পশ্চিমবঙ্গে পালাবদলের পর বিজেপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু সরকার পরিচালনা নয়, বরং যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রত্যাশায় মানুষ তাদের ক্ষমতায় এনেছে, সেই প্রত্যাশা কতটা ধরে রাখা যায়–সেই প্রশ্ন। আর ঠিক এই জায়গাতেই আরএসএস-ঘনিষ্ঠ বাংলা সাপ্তাহিক ‘স্বস্তিকা’র সাম্প্রতিক সম্পাদকীয়কে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
সম্পাদকীয়টির মূল সতর্কবার্তা হল–বিজেপি যেন তৃণমূলের বিকল্প হতে গিয়ে তৃণমূলেরই আর একটি সংস্করণে পরিণত না হয়। ‘স্বস্তিকা’র বক্তব্য অনুযায়ী, মানুষের কাছে বিজেপির সবচেয়ে বড় সম্পদ হল আস্থা। সেই আস্থায় সামান্য চিড়ও ভবিষ্যতে বড় রাজনৈতিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে সম্পাদকীয়র বক্তব্য হিসেবে এমন সতর্কতাও এসেছে যে, মাত্র ২ শতাংশ ভোটারের মধ্যেও যদি এই ধারণা তৈরি হয় যে বিজেপি দীর্ঘদিনের তৃণমূল শাসনেরই অন্য রূপ, তা হলে বিপুল সংখ্যক ভোটার বিজেপি থেকে সরে যেতে পারেন।
এই সতর্কবার্তার পেছনে রয়েছে বিজেপিতে তৃণমূল-সহ অন্য দল থেকে আসা নেতা-কর্মীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন। ভোটের আগে যে রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল, ভোটের ফল প্রকাশের পর সেই শিবিরের বহু নেতা-কর্মী বিজেপির দিকে চলে এলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে–তাহলে কি শুধু দলের পতাকা বদলেছে, নাকি রাজনৈতিক সংস্কৃতিও বদলাবে?
‘স্বস্তিকা’র আগের লেখাতেও বিজেপির মধ্যে প্রবেশ করা কিছু ‘দুষ্কৃতী’ ও ‘তোলাবাজ’ নিয়ে সতর্ক করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনগুলিতে উল্লেখ রয়েছে। এমনকি দলের অভ্যন্তরে কয়েকশো সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রসঙ্গও আলোচনায় এসেছে। অর্থাৎ এটি এক দিনের সতর্কবার্তা নয়; বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর দলের চরিত্র ও ভাবমূর্তি নিয়ে আরএসএস-ঘনিষ্ঠ মহলে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তারই ধারাবাহিকতা হিসেবে বিষয়টি দেখা যায়।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দিক রয়েছে। তৃণমূল থেকে বিজেপিতে যাওয়া কয়েকজন প্রাক্তন সাংসদকে রাজ্যসভায় পাঠানোর সিদ্ধান্তের পর ‘তৃণমূলীকরণ’ নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সুখেন্দুশেখর রায়, সুস্মিতা দেব ও প্রকাশ চিক বরাইকের মতো প্রাক্তন তৃণমূল সাংসদ বিজেপির তরফে রাজ্যসভায় যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। ফলে বিজেপির পুরনো কর্মীদের একাংশের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক–দীর্ঘদিনের সংগঠন-নির্ভর রাজনীতির মূল্যায়ন কীভাবে হবে এবং দলবদল করে আসা নেতাদের কতটা গুরুত্ব দেওয়া হবে?
তবে এই ঘটনাকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত রাজনৈতিক পুনর্বাসন হিসেবে দেখলে পুরো ছবিটি ধরা পড়বে না। ক্ষমতায় আসার পর বিজেপির জন্য বিধানসভায় শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রাখা, প্রশাসন চালানো এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আইন ও সিদ্ধান্ত কার্যকর করার জন্য রাজনৈতিক সমীকরণও গুরুত্বপূর্ণ। ‘স্বস্তিকা’র আগের আলোচনায় জাতীয় রাজনীতির প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে এসেছে। ফলে একদিকে সংগঠনের আদর্শ ও ভোটারের প্রত্যাশা, অন্যদিকে বাস্তব রাজনীতির প্রয়োজন–এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই বিজেপির বড় পরীক্ষা।
এই জায়গাতেই ‘স্বস্তিকা’র সতর্কবার্তার রাজনৈতিক গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। বিজেপি যদি মনে করে শুধুমাত্র তৃণমূলকে সরিয়ে ক্ষমতায় আসাই তাদের সাফল্যের শেষ ধাপ, তা হলে সেটি বড় ভুল হবে। ভোটাররা সরকার পরিবর্তন করেছেন মানেই তাঁরা পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির সমস্ত উপাদানকে নতুন দলের মধ্যে দেখতে চাইবেন–এমন নয়। বরং মানুষ পরিবর্তনের সঙ্গে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোরতা, দলীয় শৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক আচরণে পরিবর্তনও প্রত্যাশা করতে পারেন।
এই প্রেক্ষাপটে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রসঙ্গও গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনের পর সরকার গঠনের কয়েক মাসের মধ্যেই প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে একাধিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ‘স্বস্তিকা’র সতর্কতার আলোকে প্রশ্ন উঠছে–সরকারের প্রথম কয়েক মাসের ঘোষণাগুলি এবং বাস্তব প্রশাসনিক ফলাফলের মধ্যে কতটা সামঞ্জস্য তৈরি হচ্ছে? ক্ষমতায় বসার পর প্রাথমিক রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক সাফল্যই শেষ পর্যন্ত সরকারের গ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠি হবে।
সুতরাং ১ সেপ্টেম্বরের ‘স্বস্তিকা’র বার্তাকে শুধু বিজেপিকে তিরস্কার হিসেবে দেখা সম্ভবত অতিসরলীকরণ হবে। বরং এটি বিজেপির জন্য একটি ‘ক্ষমতায় এসেছ, এবার নিজেকে প্রমাণ করো’ ধরনের সতর্কবার্তা। আরএসএস-ঘনিষ্ঠ একটি প্রকাশনা যখন প্রকাশ্যেই বিজেপির ‘তৃণমূলীকরণ’ নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তখন তার রাজনৈতিক তাৎপর্য অবশ্যই রয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই বিরোধী দল কে, তা নয়। প্রশ্ন হল–বিজেপি ক্ষমতায় এসে নিজেকে কতটা আলাদা রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারছে। কারণ বিরোধীরা দুর্বল থাকলেও ভোটারের আস্থা দুর্বল হয়ে গেলে ক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন। ‘স্বস্তিকা’র সম্পাদকীয় মূলত সেই জায়গাটিই মনে করিয়ে দিয়েছে–বিজেপির বিরুদ্ধে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হয়তো বিরোধী দল নয়, বরং নিজেদের ভাবমূর্তি এবং নিজেদেরই রাজনৈতিক আচরণ।
\

সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গে পালাবদলের পর বিজেপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু সরকার পরিচালনা নয়, বরং যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রত্যাশায় মানুষ তাদের ক্ষমতায় এনেছে, সেই প্রত্যাশা কতটা ধরে রাখা যায়–সেই প্রশ্ন। আর ঠিক এই জায়গাতেই আরএসএস-ঘনিষ্ঠ বাংলা সাপ্তাহিক ‘স্বস্তিকা’র সাম্প্রতিক সম্পাদকীয়কে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
সম্পাদকীয়টির মূল সতর্কবার্তা হল–বিজেপি যেন তৃণমূলের বিকল্প হতে গিয়ে তৃণমূলেরই আর একটি সংস্করণে পরিণত না হয়। ‘স্বস্তিকা’র বক্তব্য অনুযায়ী, মানুষের কাছে বিজেপির সবচেয়ে বড় সম্পদ হল আস্থা। সেই আস্থায় সামান্য চিড়ও ভবিষ্যতে বড় রাজনৈতিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে সম্পাদকীয়র বক্তব্য হিসেবে এমন সতর্কতাও এসেছে যে, মাত্র ২ শতাংশ ভোটারের মধ্যেও যদি এই ধারণা তৈরি হয় যে বিজেপি দীর্ঘদিনের তৃণমূল শাসনেরই অন্য রূপ, তা হলে বিপুল সংখ্যক ভোটার বিজেপি থেকে সরে যেতে পারেন।
এই সতর্কবার্তার পেছনে রয়েছে বিজেপিতে তৃণমূল-সহ অন্য দল থেকে আসা নেতা-কর্মীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন। ভোটের আগে যে রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল, ভোটের ফল প্রকাশের পর সেই শিবিরের বহু নেতা-কর্মী বিজেপির দিকে চলে এলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে–তাহলে কি শুধু দলের পতাকা বদলেছে, নাকি রাজনৈতিক সংস্কৃতিও বদলাবে?
‘স্বস্তিকা’র আগের লেখাতেও বিজেপির মধ্যে প্রবেশ করা কিছু ‘দুষ্কৃতী’ ও ‘তোলাবাজ’ নিয়ে সতর্ক করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনগুলিতে উল্লেখ রয়েছে। এমনকি দলের অভ্যন্তরে কয়েকশো সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রসঙ্গও আলোচনায় এসেছে। অর্থাৎ এটি এক দিনের সতর্কবার্তা নয়; বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর দলের চরিত্র ও ভাবমূর্তি নিয়ে আরএসএস-ঘনিষ্ঠ মহলে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তারই ধারাবাহিকতা হিসেবে বিষয়টি দেখা যায়।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দিক রয়েছে। তৃণমূল থেকে বিজেপিতে যাওয়া কয়েকজন প্রাক্তন সাংসদকে রাজ্যসভায় পাঠানোর সিদ্ধান্তের পর ‘তৃণমূলীকরণ’ নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সুখেন্দুশেখর রায়, সুস্মিতা দেব ও প্রকাশ চিক বরাইকের মতো প্রাক্তন তৃণমূল সাংসদ বিজেপির তরফে রাজ্যসভায় যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। ফলে বিজেপির পুরনো কর্মীদের একাংশের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক–দীর্ঘদিনের সংগঠন-নির্ভর রাজনীতির মূল্যায়ন কীভাবে হবে এবং দলবদল করে আসা নেতাদের কতটা গুরুত্ব দেওয়া হবে?
তবে এই ঘটনাকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত রাজনৈতিক পুনর্বাসন হিসেবে দেখলে পুরো ছবিটি ধরা পড়বে না। ক্ষমতায় আসার পর বিজেপির জন্য বিধানসভায় শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রাখা, প্রশাসন চালানো এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আইন ও সিদ্ধান্ত কার্যকর করার জন্য রাজনৈতিক সমীকরণও গুরুত্বপূর্ণ। ‘স্বস্তিকা’র আগের আলোচনায় জাতীয় রাজনীতির প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে এসেছে। ফলে একদিকে সংগঠনের আদর্শ ও ভোটারের প্রত্যাশা, অন্যদিকে বাস্তব রাজনীতির প্রয়োজন–এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই বিজেপির বড় পরীক্ষা।
এই জায়গাতেই ‘স্বস্তিকা’র সতর্কবার্তার রাজনৈতিক গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। বিজেপি যদি মনে করে শুধুমাত্র তৃণমূলকে সরিয়ে ক্ষমতায় আসাই তাদের সাফল্যের শেষ ধাপ, তা হলে সেটি বড় ভুল হবে। ভোটাররা সরকার পরিবর্তন করেছেন মানেই তাঁরা পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির সমস্ত উপাদানকে নতুন দলের মধ্যে দেখতে চাইবেন–এমন নয়। বরং মানুষ পরিবর্তনের সঙ্গে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোরতা, দলীয় শৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক আচরণে পরিবর্তনও প্রত্যাশা করতে পারেন।
এই প্রেক্ষাপটে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রসঙ্গও গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনের পর সরকার গঠনের কয়েক মাসের মধ্যেই প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে একাধিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ‘স্বস্তিকা’র সতর্কতার আলোকে প্রশ্ন উঠছে–সরকারের প্রথম কয়েক মাসের ঘোষণাগুলি এবং বাস্তব প্রশাসনিক ফলাফলের মধ্যে কতটা সামঞ্জস্য তৈরি হচ্ছে? ক্ষমতায় বসার পর প্রাথমিক রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক সাফল্যই শেষ পর্যন্ত সরকারের গ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠি হবে।
সুতরাং ১ সেপ্টেম্বরের ‘স্বস্তিকা’র বার্তাকে শুধু বিজেপিকে তিরস্কার হিসেবে দেখা সম্ভবত অতিসরলীকরণ হবে। বরং এটি বিজেপির জন্য একটি ‘ক্ষমতায় এসেছ, এবার নিজেকে প্রমাণ করো’ ধরনের সতর্কবার্তা। আরএসএস-ঘনিষ্ঠ একটি প্রকাশনা যখন প্রকাশ্যেই বিজেপির ‘তৃণমূলীকরণ’ নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তখন তার রাজনৈতিক তাৎপর্য অবশ্যই রয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই বিরোধী দল কে, তা নয়। প্রশ্ন হল–বিজেপি ক্ষমতায় এসে নিজেকে কতটা আলাদা রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারছে। কারণ বিরোধীরা দুর্বল থাকলেও ভোটারের আস্থা দুর্বল হয়ে গেলে ক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন। ‘স্বস্তিকা’র সম্পাদকীয় মূলত সেই জায়গাটিই মনে করিয়ে দিয়েছে–বিজেপির বিরুদ্ধে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হয়তো বিরোধী দল নয়, বরং নিজেদের ভাবমূর্তি এবং নিজেদেরই রাজনৈতিক আচরণ।
\

আপনার মতামত লিখুন