সংবাদ

প্রবাসে ভাগ্য বদলাতে গিয়ে ফিরলেন লাশ হয়ে


প্রতিনিধি, শেরপুর (বগুড়া)
প্রতিনিধি, শেরপুর (বগুড়া)
প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৪৫ পিএম

প্রবাসে ভাগ্য বদলাতে গিয়ে ফিরলেন লাশ হয়ে
নিহত রফিকুল ইসলাম (৪৫)। ছবি : সংগৃহীত

অভাব-অনটনের সংসারে একটু স্বচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্নে ভিটামাটি বিক্রি করে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন রফিকুল ইসলাম (৪৫)। কিন্তু ভাগ্যের চাকা ঘোরা তো দূরের কথা, প্রতারক দালালের খপ্পরে পড়ে একে একে হারিয়েছেন শেষ সম্বলটুকু। শেষ পর্যন্ত বিদেশে নির্মম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে দেশে ফিরতে টিকিট কেটেছিলেন; কিন্তু ফিরলেন লাশ হয়ে।

শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯টায় যখন রফিকের মরদেহ জন্মভিটা বগুড়ার শেরপুর উপজেলার খামারকান্দি ফারাজী পাড়া গ্রামে এসে পৌঁছায়, তখন কান্নায় পুরো এলাকার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। রেখে যাওয়া এক ছেলে, এক মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে এখন অথৈ সাগরে পড়েছে পরিবারটি। মৃত রফিকুল ইসলাম ওই গ্রামের মৃত ইউসুফ আলীর ছেলে।

নিহতের ছেলে শাহরিয়ার নাফিস ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সংসারের দারিদ্র্য ঘোরাতে জমি বিক্রি ও চড়া সুদে ঋণ নিয়ে বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন রফিকুল। একই গ্রামের দালাল নাসিমা খাতুন, তার স্বামী সাইফুল ইসলাম, মেয়ে সোনিয়া আক্তার ও জামাই মুসা তাকে ভালো চাকরির প্রলোভন দেখান। তবে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর পর রফিকুল জানতে পারেন, তাকে আকামা বা ওয়ার্ক পারমিট নয়, ৩ মাসের ট্যুরিস্ট ভিসায় পাঠানো হয়েছে। ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর রফিকুল মালয়েশিয়ায় পুলিশের ভয়ে দিনের পর দিন লুকিয়ে বেড়াতে থাকেন। এ বিষয়ে অভিযুক্ত দালাল নাসিমা খাতুন ও তার জামাই মুসার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা চাকরি দেওয়ার কথা বলে রফিকের পরিবারের কাছ থেকে আরও ১ লাখ ২০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন।

টাকা নেওয়ার পরও রফিকুলকে কোনো চাকরি দেওয়া হয়নি। উল্টো তার পাসপোর্ট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কেড়ে নিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। দিনের পর দিন এই অমানবিক অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে দেশে ফেরার জন্য বিমানের টিকিট কেটেছিলেন তিনি। এজন্য ধারদেনা করে টাকা সংগ্রহ করে মালয়েশিয়ায় পাঠানো হয়েছিল।

১৮ সেপ্টেম্বর তার দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু ১৭ সেপ্টেম্বর মালয়েশিয়ায় মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণে (ব্রেইন স্ট্রোক) আক্রান্ত হলে তাকে দেশটির ‘সুঙ্গাই বুলোহ হাসপাতালে’ (Sungai Buloh Hospital) ভর্তি করা হয়। ২১ সেপ্টেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেখানেই মারা যান রফিকুল ইসলাম।

এদিকে শুক্রবার সকালে রফিকের মরদেহ গ্রামে পৌঁছানোর খবর ছড়িয়ে পড়লে অভিযুক্ত দালাল পরিবার বাড়ি তালাবদ্ধ করে পালিয়ে যায়। রফিকের স্ত্রী স্বপ্না খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমগোর শেষ সম্বল জমিটুকু বেচা আর ঋণ কইরা টাকা দিছিলাম। শেষ পর্যন্ত আমার জামাইটারে দালালরা মিছা কথা কইয়া নিয়া মাইরা ফেললো। এখন আমি এই দুইডা এতিম ছাওয়াল-মিয়া নিয়া কোনহানে দাঁড়ামু?’

এ বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা অবিলম্বে অভিযুক্ত প্রতারক চক্রের সদস্য নাসিমা খাতুন, সাইফুল ইসলাম, সোনিয়া ও মুসাকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। ঘটনাটির বিষয়ে অভিযুক্তদের বাড়িতে গেলে তারা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি।

শেরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম মঈনুদ্দিন বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬


প্রবাসে ভাগ্য বদলাতে গিয়ে ফিরলেন লাশ হয়ে

প্রকাশের তারিখ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

অভাব-অনটনের সংসারে একটু স্বচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্নে ভিটামাটি বিক্রি করে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন রফিকুল ইসলাম (৪৫)। কিন্তু ভাগ্যের চাকা ঘোরা তো দূরের কথা, প্রতারক দালালের খপ্পরে পড়ে একে একে হারিয়েছেন শেষ সম্বলটুকু। শেষ পর্যন্ত বিদেশে নির্মম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে দেশে ফিরতে টিকিট কেটেছিলেন; কিন্তু ফিরলেন লাশ হয়ে।

শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯টায় যখন রফিকের মরদেহ জন্মভিটা বগুড়ার শেরপুর উপজেলার খামারকান্দি ফারাজী পাড়া গ্রামে এসে পৌঁছায়, তখন কান্নায় পুরো এলাকার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। রেখে যাওয়া এক ছেলে, এক মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে এখন অথৈ সাগরে পড়েছে পরিবারটি। মৃত রফিকুল ইসলাম ওই গ্রামের মৃত ইউসুফ আলীর ছেলে।

নিহতের ছেলে শাহরিয়ার নাফিস ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সংসারের দারিদ্র্য ঘোরাতে জমি বিক্রি ও চড়া সুদে ঋণ নিয়ে বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন রফিকুল। একই গ্রামের দালাল নাসিমা খাতুন, তার স্বামী সাইফুল ইসলাম, মেয়ে সোনিয়া আক্তার ও জামাই মুসা তাকে ভালো চাকরির প্রলোভন দেখান। তবে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর পর রফিকুল জানতে পারেন, তাকে আকামা বা ওয়ার্ক পারমিট নয়, ৩ মাসের ট্যুরিস্ট ভিসায় পাঠানো হয়েছে। ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর রফিকুল মালয়েশিয়ায় পুলিশের ভয়ে দিনের পর দিন লুকিয়ে বেড়াতে থাকেন। এ বিষয়ে অভিযুক্ত দালাল নাসিমা খাতুন ও তার জামাই মুসার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা চাকরি দেওয়ার কথা বলে রফিকের পরিবারের কাছ থেকে আরও ১ লাখ ২০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন।

টাকা নেওয়ার পরও রফিকুলকে কোনো চাকরি দেওয়া হয়নি। উল্টো তার পাসপোর্ট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কেড়ে নিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। দিনের পর দিন এই অমানবিক অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে দেশে ফেরার জন্য বিমানের টিকিট কেটেছিলেন তিনি। এজন্য ধারদেনা করে টাকা সংগ্রহ করে মালয়েশিয়ায় পাঠানো হয়েছিল।

১৮ সেপ্টেম্বর তার দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু ১৭ সেপ্টেম্বর মালয়েশিয়ায় মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণে (ব্রেইন স্ট্রোক) আক্রান্ত হলে তাকে দেশটির ‘সুঙ্গাই বুলোহ হাসপাতালে’ (Sungai Buloh Hospital) ভর্তি করা হয়। ২১ সেপ্টেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেখানেই মারা যান রফিকুল ইসলাম।

এদিকে শুক্রবার সকালে রফিকের মরদেহ গ্রামে পৌঁছানোর খবর ছড়িয়ে পড়লে অভিযুক্ত দালাল পরিবার বাড়ি তালাবদ্ধ করে পালিয়ে যায়। রফিকের স্ত্রী স্বপ্না খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমগোর শেষ সম্বল জমিটুকু বেচা আর ঋণ কইরা টাকা দিছিলাম। শেষ পর্যন্ত আমার জামাইটারে দালালরা মিছা কথা কইয়া নিয়া মাইরা ফেললো। এখন আমি এই দুইডা এতিম ছাওয়াল-মিয়া নিয়া কোনহানে দাঁড়ামু?’

এ বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা অবিলম্বে অভিযুক্ত প্রতারক চক্রের সদস্য নাসিমা খাতুন, সাইফুল ইসলাম, সোনিয়া ও মুসাকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। ঘটনাটির বিষয়ে অভিযুক্তদের বাড়িতে গেলে তারা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি।

শেরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম মঈনুদ্দিন বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত