সংবাদ

চলনবিলে অবাধে শামুক-ঝিনুক নিধন, হুমকির মুখে জীববৈচিত্র্য


হাবিবুর রহমান স্বপন, পাবনা
হাবিবুর রহমান স্বপন, পাবনা
প্রকাশ: ৭ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৫৪ পিএম

চলনবিলে অবাধে শামুক-ঝিনুক নিধন, হুমকির মুখে জীববৈচিত্র্য
ছবি : সংবাদ

চলনবিলের নদী, বিল ও খাঁড়ির জলাভূমিতে প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়া শামুক ও ঝিনুক কুড়িয়ে জীবিকা অর্জন করছেন এ অঞ্চলের হাজারো নিম্নবিত্ত মানুষ। তবে নির্বিচারে এই জলজ প্রাণী আহরণের ফলে পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জ জেলার ১৪টি উপজেলা নিয়ে বিস্তৃত চলনবিল এলাকার জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। বর্ষা মৌসুমে কর্মহীন সময়ে সাধারণ মানুষ এসব শামুক-ঝিনুক কুড়িয়ে বিক্রি করলেও পরিবেশবিদ ও কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অবাধ নিধনের ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশ ও মাটির উর্বরতার চরম ক্ষতি হচ্ছে।

দক্ষিণাঞ্চলের মৎস্যঘেরে বিপুল চাহিদা:

চলনবিল থেকে আহরিত শামুক-ঝিনুক ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে চলে যাচ্ছে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলার চিংড়ি ও মৎস্যঘেরে। বিশেষ করে ঘেরের চিংড়ির প্রধান ও সাশ্রয়ী খাবার হিসেবে এর মাংস ব্যবহৃত হচ্ছে। এছাড়া শামুক-ঝিনুকের খোলস গুঁড়ো করে ফিশমিল, পোল্ট্রি ফিড এবং চুন তৈরি করা হয়। চাহিদা বেশি থাকায় চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, তাড়াশ ও সিংড়া উপজেলায় গড়ে উঠেছে ৫০টিরও বেশি আড়ত। সেখান থেকে ট্রাকে করে প্রতিদিন প্রায় ২০০ টন শামুক-ঝিনুক চালান করা হচ্ছে দক্ষিণাঞ্চলে। আড়তদারেরা প্রতি বস্তা ৭০০ থেকে ৯০০ টাকায় কিনে নিয়ে ঘেরমালিকদের কাছে ১,০০০ থেকে ১,২০০ টাকায় বিক্রি করছেন।

দরিদ্র মানুষের জীবিকার অবলম্বন:

বর্ষার দিনে কাজ না থাকায় চলনবিল অঞ্চলের দরিদ্র পরিবারগুলোর আয়ের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে শামুক কুড়ানো। তাড়াশ উপজেলার ডাহিয়া গ্রামের কামাল মিয়া জানান, পরিবার নিয়ে প্রতিদিন দুই বস্তা শামুক তুলে তিনি দিনে ১,২০০ থেকে ১,৪০০ টাকা আয় করেন, যা দিয়ে তাদের পুরো সংসার চলে। একই এলাকার শারীরিক প্রতিবন্ধী স্বামীর সংসার চালাতে আসমা বেগম প্রতিদিন নদী-বিল থেকে এক বস্তা শামুক কুড়িয়ে পান ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা। আবার ভেটুয়া গ্রামের কিশোর সাইদুল শামুক বিক্রি করেই জোগাড় করছে তার পড়াশোনার খরচ।

যেভাবে ধরা হয় শামুক-ঝিনুক:

চলনবিলের ১৬টি নদী, ৩৯টি বিল ও ২২টি খাঁড়ি থেকে বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি থেকে অগ্রহায়ণ মাস পর্যন্ত শামুক সংগ্রহ চলে। তবে আষাঢ় থেকে কার্তিক মাস হলো মূল মৌসুম। ধান, পাট বা কচুরিপানার ওপর ভেসে থাকা শামুক জাল দিয়ে তৈরি ফাঁদ দিয়ে টেনে তুলে ডিঙি নৌকায় জমা করা হয়। তীব্র রোদ বাড়ার আগেই ভোর থেকে সকালের মধ্যে শামুক সংগ্রহ করতে হয়, কারণ রোদ বাড়লে এরা পানির নিচে চলে যায়।

পরিবেশ ও মাটির উর্বরতায় ক্ষতিকর প্রভাব:

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক নজরুল ইসলাম জানান, চলনবিল অঞ্চলে মূলত 'অ্যাপেল স্নেল' বা আপেল শামুক প্রজাতি বেশি ধরা হয়। এগুলো জলাভূমির খাদ্যশৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বর্ষা শেষে মাটিতে মিশে শামুক পচে গিয়ে প্রাকৃতিকভাবে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও পটাশ তৈরি করে মাটির উর্বরতা বাড়ায়। অবাধে শামুক নিধনের ফলে জমির প্রাকৃতিক উর্বরতা কমছে এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। পাবনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) শামসুল আলম জানান, অতিরিক্ত শামুক ধ্বংসের কারণে মাটির পুষ্টি উপাদান যেমন কমছে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে তা খাদ্যশৃঙ্খল ও পরিবেশের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

দরিদ্র মানুষের সাময়িক আর্থিক সংস্থান হলেও চলনবিলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও দীর্ঘমেয়াদী কৃষি সুরক্ষায় অবিলম্বে অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত শামুক-ঝিনুক নিধন বন্ধ করা জরুরি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত তদারকি ও সচেতনতা সৃষ্টি না করা গেলে অদূর ভবিষ্যতে চলনবিলের জীববৈচিত্র্য চিরতরে বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬


চলনবিলে অবাধে শামুক-ঝিনুক নিধন, হুমকির মুখে জীববৈচিত্র্য

প্রকাশের তারিখ : ০৭ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

চলনবিলের নদী, বিল ও খাঁড়ির জলাভূমিতে প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়া শামুক ও ঝিনুক কুড়িয়ে জীবিকা অর্জন করছেন এ অঞ্চলের হাজারো নিম্নবিত্ত মানুষ। তবে নির্বিচারে এই জলজ প্রাণী আহরণের ফলে পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জ জেলার ১৪টি উপজেলা নিয়ে বিস্তৃত চলনবিল এলাকার জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। বর্ষা মৌসুমে কর্মহীন সময়ে সাধারণ মানুষ এসব শামুক-ঝিনুক কুড়িয়ে বিক্রি করলেও পরিবেশবিদ ও কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অবাধ নিধনের ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশ ও মাটির উর্বরতার চরম ক্ষতি হচ্ছে।

দক্ষিণাঞ্চলের মৎস্যঘেরে বিপুল চাহিদা:

চলনবিল থেকে আহরিত শামুক-ঝিনুক ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে চলে যাচ্ছে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলার চিংড়ি ও মৎস্যঘেরে। বিশেষ করে ঘেরের চিংড়ির প্রধান ও সাশ্রয়ী খাবার হিসেবে এর মাংস ব্যবহৃত হচ্ছে। এছাড়া শামুক-ঝিনুকের খোলস গুঁড়ো করে ফিশমিল, পোল্ট্রি ফিড এবং চুন তৈরি করা হয়। চাহিদা বেশি থাকায় চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, তাড়াশ ও সিংড়া উপজেলায় গড়ে উঠেছে ৫০টিরও বেশি আড়ত। সেখান থেকে ট্রাকে করে প্রতিদিন প্রায় ২০০ টন শামুক-ঝিনুক চালান করা হচ্ছে দক্ষিণাঞ্চলে। আড়তদারেরা প্রতি বস্তা ৭০০ থেকে ৯০০ টাকায় কিনে নিয়ে ঘেরমালিকদের কাছে ১,০০০ থেকে ১,২০০ টাকায় বিক্রি করছেন।

দরিদ্র মানুষের জীবিকার অবলম্বন:

বর্ষার দিনে কাজ না থাকায় চলনবিল অঞ্চলের দরিদ্র পরিবারগুলোর আয়ের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে শামুক কুড়ানো। তাড়াশ উপজেলার ডাহিয়া গ্রামের কামাল মিয়া জানান, পরিবার নিয়ে প্রতিদিন দুই বস্তা শামুক তুলে তিনি দিনে ১,২০০ থেকে ১,৪০০ টাকা আয় করেন, যা দিয়ে তাদের পুরো সংসার চলে। একই এলাকার শারীরিক প্রতিবন্ধী স্বামীর সংসার চালাতে আসমা বেগম প্রতিদিন নদী-বিল থেকে এক বস্তা শামুক কুড়িয়ে পান ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা। আবার ভেটুয়া গ্রামের কিশোর সাইদুল শামুক বিক্রি করেই জোগাড় করছে তার পড়াশোনার খরচ।

যেভাবে ধরা হয় শামুক-ঝিনুক:

চলনবিলের ১৬টি নদী, ৩৯টি বিল ও ২২টি খাঁড়ি থেকে বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি থেকে অগ্রহায়ণ মাস পর্যন্ত শামুক সংগ্রহ চলে। তবে আষাঢ় থেকে কার্তিক মাস হলো মূল মৌসুম। ধান, পাট বা কচুরিপানার ওপর ভেসে থাকা শামুক জাল দিয়ে তৈরি ফাঁদ দিয়ে টেনে তুলে ডিঙি নৌকায় জমা করা হয়। তীব্র রোদ বাড়ার আগেই ভোর থেকে সকালের মধ্যে শামুক সংগ্রহ করতে হয়, কারণ রোদ বাড়লে এরা পানির নিচে চলে যায়।

পরিবেশ ও মাটির উর্বরতায় ক্ষতিকর প্রভাব:

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক নজরুল ইসলাম জানান, চলনবিল অঞ্চলে মূলত 'অ্যাপেল স্নেল' বা আপেল শামুক প্রজাতি বেশি ধরা হয়। এগুলো জলাভূমির খাদ্যশৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বর্ষা শেষে মাটিতে মিশে শামুক পচে গিয়ে প্রাকৃতিকভাবে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও পটাশ তৈরি করে মাটির উর্বরতা বাড়ায়। অবাধে শামুক নিধনের ফলে জমির প্রাকৃতিক উর্বরতা কমছে এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। পাবনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) শামসুল আলম জানান, অতিরিক্ত শামুক ধ্বংসের কারণে মাটির পুষ্টি উপাদান যেমন কমছে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে তা খাদ্যশৃঙ্খল ও পরিবেশের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

দরিদ্র মানুষের সাময়িক আর্থিক সংস্থান হলেও চলনবিলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও দীর্ঘমেয়াদী কৃষি সুরক্ষায় অবিলম্বে অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত শামুক-ঝিনুক নিধন বন্ধ করা জরুরি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত তদারকি ও সচেতনতা সৃষ্টি না করা গেলে অদূর ভবিষ্যতে চলনবিলের জীববৈচিত্র্য চিরতরে বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত