ঢাকার রাস্তায় রিকশা মানেই একসময় শুধু যাতায়াতের বাহন ছিল না। যানজটে ধীরগতিতে এগিয়ে চলা প্রতিটি রিকশার পেছনে যেন থাকত আলাদা একটি গল্প। কাঠের প্যানেলে আঁকা ফুল, পাখি, প্রজাপতি, নদী-নৌকা, গ্রামের দৃশ্য থেকে শুরু করে সিনেমার নায়ক-নায়িকা,সব মিলিয়ে রিকশাই হয়ে উঠত চলমান এক ক্যানভাস।
এই শিল্পের কোনো নির্দিষ্ট গ্যালারি ছিল না। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে, জ্যামে বসে কিংবা রিকশায় চড়তে চড়তেই মানুষ এসব ছবি দেখত। UNESCO-ও ঢাকার রিকশা ও রিকশাচিত্রকে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ নগর লোকশিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ২০২৩ সালে এটি মানবজাতির অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধি তালিকায় স্থান পায়।
তুলির আঁচড়ে তৈরি হতো আলাদা জগৎ
একটি রিকশার পেছনের প্যানেল তৈরি করা ছিল একাধিক ধাপের কাজ। কাঠ কেটে আকার দেওয়া, ঘষে মসৃণ করা, রং করা এবং শেষে নকশা আঁকা-প্রতিটি পর্যায়েই প্রয়োজন হতো দক্ষতার।
রিকশাচিত্রের বিষয়ও সময়ের সঙ্গে বদলেছে। ফুল, লতা-পাতা, পাখি ও পশুর পাশাপাশি গ্রামীণ জীবন, প্রাকৃতিক দৃশ্য, স্মৃতিসৌধ, চলচ্চিত্রের দৃশ্য এবং জনপ্রিয় নায়ক-নায়িকার ছবি জায়গা করে নিয়েছে এসব প্যানেলে। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবিষয়ক সরকারি তথ্যেও রিকশাচিত্রে এমন নানা মোটিফের উল্লেখ রয়েছে।
শিল্পী হয়তো নিজের নাম লিখে রাখতেন না। কিন্তু তাঁর আঁকা একটি ফুল, পাখি কিংবা গ্রামের দৃশ্য দিনের পর দিন মানুষের চোখের সামনে ঘুরে বেড়াত। কোনো শিল্পকর্মকে মানুষের এত কাছে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ হয়তো খুব কম শিল্পীরই হয়েছে।
বদলে গেছে রিকশার শরীর
ঢাকার পরিবহনব্যবস্থায় পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে গেছে রিকশার চেহারাও। কাঠের ঐতিহ্যবাহী কাঠামোর জায়গায় এখন ধাতব বডি, প্রস্তুত নকশা ও বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিকের সাজসজ্জা বেশি দেখা যায়। বিশেষ করে ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক রিকশার বিস্তারের সঙ্গে পুরোনো ধরনের রিকশার উপস্থিতি অনেক জায়গাতেই কমেছে।
নতুন বাহনের গতি ও ব্যবহারিক সুবিধা থাকলেও এর সঙ্গে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে পুরোনো রিকশা তৈরির কারিগরি দক্ষতা এবং হাতে আঁকা অলংকরণের চর্চা।
কারিগররাও বদলে যাচ্ছেন
রিকশাচিত্র কোনো যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তৈরি শিল্প ছিল না। কর্মশালায় হাতে-কলমে শেখানো হতো এই কাজ। শিল্পীরা অনেক সময় পরিবারের সদস্যদের কাছেই নিজেদের কৌশল ও অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতেন।
কিন্তু রিকশার ধরন বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই কাজের চাহিদাও কমেছে। ফলে বহু কারিগরের পরবর্তী প্রজন্ম আর এই পেশায় থাকতে চাইছে না। একদিকে জীবিকার প্রশ্ন, অন্যদিকে দ্রুত ও প্রস্তুত উপকরণের সহজলভ্যতা-দুটিই ঐতিহ্যবাহী কাজের ওপর চাপ তৈরি করছে।
শুধু যানবাহন নয়, ছিল শহরের স্মৃতি
আজকের ব্যস্ত ঢাকায় পুরোনো নকশার একটি রিকশা চোখে পড়লে অনেকেরই হয়তো শৈশবের কথা মনে পড়ে। স্কুল থেকে ফেরার পথে জ্যামে আটকে থাকা, রিকশার পেছনের ছবিতে চোখ রাখা কিংবা একই ছবির গল্প নিজের মতো করে কল্পনা করা-এসব ছিল শহুরে জীবনের ছোট ছোট অভিজ্ঞতা।
আজ বৈদ্যুতিক রিকশা শহরের নতুন বাস্তবতার অংশ। কিন্তু আধুনিকতার সঙ্গে পুরোনো শিল্পটিও যদি হারিয়ে যায়, তাহলে শুধু একটি বাহনের নকশা নয়, হারিয়ে যাবে শহরের এক টুকরো দৃশ্যমান স্মৃতি।
ঢাকার কোথাও এখনো কাঠের পেছনে উজ্জ্বল রঙের ফুল, পাখি কিংবা অচেনা কোনো গ্রামের ছবি নিয়ে পুরোনো রিকশা দেখা যায়। সংখ্যায় কমে আসা এসব রিকশা যেন ধীরে ধীরে বদলে যাওয়া একটি শহরের চলমান ছবি।

রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ঢাকার রাস্তায় রিকশা মানেই একসময় শুধু যাতায়াতের বাহন ছিল না। যানজটে ধীরগতিতে এগিয়ে চলা প্রতিটি রিকশার পেছনে যেন থাকত আলাদা একটি গল্প। কাঠের প্যানেলে আঁকা ফুল, পাখি, প্রজাপতি, নদী-নৌকা, গ্রামের দৃশ্য থেকে শুরু করে সিনেমার নায়ক-নায়িকা,সব মিলিয়ে রিকশাই হয়ে উঠত চলমান এক ক্যানভাস।
এই শিল্পের কোনো নির্দিষ্ট গ্যালারি ছিল না। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে, জ্যামে বসে কিংবা রিকশায় চড়তে চড়তেই মানুষ এসব ছবি দেখত। UNESCO-ও ঢাকার রিকশা ও রিকশাচিত্রকে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ নগর লোকশিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ২০২৩ সালে এটি মানবজাতির অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধি তালিকায় স্থান পায়।
তুলির আঁচড়ে তৈরি হতো আলাদা জগৎ
একটি রিকশার পেছনের প্যানেল তৈরি করা ছিল একাধিক ধাপের কাজ। কাঠ কেটে আকার দেওয়া, ঘষে মসৃণ করা, রং করা এবং শেষে নকশা আঁকা-প্রতিটি পর্যায়েই প্রয়োজন হতো দক্ষতার।
রিকশাচিত্রের বিষয়ও সময়ের সঙ্গে বদলেছে। ফুল, লতা-পাতা, পাখি ও পশুর পাশাপাশি গ্রামীণ জীবন, প্রাকৃতিক দৃশ্য, স্মৃতিসৌধ, চলচ্চিত্রের দৃশ্য এবং জনপ্রিয় নায়ক-নায়িকার ছবি জায়গা করে নিয়েছে এসব প্যানেলে। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবিষয়ক সরকারি তথ্যেও রিকশাচিত্রে এমন নানা মোটিফের উল্লেখ রয়েছে।
শিল্পী হয়তো নিজের নাম লিখে রাখতেন না। কিন্তু তাঁর আঁকা একটি ফুল, পাখি কিংবা গ্রামের দৃশ্য দিনের পর দিন মানুষের চোখের সামনে ঘুরে বেড়াত। কোনো শিল্পকর্মকে মানুষের এত কাছে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ হয়তো খুব কম শিল্পীরই হয়েছে।
বদলে গেছে রিকশার শরীর
ঢাকার পরিবহনব্যবস্থায় পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে গেছে রিকশার চেহারাও। কাঠের ঐতিহ্যবাহী কাঠামোর জায়গায় এখন ধাতব বডি, প্রস্তুত নকশা ও বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিকের সাজসজ্জা বেশি দেখা যায়। বিশেষ করে ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক রিকশার বিস্তারের সঙ্গে পুরোনো ধরনের রিকশার উপস্থিতি অনেক জায়গাতেই কমেছে।
নতুন বাহনের গতি ও ব্যবহারিক সুবিধা থাকলেও এর সঙ্গে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে পুরোনো রিকশা তৈরির কারিগরি দক্ষতা এবং হাতে আঁকা অলংকরণের চর্চা।
কারিগররাও বদলে যাচ্ছেন
রিকশাচিত্র কোনো যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তৈরি শিল্প ছিল না। কর্মশালায় হাতে-কলমে শেখানো হতো এই কাজ। শিল্পীরা অনেক সময় পরিবারের সদস্যদের কাছেই নিজেদের কৌশল ও অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতেন।
কিন্তু রিকশার ধরন বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই কাজের চাহিদাও কমেছে। ফলে বহু কারিগরের পরবর্তী প্রজন্ম আর এই পেশায় থাকতে চাইছে না। একদিকে জীবিকার প্রশ্ন, অন্যদিকে দ্রুত ও প্রস্তুত উপকরণের সহজলভ্যতা-দুটিই ঐতিহ্যবাহী কাজের ওপর চাপ তৈরি করছে।
শুধু যানবাহন নয়, ছিল শহরের স্মৃতি
আজকের ব্যস্ত ঢাকায় পুরোনো নকশার একটি রিকশা চোখে পড়লে অনেকেরই হয়তো শৈশবের কথা মনে পড়ে। স্কুল থেকে ফেরার পথে জ্যামে আটকে থাকা, রিকশার পেছনের ছবিতে চোখ রাখা কিংবা একই ছবির গল্প নিজের মতো করে কল্পনা করা-এসব ছিল শহুরে জীবনের ছোট ছোট অভিজ্ঞতা।
আজ বৈদ্যুতিক রিকশা শহরের নতুন বাস্তবতার অংশ। কিন্তু আধুনিকতার সঙ্গে পুরোনো শিল্পটিও যদি হারিয়ে যায়, তাহলে শুধু একটি বাহনের নকশা নয়, হারিয়ে যাবে শহরের এক টুকরো দৃশ্যমান স্মৃতি।
ঢাকার কোথাও এখনো কাঠের পেছনে উজ্জ্বল রঙের ফুল, পাখি কিংবা অচেনা কোনো গ্রামের ছবি নিয়ে পুরোনো রিকশা দেখা যায়। সংখ্যায় কমে আসা এসব রিকশা যেন ধীরে ধীরে বদলে যাওয়া একটি শহরের চলমান ছবি।

আপনার মতামত লিখুন