সংবাদ

নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন, জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে সুপ্রিম কোর্টে শুনানি


দীপক মুখার্জী
দীপক মুখার্জী প্রতিনিধি, কলকাতা
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:২২ পিএম

নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন, জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে সুপ্রিম কোর্টে শুনানি
ছবি : সংগৃহীত

নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক এবার পৌঁছে গেল সুপ্রিম কোর্টে। গত কয়েক দিনে কমিশনের তিন সদস্যের মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মতপার্থক্য এবং একাধিক বিষয়ে দুই নির্বাচন কমিশনারের লিখিত আপত্তির খবর সামনে আসার পরই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে - নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে সিদ্ধান্ত ঠিক কীভাবে এবং কার সম্মতিতে নেওয়া হচ্ছে? সেই বিতর্কের মধ্যেই জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বাধীন কমিশনের কার্যপদ্ধতি নিয়ে দায়ের হওয়া একটি মামলার দ্রুত শুনানিতে সম্মতি দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। আগামী সপ্তাহে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চে মামলাটির শুনানি হওয়ার কথা।

প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চে বিষয়টি তোলেন প্রবীণ আইনজীবী বিকাশ সিং। মামলায় মূলত প্রশ্ন তোলা হয়েছে, তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশনে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এককভাবে নিতে পারেন, নাকি কমিশনের তিন সদস্যের সম্মতি অথবা আইন অনুযায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া বাধ্যতামূলক। মামলাকারীর বক্তব্য, নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা একটি সমষ্টিগত সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে প্রয়োগ করার কথা।

এই বিতর্কের সূত্রপাত হয় কমিশনের অভ্যন্তরীণ কিছু নথি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের পর। সেখানে দাবি করা হয়, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশী গত প্রায় ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও প্রক্রিয়া নিয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাদের আপত্তির মধ্যে ছিল নতুন ভোটারদের নিবন্ধনের জন্য ফর্ম ৬-এর পরিবর্তন, ভোটার তালিকায় নাম যোগ ও বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া, ভোটার ডেটাবেসে প্রবেশাধিকার এবং বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR-এর সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন বিষয়।

তবে এখানেই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি দিক। নির্বাচন কমিশনের তরফে স্পষ্ট করা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ আলোচনায় মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগুলি তিন নির্বাচন কমিশনারের অনুমোদনেই নেওয়া হয়েছে। কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, SIR-সহ কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলি সর্বসম্মতভাবেই গৃহীত হয়েছে। ফলে একদিকে দুই কমিশনারের লিখিত আপত্তির বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, অন্যদিকে কমিশন বলছে, আপত্তি বা মতপার্থক্যকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক নয়।

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ২০২৩ সালের ‘Chief Election Commissioner and Other Election Commissioners Act’-এর ১৮ নম্বর ধারা। ওই ধারায় বলা হয়েছে, কমিশনের কাজকর্ম যতটা সম্ভব সর্বসম্মতির ভিত্তিতে পরিচালিত হবে। আর কোনও বিষয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও অন্য নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যে মতপার্থক্য হলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মত অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, তিন সদস্যের কমিশনে কোনও সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে মতবিরোধ তৈরি হলে আইন অনুযায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ মতই কার্যকর হওয়ার কথা।

বর্তমান বিতর্কের মূল প্রশ্ন তাই শুধু জ্ঞানেশ কুমারের কোনও নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তকে ঘিরে নয়। বরং প্রশ্নটি আরও বিস্তৃত - তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক ক্ষমতা কীভাবে প্রয়োগ হবে, মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের ভূমিকার সীমা কোথায় এবং অন্য দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তি থাকলে সেই আপত্তি কীভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় প্রতিফলিত হবে।

সুপ্রিম কোর্টে দায়ের হওয়া আবেদনে এই বিষয়গুলিই বিচারিকভাবে খতিয়ে দেখার আবেদন জানানো হয়েছে। মামলাটি শুনানির জন্য গ্রহণ করা মানেই অভিযোগগুলি আদালতের কাছে প্রমাণিত হয়েছে - এমন নয়। আগামী সপ্তাহের শুনানিতে আদালত মূলত এই অভিযোগগুলির আইনি ভিত্তি এবং নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো নিয়ে কী প্রশ্ন উঠছে, তা পর্যালোচনা করবে। ফলে এই শুনানির দিকে এখন নজর রয়েছে রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে নির্বাচন ও সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞদেরও।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬


নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন, জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে সুপ্রিম কোর্টে শুনানি

প্রকাশের তারিখ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক এবার পৌঁছে গেল সুপ্রিম কোর্টে। গত কয়েক দিনে কমিশনের তিন সদস্যের মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মতপার্থক্য এবং একাধিক বিষয়ে দুই নির্বাচন কমিশনারের লিখিত আপত্তির খবর সামনে আসার পরই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে - নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে সিদ্ধান্ত ঠিক কীভাবে এবং কার সম্মতিতে নেওয়া হচ্ছে? সেই বিতর্কের মধ্যেই জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বাধীন কমিশনের কার্যপদ্ধতি নিয়ে দায়ের হওয়া একটি মামলার দ্রুত শুনানিতে সম্মতি দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। আগামী সপ্তাহে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চে মামলাটির শুনানি হওয়ার কথা।

প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চে বিষয়টি তোলেন প্রবীণ আইনজীবী বিকাশ সিং। মামলায় মূলত প্রশ্ন তোলা হয়েছে, তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশনে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এককভাবে নিতে পারেন, নাকি কমিশনের তিন সদস্যের সম্মতি অথবা আইন অনুযায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া বাধ্যতামূলক। মামলাকারীর বক্তব্য, নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা একটি সমষ্টিগত সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে প্রয়োগ করার কথা।

এই বিতর্কের সূত্রপাত হয় কমিশনের অভ্যন্তরীণ কিছু নথি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের পর। সেখানে দাবি করা হয়, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশী গত প্রায় ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও প্রক্রিয়া নিয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাদের আপত্তির মধ্যে ছিল নতুন ভোটারদের নিবন্ধনের জন্য ফর্ম ৬-এর পরিবর্তন, ভোটার তালিকায় নাম যোগ ও বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া, ভোটার ডেটাবেসে প্রবেশাধিকার এবং বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR-এর সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন বিষয়।

তবে এখানেই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি দিক। নির্বাচন কমিশনের তরফে স্পষ্ট করা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ আলোচনায় মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগুলি তিন নির্বাচন কমিশনারের অনুমোদনেই নেওয়া হয়েছে। কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, SIR-সহ কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলি সর্বসম্মতভাবেই গৃহীত হয়েছে। ফলে একদিকে দুই কমিশনারের লিখিত আপত্তির বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, অন্যদিকে কমিশন বলছে, আপত্তি বা মতপার্থক্যকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক নয়।

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ২০২৩ সালের ‘Chief Election Commissioner and Other Election Commissioners Act’-এর ১৮ নম্বর ধারা। ওই ধারায় বলা হয়েছে, কমিশনের কাজকর্ম যতটা সম্ভব সর্বসম্মতির ভিত্তিতে পরিচালিত হবে। আর কোনও বিষয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও অন্য নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যে মতপার্থক্য হলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মত অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, তিন সদস্যের কমিশনে কোনও সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে মতবিরোধ তৈরি হলে আইন অনুযায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ মতই কার্যকর হওয়ার কথা।

বর্তমান বিতর্কের মূল প্রশ্ন তাই শুধু জ্ঞানেশ কুমারের কোনও নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তকে ঘিরে নয়। বরং প্রশ্নটি আরও বিস্তৃত - তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক ক্ষমতা কীভাবে প্রয়োগ হবে, মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের ভূমিকার সীমা কোথায় এবং অন্য দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তি থাকলে সেই আপত্তি কীভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় প্রতিফলিত হবে।

সুপ্রিম কোর্টে দায়ের হওয়া আবেদনে এই বিষয়গুলিই বিচারিকভাবে খতিয়ে দেখার আবেদন জানানো হয়েছে। মামলাটি শুনানির জন্য গ্রহণ করা মানেই অভিযোগগুলি আদালতের কাছে প্রমাণিত হয়েছে - এমন নয়। আগামী সপ্তাহের শুনানিতে আদালত মূলত এই অভিযোগগুলির আইনি ভিত্তি এবং নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো নিয়ে কী প্রশ্ন উঠছে, তা পর্যালোচনা করবে। ফলে এই শুনানির দিকে এখন নজর রয়েছে রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে নির্বাচন ও সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞদেরও।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত