অতি সম্প্রতি জাতিসংঘে মুহাম্মদ ইউনূস একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে নিজের প্রভাব-প্রতিপত্তি ও অস্তিত্বের ঘোষণা দিয়েছেন। ২১ সেপ্টেম্বর সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে ভাড়া করা হলে ‘সোশ্যাল বিজনেস, ইয়ুথ অ্যান্ড টেকনোলজি’ নামে সাইড ইভেন্ট হয়, যেখানে অল্প কিছু অতিথি ছিলেন। কৃতজ্ঞতাবশত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান তাকে হাইলাইট করতে চেয়েছেন। কিন্তু এতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণের গুরুত্ব জনগণের কাছে কমে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন ইউনূসের পক্ষে-বিপক্ষে সরগরম আলোচনা, অথচ প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ তত গুরুত্ব পায়নি। এর দায় বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর। ইউনূসের প্রভাব নিয়ে সন্দেহ নেই, কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তিনি যে অপকর্ম করেছেন, তা জনগণ ভুলবে না।
মোহাম্মদ ইউনূসের একটি বড় ভাঁওতাবাজি ছিল পাসপোর্ট নিয়ে। তিনি বলেছিলেন, পাসপোর্টের জন্য জনগণ অফিসে যাবে কেন, ঘরে বসে অনলাইনে পেয়ে যাবে। তিনি নিজেই বলেছেন, সরকার ঘরে পাসপোর্ট পৌঁছে দেওয়ার জন্য কাজ করছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ ঘরে বসে পাসপোর্ট পাচ্ছে না, ভোগান্তি একই আছে।
মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয় ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বিএনপি নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসা পর্যন্ত সময়কাল প্রায় ১৮ মাস। এই সময়ে বড় প্রতিশ্রুতি ছিল সংস্কার, দুর্নীতি দমন ও বিনিয়োগ। কিন্তু মিলল বক্তৃতার জৌলুস আর কাজের ঘাটতি। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন জবাবদিহিতা। ইউনূস সরকার এখন ক্ষমতায় নেই, কিন্তু তার অপকর্মের কোনো বিচার হচ্ছে না। কারণ ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার তাকে রাজনৈতিক ছাড় দিয়েছে। আদালতও অভিযোগগুলো আমলে নিচ্ছে না। ফলে ১৮ মাসে রাষ্ট্রের যে ক্ষতির পাহাড় জমেছে, তার দায়ও আওয়ামী লীগের ওপর বর্তানো হচ্ছে।
২০২৪ সালের অক্টোবরে জাতিসংঘ মহাসচিবকে কক্সবাজারে আনা হয়। ইউনূস চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে বোঝাতে চাইলেন, রোহিঙ্গারা আমাদের লোক। বলা হলো, ‘আগামী ঈদ তারা নিজ ভূখণ্ডে করবে।’ কিন্তু ১৮ মাস শেষেও একজন রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন হয়নি। ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার ভরণপোষণ, পাসপোর্ট জালিয়াতি করে বিদেশে গিয়ে বাংলাদেশের বদনাম—আগের মতোই আছে। ইউনূস শোডাউনের ভাঁওতাবাজি করলেন, কিন্তু কূটনৈতিক অগ্রগতি শূন্য।
বিনিয়োগের নামেও একই প্রতারণা। একজন তরুণকে ‘বিনিয়োগের জাদুকর’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো। প্রচার হলো, ইংরেজি জানা এই প্যারাসুট তরুণ বিদেশ থেকে বিনিয়োগ এনে দেশকে সিঙ্গাপুর বানিয়ে দেবে। কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিট বৈদেশিক বিনিয়োগ কমেছে। উল্টো চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং ও পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানিকে দীর্ঘমেয়াদে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। একই সময়ে বলা হলো, পৃথিবীর সব দেশ বাংলাদেশ থেকে লোক নেওয়ার জন্য তার কাছে আবেদনের পর আবেদন করে যাচ্ছে, অথচ ২০২৫ সালে বৈধ অভিবাসন আগের বছরের চেয়ে কমেছে।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের সিদ্ধান্ত ছিল আত্মঘাতী। আওয়ামী লীগ সরকার সামিটের সঙ্গে তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের চুক্তি করেছিল। ইউনূস সরকার ২০২৫-এর শুরুতে ‘স্বৈরাচারের দোসর’ আখ্যা দিয়ে চুক্তি বাতিল করে, কিন্তু বিকল্প টার্মিনাল করল না। জুলাই ২০২৫-এ এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে আগুনের পর দৈনিক প্রায় ৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে তীব্র সংকট শুরু হয়। একইভাবে আগের সরকারের অনুমোদিত ৩৭টি সৌর প্রকল্পের এলওআই বা লেটার অব ইনটেন্ট বাতিল করা হয়। বলা হলো, স্বচ্ছ দরপত্র হবে। ওই ৩৭টি প্রকল্প থেকে ৩ হাজার ২৮৭ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৬ বিলিয়ন ডলার বিদেশি বিনিয়োগ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নতুন করে সমপরিমাণ বিদ্যুৎ যোগ করার উদ্যোগ আর নেওয়া হয়নি।
স্বাস্থ্য খাতে অবহেলার খেসারত দিল শিশুরা। অন্তর্বর্তী সরকার ইউনিসেফের মাধ্যমে হামের টিকা কেনার আগের প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয়। যুক্তি ছিল, উন্মুক্ত দরপত্র হবে। কিন্তু সময়মতো টিকা আসেনি। ফলে ২০২৫ সাল থেকে হামে এক হাজারের বেশি শিশু মারা গেছে।একইভাবে ১৪ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক ইউনূসের আমলে কয়েক মাস কার্যত অকার্যকর করে রাখা হয়। স্টোরের ওষুধ তালাবদ্ধ থাকায় কোটি টাকার ওষুধ মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে। শুধু রাজনৈতিক প্রতিশোধের কারণে আগের সরকারের ভালো-মন্দ নির্বিশেষে সব বাতিল করার পরিণতি জনগণ এখন ভুগছে।
অর্থনীতিতে ধস নামে ব্যাংক ও বাণিজ্যনীতির কারণে। আইন লঙ্ঘন করে সত্তরোর্ধ্ব একজন অর্থনীতিবিদকে গভর্নর করা হয়। তিনি প্রকাশ্যে কয়েকটি ব্যাংককে ‘দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ’ আখ্যা দিয়ে ‘লাল তালিকাভুক্ত’ করেন। এরপরই আমানতকারীরা আতঙ্কে টাকা তুলতে শুরু করে, কয়েকটি ব্যাংক তারল্য সংকটে পড়ে। আওয়ামী ঘরানার ব্যবসায়ীদের ব্যাংকিং সহায়তা বন্ধ করায় অল্প দিনেই খেলাপি ঋণ দ্বিগুণ হয়, অনেক কারখানা বন্ধ হয়। নিজের গদি রক্ষায় ইউনূস সরকার প্রথমে স্টারলিংক নিয়ে হৈচৈ করল, ট্রাম্প প্রশাসনের পালাবদলের পর সেই প্রসঙ্গও চাপা পড়ে গেল। সবচেয়ে বড় বিতর্ক যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি, যা বাংলাদেশের নীতি নির্ধারণের স্বাধীনতা খর্ব করবে।
সবশেষে দুর্নীতির শ্বেতপত্র। ‘সেরা অর্থনীতিবিদ’ দিয়ে আগের সরকারের পাচারের হিসাব বের করে ভাষণ দেওয়া হলো, বিদেশে দল বেঁধে সফর হলো, কোটি টাকা খরচ হলো। কিন্তু একটি টাকাও ফেরত আসেনি। উল্টো আলোচনা হচ্ছে, ইউনূস আমলেই বিভিন্ন খাতে বড় দুর্নীতি হয়েছে। তার বিরুদ্ধে থাকা শ্রম আইন ও অন্যান্য মামলা প্রশাসনিক নির্দেশে প্রত্যাহার হয়েছে, তার প্রতিষ্ঠানগুলো পেয়েছে কর সুবিধা ও নতুন লাইসেন্স। নোবেল লরিয়েটের আমলে আরও দুটি বস্তুর উদয় হয়েছে—অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি আর মব সন্ত্রাস।
