সংবাদ

নিসর্গপ্রেমীদের প্রিয় অপরূপ সৌন্দর্যের নাগলিঙ্গম


হাবিবুর রহমান স্বপন, পাবনা
হাবিবুর রহমান স্বপন, পাবনা
প্রকাশ: ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৫০ এএম

নিসর্গপ্রেমীদের প্রিয় অপরূপ সৌন্দর্যের নাগলিঙ্গম
ছবি : সংবাদ

বিশাল ও সুউচ্চ আকৃতির এক গাছ। কাণ্ড অত্যন্ত মোটা। সেই কাণ্ড ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা দীর্ঘ মঞ্জুরিতে ঝুলছে থোক থোক ফুল। ফুলের তীব্র মিষ্টি ঘ্রাণে ম ম করছে চারপাশ। কাছে গিয়ে দেখলে মনে হবে, যেন একটি কেউটে সাপ ফণা তুলে আছে। অদ্ভুত সুন্দর এই ফুলটির নাম ‘নাগলিঙ্গম’। এর ইংরেজি নাম ‘ক্যাননবল’ (Cannonball tree) এবং বৈজ্ঞানিক নাম Couroupita guianensis। এটি লেসিথিডাসি (Lecythidaceae) পরিবারভুক্ত একটি উদ্ভিদ।

আকার ও বৈশিষ্ট্য
নাগলিঙ্গম বৃক্ষ ২৫ মিটার বা প্রায় ৮০ ফুট পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। এর গুচ্ছ পাতাগুলো সাধারণত ৫ থেকে ৭ ইঞ্চি লম্বা এবং ৩ থেকে ৪ ইঞ্চি পর্যন্ত চওড়া হয়। পাতার রং গাঢ় সবুজ। বছরের প্রায় সব ঋতুতেই এর পাতা ঝরে এবং নতুন পাতা গজায়। অনেকেই নাগলিঙ্গমকে নাগেশ্বর বা নাগকেশর ভেবে ভুল করেন, তবে এই তিনটি ভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ। নাগলিঙ্গম ফুলের পরাগচক্র বিশেষ বক্রাকৃতির এবং সাপের ফণার মতো দেখতে। এই ফুল থেকে বড় আকারের গোল গোল ফল হয়, যা অনেকটা বেলের মতো। এই ফল হাতির খুব প্রিয় বলে একে ‘হাতির ঝোলাপ’ গাছও বলা হয়।

আদি নিবাস ও বিস্তার
নাগলিঙ্গমের আদি নিবাস দক্ষিণ আমেরিকার উষ্ণ অঞ্চল, বিশেষ করে ত্রিনিদাদ ও ল্যাটিন আমেরিকায়। ভারতে এই বৃক্ষ প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে থেকে দেখা গেলেও ক্রমে তা এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা শিব পূজায় নাগলিঙ্গম ফুল ব্যবহার করেন। আবার বৌদ্ধদের মন্দিরেও এই ফুলের যথেষ্ট কদর রয়েছে। থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমারের বৌদ্ধ মন্দির প্রাঙ্গণে প্রায়ই নাগলিঙ্গম গাছ দেখা যায়।

ওষুধি গুণ
নাগলিঙ্গম কেবল সৌন্দর্যেই অনন্য নয়, এর রয়েছে ব্যাপক ওষুধি গুণ। এর ফুল, পাতা ও বাকলের নির্যাস থেকে তৈরি হয় বিভিন্ন ধরনের ওষুধ। এটি অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যান্টিফাঙ্গাল ও অ্যান্টিসেপটিক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর থেকে তৈরি ওষুধ পেটের পীড়া দূর করতে বেশ কার্যকর। এ ছাড়া পাতার রস ত্বকের নানা সমস্যায় ও ম্যালেরিয়া রোগ নিরাময়ে প্রাচীনকাল থেকেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

ফুলের রূপ ও সুবাস
চারা রোপণের ১২ থেকে ১৪ বছর পর নাগলিঙ্গম গাছে ফুল ধরে। সাধারণত গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে এই ফুল ফুটতে দেখা যায়। গাছের কাণ্ডের সঙ্গে ঝুলে থাকে অসংখ্য মঞ্জুরি। প্রায় সাত ফুট দীর্ঘ মঞ্জুরিতে বড় বড় গোলাকার ফুল ধরে। ছয়টি পাপড়িবিশিষ্ট ফুলের ব্যাস হয় ২ থেকে ৩ ইঞ্চি। পাপড়িগুলো বক্রাকৃতির ও পুরু। ফুলের ভেতর দিকটা গাঢ় গোলাপি এবং বাইরের দিকে হালকা হলুদ আভা দেখা যায়। সাপের ফণার মতো দর্শনীয় এই ফুলের ঘ্রাণ অত্যন্ত তীব্র ও মিষ্টি। একটি ফুল ফোটার পর সপ্তাহজুড়ে সুবাস ছড়ায়।

বাংলাদেশে নাগলিঙ্গমের অবস্থান
বাংলাদেশে নাগলিঙ্গম একটি দুর্লভ বৃক্ষ। বর্তমানে হাতেগোনা কয়েকটি স্থানে এই গাছের দেখা মেলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় রয়েছে দুটি বৃক্ষ; যার একটি ভূতত্ত্ব বিভাগের পাশে এবং অন্যটি কার্জন হল প্রাঙ্গণে। এ ছাড়া শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঁচটি, বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটে (বিএফআরআই) তিনটি এবং জাতীয় বোটানিক্যাল গার্ডেনে একটি গাছ রয়েছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, রমনা পার্ক, বলধা গার্ডেন, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান এবং চন্দ্রিমা উদ্যানেও বিভিন্ন বয়সী কয়েকটি নাগলিঙ্গম গাছ দেখা যায়। শ্রীমঙ্গলের চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই) ভবনের সামনে একটি বিশাল নাগলিঙ্গম গাছ পর্যটকদের মুগ্ধ করে। বান্দরবান ও কক্সবাজারের কিছু বৌদ্ধ মন্দিরেও এই দুর্লভ বৃক্ষটি টিকে আছে।

ফল ও সতর্কতা
নাগলিঙ্গম দ্রুত বর্ধনশীল একটি গাছ। এর কাণ্ডের রং ধূসর ও অসমতল। গাছের গোড়ার দিকটা প্রায় ১৮ ফুট ব্যাসবিশিষ্ট হতে পারে। এর ফলগুলো ক্যাননবল বা কামানের গোলার মতো দেখতে হওয়ায় এর ইংরেজি নাম হয়েছে ক্যাননবল। ফলের ওজন প্রায় চার কেজি পর্যন্ত হতে পারে। এই ফল পাকার পর গাছ থেকে পড়লে মাথায় লেগে মারাত্মক জখম হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ফলের শাঁস বেশ ঝাঁঝালো গন্ধযুক্ত।

নাগলিঙ্গমের রূপ ও বর্ণ বর্ণনা করা কঠিন। এর প্রতিটি পাপড়ি আর ঘ্রাণে মিশে আছে প্রকৃতির এক অনন্য রহস্য। বিলুপ্তপ্রায় এই দুর্লভ বৃক্ষটি রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬


নিসর্গপ্রেমীদের প্রিয় অপরূপ সৌন্দর্যের নাগলিঙ্গম

প্রকাশের তারিখ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

বিশাল ও সুউচ্চ আকৃতির এক গাছ। কাণ্ড অত্যন্ত মোটা। সেই কাণ্ড ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা দীর্ঘ মঞ্জুরিতে ঝুলছে থোক থোক ফুল। ফুলের তীব্র মিষ্টি ঘ্রাণে ম ম করছে চারপাশ। কাছে গিয়ে দেখলে মনে হবে, যেন একটি কেউটে সাপ ফণা তুলে আছে। অদ্ভুত সুন্দর এই ফুলটির নাম ‘নাগলিঙ্গম’। এর ইংরেজি নাম ‘ক্যাননবল’ (Cannonball tree) এবং বৈজ্ঞানিক নাম Couroupita guianensis। এটি লেসিথিডাসি (Lecythidaceae) পরিবারভুক্ত একটি উদ্ভিদ।

আকার ও বৈশিষ্ট্য
নাগলিঙ্গম বৃক্ষ ২৫ মিটার বা প্রায় ৮০ ফুট পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। এর গুচ্ছ পাতাগুলো সাধারণত ৫ থেকে ৭ ইঞ্চি লম্বা এবং ৩ থেকে ৪ ইঞ্চি পর্যন্ত চওড়া হয়। পাতার রং গাঢ় সবুজ। বছরের প্রায় সব ঋতুতেই এর পাতা ঝরে এবং নতুন পাতা গজায়। অনেকেই নাগলিঙ্গমকে নাগেশ্বর বা নাগকেশর ভেবে ভুল করেন, তবে এই তিনটি ভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ। নাগলিঙ্গম ফুলের পরাগচক্র বিশেষ বক্রাকৃতির এবং সাপের ফণার মতো দেখতে। এই ফুল থেকে বড় আকারের গোল গোল ফল হয়, যা অনেকটা বেলের মতো। এই ফল হাতির খুব প্রিয় বলে একে ‘হাতির ঝোলাপ’ গাছও বলা হয়।

আদি নিবাস ও বিস্তার
নাগলিঙ্গমের আদি নিবাস দক্ষিণ আমেরিকার উষ্ণ অঞ্চল, বিশেষ করে ত্রিনিদাদ ও ল্যাটিন আমেরিকায়। ভারতে এই বৃক্ষ প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে থেকে দেখা গেলেও ক্রমে তা এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা শিব পূজায় নাগলিঙ্গম ফুল ব্যবহার করেন। আবার বৌদ্ধদের মন্দিরেও এই ফুলের যথেষ্ট কদর রয়েছে। থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমারের বৌদ্ধ মন্দির প্রাঙ্গণে প্রায়ই নাগলিঙ্গম গাছ দেখা যায়।

ওষুধি গুণ
নাগলিঙ্গম কেবল সৌন্দর্যেই অনন্য নয়, এর রয়েছে ব্যাপক ওষুধি গুণ। এর ফুল, পাতা ও বাকলের নির্যাস থেকে তৈরি হয় বিভিন্ন ধরনের ওষুধ। এটি অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যান্টিফাঙ্গাল ও অ্যান্টিসেপটিক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর থেকে তৈরি ওষুধ পেটের পীড়া দূর করতে বেশ কার্যকর। এ ছাড়া পাতার রস ত্বকের নানা সমস্যায় ও ম্যালেরিয়া রোগ নিরাময়ে প্রাচীনকাল থেকেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

ফুলের রূপ ও সুবাস
চারা রোপণের ১২ থেকে ১৪ বছর পর নাগলিঙ্গম গাছে ফুল ধরে। সাধারণত গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে এই ফুল ফুটতে দেখা যায়। গাছের কাণ্ডের সঙ্গে ঝুলে থাকে অসংখ্য মঞ্জুরি। প্রায় সাত ফুট দীর্ঘ মঞ্জুরিতে বড় বড় গোলাকার ফুল ধরে। ছয়টি পাপড়িবিশিষ্ট ফুলের ব্যাস হয় ২ থেকে ৩ ইঞ্চি। পাপড়িগুলো বক্রাকৃতির ও পুরু। ফুলের ভেতর দিকটা গাঢ় গোলাপি এবং বাইরের দিকে হালকা হলুদ আভা দেখা যায়। সাপের ফণার মতো দর্শনীয় এই ফুলের ঘ্রাণ অত্যন্ত তীব্র ও মিষ্টি। একটি ফুল ফোটার পর সপ্তাহজুড়ে সুবাস ছড়ায়।

বাংলাদেশে নাগলিঙ্গমের অবস্থান
বাংলাদেশে নাগলিঙ্গম একটি দুর্লভ বৃক্ষ। বর্তমানে হাতেগোনা কয়েকটি স্থানে এই গাছের দেখা মেলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় রয়েছে দুটি বৃক্ষ; যার একটি ভূতত্ত্ব বিভাগের পাশে এবং অন্যটি কার্জন হল প্রাঙ্গণে। এ ছাড়া শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঁচটি, বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটে (বিএফআরআই) তিনটি এবং জাতীয় বোটানিক্যাল গার্ডেনে একটি গাছ রয়েছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, রমনা পার্ক, বলধা গার্ডেন, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান এবং চন্দ্রিমা উদ্যানেও বিভিন্ন বয়সী কয়েকটি নাগলিঙ্গম গাছ দেখা যায়। শ্রীমঙ্গলের চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই) ভবনের সামনে একটি বিশাল নাগলিঙ্গম গাছ পর্যটকদের মুগ্ধ করে। বান্দরবান ও কক্সবাজারের কিছু বৌদ্ধ মন্দিরেও এই দুর্লভ বৃক্ষটি টিকে আছে।

ফল ও সতর্কতা
নাগলিঙ্গম দ্রুত বর্ধনশীল একটি গাছ। এর কাণ্ডের রং ধূসর ও অসমতল। গাছের গোড়ার দিকটা প্রায় ১৮ ফুট ব্যাসবিশিষ্ট হতে পারে। এর ফলগুলো ক্যাননবল বা কামানের গোলার মতো দেখতে হওয়ায় এর ইংরেজি নাম হয়েছে ক্যাননবল। ফলের ওজন প্রায় চার কেজি পর্যন্ত হতে পারে। এই ফল পাকার পর গাছ থেকে পড়লে মাথায় লেগে মারাত্মক জখম হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ফলের শাঁস বেশ ঝাঁঝালো গন্ধযুক্ত।

নাগলিঙ্গমের রূপ ও বর্ণ বর্ণনা করা কঠিন। এর প্রতিটি পাপড়ি আর ঘ্রাণে মিশে আছে প্রকৃতির এক অনন্য রহস্য। বিলুপ্তপ্রায় এই দুর্লভ বৃক্ষটি রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত