জাতিসংঘের মঞ্চে আমেরিকার পররাস্ট্রনীতির তীব্র সমালোচনা করে ইতিহাসের দীর্ঘতম ভাষণ দিয়েছেন কিউবার বিপ্লবী নেতা ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ফিদেল কাস্ত্রো।
১৯৬০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সামরিক পোশাক পরিহিত কাস্ত্রো নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে টানা ৪ ঘণ্টা ২৯ মিনিট (২৬৯ মিনিট) বক্তব্য প্রদান করেন, যা জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে দেওয়া দীর্ঘতম ভাষণের রেকর্ড তৈরি করেছে।
নিজের দীর্ঘ বক্তব্যে কাস্ত্রো যুক্তরাষ্ট্রের "পাকা ফল তত্ত্ব" বা "পাকা আপেল নীতির" কঠোর সমালোচনা করেন। ১৮২৩ সালে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কুইন্সি অ্যাডামসের উত্থাপিত এই তত্ত্বের কথা উল্লেখ করে কাস্ত্রো বিশ্বনেতাদের সামনে বলেন, "স্প্যানিশ সাম্রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কিউবা মহাকর্ষের নিয়মে আপনা-আপনি একদিন যুক্তরাষ্ট্রের কোলে খসে পড়বে—এমন ধারণা ভুল। কিউবা কোনো খসে পড়া ফল নয়, বরং এটি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ, যা কারো শোষণের শিকার হবে না।"
তিনি আরও অভিযোগ করেন, স্পেনের শাসন থেকে মুক্ত করার নামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিউবার সম্পদ শোষণ করেছে এবং ফুলগেনসিও বাতিস্তার মতো স্বৈরাচারী শাসক বসিয়ে দেশটিকে নিজেদের কলোনিতে পরিণত করতে চেয়েছিল।
পরবর্তীতে কিউবার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ওপর এই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে কাস্ত্রো উল্লেখ করেছিলেন, "আমেরিকা এখনো সেই পাকা আপেলটার আশায় বসে আছে, কিন্তু এই ফল আর কোনোদিন তাদের কোলে পড়বে না।"
সাধারণ পরিষদে কাস্ত্রোর এই ভাষণের আগে নিউ ইয়র্কে অবস্থানকালীন বেশ কিছু কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়। ১৯৫৯ সালে বাতিস্তাকে উৎখাত করে কিউবায় বিপ্লব সফল করার পর থেকেই ওয়াশিংটনের সঙ্গে হাভানার উত্তপ্ত সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। জাতিসংঘের সম্মেলনে যোগ দিতে নিউ ইয়র্কে গিয়ে ম্যানহাটনের 'হোটেল শেলবোর্ন'-এ ওঠেন কাস্ত্রো ও তাঁর প্রতিনিধি দল।
সেখানে কঠোর বিধিনিষেধ এবং নিরাপত্তার অজুহাতে ১০ হাজার ডলার অগ্রিম জমা চাওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় গণমাধ্যমে কিউবান প্রতিনিধি দলের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হলে কাস্ত্রো হোটেল ত্যাগ করেন।
এই পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব দাগ হামারশোল্ডের সঙ্গে দেখা করে কাস্ত্রো স্পষ্ট জানিয়ে দেন, "যুক্তরাষ্ট্র সরকার যদি আমাদের উপযুক্ত থাকার জায়গা না দেয়, তবে আমরা জাতিসংঘের সামনের 'রোজ গার্ডেন' অথবা সেন্ট্রাল পার্কে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান করব।"
পরবর্তীতে কাস্ত্রো ম্যানহাটনের কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিত সামাজিক বৈষম্যের শিকার এলাকা হার্লেমের সাধারণ 'হোটেল থেরেসা'-তে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। এই পদক্ষেপের পর সেখানে হাজার হাজার স্থানীয় বাসিন্দা তাকে দেখতে ভিড় জমান।
এই হোটেলেই তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যান সোভিয়েত ইউনিয়নের শীর্ষ নেতা নিকিতা ক্রুশচেভ, ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু, মিসরের প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের এবং মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ অধিকার আন্দোলনের নেতা ম্যালকম এক্স। ম্যালকম এক্সের সঙ্গে কাস্ত্রো তাঁর কক্ষে প্রায় দুই ঘণ্টা দীর্ঘ আলোচনা করেন।
সম্মেলন চলাকালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ার লাতিন আমেরিকার রাষ্ট্রপ্রধানদের জন্য এক নৈশভোজের আয়োজন করলেও সেখান থেকে কাস্ত্রোকে বাদ দেওয়া হয়। এর জবাবে কাস্ত্রো হোটেল থেরেসার বলরুমে এক ব্যতিক্রমী মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করেন, যেখানে কোনো ভিআইপি প্রতিনিধিকে দাওয়াত না দিয়ে স্থানীয় হোটেলকর্মী, বাবুর্চি, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও দিনমজুরদের আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং কাস্ত্রো তাঁদের সঙ্গে একই টেবিলে বসে খাবার গ্রহণ করেন।
জাতিসংঘে দেওয়া নিজের ভাষণের শেষ অংশে কাস্ত্রো বিশ্ব শান্তির আহ্বান জানান এবং কীভাবে বিশ্বজুড়ে পরাশক্তিগুলোর সাম্রাজ্যবাদী নীতির কারণে বিশ্বযুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে তা তুলে ধরেন।

রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জাতিসংঘের মঞ্চে আমেরিকার পররাস্ট্রনীতির তীব্র সমালোচনা করে ইতিহাসের দীর্ঘতম ভাষণ দিয়েছেন কিউবার বিপ্লবী নেতা ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ফিদেল কাস্ত্রো।
১৯৬০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সামরিক পোশাক পরিহিত কাস্ত্রো নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে টানা ৪ ঘণ্টা ২৯ মিনিট (২৬৯ মিনিট) বক্তব্য প্রদান করেন, যা জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে দেওয়া দীর্ঘতম ভাষণের রেকর্ড তৈরি করেছে।
নিজের দীর্ঘ বক্তব্যে কাস্ত্রো যুক্তরাষ্ট্রের "পাকা ফল তত্ত্ব" বা "পাকা আপেল নীতির" কঠোর সমালোচনা করেন। ১৮২৩ সালে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কুইন্সি অ্যাডামসের উত্থাপিত এই তত্ত্বের কথা উল্লেখ করে কাস্ত্রো বিশ্বনেতাদের সামনে বলেন, "স্প্যানিশ সাম্রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কিউবা মহাকর্ষের নিয়মে আপনা-আপনি একদিন যুক্তরাষ্ট্রের কোলে খসে পড়বে—এমন ধারণা ভুল। কিউবা কোনো খসে পড়া ফল নয়, বরং এটি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ, যা কারো শোষণের শিকার হবে না।"
তিনি আরও অভিযোগ করেন, স্পেনের শাসন থেকে মুক্ত করার নামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিউবার সম্পদ শোষণ করেছে এবং ফুলগেনসিও বাতিস্তার মতো স্বৈরাচারী শাসক বসিয়ে দেশটিকে নিজেদের কলোনিতে পরিণত করতে চেয়েছিল।
পরবর্তীতে কিউবার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ওপর এই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে কাস্ত্রো উল্লেখ করেছিলেন, "আমেরিকা এখনো সেই পাকা আপেলটার আশায় বসে আছে, কিন্তু এই ফল আর কোনোদিন তাদের কোলে পড়বে না।"
সাধারণ পরিষদে কাস্ত্রোর এই ভাষণের আগে নিউ ইয়র্কে অবস্থানকালীন বেশ কিছু কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়। ১৯৫৯ সালে বাতিস্তাকে উৎখাত করে কিউবায় বিপ্লব সফল করার পর থেকেই ওয়াশিংটনের সঙ্গে হাভানার উত্তপ্ত সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। জাতিসংঘের সম্মেলনে যোগ দিতে নিউ ইয়র্কে গিয়ে ম্যানহাটনের 'হোটেল শেলবোর্ন'-এ ওঠেন কাস্ত্রো ও তাঁর প্রতিনিধি দল।
সেখানে কঠোর বিধিনিষেধ এবং নিরাপত্তার অজুহাতে ১০ হাজার ডলার অগ্রিম জমা চাওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় গণমাধ্যমে কিউবান প্রতিনিধি দলের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হলে কাস্ত্রো হোটেল ত্যাগ করেন।
এই পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব দাগ হামারশোল্ডের সঙ্গে দেখা করে কাস্ত্রো স্পষ্ট জানিয়ে দেন, "যুক্তরাষ্ট্র সরকার যদি আমাদের উপযুক্ত থাকার জায়গা না দেয়, তবে আমরা জাতিসংঘের সামনের 'রোজ গার্ডেন' অথবা সেন্ট্রাল পার্কে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান করব।"
পরবর্তীতে কাস্ত্রো ম্যানহাটনের কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিত সামাজিক বৈষম্যের শিকার এলাকা হার্লেমের সাধারণ 'হোটেল থেরেসা'-তে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। এই পদক্ষেপের পর সেখানে হাজার হাজার স্থানীয় বাসিন্দা তাকে দেখতে ভিড় জমান।
এই হোটেলেই তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যান সোভিয়েত ইউনিয়নের শীর্ষ নেতা নিকিতা ক্রুশচেভ, ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু, মিসরের প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের এবং মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ অধিকার আন্দোলনের নেতা ম্যালকম এক্স। ম্যালকম এক্সের সঙ্গে কাস্ত্রো তাঁর কক্ষে প্রায় দুই ঘণ্টা দীর্ঘ আলোচনা করেন।
সম্মেলন চলাকালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ার লাতিন আমেরিকার রাষ্ট্রপ্রধানদের জন্য এক নৈশভোজের আয়োজন করলেও সেখান থেকে কাস্ত্রোকে বাদ দেওয়া হয়। এর জবাবে কাস্ত্রো হোটেল থেরেসার বলরুমে এক ব্যতিক্রমী মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করেন, যেখানে কোনো ভিআইপি প্রতিনিধিকে দাওয়াত না দিয়ে স্থানীয় হোটেলকর্মী, বাবুর্চি, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও দিনমজুরদের আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং কাস্ত্রো তাঁদের সঙ্গে একই টেবিলে বসে খাবার গ্রহণ করেন।
জাতিসংঘে দেওয়া নিজের ভাষণের শেষ অংশে কাস্ত্রো বিশ্ব শান্তির আহ্বান জানান এবং কীভাবে বিশ্বজুড়ে পরাশক্তিগুলোর সাম্রাজ্যবাদী নীতির কারণে বিশ্বযুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে তা তুলে ধরেন।

আপনার মতামত লিখুন