বাগাড়ম্বরপূর্ণ কথা দিয়ে রাষ্ট্র চলে না। রোহিঙ্গা যায়নি, বিনিয়োগ আসেনি, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট বেড়েছে, শিশু মরছে, ক্লিনিক অচল হয়েছে, ব্যাংক খাত ধুকছে, বাণিজ্য চুক্তি গলার ফাঁস হয়েছে। ক্ষমতা ছেড়েও তিনি জবাবদিহির বাইরে। কিন্তু আরোপিত দেবত্বের মহিমা আর বাস্তবতার হোঁচট একসঙ্গে হাঁটে না।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অতি সম্প্রতি জাতিসংঘে মুহাম্মদ ইউনূস একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে নিজের প্রভাব-প্রতিপত্তি ও অস্তিত্বের ঘোষণা দিয়েছেন। ২১ সেপ্টেম্বর সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে ভাড়া করা হলে ‘সোশ্যাল বিজনেস, ইয়ুথ অ্যান্ড টেকনোলজি’ নামে সাইড ইভেন্ট হয়, যেখানে অল্প কিছু অতিথি ছিলেন। কৃতজ্ঞতাবশত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান তাকে হাইলাইট করতে চেয়েছেন। কিন্তু এতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণের গুরুত্ব জনগণের কাছে কমে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন ইউনূসের পক্ষে-বিপক্ষে সরগরম আলোচনা, অথচ প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ তত গুরুত্ব পায়নি। এর দায় বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর। ইউনূসের প্রভাব নিয়ে সন্দেহ নেই, কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তিনি যে অপকর্ম করেছেন, তা জনগণ ভুলবে না।
মোহাম্মদ ইউনূসের একটি বড় ভাঁওতাবাজি ছিল পাসপোর্ট নিয়ে। তিনি বলেছিলেন, পাসপোর্টের জন্য জনগণ অফিসে যাবে কেন, ঘরে বসে অনলাইনে পেয়ে যাবে। তিনি নিজেই বলেছেন, সরকার ঘরে পাসপোর্ট পৌঁছে দেওয়ার জন্য কাজ করছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ ঘরে বসে পাসপোর্ট পাচ্ছে না, ভোগান্তি একই আছে।
মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয় ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বিএনপি নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসা পর্যন্ত সময়কাল প্রায় ১৮ মাস। এই সময়ে বড় প্রতিশ্রুতি ছিল সংস্কার, দুর্নীতি দমন ও বিনিয়োগ। কিন্তু মিলল বক্তৃতার জৌলুস আর কাজের ঘাটতি। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন জবাবদিহিতা। ইউনূস সরকার এখন ক্ষমতায় নেই, কিন্তু তার অপকর্মের কোনো বিচার হচ্ছে না। কারণ ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার তাকে রাজনৈতিক ছাড় দিয়েছে। আদালতও অভিযোগগুলো আমলে নিচ্ছে না। ফলে ১৮ মাসে রাষ্ট্রের যে ক্ষতির পাহাড় জমেছে, তার দায়ও আওয়ামী লীগের ওপর বর্তানো হচ্ছে।
২০২৪ সালের অক্টোবরে জাতিসংঘ মহাসচিবকে কক্সবাজারে আনা হয়। ইউনূস চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে বোঝাতে চাইলেন, রোহিঙ্গারা আমাদের লোক। বলা হলো, ‘আগামী ঈদ তারা নিজ ভূখণ্ডে করবে।’ কিন্তু ১৮ মাস শেষেও একজন রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন হয়নি। ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার ভরণপোষণ, পাসপোর্ট জালিয়াতি করে বিদেশে গিয়ে বাংলাদেশের বদনাম—আগের মতোই আছে। ইউনূস শোডাউনের ভাঁওতাবাজি করলেন, কিন্তু কূটনৈতিক অগ্রগতি শূন্য।
বিনিয়োগের নামেও একই প্রতারণা। একজন তরুণকে ‘বিনিয়োগের জাদুকর’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো। প্রচার হলো, ইংরেজি জানা এই প্যারাসুট তরুণ বিদেশ থেকে বিনিয়োগ এনে দেশকে সিঙ্গাপুর বানিয়ে দেবে। কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিট বৈদেশিক বিনিয়োগ কমেছে। উল্টো চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং ও পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানিকে দীর্ঘমেয়াদে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। একই সময়ে বলা হলো, পৃথিবীর সব দেশ বাংলাদেশ থেকে লোক নেওয়ার জন্য তার কাছে আবেদনের পর আবেদন করে যাচ্ছে, অথচ ২০২৫ সালে বৈধ অভিবাসন আগের বছরের চেয়ে কমেছে।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের সিদ্ধান্ত ছিল আত্মঘাতী। আওয়ামী লীগ সরকার সামিটের সঙ্গে তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের চুক্তি করেছিল। ইউনূস সরকার ২০২৫-এর শুরুতে ‘স্বৈরাচারের দোসর’ আখ্যা দিয়ে চুক্তি বাতিল করে, কিন্তু বিকল্প টার্মিনাল করল না। জুলাই ২০২৫-এ এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে আগুনের পর দৈনিক প্রায় ৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে তীব্র সংকট শুরু হয়। একইভাবে আগের সরকারের অনুমোদিত ৩৭টি সৌর প্রকল্পের এলওআই বা লেটার অব ইনটেন্ট বাতিল করা হয়। বলা হলো, স্বচ্ছ দরপত্র হবে। ওই ৩৭টি প্রকল্প থেকে ৩ হাজার ২৮৭ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৬ বিলিয়ন ডলার বিদেশি বিনিয়োগ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নতুন করে সমপরিমাণ বিদ্যুৎ যোগ করার উদ্যোগ আর নেওয়া হয়নি।
স্বাস্থ্য খাতে অবহেলার খেসারত দিল শিশুরা। অন্তর্বর্তী সরকার ইউনিসেফের মাধ্যমে হামের টিকা কেনার আগের প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয়। যুক্তি ছিল, উন্মুক্ত দরপত্র হবে। কিন্তু সময়মতো টিকা আসেনি। ফলে ২০২৫ সাল থেকে হামে এক হাজারের বেশি শিশু মারা গেছে।একইভাবে ১৪ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক ইউনূসের আমলে কয়েক মাস কার্যত অকার্যকর করে রাখা হয়। স্টোরের ওষুধ তালাবদ্ধ থাকায় কোটি টাকার ওষুধ মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে। শুধু রাজনৈতিক প্রতিশোধের কারণে আগের সরকারের ভালো-মন্দ নির্বিশেষে সব বাতিল করার পরিণতি জনগণ এখন ভুগছে।
অর্থনীতিতে ধস নামে ব্যাংক ও বাণিজ্যনীতির কারণে। আইন লঙ্ঘন করে সত্তরোর্ধ্ব একজন অর্থনীতিবিদকে গভর্নর করা হয়। তিনি প্রকাশ্যে কয়েকটি ব্যাংককে ‘দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ’ আখ্যা দিয়ে ‘লাল তালিকাভুক্ত’ করেন। এরপরই আমানতকারীরা আতঙ্কে টাকা তুলতে শুরু করে, কয়েকটি ব্যাংক তারল্য সংকটে পড়ে। আওয়ামী ঘরানার ব্যবসায়ীদের ব্যাংকিং সহায়তা বন্ধ করায় অল্প দিনেই খেলাপি ঋণ দ্বিগুণ হয়, অনেক কারখানা বন্ধ হয়। নিজের গদি রক্ষায় ইউনূস সরকার প্রথমে স্টারলিংক নিয়ে হৈচৈ করল, ট্রাম্প প্রশাসনের পালাবদলের পর সেই প্রসঙ্গও চাপা পড়ে গেল। সবচেয়ে বড় বিতর্ক যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি, যা বাংলাদেশের নীতি নির্ধারণের স্বাধীনতা খর্ব করবে।
সবশেষে দুর্নীতির শ্বেতপত্র। ‘সেরা অর্থনীতিবিদ’ দিয়ে আগের সরকারের পাচারের হিসাব বের করে ভাষণ দেওয়া হলো, বিদেশে দল বেঁধে সফর হলো, কোটি টাকা খরচ হলো। কিন্তু একটি টাকাও ফেরত আসেনি। উল্টো আলোচনা হচ্ছে, ইউনূস আমলেই বিভিন্ন খাতে বড় দুর্নীতি হয়েছে। তার বিরুদ্ধে থাকা শ্রম আইন ও অন্যান্য মামলা প্রশাসনিক নির্দেশে প্রত্যাহার হয়েছে, তার প্রতিষ্ঠানগুলো পেয়েছে কর সুবিধা ও নতুন লাইসেন্স। নোবেল লরিয়েটের আমলে আরও দুটি বস্তুর উদয় হয়েছে—অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি আর মব সন্ত্রাস।
বাগাড়ম্বরপূর্ণ কথা দিয়ে রাষ্ট্র চলে না। রোহিঙ্গা যায়নি, বিনিয়োগ আসেনি, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট বেড়েছে, শিশু মরছে, ক্লিনিক অচল হয়েছে, ব্যাংক খাত ধুকছে, বাণিজ্য চুক্তি গলার ফাঁস হয়েছে। ক্ষমতা ছেড়েও তিনি জবাবদিহির বাইরে। কিন্তু আরোপিত দেবত্বের মহিমা আর বাস্তবতার হোঁচট একসঙ্গে হাঁটে না।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

আপনার মতামত লিখুন