জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে নিজের অভিষেক ভাষণে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করেছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। অস্ত্রের অবাধ চলাচল বনাম কৃষকের দৈনন্দিন সংকটের বৈষম্য তুলে ধরে তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন এমন এক বৈশ্বিক ব্যবস্থা গড়ে উঠল–যেখানে যুদ্ধাস্ত্র অনায়াসে সীমান্ত পেরিয়ে যায়, কিন্তু কৃষকের প্রয়োজনের সময় সার বা জ্বালানি মিলবে না?
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে বালেন্দ্র শাহর এই বক্তব্যের তথ্য জানানো হয়।
জাতিসংঘের মঞ্চে ক্ষোভ প্রকাশ করে নেপালি প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র নিখুঁত সময়ে ঠিকই গন্তব্যে পৌঁছে যাচ্ছে। রাইফেল কিংবা গোলাবারুদ সব বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে যেকোনো সময়সীমায় সীমান্ত পার হচ্ছে। অথচ নেপালের একজন কৃষক যখন বাজারে যান, প্রয়োজনের মুহূর্তে ন্যায্যদামে সার কিংবা জ্বালানিটুকুও সংগ্রহ করতে পারেন না।’
বিদ্যমান ব্যবস্থার অসংগতি আঙুল দিয়ে দেখিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এমন এক ধরণি গড়ে তুলেছি, যেখানে যুদ্ধের রসদ সরবরাহের ব্যবস্থাটি নিখুঁত; অথচ মানুষের আহার জোগানোর খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণ।’
৩৬ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহ এ বছরের সাধারণ অধিবেশনে ভাষণ দেওয়া সর্বকনিষ্ঠ সরকারপ্রধান। বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি পুরো দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের পক্ষ থেকে জলবায়ু ন্যায্যতার পক্ষে জোর দাবি জানান।
দক্ষিণ এশিয়ার অভিন্ন সংকটের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এটি কেবল নেপালের একার দুর্ভাগ্য নয়। বাংলাদেশকে জিজ্ঞাসা করুন। ভুটান, ভারত কিংবা মালদ্বীপকে প্রশ্ন করুন। পাকিস্তান কিংবা শ্রীলঙ্কার কাছে জানতে চান। অথবা আমাদের এ অঞ্চলের যেকোনো দেশকে জিজ্ঞেস করে দেখুন–সবাই একই কষ্টের কথা বলবে। যে জলবায়ু উষ্ণায়নে আমাদের কোনো ভূমিকা ছিল না, আমরা আজ তার কুফলে ক্ষতিগ্রস্ত। আর যে যুদ্ধ আমরা বাধাইনি, তার মাশুলও দিতে হচ্ছে আমাদের। এতেই প্রমাণ হয়, বৈশ্বিক সহযোগিতার বিদ্যমান কাঠামোতে দৃশ্যমানের চেয়েও গভীর গলদ রয়ে গেছে।’
উল্লেখ্য, গত ২৬ আগস্ট নেপালে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং নিখোঁজ হন আরও হাজার হাজার মানুষ। সেই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ক্ষত তাজা থাকতেই জাতিসংঘে এই জোরালো ভাষণ দিলেন তিনি। শাহ পুরো দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের জলবায়ু ঝুঁকির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে বিশ্বনেতাদের বাস্তব পরিস্থিতি অনুধাবনের আহ্বান জানান।
বক্তব্যের শেষ অংশে বালেন্দ্র শাহ ‘হিমালয় জলবায়ু সহনশীলতা ব্যবস্থা’ নামের একটি নতুন বৈশ্বিক জোট গঠনের প্রস্তাব পেশ করেন। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে হিমালয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য যে মারাত্মক হুমকির মুখে, তা উল্লেখ করে তিনি এই উদ্যোগটি নেপাল, ভারত ও চীনের যৌথ নেতৃত্বে পরিচালনার আহ্বান জানান।
