমাকেই স্মরণের প্ররোচনা!
নগরের খতিয়ান থেকে ছিটকে বেরিয়ে দেখি
অসংখ্যবার ঘোষণা হয়েছে তোমার মৃত্যুদণ্ডের রায়
কতবার ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে
ছিন্নভিন্ন করার বন্দোবস্ত করেছে তোমার সত্তাকে
কত অজস্রবার তোমাকে আটকে রাখার চেষ্টা হলো—
ধর্মতাত্ত্বিকের জোব্বার অন্ধকারে। অথচ—
সাম্রাজ্যবাদের রক্তাক্ত জিহ্বা দ্বারা সুনিয়ন্ত্রিত বিলিবণ্টনরীতির—
একচ্ছত্র প্রতাপ সহ্য করেও— তোমার সুকুমার শরীরে পুনঃ পুনঃ
শেফালি ফুটিয়ে জানান দিয়ে যাও তোমার শুভ্র অস্তিত্ব
বাবা এনে দিতেন শরতের কাশফুল
মিরাজুল আলম
বর্ষা ঋতু বাবা ভালবাসতেন না,
বাবার দু’চোখে সারাক্ষণ বর্ষা লেগেই থাকত।
বাবার প্রিয় ঋতু ছিল শরৎ।
শরতের কাশফুল
বাবা আমাকে এনে দিতেন।
এক ভরা জোছনার প্লাবনে
বাবা ভাঁসতে ভাঁসতে চলে গেলেন আকাশের ওপারে
শরৎ এলে মনে পড়ে বাবার
দেয়া কাশফুলের কথা।
মানুষ মরে গেলে সাদা হয়ে যায়।
বাবা শরতের সাদা কাশফুলের সাথে মিশে আছেন।
আমি অনন্তকাল ধরে অসীমের পথে হাঁটছি।
শরতের কাশফুল থেকে বাবার দেহের গন্ধ পাচ্ছি।
পৃথিবীতে শরৎ এসেছে।
কাশফুল এসেছে। বাবা আসেনি।
কাশফুল-শরৎ আর আমি
আমরা সেদিন আকাশের ওপারে বাবাকে দেখতে গিয়েছিলাম।
বাবা কেমন আছেন। দেখলাম; বাবা, কতগুলো শরতের কাশফুল হাতে নিয়ে
স্বর্গের বারান্দায় বসে আছে

বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মনে পড়ে
মহাদেব সাহা
এখন শুধু মনে পড়ে আর মনে পড়ে
মনে পড়ে মেঘ, মনে পড়ে চাঁদ,
জলের ধারা কেমন ছিলো—
সেসব কথাই মনে পড়ে;
এখন শুধু মনে পড়ে, নদীর কথা মনে পড়ে,
তোমার কথা মনে পড়ে,
এখন এই গভীর রাতে মনে পড়ে
তোমার মুখ, তোমার ছায়া,
তোমার বাড়ির ভেতর-মহল,
তোমার উঠোন, সন্ধ্যাতারা
এখন শুধু মনে পড়ে, তোমার কথা মনে পড়ে;
তোমার কথা মনে পড়ে
অনেক কথা মনে পড়ে,
এখন শুধু মনে পড়ে, এখন শুধু মনে পড়ে;
এখন শুধু মনে পড়ে আর মনে পড়ে
আকাশে মেঘ থেকে থেকে
এখন বুঝি বৃষ্টি ঝরে।
পূর্ণিমার মধ্যে মৃত্যু
নির্মলেন্দু গুণ
একদিন চাঁদ উঠবে না, সকাল দুপুরগুলো
মরীচিকায় স্থির হয়ে রবে;
একদিন অন্ধকার সারাবেলা প্রিয় বন্ধু হবে,
একদিন সারাদিন সূর্য উঠবে না।
একদিন চুল কাটতে যাবো না সেলুনে
একদিন নিদ্রাহীন চোখে পড়বে ধুলো।
একদিন কালো চুলগুলো খ’সে যাবে,
কিছুতেই গন্ধরাজ ফুল ফুটবে না।
একদিন জনসংখ্যা কম হবে এ শহরে,
ট্রেনের টিকিট কেটে
একটি মানুষ কাশবনে গ্রামে ফিরবে না।
একদিন পরাজিত হবো।
একদিন কোথাও যাবো না, শূন্যস্থানে তুমি
কিংবা অন্য কেউ বসে থেকে বাড়াবে বয়স।
একদিন তোমাকে শাসন করা অসম্ভব ভেবে
পূর্ণিমার রাত্রে ম’রে যাবো।
একদিন সারাদিন কোথাও যাবো না।
জ্যোৎস্নাঝারি
ফারুক মাহমুদ
শরতের চোখ থেকে যখন কুয়াশা ঝরে পড়ে
ওকে বলি জ্যোৎস্নাঝারি। ওর হেসে থাকা হাসিগুলো
ছুঁয়ে দেখে শেফালির মৃদু মুখ, আরো বেশি ঝরে
সরলরেখার মতো কিছু কথা— শুভ উপাচার
শিশির ভিজেছে নিজে, সকালের গল্পগুলো শোনে
নির্জন চোখের মতো হেসে থাকে রোদের চিবুক
লোভের সামান্য কাজ! প্রাপ্যতাকে যারা দীর্ঘ গোনে
তাদের শান্তির পাশে উগ্র-উঁচু বেদনার মুখ...
শরতের চোখ থেকে আমাকেও দূরে ডেকে রাখে
আমাদের জ্যোৎস্নাঝারি— দূরত্বে কি খুঁজে পাবে তাকে
২.
জ্যোৎস্নাঝারি, কোন মুখে তোমাকে যে সেই কথা বলি!
তবু বলি: ঊর্ধশ্বাস শহরের গলিঘুঁচি দালানের ফাঁকে
ওঠে বটে শীর্ণ চাঁদ। এমন শরৎ যায়, জ্যোৎস্না শুধু নেই
রূপ রূপান্তর
আবদুর রাজ্জাক
কোনো ভুল নেই, তুমি যখন প্রথম মিথ্যে বলেছিলে, বিশ্বাস করেছি।
দ্বিতীয়বারও করেছি, তৃতীয়বার! থমকে গিয়েছি।
বাবা বলতেন মিথ্যা বলিও না। মা বলতেন কদাচ মিথ্যা বলিও না।
মিথ্যার পাহাড় ডিঙ্গিয়ে এই যে আমি সেভেনটি ফাইভ—
আমার সেই আত্মবিশ্বাস— যেন কেউ ভেঙেচুরে গুঁড়িয়ে দিয়েছে।
সেদিন শরতের নরম কুয়াশাকে বললাম: তুমি মিথ্যা।
‘হেই! তুমি আমাকে স্পর্শ ক’রো না, তুমি নিজেই একটা মিথ্যা।’
শুনে আমি স্তম্ভিত হয়ে যাই, আরো বলে: একটা ইতর তুমি,
মিথ্যার বেসাতি করো।
‘আমি সত্য, নিঃশর্ত সত্য, অমেয় সত্য, অপবাদ দিও না, বলে: কুয়াশা।
একদিন সেই কুয়াশায় আগুন দিলাম, কুয়াশা পুড়ে ছাই হয়ে গেলো,
দুধের মতো শাদা ধবধবে ছাই।
আরেক দিন পাথুরে পাহাড়ে আগুন ধরিয়ে দিলাম, পাহাড় বললো:
আমাকে পুড়িয়ে কোনো কাজ হবে না, যদি তুমি অন্ধকার পুড়িয়ে ছাই করে
দিতে পারো, সেটাই হবে কাজের কাজ।
আমি পাহাড়ের কাছে নতজানু হয়ে বললাম, ‘এও কি সম্ভব?’
‘মিথ্যা যদি সত্যে পরিণত হয়, অন্ধকার পুড়িয়ে কেনো ছাই করা যাবে না?
প্রেম-প্রার্থনাকেও তো আগুনে পুড়িয়ে শরৎ-শিশিরের সাথে
মিশিয়ে দিয়েছো। এবার অন্ধকার পুড়িয়ে দাও।’
ধন্যবাদ তোমাকে, পারবো। আমি মিথ্যাকেই শিরোধার্য করেছি।
শরতের দিনে
হাইকেল হাশমী
আমার ভাবনাগুলো উড়ে বেড়ায়
স্বচ্ছ শরতের আকাশে।
নীলের পর নীল,
যতদূর চোখ যায়।
মনে হয়, আকাশের নীল শামিয়ানা
নিজেকে আরও সরিয়ে নিয়েছে
আরও উঁচু নতুন কোনো উচ্চতায়।
এই ভ্যাপসা দিনগুলোতে,
সূর্যের কাছ থেকে সরাসরি
পৃথিবীর বুকে নেমে আসে তাপ;
আর রাতে,
পৃথিবী তার সঞ্চিত উত্তাপ
ফিরিয়ে দেয় আকাশকে।
আর এরই মাঝে,
আমি, এক অস্থির আত্মা— ভাবি:
কোথায় যাব আমি
একটু ছায়ার খোঁজে?
হয়তো সেই বৃক্ষের নিচে
যার ছায়ার মাঝেও উত্তাপ,
সে তার সকল শীতলতা বিলিয়ে দিয়েছে
শরতের বেদিতে,
অপেক্ষা করছে ধৈর্য ধরে,
বসন্ত ফিরে আসবে— কিছু দিনের মধ্যে।
এদিকে,
তুষার-সাদা কাশবনের নিচে
ছায়ারা এসে বিশ্রাম করে।
আমার ভাবনাগুলো উড়ে বেড়ায়
নীল আকাশের শেষ প্রান্তে,
খুঁজতে থাকে—
শীতল দিন রাত কোথায় হারিয়ে গেল?
আমি তাদের ডেকে বলি:
ফিরে এসো—
ফিরে এসো এই উত্তপ্ত পৃথিবীর কাছে।
এদিকে,
তুষার-সাদা কাশবনের ভেতর দিয়ে
গরম হাওয়া বয়ে যায়,
শিস দিতে দিতে।
মেঘান্তক
মাসুদ খান
এই সেই শরৎ, যা মরণের জন্য
সবচেয়ে যুতসই মৌসুম।
এবং বিসর্জনের জন্য সবথেকে খাঁটি, উপযুক্ত ঋতু।
নির্বাণেরও।
আকাশ এখন সূক্ষ্ম রুপালি জরির পাড়ে গড়া
স্বচ্ছ মসলিন শাড়ি, বৈধব্যধবল।
এবং নিঃশব্দ সব অশ্রুতে সজল
আদিগন্ত শোকাবহ সমতল।
থেমে গেছে শ্রাবণের তুমুল বর্ষণ, রয়ে গেছে শুধু প্রকৃতির নীরব অন্তঃক্ষরণ
আর
তিলে তিলে বিজলি-জাগানো সাদা রূপচাঁদা মেঘের মরণ...
সমর্পণ
রাজা হাসান
না, বন্ধ করিনি। আবারও তোমার সঙ্গে দেখা হবে।
আমি নিশ্চিত, তা হবে কোলাহলের প্রান্তে,
যদিও সেখানে ঘিরে থাকবে দুর্গের গাম্ভীর্য।
তখন তুমি আমার সঙ্গোপন বুঝবে?
জানি, ফিরে দেখায় অনেক জঞ্জাল চোখে পড়ে।
পাড়ে থাকা নৌকা ঠেলে নদীতে নামানোর পরে,
পিছনের কাদামাটিতে ঘসটানো দাগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সেটা কি উচ্ছিষ্ট? প্রান্তিক?
তবে কি পিছন ফিরে তাকাবো না?
প্রগলভতার শেষে যে দাঁড়িয়ে—
আমি তাকে চিনি না, তুমি চেনো?
ঘুমহারা গান
হাফিজ রশিদ খান
তুমি আকাশের ওই মসৃণ মেঘলা পথ
হরিৎপাতার ঘনিষ্ঠ পরগনায় বাতাসের হৃষ্ট মার্চপাস্ট
উঠোনে ঝকমকিয়ে হাসা বৃষ্টিবাদিকের জলকেলি
এই শরতের উজল পহরে শুরু হলো তবে আজ
পরিপাটিরূপে সাজা ভুবনের ঘরে-ঘরে আমার চোখের
ঘুমহারা গান আর অক্লান্ত প্রব্রজ্যা...
সাদা-কালো
খোরশেদ বাহার
রং নিয়ে আড়ম্বরের সময় এটি নয়
সব রং ধুয়ে গেছে মহাকালের খেয়ায়
এখানে কেবলই সাদা আর কালোর মিছিল
ঋতুচক্র বাঁক ঘুরিয়ে চলে গেছে অন্য কোথাও।
এখানে নদীর জল কৃষ্ণকালো
বাতাস বেঁধেছে বাসা কালো ধোঁয়ার ঘরে।
এখানে মলাটবিহীন বইয়ের সারি ড্রইংরুমে অন্ধকারে
ভেতরটা তার নিরেট সাদা
ভাঙা জানালার গ্রিল ধরে জোড়া বৃক্ষের আদলে
সাদাকালো আভরণে দুটি অবয়ব
তাদের রক্তশূন্য সাদা সাদা চোখ।
সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে আসার অনেক আগেই
কালোর মিছিলে শিহরন জাগে ফুলার রোডে
ধবল রমণীসকল রাত্রির সাথে পাল্লা দিয়ে
নিজেকে মুড়িয়ে ফেলে কালোর আভরণে।
উচ্চকণ্ঠ তরুণ লাফিয়ে বেড়ায় সাদা মোড়কের আড়ালে
এখানে সর্বত্রই সাদা আর কালোর খেলা
কাশবনে জেঁকে বসেছে কালো বাতাসের মেলা
সাদা দালানটি ঘিরে আজ অসংখ্য কালো কঙ্কের সরব সমাবেশ।
শরতের খাতায় সোনালি হেম
মাহফুজ আল-হোসেন
জানি না কেন যে তোমরা অযথাই
ঘাসের ডগায় নুয়ে-পড়া স্বচ্ছ হীরক-দ্যুতিকে শিশির বলো।
অথচ, আমি দেখি শিউলি ঝরা সকালে কিশোরীর
অশ্রুসজল চোখে নিষ্ঠুর রোদের ঝিলিক;
ভুল প্রেমের চোরাগলিতে যে ফেলে এসেছে
হন্তারক বিশ্বাসের এক নীলাম্বরী নিষিক্ত রুমাল।
বলো তবে কোন অর্বাচীন বলছে হাল্কা বৃষ্টির চাদর
মুড়ি দিয়ে এবার এসেছে শরৎ?
কোথায় লুকালো সে রৌদ্রে শুকাতে দেয়া শাদা শাদা
পেঁজা তুলোর ভেজা লেপ?
আর কাশবনের শাদা উৎসবই-বা কীভাবে হারালো
ইটভাটার আকাশছোঁয়া ধূম্রকুণ্ডলির জমজমাট কনসার্টে?
অথচ, মাথার উপরে ঝুঁকে রয়েছে এক পৌরাণিক
বইপড়া ড্রাগন আর তার বিদগ্ধ নিঃশ্বাস;
যে কিনা উপসাগরীয় ড্রোন ছুঁড়ে মুহূর্তেই পুড়িয়ে দিতে চায়
ঋতুচক্রের আজন্ম লালিত বিশ্বাস।
তবু এই রাতকানা শহরে শারদ সন্ধ্যায়
ভাঁজ-ভাঙা পাঞ্জাবিতে জমে উঠুক কথামৃত কসমোপলিটান প্রেম;
আবারো নতুন উৎপ্রেক্ষায় লেখা হোক
ফসলের মাঠজুড়ে সেলাই করা ধানগন্ধী সোনালি হেম...
বিরক্তি ভরা প্রেম
আব্দুল্লাহ জামিল
কিছু কিছু সময় বিরক্তিতে ভরে যায় মন
কী কারণে তা? জানা হয়নি কখনো।
একদিকে জঙ্গী জঙ্গী ভাব-সম্পন্ন পাখির দল
অন্যদিকে তুখোড় তার্কিক জিহ্বার পদলেহন।
বাতসের আর্দ্রতা নিংড়ে বৃষ্টি ঝরে পড়ে মাটিতে
হৃদয় নিংড়ে পাওয়া যায় কি একটু ভালোবাসা?
দীর্ঘ অন্ধকার রাতে হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত ভালোবাসা
অজানা দেশে এক পাহাড়ের পাদদেশে ঘুমায়।
শরতের সাদা মেঘগুলো স্থবির নীল আকাশে
স্বার্থের কাছে পরাজিত প্রেম পড়ে থাকে পদমূলে।
আমার শরৎকাল
মাসুদার রহমান
বৃষ্টি লিখেছিলাম, তুমি ছাতা হাতে বাইরে এসেছ
বর্ষাকাল ব্যর্থ হলে নাম উল্টে শরৎ হয়ে যায়
রাঙামাটি খাগড়াছড়ি বান্দরবন পাহাড়ে পাহাড়ে
এবারও যে বর্ষা নেমেছিল
সেই বর্ষার বৃষ্টিতে কি গাছেরা ভিজেনি?
একপাল ভেড়া নিয়ে বাড়ি পথে মারমা মেয়েটি
হঠাৎ বৃষ্টি এলে ভিজে গিয়েছিল
পেশাদার ফটোজার্নালালিস্ট সেই ছবি
দৈনিক পত্রিকার শেষের পাতায় ছেপে বৃষ্টি উদযাপন
করেছে তুমুল
সবুজ চুড়িদার পরা এক গাছ মাথার উপরে
ডালপালার মতো ছাতা মেলে হেঁটে গেছে
একটুও ভিজেনি
এইভাবে ছাতার প্রভাবে আমার বর্ষাকাল
এ বছরও শরতে মিশেছে
কাশফুলের মরমী রূপে
কামরুল ইসলাম
তুমি তো খড়কুটো দিয়ে বাসা বাঁধতে পারো,
যে বাসার চারদিকে দূর বনের সংগীত এসে
বুনে যায় অন্তঃনীল বেদনার ঘোর,
একদিন তুমিও দুলবে বসে ঘুম ঘুম চোখে
শরতের অবকাশে, ধুন্দুল পাতার ঔরসে—
আকাশ ও সমুদ্র তোমার উদাস ডানায় তুলে দেবে
যাদুর রুমাল, তুমি হবে সেই স্বর্গীয় পাখি, যে
তার নিজস্ব আলোয় দেখে নিতে পারে জঙ্গলের
অধীর তৃষ্ণা, পশু-পাখির চরম প্রস্থান—
কাশফুলের মরমি রূপে খোলো তোমার শুভ্র সিন্দুক
অজ্ঞাতনামা কাদার গন্ধে যখন ঘুমিয়ে পড়ছে জগৎ—
প্রলাপ
জুনান নাশিত
পুড়ে যেতে যেতে সূর্যটা বিলীন হলো অন্ধকারে।
আমি মিটিংয়ে। তৃতীয় বিশ্বের ছোট্ট একটি দেশের ততোধিক ছোট্ট প্রতিষ্ঠানের পাহাড়সম সমস্যা সাঁতরিয়ে কীভাবে আমরা তীরে পৌঁছাতে পারি তা নিয়ে গভীর আলোচনা চলছিল।
শরতের আকাশে চাঁদ, শান্ত লয়ে পেখম মেলছিল।
আমি রাস্তায়। পল্টন লেন ধরে হেঁটে যেতে মনে হচ্ছিল কে যেন হাঁটছে মাথা গুঁজে, পাশে। চেনা লাগল ভীষণ।
‘ভালোবাসতে বাসতে ফতুর করে দেবো’ বইটি উঁকি দিচ্ছে তাঁর ঝোলা থেকে। ও মা! ত্রিদিব দা, আপনি? কবি ত্রিদিব দস্তিদার। কতো কতো দিন হেঁটে গেছেন তিনি এই রাস্তা ধরে, তার হিসেব কে জানে। পাশ ফিরতেই দেখি কেউ নেই, আমি হাঁটছি-একা।
মনে পড়লো ভীষণ কবি বেলাল চৌধুরীর কথা। তিনিও পল্টনের। দাঁড়িয়ে আছেন আজাদ প্রোডাক্টসের গলির মুখে। হেসে এগিয়ে গিয়ে সালাম দিতেই বললেন, জুনান কবিতা দিও। ঠিকাছে বেলাল ভাই, দেবো।
ত্রিদিব দা নেই, বেলাল ভাই নেই। আরো কতো কতো জন আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। কোথায় গেছেন? কোথায় আছেন তারা? কেউ বলতে পারেন?
শরতের পূর্ণিমা ভেঙে শান্তিবিন্দুগুলো উড়ে যাচ্ছিল দূর দিগন্ত ধরে। ডানা ঝাপটিয়ে ফিসফাস করছিল তারা।
বলছিল, কে বড়ো? ভালোবাসা নাকি প্রেম? বন্ধুত্ব নাকি মানবিকতা? কাক বড়ো প্রেমিক নাকি কোকিল?
কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করতে করতে মনে পড়লো আজ ১৬ ভাদ্র, ১৪৩৩। মোবাইল স্ক্যালেন্ডারে চোখ রাখতেই দেখি ১৬ ভাদ্র, ১৪১৩। কী আশ্চর্য ২০ বছরের গরমিল! কীভাবে হলো? এই ২০ বছরে পৃথিবী কতোটা উত্তপ্ত আর অমানবিক হলো? আর আমি কতোটা নিঃস্ব?
শরৎ সকাল কিংবা বিকেল যতই মায়াবী হোক গরমিলের এই আঁচড় ঘিরে রাখে আমাদের জীবনভর। তবু, টেনে টেনে আমরা ফেরাতে চাই যাবতীয় উৎসসুখ।
বিস্তীর্ণ হাওড়— জলে ভেঙে খান খান কৌমুদি রাত হেসে বলে, ফেরাবে কী করে? সে তো শুধু শূন্যতার অতল।
শরৎ এবং বর্ষার কদম
নভেরা হোসেন
পথে পথে হীরার টুকরো, শ্বাপদ,
প্রেমিকের ঠোঁট, আপেলের গোলাপি আভা
তোমার মনে খুব গাঢ় কোনো রঙের স্তূপ—
ছড়ানো ছিটানো রেশমি চুল
পায়ে রোদের চিহ্ন
চোখে অনির্ণীত বায়োস্কোপ—
কালকেতু এবং ফুল্লরা তোমাকে নিয়ে যাচ্ছে অমৃতনগরে
সেখানে নটরাজ, বেহুলা লখিন্দর
কত স্বপ্ন-বাসর ভাসে অগাথ জলে—
এইসব লোকালয়, ফুলের মুকুট তোমার নয়—
তুমি শরৎ এবং বর্ষার কদম
নুয়ে থাকো জলের আড়ালে
মেহগনির কালো শরীর
রাতের মধ্যমায়
শারদীয় মুখ
হাদিউল ইসলাম
উঠি উঠি সূর্যটাকে
দুহাতের আঁজলায় পৃথিবীর সম্মুখে ধরে আছো
যেন হাসি, আগুনের নরম ঘিলু ডিমের কুসুমের
মতো আঁজলা চুয়ে পড়তে লাগলো এমন প্রণয়
কিংবা শিশুর প্রথম হাসি টোল পড়া গাল বেয়ে
পড়তে লাগলো অন্তর্গত নিভৃত নির্জনে
অপার বিস্ময়ে, শিরাময় শিরশির চতুর্দিকে মায়া
দেখলাম—
দুহাতের আঁজলার কিঞ্চিৎ উপরে একটা সুখ
মন থেকে উদয়রে ভানু পৃথিবীতে এ তোমার মুখ
মায়াটান
আফরোজা সোমা
পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব
৩ লাখ ৮৪ হাজার কিলোমিটার;
অত দূরত্ব থেকেও চাঁদের টানে
পৃথিবীতে রোজ জোয়ার-ভাটা হয়।
পরস্পর থেকে তোমরা আর
কতটুকুই-বা দূরে থাকো, বলো?
একই ধরণীর পরে তো দু’জনেই নিচ্ছ শ্বাস;
অতএব তোমার মহাকর্ষ বলে যদি তার,
অথবা তার কথা মনে হলে যদি তোমার
হঠাৎ কান্না পায়, বুঝে নিও—
তোমাদের ভালোবাসা হয়ে গিয়েছিলো।
শরৎ ঠিকুজি
হাবিবা রোজী
পাখির গালের মতো নরম সাদা রোদে সূর্য ভাসে
ভাদ্র আশ্বিনের শরতের পেলব আকাশে।
বাউরি দিগন্তে বৈঠা বায় হাওয়ার সাম্পান,
পশ্চিমে পেজা তুলট জলহারা নীলমেঘের গান।
শিশিরে পা রেখে ঘাসে এসে শুয়ে পড়ে
সাদা শাড়ি কমলা পেড়ে সলাজ শিউলি।
হাসে পদ্ম, জুই, কেয়া, কামিনী ফুলগুলি।
স্বচ্ছতোয়া জলাঙ্গীর ঢেউ এ নোলক শাপলা শালুক,
অঘ্রানে ঘ্রাণ, চাঁদ রাতে রূপারঙা জ্যোৎস্না আলো জ্বালুক।
ছাতিম ছাওয়া শরৎ আনুক কাশ সাদা অন্ন
কিষাণী আঁচল পেতে সাজাবে সোনালু নবান্ন।
শিশিরে শিশিরে হৈমন্তী স্বপ্নের বীজ বোনে,
বালুচরে কলকাকলিতে আনমনে দিন গোনে।
মাটি, হাওয়া জলমাখা স্বপ্নে আনমনে চেয়ে।
ভাদর কাটানি শেষে বাড়ি ফিরুক শরৎ মেয়ে।
শালিক, মাছরাঙা, টিয়া, ময়না পাখির ঝাঁক
পুরাতন পথে রেখা মুছে দিক, সবুজ বাঁক।
শরৎ লিখুক বুকে এবার নতুন কোষ্ঠি ঠিকুজি,
পৃথিবীর প্রান্তিক পান্থ, পাক নিজ নীড় খুঁজি।
সুলতানা বিবিয়ানা , লাস্যময়ী, হাস্যময়ী শরৎ রানি,
কাশবন হাওয়ায় উড়িয়ে দিক, মায়াবাসি বাণী।
দূরগামী মেঘ
জয়নাল আবেদীন শিবু
আমার বাড়ি আর উঠোন, খুব সাদাসিদে
পথটা আরো সরু— তুমি তবু হেঁটে আসো পথের ভেতর
হারিয়ে গেছে যে পথ দূর গন্তব্যে...
তোমার তো জানাই আছে— শরতের সকল মেঘমালা থেকে
বৃষ্টি ঝরে না সচরাচর... সব বৃক্ষও পায় না পরিণত বয়স;
মানুষ তবু বৃষ্টির প্রার্থনা করে করে বৃক্ষের বয়স বাড়াতে চায়!
এই বদলে যাওয়া সময়ে অনেক কিছুই খোলে খোলে ঝরে পরছে—
লক্কর-ঝক্কর রেললাইনের মতোন। আমিও দ্বিধায় ভুগি
বৃক্ষ আর বৃষ্টি নিয়ে... তুমি এত কিছু জেনেও নিতে আসো
ভিটের খতিয়ান! হারিয়ে ফেলা কতো কী হিসেব...
আমলকির গুণাগুণ নিয়ে অলস দুপুর কাটে— অনেক ভালো,
শরতের পেজাতুলো মেঘ যায় দূরদেশে সীমানা পেরিয়ে—
হয়তোবা নিজ গন্তব্য খুঁজে নেবে নিজস্ব নিয়মে
ঘরচ্যুত মানুষও যেভাবে নাড়িপোঁতা ভিটেয় ফিরে একদিন
সম্পর্কের সুর তোলে...
আমিতো হারিয়ে ফেলেছি কতোকিছু, নামজপতপ
বয়স বাড়ানো আড়িয়াটিলা পথ, বৃষ্টিকামী ভোর
কী দিয়ে ফেরাবে তুমি দূরগামী মেঘ?
শরৎ এক কুয়াশা কুহক
অদ্বৈত মারুত
ডানাহীন আকাশ— ঈগলের মৃত চোখ;
মেঘের কঙ্কাল;
বুকপকেটে দুপুরের ধারালো কাচরোদ,
জানালাজুড়ে উদাসীন ধুলো-কফিন।
কাশবন কোথাও একাকী থাকে না,
না হৃদয়ে, না নদীতীরে—
নুয়ে পড়া বাতাস আলগা হাসে।
ভোরে বিবাগী শেফালী ঝরে পড়ে—
ঘাসের পাতাজুড়ে মায়াগন্ধ,
অচেনা কবরের কর্পূর।
শরৎ এক কুয়াশা কুহক।
শুভ্র সুকুমার তুমি
এলিজা খাতুন
মেঘের ঘুড়ির গায়ে ঝুলে আছে শৈশব
একসময় আকাশে ঘুড়ি ওড়াতে গিয়ে লাটাই সুতো টান দিলেই
হুড়মুড় করে নেমে পড়তো অজস্র খণ্ড সাদা মেঘ
অব্যহতভাবে এখনো আকাশ ছিঁড়ে নেমে আসে হয়তো
ঝিরি ঝিরি ধারার ঝরে পড়া উপক্রমে উঁকি দেয়
একতারা টুংটাং, পাতার বাঁশি, সলতের আলোয় পুঁথির আসর;
যেন তোমাকেই স্মরণের প্ররোচনা!
নগরের খতিয়ান থেকে ছিটকে বেরিয়ে দেখি
অসংখ্যবার ঘোষণা হয়েছে তোমার মৃত্যুদণ্ডের রায়
কতবার ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে
ছিন্নভিন্ন করার বন্দোবস্ত করেছে তোমার সত্তাকে
কত অজস্রবার তোমাকে আটকে রাখার চেষ্টা হলো—
ধর্মতাত্ত্বিকের জোব্বার অন্ধকারে। অথচ—
সাম্রাজ্যবাদের রক্তাক্ত জিহ্বা দ্বারা সুনিয়ন্ত্রিত বিলিবণ্টনরীতির—
একচ্ছত্র প্রতাপ সহ্য করেও— তোমার সুকুমার শরীরে পুনঃ পুনঃ
শেফালি ফুটিয়ে জানান দিয়ে যাও তোমার শুভ্র অস্তিত্ব
বাবা এনে দিতেন শরতের কাশফুল
মিরাজুল আলম
বর্ষা ঋতু বাবা ভালবাসতেন না,
বাবার দু’চোখে সারাক্ষণ বর্ষা লেগেই থাকত।
বাবার প্রিয় ঋতু ছিল শরৎ।
শরতের কাশফুল
বাবা আমাকে এনে দিতেন।
এক ভরা জোছনার প্লাবনে
বাবা ভাঁসতে ভাঁসতে চলে গেলেন আকাশের ওপারে
শরৎ এলে মনে পড়ে বাবার
দেয়া কাশফুলের কথা।
মানুষ মরে গেলে সাদা হয়ে যায়।
বাবা শরতের সাদা কাশফুলের সাথে মিশে আছেন।
আমি অনন্তকাল ধরে অসীমের পথে হাঁটছি।
শরতের কাশফুল থেকে বাবার দেহের গন্ধ পাচ্ছি।
পৃথিবীতে শরৎ এসেছে।
কাশফুল এসেছে। বাবা আসেনি।
কাশফুল-শরৎ আর আমি
আমরা সেদিন আকাশের ওপারে বাবাকে দেখতে গিয়েছিলাম।
বাবা কেমন আছেন। দেখলাম; বাবা, কতগুলো শরতের কাশফুল হাতে নিয়ে
স্বর্গের বারান্দায় বসে আছে

আপনার মতামত লিখুন