ছোটবেলায় কার্টুন দেখার জন্য খাওয়ার কথা ভুলে যাওয়ার স্মৃতি অনেকেরই আছে। স্কুল থেকে ফিরে টেলিভিশনের সামনে বসা, ছুটির দিনে প্রিয় চরিত্রের নতুন পর্বের অপেক্ষা কিংবা পরিবারের সবার সঙ্গে একসঙ্গে কার্টুন দেখা—শৈশবের এমন মুহূর্তগুলো সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গেলেও স্মৃতিতে থেকে যায়।
তাই বহু বছর পর হঠাৎ সেই পরিচিত
কার্টুনের গান, চরিত্র কিংবা কোনো দৃশ্য চোখে পড়লে অদ্ভুত এক অনুভূতি তৈরি হয়। মনে
হয় যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য ফিরে গেছি সেই পুরোনো সময়ে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই অনুভূতির
সঙ্গে জড়িয়ে আছে নস্টালজিয়া-অতীতের কোনো সময়, মানুষ বা
অভিজ্ঞতার সঙ্গে আবেগপূর্ণভাবে আবার যুক্ত হওয়ার অনুভূতি।
কার্টুনে কেন স্বস্তি মেলে
প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে কাজ, পরিবার,
অর্থনৈতিক চিন্তা ও নানা দায়িত্বের চাপ থাকে। এর মধ্যে পরিচিত ও হালকা ধরনের কোনো কার্টুন
দেখা কিছু সময়ের জন্য মনোযোগকে দৈনন্দিন উদ্বেগ থেকে সরিয়ে নিতে পারে।
হাস্যরসাত্মক কার্টুন বা অ্যানিমেটেড
সিটকম অনেকের কাছে বিনোদনের পাশাপাশি মানসিক স্বস্তির মাধ্যম হিসেবেও কাজ করতে পারে।
২০২০ সালে প্রকাশিত একটি হাঙ্গেরীয় গবেষণায় ৮১৬ জন প্রাপ্তবয়স্ক দর্শকের অ্যানিমেটেড
সিটকম দেখার বিভিন্ন কারণ বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে বিনোদন, সামাজিক ব্যঙ্গের প্রতি
আগ্রহ এবং মানসিকভাবে কিছুটা স্বস্তি পাওয়ার বিষয়গুলো উঠে আসে।
তবে কার্টুনকে মানসিক চাপ, উদ্বেগ
বা বিষণ্নতার চিকিৎসা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি অনেকের ক্ষেত্রে সাময়িক
ভালো লাগা বা মনোযোগ পরিবর্তনের একটি উপায় হতে পারে।
প্রিয় চরিত্রের সঙ্গে কেন নিজের মিল খুঁজি
কার্টুনের গল্প অনেক সময় বাস্তব
জীবনের মতোই সমস্যা, ব্যর্থতা, বন্ধুত্ব কিংবা সম্পর্কের নানা বিষয় তুলে ধরে। কোনো
চরিত্র প্রতিকূলতার মধ্যেও চেষ্টা চালিয়ে গেলে দর্শকের নিজের জীবনেও তার সঙ্গে মিল
খুঁজে পাওয়া সম্ভব।
এ ধরনের গল্প সরাসরি বাস্তব সমস্যার
সমাধান না দিলেও কিছু সময়ের জন্য নেতিবাচক চিন্তা থেকে মনকে দূরে রাখতে পারে। বিশেষ
করে পরিচিত চরিত্র ও গল্পের জগৎ অনেকের কাছে দৈনন্দিন একঘেয়েমি থেকে সাময়িক বিরতির
জায়গা হয়ে ওঠে।
পুরোনো কার্টুনে এত নস্টালজিয়া কেন
বছর দশেক পর পুরোনো কোনো কার্টুনের
গান শুনলেই যদি মনে পড়ে যায় শৈশবের ঘর, সেই সময়কার টেলিভিশন কিংবা পরিবারের কোনো সদস্যের
কথা, তার কারণ স্মৃতি শুধু ঘটনা সংরক্ষণ করে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নির্দিষ্ট সময়,
স্থান, মানুষ এবং আবেগও।
ফলে পরিচিত কোনো গান, চরিত্র
বা দৃশ্য বর্তমান সময়ে একটি ‘ট্রিগার’ হিসেবে কাজ করে অতীতের স্মৃতি সামনে নিয়ে আসতে
পারে। এই নস্টালজিক অনুভূতি অনেকের কাছে আনন্দদায়ক ও আবেগপূর্ণ হয়ে ওঠে।
নস্টালজিয়ার সঙ্গে সৃজনশীলতার
সম্পর্ক নিয়েও গবেষণা হয়েছে। কয়েকটি পরীক্ষায় অতীতের স্মৃতিময় অনুভূতি সৃজনশীল লেখার
ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে দেখা গেছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে পুরোনো কার্টুন
দেখলেই সবার সৃজনশীলতা বেড়ে যাবে।
বড়রা কার্টুন দেখলে কি শিশুসুলভ?
একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কার্টুন
পছন্দ করেন মানেই তার মানসিক পরিপক্বতা কম-এমন কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। অ্যানিমেশনও
অন্যান্য বিনোদনমাধ্যমের মতোই গল্প, হাস্যরস, আবেগ ও কল্পনার অভিজ্ঞতা দিতে পারে।
বরং অনেকের কাছে শৈশবের প্রিয়
কার্টুন বড় হয়ে ওঠার পরও বিশেষ হয়ে থাকে মূলত সেই সময়ের স্মৃতির কারণে। তখন কার্টুনটি
শুধু একটি অনুষ্ঠান থাকে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে যায় জীবনের একটি নির্দিষ্ট অধ্যায়।
কল্পনার জগতের ভূমিকা
কার্টুনের জগতে অসম্ভব অনেক ঘটনাই
স্বাভাবিক। উড়তে পারা, কথা বলা প্রাণী কিংবা বাস্তবতার বাইরে তৈরি নানা চরিত্র দর্শককে
কল্পনার জগতে নিয়ে যায়। তবে শুধু কার্টুন দেখলেই কল্পনাশক্তি বাড়ে-এমন সরাসরি সিদ্ধান্তে
যাওয়ার মতো প্রমাণ নেই।
দর্শক কী দেখছেন, কতক্ষণ দেখছেন
এবং দেখার পর গল্পটি নিয়ে কীভাবে ভাবছেন-এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক গবেষণায়
কোনো গল্প দীর্ঘদিন মনে থাকা এবং পরে সেটি নিয়ে চিন্তা বা কল্পনা করার মধ্যে সম্পর্কের
বিষয়টি আলোচিত হয়েছে।
নিজের জন্য একটু সময়
বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্ব
বাড়ে, কিন্তু নিজের জন্য নির্ভার সময় কমে যায়। সেই জায়গায় পুরোনো একটি কার্টুনের পর্ব
হয়তো কয়েক মিনিটের জন্য বাস্তব জীবন থেকে মনোযোগ সরিয়ে দিতে পারে।
তবে স্বস্তি পাওয়ার জন্য কার্টুন
দেখার অভ্যাস যেন ঘুম, কাজ, পড়াশোনা বা দৈনন্দিন দায়িত্বে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়, সেদিকেও
খেয়াল রাখা জরুরি।
শেষ পর্যন্ত বড় হয়ে কার্টুন দেখতে
ভালো লাগার অর্থ এই নয় যে মানুষ আবার শিশু হয়ে গেছে। বরং একটি পরিচিত চরিত্র, গান বা
দৃশ্য কখনো কখনো আমাদের এমন এক সময়ের সঙ্গে যুক্ত করে, যখন জীবন ছিল অনেক সহজ। কার্টুনের
পর্দা তখন শুধু গল্প দেখায় না-কয়েক মুহূর্তের জন্য ফিরিয়ে দেয় নিজেরই পুরোনো একটি সংস্করণকে।

রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছোটবেলায় কার্টুন দেখার জন্য খাওয়ার কথা ভুলে যাওয়ার স্মৃতি অনেকেরই আছে। স্কুল থেকে ফিরে টেলিভিশনের সামনে বসা, ছুটির দিনে প্রিয় চরিত্রের নতুন পর্বের অপেক্ষা কিংবা পরিবারের সবার সঙ্গে একসঙ্গে কার্টুন দেখা—শৈশবের এমন মুহূর্তগুলো সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গেলেও স্মৃতিতে থেকে যায়।
তাই বহু বছর পর হঠাৎ সেই পরিচিত
কার্টুনের গান, চরিত্র কিংবা কোনো দৃশ্য চোখে পড়লে অদ্ভুত এক অনুভূতি তৈরি হয়। মনে
হয় যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য ফিরে গেছি সেই পুরোনো সময়ে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই অনুভূতির
সঙ্গে জড়িয়ে আছে নস্টালজিয়া-অতীতের কোনো সময়, মানুষ বা
অভিজ্ঞতার সঙ্গে আবেগপূর্ণভাবে আবার যুক্ত হওয়ার অনুভূতি।
কার্টুনে কেন স্বস্তি মেলে
প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে কাজ, পরিবার,
অর্থনৈতিক চিন্তা ও নানা দায়িত্বের চাপ থাকে। এর মধ্যে পরিচিত ও হালকা ধরনের কোনো কার্টুন
দেখা কিছু সময়ের জন্য মনোযোগকে দৈনন্দিন উদ্বেগ থেকে সরিয়ে নিতে পারে।
হাস্যরসাত্মক কার্টুন বা অ্যানিমেটেড
সিটকম অনেকের কাছে বিনোদনের পাশাপাশি মানসিক স্বস্তির মাধ্যম হিসেবেও কাজ করতে পারে।
২০২০ সালে প্রকাশিত একটি হাঙ্গেরীয় গবেষণায় ৮১৬ জন প্রাপ্তবয়স্ক দর্শকের অ্যানিমেটেড
সিটকম দেখার বিভিন্ন কারণ বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে বিনোদন, সামাজিক ব্যঙ্গের প্রতি
আগ্রহ এবং মানসিকভাবে কিছুটা স্বস্তি পাওয়ার বিষয়গুলো উঠে আসে।
তবে কার্টুনকে মানসিক চাপ, উদ্বেগ
বা বিষণ্নতার চিকিৎসা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি অনেকের ক্ষেত্রে সাময়িক
ভালো লাগা বা মনোযোগ পরিবর্তনের একটি উপায় হতে পারে।
প্রিয় চরিত্রের সঙ্গে কেন নিজের মিল খুঁজি
কার্টুনের গল্প অনেক সময় বাস্তব
জীবনের মতোই সমস্যা, ব্যর্থতা, বন্ধুত্ব কিংবা সম্পর্কের নানা বিষয় তুলে ধরে। কোনো
চরিত্র প্রতিকূলতার মধ্যেও চেষ্টা চালিয়ে গেলে দর্শকের নিজের জীবনেও তার সঙ্গে মিল
খুঁজে পাওয়া সম্ভব।
এ ধরনের গল্প সরাসরি বাস্তব সমস্যার
সমাধান না দিলেও কিছু সময়ের জন্য নেতিবাচক চিন্তা থেকে মনকে দূরে রাখতে পারে। বিশেষ
করে পরিচিত চরিত্র ও গল্পের জগৎ অনেকের কাছে দৈনন্দিন একঘেয়েমি থেকে সাময়িক বিরতির
জায়গা হয়ে ওঠে।
পুরোনো কার্টুনে এত নস্টালজিয়া কেন
বছর দশেক পর পুরোনো কোনো কার্টুনের
গান শুনলেই যদি মনে পড়ে যায় শৈশবের ঘর, সেই সময়কার টেলিভিশন কিংবা পরিবারের কোনো সদস্যের
কথা, তার কারণ স্মৃতি শুধু ঘটনা সংরক্ষণ করে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নির্দিষ্ট সময়,
স্থান, মানুষ এবং আবেগও।
ফলে পরিচিত কোনো গান, চরিত্র
বা দৃশ্য বর্তমান সময়ে একটি ‘ট্রিগার’ হিসেবে কাজ করে অতীতের স্মৃতি সামনে নিয়ে আসতে
পারে। এই নস্টালজিক অনুভূতি অনেকের কাছে আনন্দদায়ক ও আবেগপূর্ণ হয়ে ওঠে।
নস্টালজিয়ার সঙ্গে সৃজনশীলতার
সম্পর্ক নিয়েও গবেষণা হয়েছে। কয়েকটি পরীক্ষায় অতীতের স্মৃতিময় অনুভূতি সৃজনশীল লেখার
ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে দেখা গেছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে পুরোনো কার্টুন
দেখলেই সবার সৃজনশীলতা বেড়ে যাবে।
বড়রা কার্টুন দেখলে কি শিশুসুলভ?
একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কার্টুন
পছন্দ করেন মানেই তার মানসিক পরিপক্বতা কম-এমন কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। অ্যানিমেশনও
অন্যান্য বিনোদনমাধ্যমের মতোই গল্প, হাস্যরস, আবেগ ও কল্পনার অভিজ্ঞতা দিতে পারে।
বরং অনেকের কাছে শৈশবের প্রিয়
কার্টুন বড় হয়ে ওঠার পরও বিশেষ হয়ে থাকে মূলত সেই সময়ের স্মৃতির কারণে। তখন কার্টুনটি
শুধু একটি অনুষ্ঠান থাকে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে যায় জীবনের একটি নির্দিষ্ট অধ্যায়।
কল্পনার জগতের ভূমিকা
কার্টুনের জগতে অসম্ভব অনেক ঘটনাই
স্বাভাবিক। উড়তে পারা, কথা বলা প্রাণী কিংবা বাস্তবতার বাইরে তৈরি নানা চরিত্র দর্শককে
কল্পনার জগতে নিয়ে যায়। তবে শুধু কার্টুন দেখলেই কল্পনাশক্তি বাড়ে-এমন সরাসরি সিদ্ধান্তে
যাওয়ার মতো প্রমাণ নেই।
দর্শক কী দেখছেন, কতক্ষণ দেখছেন
এবং দেখার পর গল্পটি নিয়ে কীভাবে ভাবছেন-এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক গবেষণায়
কোনো গল্প দীর্ঘদিন মনে থাকা এবং পরে সেটি নিয়ে চিন্তা বা কল্পনা করার মধ্যে সম্পর্কের
বিষয়টি আলোচিত হয়েছে।
নিজের জন্য একটু সময়
বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্ব
বাড়ে, কিন্তু নিজের জন্য নির্ভার সময় কমে যায়। সেই জায়গায় পুরোনো একটি কার্টুনের পর্ব
হয়তো কয়েক মিনিটের জন্য বাস্তব জীবন থেকে মনোযোগ সরিয়ে দিতে পারে।
তবে স্বস্তি পাওয়ার জন্য কার্টুন
দেখার অভ্যাস যেন ঘুম, কাজ, পড়াশোনা বা দৈনন্দিন দায়িত্বে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়, সেদিকেও
খেয়াল রাখা জরুরি।
শেষ পর্যন্ত বড় হয়ে কার্টুন দেখতে
ভালো লাগার অর্থ এই নয় যে মানুষ আবার শিশু হয়ে গেছে। বরং একটি পরিচিত চরিত্র, গান বা
দৃশ্য কখনো কখনো আমাদের এমন এক সময়ের সঙ্গে যুক্ত করে, যখন জীবন ছিল অনেক সহজ। কার্টুনের
পর্দা তখন শুধু গল্প দেখায় না-কয়েক মুহূর্তের জন্য ফিরিয়ে দেয় নিজেরই পুরোনো একটি সংস্করণকে।

আপনার মতামত লিখুন