শাহ বলেন, ‘হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চল প্রায় ২০০ কোটি মানুষের আবাসস্থল। এই পর্বতমালা নেপালের সীমানা ছাড়িয়ে বিস্তীর্ণ জনগোষ্ঠীর পানি, বাস্তুতন্ত্র, চাষাবাদ ও জীবনধারার মূল উৎস। ফলে হিমালয় পৃথিবীর বিচ্ছিন্ন কোনো অঞ্চল নয়, এটি সামগ্রিক জীবনধারণ ব্যবস্থারই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।’
তিনি আরও বলেন, ‘জরুরি প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে আমরা নেপাল, ভারত ও চীনের নেতৃত্বে যৌথ উদ্যোগে একটি হিমালয় জলবায়ু সহনশীলতা ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব রাখছি।’ প্রস্তাবিত এই কাঠামোর অধীনে দেশগুলো নিজেদের মধ্যে কৃত্রিম উপগ্রহের ডেটা, রিয়েল-টাইম তথ্য এবং কারিগরি তথ্যপ্রযুক্তি আদান-প্রদান করতে পারবে বলে জানান তিনি।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, জলবায়ু পরিবর্তনের মতো দুর্যোগ কোনো ভৌগোলিক সীমানা চেনে না; হিমবাহের গলন কিংবা বন্যার পানির চলাচলে কোনো ভিসা-পাসপোর্টের প্রয়োজন হয় না। সম্প্রতি নেপালের ভয়াবহ বন্যার পর দ্রুত সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া দেশগুলোর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
বালেন্দ্র শাহ বলেন, ‘আমাদের নিকটতম দুই প্রতিবেশী ভারত ও চীন তাৎক্ষণিকভাবে ও উদারভাবে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য বন্ধুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র, জাতিসংঘ, মানবিক সাহায্য সংস্থা এবং বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষ যে সহানুভূতি দেখিয়েছে, তার জন্য নেপাল কৃতজ্ঞ।’

শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে নিজের অভিষেক ভাষণে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করেছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। অস্ত্রের অবাধ চলাচল বনাম কৃষকের দৈনন্দিন সংকটের বৈষম্য তুলে ধরে তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন এমন এক বৈশ্বিক ব্যবস্থা গড়ে উঠল–যেখানে যুদ্ধাস্ত্র অনায়াসে সীমান্ত পেরিয়ে যায়, কিন্তু কৃষকের প্রয়োজনের সময় সার বা জ্বালানি মিলবে না?
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে বালেন্দ্র শাহর এই বক্তব্যের তথ্য জানানো হয়।
জাতিসংঘের মঞ্চে ক্ষোভ প্রকাশ করে নেপালি প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র নিখুঁত সময়ে ঠিকই গন্তব্যে পৌঁছে যাচ্ছে। রাইফেল কিংবা গোলাবারুদ সব বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে যেকোনো সময়সীমায় সীমান্ত পার হচ্ছে। অথচ নেপালের একজন কৃষক যখন বাজারে যান, প্রয়োজনের মুহূর্তে ন্যায্যদামে সার কিংবা জ্বালানিটুকুও সংগ্রহ করতে পারেন না।’
বিদ্যমান ব্যবস্থার অসংগতি আঙুল দিয়ে দেখিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এমন এক ধরণি গড়ে তুলেছি, যেখানে যুদ্ধের রসদ সরবরাহের ব্যবস্থাটি নিখুঁত; অথচ মানুষের আহার জোগানোর খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণ।’
৩৬ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহ এ বছরের সাধারণ অধিবেশনে ভাষণ দেওয়া সর্বকনিষ্ঠ সরকারপ্রধান। বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি পুরো দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের পক্ষ থেকে জলবায়ু ন্যায্যতার পক্ষে জোর দাবি জানান।
দক্ষিণ এশিয়ার অভিন্ন সংকটের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এটি কেবল নেপালের একার দুর্ভাগ্য নয়। বাংলাদেশকে জিজ্ঞাসা করুন। ভুটান, ভারত কিংবা মালদ্বীপকে প্রশ্ন করুন। পাকিস্তান কিংবা শ্রীলঙ্কার কাছে জানতে চান। অথবা আমাদের এ অঞ্চলের যেকোনো দেশকে জিজ্ঞেস করে দেখুন–সবাই একই কষ্টের কথা বলবে। যে জলবায়ু উষ্ণায়নে আমাদের কোনো ভূমিকা ছিল না, আমরা আজ তার কুফলে ক্ষতিগ্রস্ত। আর যে যুদ্ধ আমরা বাধাইনি, তার মাশুলও দিতে হচ্ছে আমাদের। এতেই প্রমাণ হয়, বৈশ্বিক সহযোগিতার বিদ্যমান কাঠামোতে দৃশ্যমানের চেয়েও গভীর গলদ রয়ে গেছে।’
উল্লেখ্য, গত ২৬ আগস্ট নেপালে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং নিখোঁজ হন আরও হাজার হাজার মানুষ। সেই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ক্ষত তাজা থাকতেই জাতিসংঘে এই জোরালো ভাষণ দিলেন তিনি। শাহ পুরো দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের জলবায়ু ঝুঁকির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে বিশ্বনেতাদের বাস্তব পরিস্থিতি অনুধাবনের আহ্বান জানান।
বক্তব্যের শেষ অংশে বালেন্দ্র শাহ ‘হিমালয় জলবায়ু সহনশীলতা ব্যবস্থা’ নামের একটি নতুন বৈশ্বিক জোট গঠনের প্রস্তাব পেশ করেন। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে হিমালয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য যে মারাত্মক হুমকির মুখে, তা উল্লেখ করে তিনি এই উদ্যোগটি নেপাল, ভারত ও চীনের যৌথ নেতৃত্বে পরিচালনার আহ্বান জানান।
শাহ বলেন, ‘হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চল প্রায় ২০০ কোটি মানুষের আবাসস্থল। এই পর্বতমালা নেপালের সীমানা ছাড়িয়ে বিস্তীর্ণ জনগোষ্ঠীর পানি, বাস্তুতন্ত্র, চাষাবাদ ও জীবনধারার মূল উৎস। ফলে হিমালয় পৃথিবীর বিচ্ছিন্ন কোনো অঞ্চল নয়, এটি সামগ্রিক জীবনধারণ ব্যবস্থারই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।’
তিনি আরও বলেন, ‘জরুরি প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে আমরা নেপাল, ভারত ও চীনের নেতৃত্বে যৌথ উদ্যোগে একটি হিমালয় জলবায়ু সহনশীলতা ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব রাখছি।’ প্রস্তাবিত এই কাঠামোর অধীনে দেশগুলো নিজেদের মধ্যে কৃত্রিম উপগ্রহের ডেটা, রিয়েল-টাইম তথ্য এবং কারিগরি তথ্যপ্রযুক্তি আদান-প্রদান করতে পারবে বলে জানান তিনি।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, জলবায়ু পরিবর্তনের মতো দুর্যোগ কোনো ভৌগোলিক সীমানা চেনে না; হিমবাহের গলন কিংবা বন্যার পানির চলাচলে কোনো ভিসা-পাসপোর্টের প্রয়োজন হয় না। সম্প্রতি নেপালের ভয়াবহ বন্যার পর দ্রুত সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া দেশগুলোর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
বালেন্দ্র শাহ বলেন, ‘আমাদের নিকটতম দুই প্রতিবেশী ভারত ও চীন তাৎক্ষণিকভাবে ও উদারভাবে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য বন্ধুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র, জাতিসংঘ, মানবিক সাহায্য সংস্থা এবং বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষ যে সহানুভূতি দেখিয়েছে, তার জন্য নেপাল কৃতজ্ঞ।’

আপনার মতামত লিখুন