সংবাদ

রামপালে অর্থায়ন: যুক্তরাজ্যের ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৪০ পিএম

রামপালে অর্থায়ন: যুক্তরাজ্যের ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা
ছবি : সংগৃহীত

সুন্দরবনের কাছে নির্মিতবিতর্কিত’ কয়লাভিত্তিক রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে আর্থিক সংযোগ থাকার অভিযোগে যুক্তরাজ্যে ব্রিটিশ বহুজাতিক ব্যাংক বার্কলেসের বিরুদ্ধে একটি আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করা হয়েছে।

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাজ্য সরকারের অফিস ফর রেসপনসিবল বিজনেস কন্ডাক্টে বাংলাদেশ ভারতের তিনজন সংক্ষুব্ধ অভিযোগকারী এই অভিযোগ জমা দিয়েছেন। অভিযোগকারীদের আইনি সহায়তা দিচ্ছে মর্যাদাপূর্ণ কিংস কলেজ লন্ডনের আইন স্কুলের কিংস হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ক্লিনিক।

কিংস লিগ্যাল ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, ব্রিটিশ ব্যাংক বার্কলেস ভারতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এনটিপিসি লিমিটেডের ঋণের আন্ডাররাইটার হিসেবে কাজ করেছে। এই এনটিপিসি রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের যৌথ উদ্যোগের একটি অংশীদার। ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বার্কলেস এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার বন্ড ইস্যুতে আন্ডাররাইটার হিসেবে যুক্ত ছিল, যা পরবর্তীতে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ঋণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

অভিযোগকারীদের প্রধান দাবি, কোনো প্রকল্প বা প্রতিষ্ঠানকে বড় ধরনের আর্থিক সেবা দেওয়ার আগে ব্যাংকগুলোর যে ধরনের কঠোর পরিবেশগত মানবাধিকার ঝুঁকি যাচাই করা উচিত ছিল, বার্কলেস তা করেনি।

মামলার অন্যতম বাংলাদেশি অভিযোগকারী পরিচিত পরিবেশকর্মী শরীফ জামিল জোরালো কণ্ঠে বলেন, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং এর আশপাশের বিভিন্ন শিল্প কার্যক্রম থেকে নির্গত ভারী ধাতুর দূষণ নদী খালের মাধ্যমে সরাসরি সুন্দরবনে প্রবেশ করছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পশুর নদীর তীরে অবস্থিত হওয়ায় এবং পশুর নদী সুন্দরবনের পরিবেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এর দূষণের মাত্রা বনের স্বাস্থ্যকে মারত্মক হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

গত বছরের নভেম্বরে প্রকাশিত একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণায় সুন্দরবনের পানিতে পারদ আর্সেনিকের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধির তথ্য উঠে আসে, যেখানে সবচেয়ে বেশি ঘনত্ব পাওয়া যায় পশুর নদীর পানিতেই। শিল্পকারখানার বর্জ্য, বন্দরের কার্যক্রম এবং কয়লা পোড়ানোর নির্গমন একত্রে মিলে রামপালকে সুন্দরবনের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য পরিবেশগত হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন বাংলাদেশ ভারতের বিস্তীর্ণ উপকূলজুড়ে বিস্তৃত থেকে বহু দুর্লভ উদ্ভিদ রয়েল বেঙ্গল টাইগারের মতো বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল রক্ষা করে আসছে। এখানকার লাখো খেটে খাওয়া মানুষ খাদ্য জীবিকার জন্য এই বন নদীর ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল।

অভিযোগকারীরা বলছেন, রামপাল প্রকল্পের কয়লা পোড়ানো থেকে উৎপন্ন কার্বন নিঃসরণ বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বৃদ্ধিতে সরাসরি ভূমিকা রাখছে, যা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি চরম আবহাওয়ার চরম ঝুঁকি ডেকে আনছে।

এছাড়া ২০১৬ সালে ইউনেসকোর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনেও রামপাল প্রকল্পের কারণে সুন্দরবনের বিশ্ব ঐতিহ্য এলাকার ওপর সম্ভাব্য বায়ু পানিদূষণের মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কার কথা বলা হয়েছিল।

এই আইনি লড়াইয়ে বাংলাদেশি পরিবেশকর্মী ছাড়াও অন্যান্য অভিযোগকারীদের মধ্যে রয়েছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কৃষক রাজনীতিক অনিমেষ মণ্ডল এবং মাছশ্রমিকদের সংগঠন দক্ষিণবঙ্গ মৎস্যজীবী ফোরাম।

তাদের হয়ে কাজ করা কিংস হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ক্লিনিকের আইনজীবী সু উইলম্যান মন্তব্য করেছেন যে সুন্দরবনের গ্রামীণ জনগোষ্ঠী আজ জলবায়ু প্রকৃতির এই মারাত্মক সংকটের একদম সম্মুখসারিতে অবস্থান করছে।

তিনি আশাপ্রকাশ করেন, এই আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে বিশ্বের বড় বড় ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো জীবাশ্ম জ্বালানি কয়লাভিত্তিক ক্ষতিকর প্রকল্পে অর্থায়নের আগে আরও বেশি সতর্ক হবে।

পরিবেশকর্মী শরীফ জামিল আরও যোগ করেন, অন্যান্য আন্তর্জাতিক ব্যাংক যখন এই প্রকল্প থেকে নিজেদের বিনিয়োগ প্রত্যাহার করেছিল বা অর্থায়ন থেকে বিরত ছিল, তখন বার্কলেসের মতো প্রতিষ্ঠানের নীতিও পুনর্বিবেচনা করা উচিত।

বাংলাদেশে সারা বছর প্রচুর সূর্যালোক পাওয়া যায় উল্লেখ করে তিনি জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর তাগিদ দেন এবং সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির অফুরন্ত সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জোরালো আহ্বান জানান।

বর্তমানে যুক্তরাজ্যের ব্যবসা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন অফিস ফর রেসপনসিবল বিজনেস কন্ডাক্ট এই অভিযোগটি গ্রহণ করে তদন্ত শুরু করবে কি না, তা যাচাই মূল্যায়ন করছে। তবে সুনির্দিষ্ট এই অভিযোগের বিষয়ে বার্কলেস ব্যাংক এবং রামপাল প্রকল্পের হোল্ডিং কোম্পানি বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (বিআইএফপিসিএল) পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬


রামপালে অর্থায়ন: যুক্তরাজ্যের ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা

প্রকাশের তারিখ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

সুন্দরবনের কাছে নির্মিতবিতর্কিত’ কয়লাভিত্তিক রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে আর্থিক সংযোগ থাকার অভিযোগে যুক্তরাজ্যে ব্রিটিশ বহুজাতিক ব্যাংক বার্কলেসের বিরুদ্ধে একটি আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করা হয়েছে।

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাজ্য সরকারের অফিস ফর রেসপনসিবল বিজনেস কন্ডাক্টে বাংলাদেশ ভারতের তিনজন সংক্ষুব্ধ অভিযোগকারী এই অভিযোগ জমা দিয়েছেন। অভিযোগকারীদের আইনি সহায়তা দিচ্ছে মর্যাদাপূর্ণ কিংস কলেজ লন্ডনের আইন স্কুলের কিংস হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ক্লিনিক।

কিংস লিগ্যাল ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, ব্রিটিশ ব্যাংক বার্কলেস ভারতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এনটিপিসি লিমিটেডের ঋণের আন্ডাররাইটার হিসেবে কাজ করেছে। এই এনটিপিসি রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের যৌথ উদ্যোগের একটি অংশীদার। ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বার্কলেস এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার বন্ড ইস্যুতে আন্ডাররাইটার হিসেবে যুক্ত ছিল, যা পরবর্তীতে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ঋণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

অভিযোগকারীদের প্রধান দাবি, কোনো প্রকল্প বা প্রতিষ্ঠানকে বড় ধরনের আর্থিক সেবা দেওয়ার আগে ব্যাংকগুলোর যে ধরনের কঠোর পরিবেশগত মানবাধিকার ঝুঁকি যাচাই করা উচিত ছিল, বার্কলেস তা করেনি।

মামলার অন্যতম বাংলাদেশি অভিযোগকারী পরিচিত পরিবেশকর্মী শরীফ জামিল জোরালো কণ্ঠে বলেন, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং এর আশপাশের বিভিন্ন শিল্প কার্যক্রম থেকে নির্গত ভারী ধাতুর দূষণ নদী খালের মাধ্যমে সরাসরি সুন্দরবনে প্রবেশ করছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পশুর নদীর তীরে অবস্থিত হওয়ায় এবং পশুর নদী সুন্দরবনের পরিবেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এর দূষণের মাত্রা বনের স্বাস্থ্যকে মারত্মক হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

গত বছরের নভেম্বরে প্রকাশিত একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণায় সুন্দরবনের পানিতে পারদ আর্সেনিকের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধির তথ্য উঠে আসে, যেখানে সবচেয়ে বেশি ঘনত্ব পাওয়া যায় পশুর নদীর পানিতেই। শিল্পকারখানার বর্জ্য, বন্দরের কার্যক্রম এবং কয়লা পোড়ানোর নির্গমন একত্রে মিলে রামপালকে সুন্দরবনের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য পরিবেশগত হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন বাংলাদেশ ভারতের বিস্তীর্ণ উপকূলজুড়ে বিস্তৃত থেকে বহু দুর্লভ উদ্ভিদ রয়েল বেঙ্গল টাইগারের মতো বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল রক্ষা করে আসছে। এখানকার লাখো খেটে খাওয়া মানুষ খাদ্য জীবিকার জন্য এই বন নদীর ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল।

অভিযোগকারীরা বলছেন, রামপাল প্রকল্পের কয়লা পোড়ানো থেকে উৎপন্ন কার্বন নিঃসরণ বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বৃদ্ধিতে সরাসরি ভূমিকা রাখছে, যা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি চরম আবহাওয়ার চরম ঝুঁকি ডেকে আনছে।

এছাড়া ২০১৬ সালে ইউনেসকোর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনেও রামপাল প্রকল্পের কারণে সুন্দরবনের বিশ্ব ঐতিহ্য এলাকার ওপর সম্ভাব্য বায়ু পানিদূষণের মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কার কথা বলা হয়েছিল।

এই আইনি লড়াইয়ে বাংলাদেশি পরিবেশকর্মী ছাড়াও অন্যান্য অভিযোগকারীদের মধ্যে রয়েছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কৃষক রাজনীতিক অনিমেষ মণ্ডল এবং মাছশ্রমিকদের সংগঠন দক্ষিণবঙ্গ মৎস্যজীবী ফোরাম।

তাদের হয়ে কাজ করা কিংস হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ক্লিনিকের আইনজীবী সু উইলম্যান মন্তব্য করেছেন যে সুন্দরবনের গ্রামীণ জনগোষ্ঠী আজ জলবায়ু প্রকৃতির এই মারাত্মক সংকটের একদম সম্মুখসারিতে অবস্থান করছে।

তিনি আশাপ্রকাশ করেন, এই আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে বিশ্বের বড় বড় ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো জীবাশ্ম জ্বালানি কয়লাভিত্তিক ক্ষতিকর প্রকল্পে অর্থায়নের আগে আরও বেশি সতর্ক হবে।

পরিবেশকর্মী শরীফ জামিল আরও যোগ করেন, অন্যান্য আন্তর্জাতিক ব্যাংক যখন এই প্রকল্প থেকে নিজেদের বিনিয়োগ প্রত্যাহার করেছিল বা অর্থায়ন থেকে বিরত ছিল, তখন বার্কলেসের মতো প্রতিষ্ঠানের নীতিও পুনর্বিবেচনা করা উচিত।

বাংলাদেশে সারা বছর প্রচুর সূর্যালোক পাওয়া যায় উল্লেখ করে তিনি জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর তাগিদ দেন এবং সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির অফুরন্ত সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জোরালো আহ্বান জানান।

বর্তমানে যুক্তরাজ্যের ব্যবসা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন অফিস ফর রেসপনসিবল বিজনেস কন্ডাক্ট এই অভিযোগটি গ্রহণ করে তদন্ত শুরু করবে কি না, তা যাচাই মূল্যায়ন করছে। তবে সুনির্দিষ্ট এই অভিযোগের বিষয়ে বার্কলেস ব্যাংক এবং রামপাল প্রকল্পের হোল্ডিং কোম্পানি বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (বিআইএফপিসিএল) পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত