একসময় হাম নির্মূলের খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিল বাংলাদেশ। শিশুদের নিয়মিত টিকা দেওয়ার হারও ছিল বেশ ভালো। কিন্তু গত দুই বছরে টিকাদান কর্মসূচিতে নানা ধরনের বাধা তৈরি হওয়ায় এখন তার বড় প্রভাব পড়ছে। মার্চ থেকে দেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব চলছে। সম্প্রতি প্রকাশিত রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, বর্তমানে বিশ্বে সবচেয়ে বড় হামের প্রাদুর্ভাব চলছে বাংলাদেশে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে। পরীক্ষায় হামের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে প্রায় ২০ হাজার মানুষের। এছাড়া ১ লাখ ৪৬ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। হামের সঙ্গে সম্পর্কিত মৃত্যুর সংখ্যা ৯৯৯। এর মধ্যে ১০০ জনের মৃত্যু পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে হামের কারণে হয়েছে।
হাম অত্যন্ত সংক্রামক, তবে নিয়মিত টিকা নিলে এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে শিশুদের হামের টিকা দেওয়ার হার ৯৫ শতাংশের কাছাকাছি বা তার ওপরে ছিল। কিন্তু ২০২৪ ও ২০২৫ সালে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে সমস্যা তৈরি হয়। ওই সময়ে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব পড়ে স্বাস্থ্যসেবা ও টিকাদান কার্যক্রমেও। টিকা দেওয়ার কিছু কর্মসূচি পিছিয়ে যায়, একটি দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচিও বাতিল হয়।
এর পাশাপাশি টিকা কেনার পদ্ধতিতে পরিবর্তনের কারণে সরবরাহেও সংকট তৈরি হয়েছিল বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সারদার মো. সাখাওয়াত হুসাইন। ফলে অনেক শিশু সময়মতো টিকা পায়নি। তাদের শরীরে হামের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়নি। এরপর একজন আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সহজেই অন্যদের মধ্যে রোগটি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।
হামের প্রাদুর্ভাবের শুরুতে আক্রান্তদের প্রায় ৮০ শতাংশই ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। এর একটি কারণ হলো, ৯ মাসের কম বয়সী শিশুরা সাধারণ নিয়মে হামের টিকা নেওয়ার বয়সে পৌঁছায় না। ফলে তাদের শরীরে টিকার মাধ্যমে তৈরি সুরক্ষা থাকে না।
অন্যদিকে, যেসব বড় শিশু বা প্রাপ্তবয়স্ক সময়মতো টিকা নেয়নি, তারাও সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকে। অর্থাৎ টিকাদানে দীর্ঘ সময়ের ঘাটতি তৈরি হলে শুধু একটি বয়সের মানুষ নয়, পুরো সমাজের মধ্যেই রোগ ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়।
মহামারি বিশেষজ্ঞ ও আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমানের মতে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের টিকাদানের ঘাটতিই বাংলাদেশের হামের নির্মূল লক্ষ্যে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার মতে, এখন দ্রুত যেসব শিশুর টিকা নেওয়া হয়নি, তাদের টিকার আওতায় আনতে হবে।
হামের রোগী বাড়ার সময়েই দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপও চলছে। ফলে হাসপাতালগুলোকে একই সঙ্গে দুই ধরনের রোগীর চাপ সামলাতে হচ্ছে। চলতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৪৫ হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের রোগীদের জন্য ৬০টি শয্যা থাকলেও রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় অনেককে মেঝেতে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। হাসপাতালটির ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. নন্দ দুলাল সাহা জানান, ১ হাজার ৩৫০ রোগীর জন্য তৈরি হাসপাতালটিতে বর্তমানে ২ হাজার ৩৫০ জনের বেশি রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এপ্রিল থেকে দেশজুড়ে জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে সরকার। ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পরে ১ কোটি ৯৭ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু একটি জরুরি কর্মসূচি দিয়ে সমস্যার পুরো সমাধান হবে না। নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ঠিক রাখতে হবে। যেসব শিশু আগের সময়ে টিকা পায়নি, তাদেরও খুঁজে বের করে টিকা দিতে হবে।
হাম অত্যন্ত সংক্রামক হলেও এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব। এর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সময়মতো টিকা নেওয়া। বাংলাদেশে বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে—টিকাদান কর্মসূচিতে সাময়িক ঘাটতিও পরে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
একসময় হাম নির্মূলের খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিল বাংলাদেশ। শিশুদের নিয়মিত টিকা দেওয়ার হারও ছিল বেশ ভালো। কিন্তু গত দুই বছরে টিকাদান কর্মসূচিতে নানা ধরনের বাধা তৈরি হওয়ায় এখন তার বড় প্রভাব পড়ছে। মার্চ থেকে দেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব চলছে। সম্প্রতি প্রকাশিত রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, বর্তমানে বিশ্বে সবচেয়ে বড় হামের প্রাদুর্ভাব চলছে বাংলাদেশে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে। পরীক্ষায় হামের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে প্রায় ২০ হাজার মানুষের। এছাড়া ১ লাখ ৪৬ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। হামের সঙ্গে সম্পর্কিত মৃত্যুর সংখ্যা ৯৯৯। এর মধ্যে ১০০ জনের মৃত্যু পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে হামের কারণে হয়েছে।
হাম অত্যন্ত সংক্রামক, তবে নিয়মিত টিকা নিলে এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে শিশুদের হামের টিকা দেওয়ার হার ৯৫ শতাংশের কাছাকাছি বা তার ওপরে ছিল। কিন্তু ২০২৪ ও ২০২৫ সালে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে সমস্যা তৈরি হয়। ওই সময়ে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব পড়ে স্বাস্থ্যসেবা ও টিকাদান কার্যক্রমেও। টিকা দেওয়ার কিছু কর্মসূচি পিছিয়ে যায়, একটি দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচিও বাতিল হয়।
এর পাশাপাশি টিকা কেনার পদ্ধতিতে পরিবর্তনের কারণে সরবরাহেও সংকট তৈরি হয়েছিল বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সারদার মো. সাখাওয়াত হুসাইন। ফলে অনেক শিশু সময়মতো টিকা পায়নি। তাদের শরীরে হামের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়নি। এরপর একজন আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সহজেই অন্যদের মধ্যে রোগটি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।
হামের প্রাদুর্ভাবের শুরুতে আক্রান্তদের প্রায় ৮০ শতাংশই ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। এর একটি কারণ হলো, ৯ মাসের কম বয়সী শিশুরা সাধারণ নিয়মে হামের টিকা নেওয়ার বয়সে পৌঁছায় না। ফলে তাদের শরীরে টিকার মাধ্যমে তৈরি সুরক্ষা থাকে না।
অন্যদিকে, যেসব বড় শিশু বা প্রাপ্তবয়স্ক সময়মতো টিকা নেয়নি, তারাও সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকে। অর্থাৎ টিকাদানে দীর্ঘ সময়ের ঘাটতি তৈরি হলে শুধু একটি বয়সের মানুষ নয়, পুরো সমাজের মধ্যেই রোগ ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়।
মহামারি বিশেষজ্ঞ ও আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমানের মতে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের টিকাদানের ঘাটতিই বাংলাদেশের হামের নির্মূল লক্ষ্যে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার মতে, এখন দ্রুত যেসব শিশুর টিকা নেওয়া হয়নি, তাদের টিকার আওতায় আনতে হবে।
হামের রোগী বাড়ার সময়েই দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপও চলছে। ফলে হাসপাতালগুলোকে একই সঙ্গে দুই ধরনের রোগীর চাপ সামলাতে হচ্ছে। চলতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৪৫ হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের রোগীদের জন্য ৬০টি শয্যা থাকলেও রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় অনেককে মেঝেতে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। হাসপাতালটির ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. নন্দ দুলাল সাহা জানান, ১ হাজার ৩৫০ রোগীর জন্য তৈরি হাসপাতালটিতে বর্তমানে ২ হাজার ৩৫০ জনের বেশি রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এপ্রিল থেকে দেশজুড়ে জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে সরকার। ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পরে ১ কোটি ৯৭ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু একটি জরুরি কর্মসূচি দিয়ে সমস্যার পুরো সমাধান হবে না। নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ঠিক রাখতে হবে। যেসব শিশু আগের সময়ে টিকা পায়নি, তাদেরও খুঁজে বের করে টিকা দিতে হবে।
হাম অত্যন্ত সংক্রামক হলেও এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব। এর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সময়মতো টিকা নেওয়া। বাংলাদেশে বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে—টিকাদান কর্মসূচিতে সাময়িক ঘাটতিও পরে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন