সংবাদ

অস্তিত্বসংকটে খোকসার বাঁশ ও বেতশিল্প: টিকতে না পেরে পেশা বদল


প্রতিনিধি, খোকসা (কুষ্টিয়া)
প্রতিনিধি, খোকসা (কুষ্টিয়া)
প্রকাশ: ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:০৩ পিএম

অস্তিত্বসংকটে খোকসার বাঁশ ও বেতশিল্প: টিকতে না পেরে পেশা বদল
ছবি : সংবাদ

কুষ্টিয়ার খোকসা পৌরসভার কমলাপুর মৌজায় গড়াই নদীর পাড়ে বংশপরম্পরায় গড়ে ওঠা ‘দাস’ পরিবারগুলো এখন চরম অস্তিত্বসংকটে। বাঁশ ও বেতের সামগ্রী এবং সনাতন বাদ্যযন্ত্র তৈরির পৈতৃক পেশা দিয়ে সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ায় অনেকেই বাধ্য হয়ে পেশা বদল করছেন।

আশির দশকেও কমলাপুর গ্রামের গড়াই নদীর তীরে দেড় শতাধিক দাসের (মুচি) পরিবারের বসতি ছিল। তখন বাদ্যযন্ত্র ও ঐতিহ্যবাহী বাঁশ-বেত শিল্পের ব্যাপক চাহিদা থাকায় নারী-পুরুষ মিলে ডালা, কুলা, চালুন, ধামা ও কাঠা তৈরি করতেন। পাশাপাশি হিন্দু সম্প্রদায়ের বিয়েসহ বিভিন্ন মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে ঢাক-ঢোল বাজিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন তারা।

বর্তমানে গড়াইয়ের নদীভাঙন, আধুনিক প্লাস্টিক পণ্যের আগ্রাসন এবং ডিজিটাল বাদ্যযন্ত্রের দাপটে এই শিল্পের চাহিদা তলানিতে ঠেকেছে। এর ফলে অনেক কারিগর মূল পেশা থেকে ছিটকে পড়েছেন। বর্তমানে এখানে মাত্র ৩৭টি পরিবারে প্রায় আড়াইশ মানুষের বসবাস। চরম দারিদ্র্যের কারণে এই পল্লির অধিকাংশ শিশু প্রাথমিক গণ্ডি পার হওয়ার আগেই উপার্জনের তাগিদে পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছে। ৩৭টি পরিবারের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশনের ব্যবস্থাও অত্যন্ত অপ্রতুল।

পেশা বদলের চিত্র তুলে ধরে পল্লির সমাজপতি ধীরেন দাস (৬৮) জানান, তার তিন ছেলে এখন রাজমিস্ত্রি, সেলুন ও ফার্নিচারের কাজ করেন। আরেক সমাজপতি বিনয় কুমার দাস (৫৬) জানান, তাঁর চার ছেলের মধ্যে দুজন মিষ্টির দোকানের কারিগর এবং দুজন কাঠমিস্ত্রি। প্রবীণ সদস্য বাদল দাসের (৬২) আক্ষেপ, জুতো মেরামত ও বাঁশ-বেতের কাজ তাদের প্রধান পেশা হলেও এখন তার ছেলেরা সেলুন ও ভ্যান চালিয়ে সংসার চালাচ্ছেন।

তবে বয়োবৃদ্ধ সুকুমার দাস (৭৩) অন্য কাজ না জানায় এই বয়সেও কষ্ট করে বাঁশ সংগ্রহ করে কুলা ও ডালা বানিয়ে হাটে বিক্রি করেন। পৈতৃক পেশা ছেড়ে নতুন কাজে গিয়ে অনেকে স্বস্তি পেলেও এনজিওর ঋণের জালে পিষ্ট হচ্ছেন অধিকাংশ পরিবার। প্রায় প্রতিটি পরিবারই দুই-তিনটি এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে দেনার দায়ে জর্জরিত।

স্থানীয় কারিগরদের দাবি, সরকারিভাবে সহজ শর্তে প্রণোদনা ও কাঁচামালের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা গেলে তারা এই ঐতিহ্যবাহী পেশাকে টিকিয়ে রাখতে পারতেন।

এ বিষয়ে খোকসা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘কমলাপুরের দাস সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ভাতা ও সহজ শর্তে ক্ষুদ্রঋণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

খোকসা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খালিদ বিন মনসুর জানান, ‘বিষয়টি অত্যন্ত মানবিক। আমরা দ্রুত সরেজমিনে ওই পল্লি পরিদর্শন করে তাঁদের স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নসহ সরকারি প্রণোদনা ও এনজিওর ঋণের প্রভাব নিরসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬


অস্তিত্বসংকটে খোকসার বাঁশ ও বেতশিল্প: টিকতে না পেরে পেশা বদল

প্রকাশের তারিখ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

কুষ্টিয়ার খোকসা পৌরসভার কমলাপুর মৌজায় গড়াই নদীর পাড়ে বংশপরম্পরায় গড়ে ওঠা ‘দাস’ পরিবারগুলো এখন চরম অস্তিত্বসংকটে। বাঁশ ও বেতের সামগ্রী এবং সনাতন বাদ্যযন্ত্র তৈরির পৈতৃক পেশা দিয়ে সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ায় অনেকেই বাধ্য হয়ে পেশা বদল করছেন।

আশির দশকেও কমলাপুর গ্রামের গড়াই নদীর তীরে দেড় শতাধিক দাসের (মুচি) পরিবারের বসতি ছিল। তখন বাদ্যযন্ত্র ও ঐতিহ্যবাহী বাঁশ-বেত শিল্পের ব্যাপক চাহিদা থাকায় নারী-পুরুষ মিলে ডালা, কুলা, চালুন, ধামা ও কাঠা তৈরি করতেন। পাশাপাশি হিন্দু সম্প্রদায়ের বিয়েসহ বিভিন্ন মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে ঢাক-ঢোল বাজিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন তারা।

বর্তমানে গড়াইয়ের নদীভাঙন, আধুনিক প্লাস্টিক পণ্যের আগ্রাসন এবং ডিজিটাল বাদ্যযন্ত্রের দাপটে এই শিল্পের চাহিদা তলানিতে ঠেকেছে। এর ফলে অনেক কারিগর মূল পেশা থেকে ছিটকে পড়েছেন। বর্তমানে এখানে মাত্র ৩৭টি পরিবারে প্রায় আড়াইশ মানুষের বসবাস। চরম দারিদ্র্যের কারণে এই পল্লির অধিকাংশ শিশু প্রাথমিক গণ্ডি পার হওয়ার আগেই উপার্জনের তাগিদে পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছে। ৩৭টি পরিবারের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশনের ব্যবস্থাও অত্যন্ত অপ্রতুল।

পেশা বদলের চিত্র তুলে ধরে পল্লির সমাজপতি ধীরেন দাস (৬৮) জানান, তার তিন ছেলে এখন রাজমিস্ত্রি, সেলুন ও ফার্নিচারের কাজ করেন। আরেক সমাজপতি বিনয় কুমার দাস (৫৬) জানান, তাঁর চার ছেলের মধ্যে দুজন মিষ্টির দোকানের কারিগর এবং দুজন কাঠমিস্ত্রি। প্রবীণ সদস্য বাদল দাসের (৬২) আক্ষেপ, জুতো মেরামত ও বাঁশ-বেতের কাজ তাদের প্রধান পেশা হলেও এখন তার ছেলেরা সেলুন ও ভ্যান চালিয়ে সংসার চালাচ্ছেন।

তবে বয়োবৃদ্ধ সুকুমার দাস (৭৩) অন্য কাজ না জানায় এই বয়সেও কষ্ট করে বাঁশ সংগ্রহ করে কুলা ও ডালা বানিয়ে হাটে বিক্রি করেন। পৈতৃক পেশা ছেড়ে নতুন কাজে গিয়ে অনেকে স্বস্তি পেলেও এনজিওর ঋণের জালে পিষ্ট হচ্ছেন অধিকাংশ পরিবার। প্রায় প্রতিটি পরিবারই দুই-তিনটি এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে দেনার দায়ে জর্জরিত।

স্থানীয় কারিগরদের দাবি, সরকারিভাবে সহজ শর্তে প্রণোদনা ও কাঁচামালের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা গেলে তারা এই ঐতিহ্যবাহী পেশাকে টিকিয়ে রাখতে পারতেন।

এ বিষয়ে খোকসা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘কমলাপুরের দাস সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ভাতা ও সহজ শর্তে ক্ষুদ্রঋণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

খোকসা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খালিদ বিন মনসুর জানান, ‘বিষয়টি অত্যন্ত মানবিক। আমরা দ্রুত সরেজমিনে ওই পল্লি পরিদর্শন করে তাঁদের স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নসহ সরকারি প্রণোদনা ও এনজিওর ঋণের প্রভাব নিরসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত