বর্তমান সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তথ্য কমিশনের মতো স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে যে সকল নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে, তার কোনটিতেই দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দৃষ্টান্ত দেখা যায়নি বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, তথ্য কমিশনে তো ট্র্যাক রেকর্ড আছে, এটি মূলত দলীয় ক্যাডার দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে এবং আমাদের মতো সাধারণ কিংবা স্বাধীন পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর জন্য সেখানে প্রবেশের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে অবস্থিত ডেইলি স্টার সেন্টারে মিডিয়া ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই) আয়োজিত 'আন্তর্জাতিক তথ্য জানার অধিকার দিবস' উপলক্ষে অনুষ্ঠিত তথ্য অধিকার সম্মেলনে প্রধান আলোচকের বক্তব্যে তিনি এসব কথা তুলে ধরেন।
সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক দেশের প্রশাসনিক ইতিহাসের এক দীর্ঘ শূন্যতার চিত্র উল্লেখ করে বলেন, আমরা বাংলাদেশে একটা বিশ্বরেকর্ড করেছি। পৃথিবীতে আর এমন কোনো দেশ নেই যেখানে আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও তথ্য কমিশন ২ বছর ২ মাস ধরে অনুপস্থিত থাকে বা গঠন করা হয় না।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকার দীর্ঘ দেড় বছরে তাদের এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। তখন সরকারে যারা দায়িত্বে ছিলেন, তাদের অনেকেই আমাদের সুপরিচিত বা বন্ধুস্থানীয় ছিলেন। তাদের কাছে বারবার অনুনয়-বিনয় করে কমিশন গঠন করার জন্য আকুল আবেদন জানানো হয়েছিল, সব ধরনের কারিগরি সহায়তাও দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছেন।
বর্তমান সরকারের প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও জানান, বর্তমান সরকারের প্রায় ৭ মাস অতিক্রান্ত হয়ে গেছে এবং একই ধারায় অত্যন্ত সচেষ্ট হয়ে দেশ সেই নেতিবাচক বিশ্বরেকর্ড ধরে রাখার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এটি অত্যন্ত বিব্রতকর একটি রেকর্ড, যা পর পর দুটি সরকার জেনেশুনেই কায়েম করেছে। এটি সরাসরি বিদ্যমান আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, কারণ আইনগতভাবে তথ্য কমিশন বহাল রাখা সরকারের জন্য বাধ্যতামূলক। সাধারণ নাগরিকরা যখন আইন ভঙ্গ করে তখন তাদের আদালতের বিচারে শাস্তি পেতে হয়, কিন্তু সরকার যখন সরাসরি আইন লঙ্ঘন করে তখন তার বিচার নির্ধারিত হয় জনগণের আস্থার পাল্লায়। সেই আস্থা যখন সরকার হারিয়ে ফেলে, তার প্রতিফলন সমাজে বিভিন্নভাবে ঘটে থাকে।
পরবর্তী তথ্য কমিশন পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে আশঙ্কার কথা জানিয়ে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এবার যে নতুন কমিশন গঠিত হতে যাচ্ছে, তা নিয়ে দেশের মানুষ আশাবাদী হতে চায় যেন এটি সত্যিকার অর্থে স্বাধীনভাবে কাজ করার সক্ষমতা রাখে। তবে অতীত ও সাম্প্রতিক নিয়োগের ট্র্যাক রেকর্ড তেমন আশাবাদী হওয়ার সুযোগ দেয় না। সাম্প্রতিক সময়ে যে ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে, তার একটিতেও রাজনৈতিক দলীয় বিবেচনার বাইরে কাউকে নিয়োগের নজির তৈরি হয়নি।
অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দিয়ে কমিশন গঠনের প্রবণতার সমালোচনা করে টিআইবি প্রধান বলেন, তথ্য কমিশন যদি ভবিষ্যতে আবার অবসরপ্রাপ্ত আমলা ও সরকারি কর্মকর্তাদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে পরিণত করা হয়, তবে সাধারণ মানুষের হতাশা বহু গুণ বেড়ে যাবে। কারণ সরকারি কর্মজীবনে তথ্য চেপে রাখা বা তথ্য প্রকাশের বিরোধিতা করাই ছিল যাদের মূল পেশাগত অভ্যাস, তারা কমিশনে বসে স্বাধীন তথ্য প্রবাহ নিশ্চিত করতে পারবেন না। তাই একটি স্বাধীন ও গ্রহণযোগ্য তথ্য কমিশন উপহার দেওয়া বর্তমান সরকারের জন্য একটি বিশাল বড় চ্যালেঞ্জ। মানুষের বিশ্বাস অর্জনে সরকারকে এমন একটি কমিশন গঠন করতে হবে যা সর্বসাধারণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করবে।
তথ্য অধিকার আইন সংস্কারের উদ্যোগ প্রসঙ্গে ড. ইফতেখারুজ্জামান স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, ভুয়া তথ্য ও অপতথ্য প্রতিরোধ করা নিঃসন্দেহে জরুরি বিষয়। তবে বিশ্বের কোনো আন্তর্জাতিক চর্চাতেই তথ্য অধিকার আইনের সঙ্গে অপতথ্য, ভুয়া তথ্য কিংবা মিথ্যা তথ্যের বিষয়গুলোকে গুলিয়ে ফেলা হয় না। অপতথ্য ও মিথ্যা প্রচার নিয়ন্ত্রণের জন্য পৃথক আইন ও ব্যবস্থা থাকা উচিত, কারণ মানুষের তথ্য জানার অধিকার এবং অপতথ্য প্রতিরোধ দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপট। এখন যদি ভুল তথ্য ঠেকানোর দোহাই দিয়ে তথ্য অধিকার আইনকে সংকুচিত করা হয়, তবে তা এই আইনের মূল চেতনার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি ডেকে আনবে এবং পুরো আইনের মহৎ উদ্দেশ্যকেই পুরোপুরি ধূলিসাৎ করে দেবে।

মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বর্তমান সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তথ্য কমিশনের মতো স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে যে সকল নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে, তার কোনটিতেই দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দৃষ্টান্ত দেখা যায়নি বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, তথ্য কমিশনে তো ট্র্যাক রেকর্ড আছে, এটি মূলত দলীয় ক্যাডার দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে এবং আমাদের মতো সাধারণ কিংবা স্বাধীন পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর জন্য সেখানে প্রবেশের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে অবস্থিত ডেইলি স্টার সেন্টারে মিডিয়া ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই) আয়োজিত 'আন্তর্জাতিক তথ্য জানার অধিকার দিবস' উপলক্ষে অনুষ্ঠিত তথ্য অধিকার সম্মেলনে প্রধান আলোচকের বক্তব্যে তিনি এসব কথা তুলে ধরেন।
সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক দেশের প্রশাসনিক ইতিহাসের এক দীর্ঘ শূন্যতার চিত্র উল্লেখ করে বলেন, আমরা বাংলাদেশে একটা বিশ্বরেকর্ড করেছি। পৃথিবীতে আর এমন কোনো দেশ নেই যেখানে আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও তথ্য কমিশন ২ বছর ২ মাস ধরে অনুপস্থিত থাকে বা গঠন করা হয় না।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকার দীর্ঘ দেড় বছরে তাদের এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। তখন সরকারে যারা দায়িত্বে ছিলেন, তাদের অনেকেই আমাদের সুপরিচিত বা বন্ধুস্থানীয় ছিলেন। তাদের কাছে বারবার অনুনয়-বিনয় করে কমিশন গঠন করার জন্য আকুল আবেদন জানানো হয়েছিল, সব ধরনের কারিগরি সহায়তাও দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছেন।
বর্তমান সরকারের প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও জানান, বর্তমান সরকারের প্রায় ৭ মাস অতিক্রান্ত হয়ে গেছে এবং একই ধারায় অত্যন্ত সচেষ্ট হয়ে দেশ সেই নেতিবাচক বিশ্বরেকর্ড ধরে রাখার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এটি অত্যন্ত বিব্রতকর একটি রেকর্ড, যা পর পর দুটি সরকার জেনেশুনেই কায়েম করেছে। এটি সরাসরি বিদ্যমান আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, কারণ আইনগতভাবে তথ্য কমিশন বহাল রাখা সরকারের জন্য বাধ্যতামূলক। সাধারণ নাগরিকরা যখন আইন ভঙ্গ করে তখন তাদের আদালতের বিচারে শাস্তি পেতে হয়, কিন্তু সরকার যখন সরাসরি আইন লঙ্ঘন করে তখন তার বিচার নির্ধারিত হয় জনগণের আস্থার পাল্লায়। সেই আস্থা যখন সরকার হারিয়ে ফেলে, তার প্রতিফলন সমাজে বিভিন্নভাবে ঘটে থাকে।
পরবর্তী তথ্য কমিশন পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে আশঙ্কার কথা জানিয়ে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এবার যে নতুন কমিশন গঠিত হতে যাচ্ছে, তা নিয়ে দেশের মানুষ আশাবাদী হতে চায় যেন এটি সত্যিকার অর্থে স্বাধীনভাবে কাজ করার সক্ষমতা রাখে। তবে অতীত ও সাম্প্রতিক নিয়োগের ট্র্যাক রেকর্ড তেমন আশাবাদী হওয়ার সুযোগ দেয় না। সাম্প্রতিক সময়ে যে ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে, তার একটিতেও রাজনৈতিক দলীয় বিবেচনার বাইরে কাউকে নিয়োগের নজির তৈরি হয়নি।
অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দিয়ে কমিশন গঠনের প্রবণতার সমালোচনা করে টিআইবি প্রধান বলেন, তথ্য কমিশন যদি ভবিষ্যতে আবার অবসরপ্রাপ্ত আমলা ও সরকারি কর্মকর্তাদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে পরিণত করা হয়, তবে সাধারণ মানুষের হতাশা বহু গুণ বেড়ে যাবে। কারণ সরকারি কর্মজীবনে তথ্য চেপে রাখা বা তথ্য প্রকাশের বিরোধিতা করাই ছিল যাদের মূল পেশাগত অভ্যাস, তারা কমিশনে বসে স্বাধীন তথ্য প্রবাহ নিশ্চিত করতে পারবেন না। তাই একটি স্বাধীন ও গ্রহণযোগ্য তথ্য কমিশন উপহার দেওয়া বর্তমান সরকারের জন্য একটি বিশাল বড় চ্যালেঞ্জ। মানুষের বিশ্বাস অর্জনে সরকারকে এমন একটি কমিশন গঠন করতে হবে যা সর্বসাধারণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করবে।
তথ্য অধিকার আইন সংস্কারের উদ্যোগ প্রসঙ্গে ড. ইফতেখারুজ্জামান স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, ভুয়া তথ্য ও অপতথ্য প্রতিরোধ করা নিঃসন্দেহে জরুরি বিষয়। তবে বিশ্বের কোনো আন্তর্জাতিক চর্চাতেই তথ্য অধিকার আইনের সঙ্গে অপতথ্য, ভুয়া তথ্য কিংবা মিথ্যা তথ্যের বিষয়গুলোকে গুলিয়ে ফেলা হয় না। অপতথ্য ও মিথ্যা প্রচার নিয়ন্ত্রণের জন্য পৃথক আইন ও ব্যবস্থা থাকা উচিত, কারণ মানুষের তথ্য জানার অধিকার এবং অপতথ্য প্রতিরোধ দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপট। এখন যদি ভুল তথ্য ঠেকানোর দোহাই দিয়ে তথ্য অধিকার আইনকে সংকুচিত করা হয়, তবে তা এই আইনের মূল চেতনার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি ডেকে আনবে এবং পুরো আইনের মহৎ উদ্দেশ্যকেই পুরোপুরি ধূলিসাৎ করে দেবে।

আপনার মতামত লিখুন