সংবাদ

হারিয়ে যাচ্ছে বৌরাণী মাছ: স্বাদ ও সৌন্দর্যের এক অনন্য আখ্যান


হাবিবুর রহমান স্বপন, পাবনা
হাবিবুর রহমান স্বপন, পাবনা
প্রকাশ: ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৩১ পিএম

হারিয়ে যাচ্ছে বৌরাণী মাছ: স্বাদ ও সৌন্দর্যের এক অনন্য আখ্যান
ছবি : সংগৃহীত

বাংলার নদ-নদী, খাল-বিল আর বিশাল জলাশয় থেকে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে এ দেশের এককালের অত্যন্ত পরিচিত ও সুস্বাদু ‘বৌরাণী’ মাছ। এখন বর্ষাকাল আসে-যায়, কিন্তু একদা রুপালি জলের ঝিলিক দেওয়া সেই বৌরাণী মাছের দেখা মেলা ভার। মৎস্য ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত পাবনার মিঠা পানির এই সুস্বাদু মাছটি এখন বিপন্ন প্রজাতির তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।

পরিচয় ও প্রজাতি
রাজশাহী মৎস্য বিভাগ ও স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের তথ্যমতে, উত্তরাঞ্চলে বৌরাণী মাছের প্রধানত দুটি প্রজাতি পাওয়া যায়। এদের দেখতে অনেকটা একই রকম মনে হলেও দেহের বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে এদের আলাদা করা সম্ভব। এই দুটি প্রজাতির বৈজ্ঞানিক নাম Botia dario এবং Botia lohachata। উত্তরাঞ্চলে এই মাছ দুটি ‘বৌরাণী’ বা ‘রাণী’ মাছ নামেই সমধিক পরিচিত। তবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অঞ্চলভেদে একে বেটি, পুতুল, বেতাঙ্গী ইত্যাদি নামেও ডাকা হয়। বৌরাণী মাছ দেখতে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এদের দেহ চ্যাপ্টা ও লম্বাটে, মুখ ছোট এবং চার জোড়া ক্ষুদ্রাকৃতির স্পর্শী থাকে।

Botia dario প্রজাতির মাছের দেহের রং হলুদাভ এবং শরীরে সাতটি কালচে লম্বালম্বি ডোরাকাটা দাগ থাকে। অন্যদিকে Botia lohachata প্রজাতির গায়ের রংও হলুদাভ, তবে এদের শরীরে ইংরেজি ‘Y’ (ওয়াই) অক্ষরের মতো চারটি কালো দাগ থাকে। উভয় প্রজাতির মাছের আঁশ এতটাই ক্ষুদ্র যে সাধারণ দৃষ্টিতে তা বোঝাই যায় না। আকারে Botia dario সর্বোচ্চ ১৮ সেন্টিমিটার এবং Botia lohachata ১১ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে।

বিচরণ ক্ষেত্র ও বর্তমান অবস্থা
বৌরাণী মাছ সাধারণত নদ-নদী, খাল-বিল ও হাওর-বাঁওড়ের তলদেশের পরিষ্কার পানিতে বাস করতে পছন্দ করে। তবে মাঝেমধ্যে ঘোলা পানিতেও এদের দেখা মেলে। একসময় পাবনার পদ্মা, যমুনা, বড়াল, আত্রাই, ইছামতী ও চিকনাই নদীসহ চলনবিল, গাজনার বিল ও ঘুঘুদহ বিলে প্রচুর পরিমাণে এই মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু এখন কেবল বর্ষাকালে যৎসামান্য বৌরাণী মাছের দেখা মেলে। পাবনা ছাড়াও বগুড়া, রাজশাহী, নাটোর, ময়মনসিংহ, সিলেট ও সুনামগঞ্জের হাওর এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের নদীগুলোতেও এই মাছের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম জানান, ২০০৭ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, চলনবিল সংলগ্ন মাছের আড়তগুলোতে বৌরাণী মাছের সংখ্যা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। মূলত মে থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত এদের প্রজননকাল। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত, যখন নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করে, তখন এই মাছ জেলেদের জালে বেশি ধরা পড়ে।

সৌন্দর্য ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব
বৌরাণী মাছ কেবল সুস্বাদু খাবার হিসেবেই নয়, এর বাহ্যিক সৌন্দর্যের কারণেও অত্যন্ত মূল্যবান। শৌখিন মৎস্যপ্রেমীরা অ্যাকুরিয়ামে এই মাছ পালন করতে পছন্দ করেন। বহি বিশ্বে, বিশেষ করে ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলোতে বাণিজ্যিকভাবে অ্যাকুরিয়ামে বৌরাণী মাছের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। আমাদের দেশে একসময় এই মাছ পর্যাপ্ত থাকলেও এখন তা বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির তালিকায় নাম লিখিয়েছে।

কেন এই বিলুপ্তি?
মৎস্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মাছ ধরার জন্য ধ্বংসাত্মক সরঞ্জাম ব্যবহার, ছোট-বড় বাছবিচার না করে নির্বিচারে মাছ ধরা এবং জলাশয় পুরোপুরি শুকিয়ে মাছ আহরণ বৌরাণী মাছের অস্তিত্বকে সংকটে ফেলেছে। এ ছাড়া অপরিকল্পিত বসতবাড়ি ও রাস্তাঘাট নির্মাণের ফলে মাছের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ও প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস হচ্ছে।

পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার পুণ্ডুরিয়া বাজারের প্রবীণ ইলিশ ব্যবসায়ী সুবল হালদার তাঁর স্মৃতি হাতড়ে বলেন, ‘যুবক বয়সে চলনবিলের বাজারে বৌরাণী মাছের ঢল দেখতাম। আমার বাবা যখন মাছের ব্যবসা করতেন, তখন ঝুড়ি ভরে এই মাছ নিয়ে আসতেন। গায়ের চামড়া এতটাই পিচ্ছিল ও উজ্জ্বল ছিল যে জল ছাড়াই তারা চকচক করত। এখন তো সারা দিনে দুই-চারটা মাছও চোখে পড়ে না।’

রক্ষণাবেক্ষণের দাবি
প্রকৃতি ও মানুষের খাদ্য তালিকার ভারসাম্য রক্ষা করতে বৌরাণী মাছের মতো দেশি প্রজাতির মাছ রক্ষা করা জরুরি। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করে, তবে অন্যান্য অনেক দেশি প্রজাতির মাছের মতো রূপসী বৌরাণীও অচিরেই কেবল ইতিহাসের পাতায় বা ছবির অ্যালবামে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬


হারিয়ে যাচ্ছে বৌরাণী মাছ: স্বাদ ও সৌন্দর্যের এক অনন্য আখ্যান

প্রকাশের তারিখ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

বাংলার নদ-নদী, খাল-বিল আর বিশাল জলাশয় থেকে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে এ দেশের এককালের অত্যন্ত পরিচিত ও সুস্বাদু ‘বৌরাণী’ মাছ। এখন বর্ষাকাল আসে-যায়, কিন্তু একদা রুপালি জলের ঝিলিক দেওয়া সেই বৌরাণী মাছের দেখা মেলা ভার। মৎস্য ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত পাবনার মিঠা পানির এই সুস্বাদু মাছটি এখন বিপন্ন প্রজাতির তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।

পরিচয় ও প্রজাতি
রাজশাহী মৎস্য বিভাগ ও স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের তথ্যমতে, উত্তরাঞ্চলে বৌরাণী মাছের প্রধানত দুটি প্রজাতি পাওয়া যায়। এদের দেখতে অনেকটা একই রকম মনে হলেও দেহের বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে এদের আলাদা করা সম্ভব। এই দুটি প্রজাতির বৈজ্ঞানিক নাম Botia dario এবং Botia lohachata। উত্তরাঞ্চলে এই মাছ দুটি ‘বৌরাণী’ বা ‘রাণী’ মাছ নামেই সমধিক পরিচিত। তবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অঞ্চলভেদে একে বেটি, পুতুল, বেতাঙ্গী ইত্যাদি নামেও ডাকা হয়। বৌরাণী মাছ দেখতে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এদের দেহ চ্যাপ্টা ও লম্বাটে, মুখ ছোট এবং চার জোড়া ক্ষুদ্রাকৃতির স্পর্শী থাকে।

Botia dario প্রজাতির মাছের দেহের রং হলুদাভ এবং শরীরে সাতটি কালচে লম্বালম্বি ডোরাকাটা দাগ থাকে। অন্যদিকে Botia lohachata প্রজাতির গায়ের রংও হলুদাভ, তবে এদের শরীরে ইংরেজি ‘Y’ (ওয়াই) অক্ষরের মতো চারটি কালো দাগ থাকে। উভয় প্রজাতির মাছের আঁশ এতটাই ক্ষুদ্র যে সাধারণ দৃষ্টিতে তা বোঝাই যায় না। আকারে Botia dario সর্বোচ্চ ১৮ সেন্টিমিটার এবং Botia lohachata ১১ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে।

বিচরণ ক্ষেত্র ও বর্তমান অবস্থা
বৌরাণী মাছ সাধারণত নদ-নদী, খাল-বিল ও হাওর-বাঁওড়ের তলদেশের পরিষ্কার পানিতে বাস করতে পছন্দ করে। তবে মাঝেমধ্যে ঘোলা পানিতেও এদের দেখা মেলে। একসময় পাবনার পদ্মা, যমুনা, বড়াল, আত্রাই, ইছামতী ও চিকনাই নদীসহ চলনবিল, গাজনার বিল ও ঘুঘুদহ বিলে প্রচুর পরিমাণে এই মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু এখন কেবল বর্ষাকালে যৎসামান্য বৌরাণী মাছের দেখা মেলে। পাবনা ছাড়াও বগুড়া, রাজশাহী, নাটোর, ময়মনসিংহ, সিলেট ও সুনামগঞ্জের হাওর এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের নদীগুলোতেও এই মাছের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম জানান, ২০০৭ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, চলনবিল সংলগ্ন মাছের আড়তগুলোতে বৌরাণী মাছের সংখ্যা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। মূলত মে থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত এদের প্রজননকাল। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত, যখন নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করে, তখন এই মাছ জেলেদের জালে বেশি ধরা পড়ে।

সৌন্দর্য ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব
বৌরাণী মাছ কেবল সুস্বাদু খাবার হিসেবেই নয়, এর বাহ্যিক সৌন্দর্যের কারণেও অত্যন্ত মূল্যবান। শৌখিন মৎস্যপ্রেমীরা অ্যাকুরিয়ামে এই মাছ পালন করতে পছন্দ করেন। বহি বিশ্বে, বিশেষ করে ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলোতে বাণিজ্যিকভাবে অ্যাকুরিয়ামে বৌরাণী মাছের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। আমাদের দেশে একসময় এই মাছ পর্যাপ্ত থাকলেও এখন তা বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির তালিকায় নাম লিখিয়েছে।

কেন এই বিলুপ্তি?
মৎস্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মাছ ধরার জন্য ধ্বংসাত্মক সরঞ্জাম ব্যবহার, ছোট-বড় বাছবিচার না করে নির্বিচারে মাছ ধরা এবং জলাশয় পুরোপুরি শুকিয়ে মাছ আহরণ বৌরাণী মাছের অস্তিত্বকে সংকটে ফেলেছে। এ ছাড়া অপরিকল্পিত বসতবাড়ি ও রাস্তাঘাট নির্মাণের ফলে মাছের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ও প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস হচ্ছে।

পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার পুণ্ডুরিয়া বাজারের প্রবীণ ইলিশ ব্যবসায়ী সুবল হালদার তাঁর স্মৃতি হাতড়ে বলেন, ‘যুবক বয়সে চলনবিলের বাজারে বৌরাণী মাছের ঢল দেখতাম। আমার বাবা যখন মাছের ব্যবসা করতেন, তখন ঝুড়ি ভরে এই মাছ নিয়ে আসতেন। গায়ের চামড়া এতটাই পিচ্ছিল ও উজ্জ্বল ছিল যে জল ছাড়াই তারা চকচক করত। এখন তো সারা দিনে দুই-চারটা মাছও চোখে পড়ে না।’

রক্ষণাবেক্ষণের দাবি
প্রকৃতি ও মানুষের খাদ্য তালিকার ভারসাম্য রক্ষা করতে বৌরাণী মাছের মতো দেশি প্রজাতির মাছ রক্ষা করা জরুরি। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করে, তবে অন্যান্য অনেক দেশি প্রজাতির মাছের মতো রূপসী বৌরাণীও অচিরেই কেবল ইতিহাসের পাতায় বা ছবির অ্যালবামে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত