সংবাদ

ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে আছে কি আপনার ভবন, বুঝবেন যেভাবে


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:২৮ পিএম

ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে আছে কি আপনার ভবন, বুঝবেন যেভাবে

ভূমিকম্পের সময় নিজের বাসাকেই সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় মনে করা হয়। কিন্তু ভবনটির কাঠামোগত নিরাপত্তা যথাযথ না হলে সেই আশ্রয়ই বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে অপরিকল্পিত নির্মাণ, নির্মাণবিধি না মানা এবং কাঠামোগত ত্রুটি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

বাসা ভূমিকম্প সহনশীল কি না, তা কিছু দৃশ্যমান লক্ষণ থেকে ঝুঁকির প্রাথমিক ধারণা পাওয়া গেলেও শুধু চোখে দেখে নিশ্চিত হওয়া যায় না। ভবনের প্রকৃত নিরাপত্তা জানতে যোগ্য কাঠামো প্রকৌশলীর মূল্যায়ন প্রয়োজন।

যে লক্ষণগুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখবেন :

দেয়ালে বড় বা তির্যক ফাটল

দরজা-জানালার কোণে তির্যক ফাটল দেখা দেওয়া কিংবা পুরোনো ফাটল ক্রমেই বড় হওয়া উদ্বেগের কারণ হতে পারে। তবে দেয়ালের প্লাস্টারে তৈরি ফাটল এবং কাঠামোগত ফাটল এক বিষয় নয়। তাই ফাটলের ধরন নিশ্চিত করতে বিশেষজ্ঞের পরীক্ষা প্রয়োজন।

পিলার-বিমে ক্ষতির চিহ্ন

পিলারে গভীর ফাটল, কংক্রিট খসে রড বের হয়ে যাওয়া, রডে মরিচা ধরা কিংবা বিমের সংযোগস্থলে ক্ষতি দেখা গেলে তা কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত হতে পারে। এ ধরনের লক্ষণ অবহেলা না করাই জরুরি।

নিচতলা বেশি খোলা থাকা

ভবনের নিচতলার বড় অংশ পার্কিং বা দোকানের জন্য খোলা এবং ওপরের তলায় তুলনামূলক বেশি দেয়াল থাকলে সফট স্টোরি বা দুর্বল তলার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে প্রকৌশলগত নকশা অনুযায়ী নির্মিত হলে এ ধরনের ভবনও নিরাপদ হতে পারে।

ভবন হেলে পড়া বা কাঠামোয় বিকৃতি

ভবন দৃশ্যত একদিকে হেলে যাওয়া, মেঝে অস্বাভাবিকভাবে বসে যাওয়া কিংবা কাঠামোর অন্য কোনো দৃশ্যমান বিকৃতি গুরুতর সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

নকশার বাইরে পরিবর্তন

অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী নির্মিত ভবনে পরবর্তী সময়ে পিলার, বিম বা ভারবহনকারী দেয়ালে পরিবর্তন করা হলে কাঠামোগত নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একইভাবে প্রকৌশলগত যাচাই ছাড়া ভবনে অতিরিক্ত তলা নির্মাণও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

শুধু ফাটল দেখেই সিদ্ধান্ত নয়

দেয়ালে ফাটল থাকলেই ভবন ভূমিকম্পে ধসে পড়বে - এমনটা বলা যায় না। আবার ভবনের বাইরে কোনো ফাটল না থাকলেও ভেতরের কাঠামো বা ভিত্তিতে দুর্বলতা থাকতে পারে।

একটি ভবনের ভূমিকম্প সহনশীলতা নির্ধারণে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে রয়েছে:

ভবনের নকশা: প্রযোজ্য বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (BNBC) অনুসরণ করা হয়েছে কি না

নির্মাণের মান: কংক্রিট, রড ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রীর গুণগত মান এবং নির্মাণকাজের তদারকি

মাটির বৈশিষ্ট্য: ভবনের নিচের মাটির ধরন, ধারণক্ষমতা এবং ভূমিকম্পের সময় সম্ভাব্য আচরণ

কাঠামোগত ব্যবস্থা: পিলার, বিম, শিয়ার ওয়াল, সংযোগস্থল ও ভিত্তির নকশা

পরবর্তী পরিবর্তন: নির্মাণের পর ভবনের কাঠামোয় অননুমোদিত কোনো পরিবর্তন আনা হয়েছে কি না

বাসার নিরাপত্তা যাচাইয়ের উপায়

ভবনের নিরাপত্তা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে:

১. ভবনের অনুমোদিত নকশা ও নির্মাণসংক্রান্ত নথি সংগ্রহ করুন।

২. ভবন নির্মাণের সময় প্রযোজ্য বিল্ডিং কোড অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা যাচাই করুন।

৩. অভিজ্ঞ ও যোগ্য কাঠামো প্রকৌশলীর মাধ্যমে ভবনের কাঠামোগত মূল্যায়ন করান। প্রয়োজন হলে কংক্রিট পরীক্ষা, রড শনাক্তকরণ, মাটির পরীক্ষা এবং অন্যান্য বিশেষায়িত পরীক্ষা করা যেতে পারে।

৪. নতুন ফাটল, পিলারের ক্ষতি বা ভবনে অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

ভূমিকম্পের পর যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকবেন

ভূমিকম্পের পর ভবনে নতুন বড় ফাটল, পিলার বা বিমে ক্ষতি, কংক্রিট খসে পড়া কিংবা ভবন হেলে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে নিরাপদে বের হয়ে আসতে হবে। ভবন পরীক্ষা না করা পর্যন্ত ভেতরে প্রবেশ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

গ্যাসের গন্ধ পাওয়া গেলে আগুন বা বৈদ্যুতিক সুইচ ব্যবহার না করে সংশ্লিষ্ট জরুরি সেবায় যোগাযোগ করতে হবে।

পুরোনো হলেই অনিরাপদ, নতুন হলেই নিরাপদ নয়

ভবনের বয়স বেশি হলেই সেটি অনিরাপদ হবে বা নতুন ভবন মানেই ভূমিকম্প সহনশীল - এমন ধারণা সঠিক নয়। ভবনের নকশা, নির্মাণের মান, মাটির অবস্থা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং কাঠামোগত সক্ষমতার ওপর এর নিরাপত্তা নির্ভর করে।

তাই চোখে দেখা ফাটল বা অন্যান্য পরিবর্তনকে প্রাথমিক সতর্কসংকেত হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে ভবনটি ভূমিকম্প সহনশীল কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে যোগ্য কাঠামো প্রকৌশলীর মাধ্যমে পেশাদার মূল্যায়ন করানোই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬


ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে আছে কি আপনার ভবন, বুঝবেন যেভাবে

প্রকাশের তারিখ : ০৪ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

ভূমিকম্পের সময় নিজের বাসাকেই সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় মনে করা হয়। কিন্তু ভবনটির কাঠামোগত নিরাপত্তা যথাযথ না হলে সেই আশ্রয়ই বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে অপরিকল্পিত নির্মাণ, নির্মাণবিধি না মানা এবং কাঠামোগত ত্রুটি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

বাসা ভূমিকম্প সহনশীল কি না, তা কিছু দৃশ্যমান লক্ষণ থেকে ঝুঁকির প্রাথমিক ধারণা পাওয়া গেলেও শুধু চোখে দেখে নিশ্চিত হওয়া যায় না। ভবনের প্রকৃত নিরাপত্তা জানতে যোগ্য কাঠামো প্রকৌশলীর মূল্যায়ন প্রয়োজন।

যে লক্ষণগুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখবেন :

দেয়ালে বড় বা তির্যক ফাটল

দরজা-জানালার কোণে তির্যক ফাটল দেখা দেওয়া কিংবা পুরোনো ফাটল ক্রমেই বড় হওয়া উদ্বেগের কারণ হতে পারে। তবে দেয়ালের প্লাস্টারে তৈরি ফাটল এবং কাঠামোগত ফাটল এক বিষয় নয়। তাই ফাটলের ধরন নিশ্চিত করতে বিশেষজ্ঞের পরীক্ষা প্রয়োজন।

পিলার-বিমে ক্ষতির চিহ্ন

পিলারে গভীর ফাটল, কংক্রিট খসে রড বের হয়ে যাওয়া, রডে মরিচা ধরা কিংবা বিমের সংযোগস্থলে ক্ষতি দেখা গেলে তা কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত হতে পারে। এ ধরনের লক্ষণ অবহেলা না করাই জরুরি।

নিচতলা বেশি খোলা থাকা

ভবনের নিচতলার বড় অংশ পার্কিং বা দোকানের জন্য খোলা এবং ওপরের তলায় তুলনামূলক বেশি দেয়াল থাকলে সফট স্টোরি বা দুর্বল তলার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে প্রকৌশলগত নকশা অনুযায়ী নির্মিত হলে এ ধরনের ভবনও নিরাপদ হতে পারে।

ভবন হেলে পড়া বা কাঠামোয় বিকৃতি

ভবন দৃশ্যত একদিকে হেলে যাওয়া, মেঝে অস্বাভাবিকভাবে বসে যাওয়া কিংবা কাঠামোর অন্য কোনো দৃশ্যমান বিকৃতি গুরুতর সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

নকশার বাইরে পরিবর্তন

অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী নির্মিত ভবনে পরবর্তী সময়ে পিলার, বিম বা ভারবহনকারী দেয়ালে পরিবর্তন করা হলে কাঠামোগত নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একইভাবে প্রকৌশলগত যাচাই ছাড়া ভবনে অতিরিক্ত তলা নির্মাণও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

শুধু ফাটল দেখেই সিদ্ধান্ত নয়

দেয়ালে ফাটল থাকলেই ভবন ভূমিকম্পে ধসে পড়বে - এমনটা বলা যায় না। আবার ভবনের বাইরে কোনো ফাটল না থাকলেও ভেতরের কাঠামো বা ভিত্তিতে দুর্বলতা থাকতে পারে।

একটি ভবনের ভূমিকম্প সহনশীলতা নির্ধারণে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে রয়েছে:

ভবনের নকশা: প্রযোজ্য বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (BNBC) অনুসরণ করা হয়েছে কি না

নির্মাণের মান: কংক্রিট, রড ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রীর গুণগত মান এবং নির্মাণকাজের তদারকি

মাটির বৈশিষ্ট্য: ভবনের নিচের মাটির ধরন, ধারণক্ষমতা এবং ভূমিকম্পের সময় সম্ভাব্য আচরণ

কাঠামোগত ব্যবস্থা: পিলার, বিম, শিয়ার ওয়াল, সংযোগস্থল ও ভিত্তির নকশা

পরবর্তী পরিবর্তন: নির্মাণের পর ভবনের কাঠামোয় অননুমোদিত কোনো পরিবর্তন আনা হয়েছে কি না

বাসার নিরাপত্তা যাচাইয়ের উপায়

ভবনের নিরাপত্তা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে:

১. ভবনের অনুমোদিত নকশা ও নির্মাণসংক্রান্ত নথি সংগ্রহ করুন।

২. ভবন নির্মাণের সময় প্রযোজ্য বিল্ডিং কোড অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা যাচাই করুন।

৩. অভিজ্ঞ ও যোগ্য কাঠামো প্রকৌশলীর মাধ্যমে ভবনের কাঠামোগত মূল্যায়ন করান। প্রয়োজন হলে কংক্রিট পরীক্ষা, রড শনাক্তকরণ, মাটির পরীক্ষা এবং অন্যান্য বিশেষায়িত পরীক্ষা করা যেতে পারে।

৪. নতুন ফাটল, পিলারের ক্ষতি বা ভবনে অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

ভূমিকম্পের পর যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকবেন

ভূমিকম্পের পর ভবনে নতুন বড় ফাটল, পিলার বা বিমে ক্ষতি, কংক্রিট খসে পড়া কিংবা ভবন হেলে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে নিরাপদে বের হয়ে আসতে হবে। ভবন পরীক্ষা না করা পর্যন্ত ভেতরে প্রবেশ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

গ্যাসের গন্ধ পাওয়া গেলে আগুন বা বৈদ্যুতিক সুইচ ব্যবহার না করে সংশ্লিষ্ট জরুরি সেবায় যোগাযোগ করতে হবে।

পুরোনো হলেই অনিরাপদ, নতুন হলেই নিরাপদ নয়

ভবনের বয়স বেশি হলেই সেটি অনিরাপদ হবে বা নতুন ভবন মানেই ভূমিকম্প সহনশীল - এমন ধারণা সঠিক নয়। ভবনের নকশা, নির্মাণের মান, মাটির অবস্থা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং কাঠামোগত সক্ষমতার ওপর এর নিরাপত্তা নির্ভর করে।

তাই চোখে দেখা ফাটল বা অন্যান্য পরিবর্তনকে প্রাথমিক সতর্কসংকেত হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে ভবনটি ভূমিকম্প সহনশীল কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে যোগ্য কাঠামো প্রকৌশলীর মাধ্যমে পেশাদার মূল্যায়ন করানোই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত