সংবাদ

পার্সিয়ান কিনি লাখে, রাস্তারটাকে দিই লাথি- এ কেমন বিড়ালপ্রেম?


বিশাখা চৌধুরী
বিশাখা চৌধুরী
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:২১ পিএম

পার্সিয়ান কিনি লাখে, রাস্তারটাকে দিই লাথি- এ কেমন বিড়ালপ্রেম?
দেশি জাতের মিউ।

একটি বিড়াল ফুটপাতে বসে আছে। ধুলো মাখা শরীর।কান একটু ছেঁড়া। লেজে পুরোনো আঘাতের দাগ। কেউ পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বলে, ‘নেড়ি বিড়াল।’ কেউ বিরক্ত হয়ে তাড়ায়। কেউ হয়তো একমুঠো ভাত ছুঁড়ে দেয়। কেউ হয়তো আচমকা লাথিই মেরে বসে!

আরেকটি বিড়াল কাচঘেরা ঘরে বসে। লম্বা লোম, গোল মুখ, নীল বা সবুজ চোখ। তার নাম পার্সিয়ান। আরেকটির শরীর গোলগাল, ঘন লোম—ব্রিটিশ শর্টহেয়ার। তাদের দাম কয়েক হাজার থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত উঠতে পারে।

দুটিই বিড়াল। দুটিরই মিউ মিউ ডাক আছে। ইঁদুর ধরার একই প্রাচীন প্রবৃত্তি আছে। মানুষের ঘরে থাকার হাজার বছরের ইতিহাসও আছে। তবু মানুষের চোখে তাদের মূল্য এক নয়। প্রশ্নটা এখানেই। আমরা কি বিড়াল ভালোবাসি, নাকি বিড়ালের মধ্যে নিজেদের শ্রেণি, রুচি, অর্থ ও অভিজাততার ছবি দেখতে ভালোবাসি?

বিড়ালের ইতিহাস আসলে মানুষের সভ্যতার ইতিহাসের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে জড়িয়ে আছে। গবেষণা বলছে, প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার বছর আগে নিকটপ্রাচ্যের কৃষিভিত্তিক সমাজে মানুষ ও বন্য বিড়ালের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করে। মানুষ শস্য মজুত করতে শুরু করল; শস্যের সঙ্গে এল ইঁদুর; ইঁদুরের পেছনে এল বন্য বিড়াল। মানুষ পেল ইঁদুরের প্রাকৃতিক শত্রু, আর বিড়াল পেল খাবারের সহজ উৎস ও নিরাপদ আশ্রয়। এভাবেই গড়ে উঠেছিল এক ধরনের পারস্পরিক সহাবস্থান। অর্থাৎ বিড়ালকে মানুষ প্রথমে সৌন্দর্যের জন্য পোষেনি, প্রয়োজনের জন্য কাছে টেনেছিল।

দেশি লক্ষ্মী বিড়াল

আজ যে পার্সিয়ান, ব্রিটিশ শর্টহেয়ার, সিয়ামিজ কিংবা অন্য নানা জাতের বিড়াল নিয়ে আমাদের এত মাতামাতি, সেগুলোর বেশির ভাগই এসেছে পরবর্তী সময়ের বাছাই করা প্রজনন থেকে। প্রত্নতাত্ত্বিক ও বংশগত গবেষণা বলছে, মানুষের সঙ্গে বিড়ালের ছড়িয়ে পড়ার দীর্ঘ ইতিহাসে সাধারণ বিড়ালই ছিল মূল চরিত্র; নির্দিষ্ট চেহারার জাত তৈরির পরিকল্পিত প্রজনন তুলনামূলকভাবে অনেক সাম্প্রতিক ঘটনা।

আজ যে দেশি বিড়ালকে আমরা ‘সাধারণ’ বলে অবজ্ঞা করি, সেই সাধারণ বিড়ালই আসলে বিড়ালের দীর্ঘ মানবসভ্যতার ইতিহাসের সবচেয়ে পুরোনো চরিত্রগুলোর উত্তরসূরি।

‘পার্সিয়ান’ কীভাবে অভিজাত?

পার্সিয়ান বিড়ালের নাম শুনলেই আমাদের চোখে এক ধরনের বিলাসিতার ছবি ভেসে ওঠে। কিন্তু এই ‘অভিজাতত্ব’ প্রকৃতির দেওয়া কোনো সনদ নয়; এটি অনেকটাই মানুষের তৈরি। বংশগত বৈশিষ্ট্য বাছাই করে মানুষ ধীরে ধীরে বিড়ালের নির্দিষ্ট চেহারা, লোম, চোখ ও শরীরের গঠনকে গুরুত্ব দিয়েছে। পরে বিড়াল প্রদর্শনী ও পরিকল্পিত প্রজননের মাধ্যমে এসব বৈশিষ্ট্য আরও নির্দিষ্ট হয়েছে।

গবেষণা বলছে, অন্যান্য গৃহপালিত প্রাণীর তুলনায় বিড়ালের চেহারাভিত্তিক পরিকল্পিত প্রজনন বেশ দেরিতে ব্যাপকভাবে শুরু হয়। অর্থাৎ আজকের ‘বিশুদ্ধ জাতের’ বিড়ালের ইতিহাসেও প্রকৃতির চেয়ে মানুষের রুচি ও বাছাইয়ের ভূমিকা কম নয়। অভিজাতত্বও অনেক সময় মানুষের বানানো গল্প।

কালো বিড়াল

মানুষের বর্ণবাদে যেমন গায়ের রং, নাক, চুল, বংশ বা জাতিগত পরিচয় দিয়ে মূল্য নির্ধারণ করা হয়, বিড়ালের ক্ষেত্রেও আমরা তৈরি করেছি এক ধরনের চেহারাভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস। দেখতে কেমন, লোম কত লম্বা, চোখ কত উজ্জ্বল, মুখ কত গোল, বংশের পরিচয় আছে কি না—এসব দিয়ে আমরা বিড়ালের মূল্য নির্ধারণ করি।

কালো বিড়াল তার একটি চমৎকার উদাহরণ। ইউরোপের বিভিন্ন সময়ে কালো বিড়ালকে অশুভ, জাদুবিদ্যা ও অন্ধবিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে তাদের ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা ভয় ও কুসংস্কার। অর্থাৎ বিড়ালের ক্ষেত্রেও মানুষের চোখ শুধু ‘বিড়াল’ দেখে না। দেখে রং, চেহারা, বংশ, সামাজিক মর্যাদা।

মিশরের দেবতা থেকে ঢাকার বিড়াল

মানবসভ্যতায় বিড়ালের মর্যাদা সব সময় নিচু ছিল না। প্রাচীন মিশরে বিড়াল ছিল ঘরের প্রাণী। ইঁদুর নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ সহচর আর ধর্মীয় প্রতীকের অংশ। দেবী বাসতেতের সঙ্গে বিড়ালের সম্পর্ক এত গভীর হয়েছিল যে বিড়ালের মূর্তি, তাবিজ ও মমি তৈরি করা হতো। বিড়ালের মমি হাজার হাজার সংখ্যায় পাওয়া গেছে।

দেশি বিড়াল

এক অর্থে মানুষ তখন বিড়ালের মধ্যে দেবত্ব দেখেছিল। আবার ইতিহাসের অন্য সময়ে একই প্রাণী হয়ে উঠেছে অশুভের প্রতীক। একই প্রাণী—কখনো দেবী, কখনো অশুভ শক্তির সঙ্গী, কখনো ইঁদুর ধরার শ্রমিক, আবার কখনো লাখ টাকার পোষা প্রাণী। বলা যায়, বিড়াল বদলায়নি, বদলেছে শুধু মানুষের চোখ।

মার্কস যদি বিড়াল দেখতেন?

কার্ল মার্কস বিড়াল নিয়ে কোনো সমাজতাত্ত্বিক তত্ত্ব দিয়ে যাননি। কিন্তু তার শ্রেণি, পণ্য ও মূল্যবোধের ধারণা দিয়ে বিষয়টিকে পড়া যায়।একটি সাধারণ দেশি বিড়ালের বাজারমূল্য কম। কারণ তাকে বিশেষ বংশের সনদ, নিয়ন্ত্রিত প্রজনন, বিরল বৈশিষ্ট্য কিংবা বাজারজাতকরণের মাধ্যমে বিশেষ পণ্যে পরিণত করা হয়নি। অন্যদিকে একটি পার্সিয়ান বা ব্রিটিশ শর্টহেয়ার শুধু প্রাণী নয়; তার সঙ্গে যুক্ত হয় বংশ, পরিচয়, বিরলতা, বিশেষ প্রজনন, সনদ এবং সামাজিক মর্যাদা।

তখন বিড়াল হয়ে ওঠে পণ্য। আর পণ্যের মূল্য তখন শুধু তার ব্যবহারিক গুণে নির্ধারিত হয় না। তার সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক পরিচয়।একটি দামি বিড়াল তখন যেন বলে—‘আমি কী পছন্দ করি’ নয়, ‘আমি কে’।এখানেই বিড়াল ঢুকে পড়ে শ্রেণি-সংস্কৃতির রাজনীতিতে।

দেশি বিড়াল কি কম সুন্দর

এখানে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের রুচির একটি চমৎকার সংঘাত আছে।দেশি বা অবাধে প্রজনন করা বিড়াল কোনো একটি নির্দিষ্ট জাতের চেহারার নিয়ম মেনে তৈরি নয়। তাদের গায়ের রং, লোম, চোখ, শরীর—সবকিছুতেই বৈচিত্র্য। এই বৈচিত্র্যই তাদের ‘অভিজাত’ করে না।

পার্সিয়ান বিড়াল

কিন্তু বিবর্তনের ভাষায় বৈচিত্র্য কখনো দুর্বলতার নাম নয়। বহু প্রজন্ম ধরে বিভিন্ন পরিবেশে ছড়িয়ে পড়া সাধারণ বিড়াল স্থানীয় আবহাওয়া, খাদ্য ও পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে টিকে এসেছে। গবেষণায় এসব অবাধে প্রজনন করা বিড়ালের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বংশগত বৈচিত্র্যের কথা উঠে এসেছে।

তবে এটাও সত্য—দেশি বিড়াল মানেই সব রোগ থেকে মুক্ত, আর বিদেশি জাতের বিড়াল মানেই অসুস্থ—এমন সরল বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তও ঠিক নয়। সমস্যা হলো, আমরা প্রায়ই স্বাস্থ্য নয়, চেহারাকেই মূল্যায়নের প্রধান মাপকাঠি বানাই।

বিড়ালের বাজারে মধ্যবিত্ত মনস্তত্ত্ব

বাংলাদেশের শহুরে মধ্যবিত্ত সমাজে পোষা প্রাণী এখন শুধু সঙ্গী নয়, জীবনযাপনের অংশ। কিন্তু এখানেই তৈরি হচ্ছে নতুন এক সাংস্কৃতিক বৈপরীত্য। একদিকে আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখি—‘আমি বিড়াল ভালোবাসি’। অন্যদিকে পাশের গলির অসুস্থ দেশি বিড়ালটির দিকে তাকাই না। কারণ একটি উদ্ধার করা দেশি বিড়াল আমাদের সামাজিক পরিচয় বাড়ায় না। একটি বিরল জাতের বিড়াল পারে।

এটি নিছক নিষ্ঠুরতা নয়; এর মধ্যে আছে নিজের সামর্থ্য, রুচি ও সামাজিক অবস্থান প্রদর্শনের আকাঙ্ক্ষা। যে সমাজে মানুষের মধ্যেও ‘কোথায় পড়েছেন’, ‘কী গাড়ি’, ‘কোথায় থাকেন’, ‘কোন পরিবারের’—এসব দিয়ে মর্যাদা মাপা হয়, সেখানে বিড়ালের মধ্যেও বংশের মর্যাদা ঢুকে পড়া খুব আশ্চর্যের নয়।

বিড়ালেও বিবর্তনের শিক্ষা

বিবর্তনের একটি মৌলিক শিক্ষা হলো—প্রকৃতি সব সময় সৌন্দর্যের প্রতিযোগিতা চালায় না। টিকে থাকা, পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, প্রজনন এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নিজেকে খাপ খাওয়ানো—এসবই বিবর্তনের বড় বিষয়। মানুষ অবশ্য অন্য জিনিসও পছন্দ করে। আমরা সৌন্দর্য পছন্দ করি। বিরলতা পছন্দ করি। অভিনবত্ব পছন্দ করি। তাই আমরা প্রাণীর চেহারাও বদলাতে শুরু করি।

পার্সিয়ান বিড়াল

গবেষণায় দেখা গেছে, আধুনিক বিড়ালের নির্দিষ্ট বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের জন্য মানুষের বাছাই করা প্রজনন তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। এর আগে সাধারণ বিড়ালের ওপর মানুষের কৃত্রিম নির্বাচনের চাপ ছিল অনেক কম। অর্থাৎ যে দেশি বিড়ালকে আমরা ‘অপরিশীলিত’ ভাবি, তার মধ্যেই হয়তো প্রকৃতির দীর্ঘ পরীক্ষার একটি অসাধারণ ইতিহাস লুকিয়ে আছে।

সত্যিকারের বিড়ালপ্রেমী কে

যে মানুষ পার্সিয়ান পোষেন, তিনি বিড়ালপ্রেমী নন—এ কথা বলা যাবে না। বিশেষ জাতের বিড়াল পোষারও আনন্দ আছে, দায়িত্ব আছে, ভালোবাসা আছে।কিন্তু ভালোবাসার সংজ্ঞা যদি শুধু দামি জাতের মধ্যে আটকে যায়, তখন প্রশ্ন উঠবেই। কারণ ভালোবাসা যদি প্রাণীর প্রতি হয়, তবে গলির বিড়ালটির জন্যও সেখানে সামান্য জায়গা থাকার কথা। দত্তক নেওয়া যেতে পারে। খাবার দেওয়া যেতে পারে। টিকা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। অন্তত লাথি না মেরে পাশ কাটিয়ে যাওয়া যেতে পারে।

পার্সিয়ান বিড়াল

অবশ্য স্মরণে রাখতে হবে যে, প্রকৃতির কাছে কোনো বিড়াল ‘নেড়ো’ নয়। ‘পার্সিয়ান’ও নয়। এসব মানুষের বানানো পরিচয়। প্রকৃতি শুধু জানে—একটি বিড়াল বেঁচে আছে। আর সভ্যতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা সম্ভবত এখানেই—আমরা কি শুধু সুন্দর, দামি ও অভিজাত প্রাণীকে ভালোবাসব, নাকি যার কোনো বংশের সনদ নেই, তাকেও বেঁচে থাকার অধিকার দেব? 

হয়তো আগামীবার রাস্তায় একটি ধুলো-মাখা দেশি বিড়াল দেখলে একটু থামা যায়। তার চোখের দিকে তাকানো যায়। সেখানে হয়তো আমাদের নিজেদের সমাজেরই একটি আয়না দেখা যাবে। বিড়ালটি ‘নেড়ো’ নয়। সম্ভবত আমাদের দৃষ্টিটাই এখনো বংশ, রং আর শ্রেণির বেড়াজালে আটকে আছে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬


পার্সিয়ান কিনি লাখে, রাস্তারটাকে দিই লাথি- এ কেমন বিড়ালপ্রেম?

প্রকাশের তারিখ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

একটি বিড়াল ফুটপাতে বসে আছে। ধুলো মাখা শরীর।কান একটু ছেঁড়া। লেজে পুরোনো আঘাতের দাগ। কেউ পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বলে, ‘নেড়ি বিড়াল।’ কেউ বিরক্ত হয়ে তাড়ায়। কেউ হয়তো একমুঠো ভাত ছুঁড়ে দেয়। কেউ হয়তো আচমকা লাথিই মেরে বসে!

আরেকটি বিড়াল কাচঘেরা ঘরে বসে। লম্বা লোম, গোল মুখ, নীল বা সবুজ চোখ। তার নাম পার্সিয়ান। আরেকটির শরীর গোলগাল, ঘন লোম—ব্রিটিশ শর্টহেয়ার। তাদের দাম কয়েক হাজার থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত উঠতে পারে।

দুটিই বিড়াল। দুটিরই মিউ মিউ ডাক আছে। ইঁদুর ধরার একই প্রাচীন প্রবৃত্তি আছে। মানুষের ঘরে থাকার হাজার বছরের ইতিহাসও আছে। তবু মানুষের চোখে তাদের মূল্য এক নয়। প্রশ্নটা এখানেই। আমরা কি বিড়াল ভালোবাসি, নাকি বিড়ালের মধ্যে নিজেদের শ্রেণি, রুচি, অর্থ ও অভিজাততার ছবি দেখতে ভালোবাসি?

বিড়ালের ইতিহাস আসলে মানুষের সভ্যতার ইতিহাসের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে জড়িয়ে আছে। গবেষণা বলছে, প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার বছর আগে নিকটপ্রাচ্যের কৃষিভিত্তিক সমাজে মানুষ ও বন্য বিড়ালের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করে। মানুষ শস্য মজুত করতে শুরু করল; শস্যের সঙ্গে এল ইঁদুর; ইঁদুরের পেছনে এল বন্য বিড়াল। মানুষ পেল ইঁদুরের প্রাকৃতিক শত্রু, আর বিড়াল পেল খাবারের সহজ উৎস ও নিরাপদ আশ্রয়। এভাবেই গড়ে উঠেছিল এক ধরনের পারস্পরিক সহাবস্থান। অর্থাৎ বিড়ালকে মানুষ প্রথমে সৌন্দর্যের জন্য পোষেনি, প্রয়োজনের জন্য কাছে টেনেছিল।

দেশি লক্ষ্মী বিড়াল

আজ যে পার্সিয়ান, ব্রিটিশ শর্টহেয়ার, সিয়ামিজ কিংবা অন্য নানা জাতের বিড়াল নিয়ে আমাদের এত মাতামাতি, সেগুলোর বেশির ভাগই এসেছে পরবর্তী সময়ের বাছাই করা প্রজনন থেকে। প্রত্নতাত্ত্বিক ও বংশগত গবেষণা বলছে, মানুষের সঙ্গে বিড়ালের ছড়িয়ে পড়ার দীর্ঘ ইতিহাসে সাধারণ বিড়ালই ছিল মূল চরিত্র; নির্দিষ্ট চেহারার জাত তৈরির পরিকল্পিত প্রজনন তুলনামূলকভাবে অনেক সাম্প্রতিক ঘটনা।

আজ যে দেশি বিড়ালকে আমরা ‘সাধারণ’ বলে অবজ্ঞা করি, সেই সাধারণ বিড়ালই আসলে বিড়ালের দীর্ঘ মানবসভ্যতার ইতিহাসের সবচেয়ে পুরোনো চরিত্রগুলোর উত্তরসূরি।

‘পার্সিয়ান’ কীভাবে অভিজাত?

পার্সিয়ান বিড়ালের নাম শুনলেই আমাদের চোখে এক ধরনের বিলাসিতার ছবি ভেসে ওঠে। কিন্তু এই ‘অভিজাতত্ব’ প্রকৃতির দেওয়া কোনো সনদ নয়; এটি অনেকটাই মানুষের তৈরি। বংশগত বৈশিষ্ট্য বাছাই করে মানুষ ধীরে ধীরে বিড়ালের নির্দিষ্ট চেহারা, লোম, চোখ ও শরীরের গঠনকে গুরুত্ব দিয়েছে। পরে বিড়াল প্রদর্শনী ও পরিকল্পিত প্রজননের মাধ্যমে এসব বৈশিষ্ট্য আরও নির্দিষ্ট হয়েছে।

গবেষণা বলছে, অন্যান্য গৃহপালিত প্রাণীর তুলনায় বিড়ালের চেহারাভিত্তিক পরিকল্পিত প্রজনন বেশ দেরিতে ব্যাপকভাবে শুরু হয়। অর্থাৎ আজকের ‘বিশুদ্ধ জাতের’ বিড়ালের ইতিহাসেও প্রকৃতির চেয়ে মানুষের রুচি ও বাছাইয়ের ভূমিকা কম নয়। অভিজাতত্বও অনেক সময় মানুষের বানানো গল্প।

কালো বিড়াল

মানুষের বর্ণবাদে যেমন গায়ের রং, নাক, চুল, বংশ বা জাতিগত পরিচয় দিয়ে মূল্য নির্ধারণ করা হয়, বিড়ালের ক্ষেত্রেও আমরা তৈরি করেছি এক ধরনের চেহারাভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস। দেখতে কেমন, লোম কত লম্বা, চোখ কত উজ্জ্বল, মুখ কত গোল, বংশের পরিচয় আছে কি না—এসব দিয়ে আমরা বিড়ালের মূল্য নির্ধারণ করি।

কালো বিড়াল তার একটি চমৎকার উদাহরণ। ইউরোপের বিভিন্ন সময়ে কালো বিড়ালকে অশুভ, জাদুবিদ্যা ও অন্ধবিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে তাদের ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা ভয় ও কুসংস্কার। অর্থাৎ বিড়ালের ক্ষেত্রেও মানুষের চোখ শুধু ‘বিড়াল’ দেখে না। দেখে রং, চেহারা, বংশ, সামাজিক মর্যাদা।

মিশরের দেবতা থেকে ঢাকার বিড়াল

মানবসভ্যতায় বিড়ালের মর্যাদা সব সময় নিচু ছিল না। প্রাচীন মিশরে বিড়াল ছিল ঘরের প্রাণী। ইঁদুর নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ সহচর আর ধর্মীয় প্রতীকের অংশ। দেবী বাসতেতের সঙ্গে বিড়ালের সম্পর্ক এত গভীর হয়েছিল যে বিড়ালের মূর্তি, তাবিজ ও মমি তৈরি করা হতো। বিড়ালের মমি হাজার হাজার সংখ্যায় পাওয়া গেছে।

দেশি বিড়াল

এক অর্থে মানুষ তখন বিড়ালের মধ্যে দেবত্ব দেখেছিল। আবার ইতিহাসের অন্য সময়ে একই প্রাণী হয়ে উঠেছে অশুভের প্রতীক। একই প্রাণী—কখনো দেবী, কখনো অশুভ শক্তির সঙ্গী, কখনো ইঁদুর ধরার শ্রমিক, আবার কখনো লাখ টাকার পোষা প্রাণী। বলা যায়, বিড়াল বদলায়নি, বদলেছে শুধু মানুষের চোখ।

মার্কস যদি বিড়াল দেখতেন?

কার্ল মার্কস বিড়াল নিয়ে কোনো সমাজতাত্ত্বিক তত্ত্ব দিয়ে যাননি। কিন্তু তার শ্রেণি, পণ্য ও মূল্যবোধের ধারণা দিয়ে বিষয়টিকে পড়া যায়।একটি সাধারণ দেশি বিড়ালের বাজারমূল্য কম। কারণ তাকে বিশেষ বংশের সনদ, নিয়ন্ত্রিত প্রজনন, বিরল বৈশিষ্ট্য কিংবা বাজারজাতকরণের মাধ্যমে বিশেষ পণ্যে পরিণত করা হয়নি। অন্যদিকে একটি পার্সিয়ান বা ব্রিটিশ শর্টহেয়ার শুধু প্রাণী নয়; তার সঙ্গে যুক্ত হয় বংশ, পরিচয়, বিরলতা, বিশেষ প্রজনন, সনদ এবং সামাজিক মর্যাদা।

তখন বিড়াল হয়ে ওঠে পণ্য। আর পণ্যের মূল্য তখন শুধু তার ব্যবহারিক গুণে নির্ধারিত হয় না। তার সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক পরিচয়।একটি দামি বিড়াল তখন যেন বলে—‘আমি কী পছন্দ করি’ নয়, ‘আমি কে’।এখানেই বিড়াল ঢুকে পড়ে শ্রেণি-সংস্কৃতির রাজনীতিতে।

দেশি বিড়াল কি কম সুন্দর

এখানে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের রুচির একটি চমৎকার সংঘাত আছে।দেশি বা অবাধে প্রজনন করা বিড়াল কোনো একটি নির্দিষ্ট জাতের চেহারার নিয়ম মেনে তৈরি নয়। তাদের গায়ের রং, লোম, চোখ, শরীর—সবকিছুতেই বৈচিত্র্য। এই বৈচিত্র্যই তাদের ‘অভিজাত’ করে না।

পার্সিয়ান বিড়াল

কিন্তু বিবর্তনের ভাষায় বৈচিত্র্য কখনো দুর্বলতার নাম নয়। বহু প্রজন্ম ধরে বিভিন্ন পরিবেশে ছড়িয়ে পড়া সাধারণ বিড়াল স্থানীয় আবহাওয়া, খাদ্য ও পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে টিকে এসেছে। গবেষণায় এসব অবাধে প্রজনন করা বিড়ালের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বংশগত বৈচিত্র্যের কথা উঠে এসেছে।

তবে এটাও সত্য—দেশি বিড়াল মানেই সব রোগ থেকে মুক্ত, আর বিদেশি জাতের বিড়াল মানেই অসুস্থ—এমন সরল বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তও ঠিক নয়। সমস্যা হলো, আমরা প্রায়ই স্বাস্থ্য নয়, চেহারাকেই মূল্যায়নের প্রধান মাপকাঠি বানাই।

বিড়ালের বাজারে মধ্যবিত্ত মনস্তত্ত্ব

বাংলাদেশের শহুরে মধ্যবিত্ত সমাজে পোষা প্রাণী এখন শুধু সঙ্গী নয়, জীবনযাপনের অংশ। কিন্তু এখানেই তৈরি হচ্ছে নতুন এক সাংস্কৃতিক বৈপরীত্য। একদিকে আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখি—‘আমি বিড়াল ভালোবাসি’। অন্যদিকে পাশের গলির অসুস্থ দেশি বিড়ালটির দিকে তাকাই না। কারণ একটি উদ্ধার করা দেশি বিড়াল আমাদের সামাজিক পরিচয় বাড়ায় না। একটি বিরল জাতের বিড়াল পারে।

এটি নিছক নিষ্ঠুরতা নয়; এর মধ্যে আছে নিজের সামর্থ্য, রুচি ও সামাজিক অবস্থান প্রদর্শনের আকাঙ্ক্ষা। যে সমাজে মানুষের মধ্যেও ‘কোথায় পড়েছেন’, ‘কী গাড়ি’, ‘কোথায় থাকেন’, ‘কোন পরিবারের’—এসব দিয়ে মর্যাদা মাপা হয়, সেখানে বিড়ালের মধ্যেও বংশের মর্যাদা ঢুকে পড়া খুব আশ্চর্যের নয়।

বিড়ালেও বিবর্তনের শিক্ষা

বিবর্তনের একটি মৌলিক শিক্ষা হলো—প্রকৃতি সব সময় সৌন্দর্যের প্রতিযোগিতা চালায় না। টিকে থাকা, পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, প্রজনন এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নিজেকে খাপ খাওয়ানো—এসবই বিবর্তনের বড় বিষয়। মানুষ অবশ্য অন্য জিনিসও পছন্দ করে। আমরা সৌন্দর্য পছন্দ করি। বিরলতা পছন্দ করি। অভিনবত্ব পছন্দ করি। তাই আমরা প্রাণীর চেহারাও বদলাতে শুরু করি।

পার্সিয়ান বিড়াল

গবেষণায় দেখা গেছে, আধুনিক বিড়ালের নির্দিষ্ট বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের জন্য মানুষের বাছাই করা প্রজনন তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। এর আগে সাধারণ বিড়ালের ওপর মানুষের কৃত্রিম নির্বাচনের চাপ ছিল অনেক কম। অর্থাৎ যে দেশি বিড়ালকে আমরা ‘অপরিশীলিত’ ভাবি, তার মধ্যেই হয়তো প্রকৃতির দীর্ঘ পরীক্ষার একটি অসাধারণ ইতিহাস লুকিয়ে আছে।

সত্যিকারের বিড়ালপ্রেমী কে

যে মানুষ পার্সিয়ান পোষেন, তিনি বিড়ালপ্রেমী নন—এ কথা বলা যাবে না। বিশেষ জাতের বিড়াল পোষারও আনন্দ আছে, দায়িত্ব আছে, ভালোবাসা আছে।কিন্তু ভালোবাসার সংজ্ঞা যদি শুধু দামি জাতের মধ্যে আটকে যায়, তখন প্রশ্ন উঠবেই। কারণ ভালোবাসা যদি প্রাণীর প্রতি হয়, তবে গলির বিড়ালটির জন্যও সেখানে সামান্য জায়গা থাকার কথা। দত্তক নেওয়া যেতে পারে। খাবার দেওয়া যেতে পারে। টিকা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। অন্তত লাথি না মেরে পাশ কাটিয়ে যাওয়া যেতে পারে।

পার্সিয়ান বিড়াল

অবশ্য স্মরণে রাখতে হবে যে, প্রকৃতির কাছে কোনো বিড়াল ‘নেড়ো’ নয়। ‘পার্সিয়ান’ও নয়। এসব মানুষের বানানো পরিচয়। প্রকৃতি শুধু জানে—একটি বিড়াল বেঁচে আছে। আর সভ্যতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা সম্ভবত এখানেই—আমরা কি শুধু সুন্দর, দামি ও অভিজাত প্রাণীকে ভালোবাসব, নাকি যার কোনো বংশের সনদ নেই, তাকেও বেঁচে থাকার অধিকার দেব? 

হয়তো আগামীবার রাস্তায় একটি ধুলো-মাখা দেশি বিড়াল দেখলে একটু থামা যায়। তার চোখের দিকে তাকানো যায়। সেখানে হয়তো আমাদের নিজেদের সমাজেরই একটি আয়না দেখা যাবে। বিড়ালটি ‘নেড়ো’ নয়। সম্ভবত আমাদের দৃষ্টিটাই এখনো বংশ, রং আর শ্রেণির বেড়াজালে আটকে আছে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত