সংবাদ

তালায় আর্সেনিকের মারাত্মক প্রভাব: স্বাস্থ্যঝুঁকিতে গ্রামবাসীরা


প্রতিনিধি, সাতক্ষীরা
প্রতিনিধি, সাতক্ষীরা
প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪৩ এএম

তালায় আর্সেনিকের মারাত্মক প্রভাব: স্বাস্থ্যঝুঁকিতে গ্রামবাসীরা
ছবি : সংবাদ

সাতক্ষীরার তালা উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নের কৃষ্ণকাটি ও আটঘরা গ্রামে আর্সেনিকজনিত রোগে গত দেড় দশকে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবারেই রয়েছেন আর্সেনিক আক্রান্ত রোগী। আর্সেনিক আক্রান্তদের জন্য বিশেষ কোনো চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। তবে নিরাপদ পানি সরবরাহে বড় প্রকল্প হাতে নেওয়ার কথা জানিয়েছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর।

জালালপুর ইউনিয়নের কৃষ্ণকাটি গ্রামের স্বজনদের দাবি, আনছার মোড়লসহ তার পরিবারের সাতজন পুরুষ সদস্য গত কয়েক বছরে আর্সেনিকজনিত ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।

একই গ্রামের শফিকুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে ভুগছেন আর্সেনিকজনিত জটিল চর্মরোগে। তার দাবি, গত এক দশকে বাবা, মা, চাচা ও স্ত্রীসহ পরিবারের একাধিক সদস্য মারা গেছেন একই রোগে। আক্রান্ত রোগীরা জানান, তাদের গ্রামে যে কবরস্থান রয়েছে, সেখানে নতুন করে আর কোনো মরদেহ দাফন করার মতো জায়গা অবশিষ্ট নেই।

পাশের পাড়ার রেখা বেগমও আক্রান্ত এই জটিল চর্মরোগে। কয়েক বছর আগে একই রোগে স্বামীকে হারিয়েছেন তিনি। রেখা বেগম বলেন, ‘আমাদের গ্রামের অনেকেই এই ঘায়ে আক্রান্ত। মাঝখানে কিছু লোক ভালো আছে, কিন্তু প্রায় প্রতিটি পরিবারেই এক-দুইজন রোগী আছেন। হাতে ঘা হয়েছে, চুলকায় খুব। পানি খেলে এই কষ্ট আরও বাড়ে।’

গ্রামবাসীর দাবি, গত দেড় দশকে এ রোগে প্রাণ হারিয়েছেন শতাধিক মানুষ। ২০০৫ সালের নমুনা পরীক্ষায় এলাকার ৯২ শতাংশের বেশি নলকূপের পানিতে অতিমাত্রায় আর্সেনিক পাওয়া যায়। আর্সেনিকের এমন প্রভাব স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি তৈরি করেছে সামাজিক সংকটও। ছোঁয়াচে রোগ না হলেও আক্রান্ত পরিবারের ছেলেমেয়েদের বিয়ে দিতে তৈরি হচ্ছে নানামুখী প্রতিবন্ধকতা।

জালালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম মফিদুল হক লিটু বলেন, ‘ইউনিয়নের প্রায় সবকটি গ্রামেই নলকূপের পানিতে ব্যাপক আকারে আর্সেনিক রয়েছে। এর মধ্যে ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কৃষ্ণকাটি গ্রাম এবং ৭ নম্বর ওয়ার্ডের শ্রীমন্তকাটি গ্রামের পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ।’

সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আব্দুর রহমান জানান, দীর্ঘদিন আর্সেনিকযুক্ত পানি পানে ত্বকের রোগ ও ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে। আর্সেনিকের নির্দিষ্ট চিকিৎসা না থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসায় উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তিনি বলেন, ‘অনেকের ভুল ধারণা থাকে যে আর্সেনিকযুক্ত পানি ফোটালে বিশুদ্ধ হয়। কিন্তু আর্সেনিকযুক্ত পানি ফোটালে তা আরও বেশি বিষাক্ত হয়ে ওঠে। তাই এই পানি পান পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে।’

সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন ডা. আব্দুস সালাম বলেন, ‘আর্সেনিকের নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নেই। সাধারণত আমরা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ভিটামিন দিয়ে থাকি, যা এই মুহূর্তে সরবরাহ নেই। মাঠকর্মীদের মাধ্যমে আক্রান্তদের তথ্য সংগ্রহ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হচ্ছে।’

সাতক্ষীরা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহিদ পারভেজ বলেন, ‘ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা গ্রহণযোগ্য সীমার চেয়ে অনেক বেশি। এ কারণে দূরবর্তী এলাকা থেকে প্রোডাকশন টিউবওয়েলের মাধ্যমে পাইপলাইনে সুপেয় পানি সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

বিপর্যস্ত কৃষ্ণকাটি গ্রামের প্রায় তিন হাজার মানুষের জন্য বর্তমানে একটিমাত্র গভীর নলকূপের পানি ভরসা। এই দূরবস্থা কাটাতে দ্রুত নিরাপদ পানি সরবরাহ ও আক্রান্তদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬


তালায় আর্সেনিকের মারাত্মক প্রভাব: স্বাস্থ্যঝুঁকিতে গ্রামবাসীরা

প্রকাশের তারিখ : ১২ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

সাতক্ষীরার তালা উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নের কৃষ্ণকাটি ও আটঘরা গ্রামে আর্সেনিকজনিত রোগে গত দেড় দশকে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবারেই রয়েছেন আর্সেনিক আক্রান্ত রোগী। আর্সেনিক আক্রান্তদের জন্য বিশেষ কোনো চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। তবে নিরাপদ পানি সরবরাহে বড় প্রকল্প হাতে নেওয়ার কথা জানিয়েছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর।

জালালপুর ইউনিয়নের কৃষ্ণকাটি গ্রামের স্বজনদের দাবি, আনছার মোড়লসহ তার পরিবারের সাতজন পুরুষ সদস্য গত কয়েক বছরে আর্সেনিকজনিত ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।

একই গ্রামের শফিকুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে ভুগছেন আর্সেনিকজনিত জটিল চর্মরোগে। তার দাবি, গত এক দশকে বাবা, মা, চাচা ও স্ত্রীসহ পরিবারের একাধিক সদস্য মারা গেছেন একই রোগে। আক্রান্ত রোগীরা জানান, তাদের গ্রামে যে কবরস্থান রয়েছে, সেখানে নতুন করে আর কোনো মরদেহ দাফন করার মতো জায়গা অবশিষ্ট নেই।

পাশের পাড়ার রেখা বেগমও আক্রান্ত এই জটিল চর্মরোগে। কয়েক বছর আগে একই রোগে স্বামীকে হারিয়েছেন তিনি। রেখা বেগম বলেন, ‘আমাদের গ্রামের অনেকেই এই ঘায়ে আক্রান্ত। মাঝখানে কিছু লোক ভালো আছে, কিন্তু প্রায় প্রতিটি পরিবারেই এক-দুইজন রোগী আছেন। হাতে ঘা হয়েছে, চুলকায় খুব। পানি খেলে এই কষ্ট আরও বাড়ে।’

গ্রামবাসীর দাবি, গত দেড় দশকে এ রোগে প্রাণ হারিয়েছেন শতাধিক মানুষ। ২০০৫ সালের নমুনা পরীক্ষায় এলাকার ৯২ শতাংশের বেশি নলকূপের পানিতে অতিমাত্রায় আর্সেনিক পাওয়া যায়। আর্সেনিকের এমন প্রভাব স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি তৈরি করেছে সামাজিক সংকটও। ছোঁয়াচে রোগ না হলেও আক্রান্ত পরিবারের ছেলেমেয়েদের বিয়ে দিতে তৈরি হচ্ছে নানামুখী প্রতিবন্ধকতা।

জালালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম মফিদুল হক লিটু বলেন, ‘ইউনিয়নের প্রায় সবকটি গ্রামেই নলকূপের পানিতে ব্যাপক আকারে আর্সেনিক রয়েছে। এর মধ্যে ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কৃষ্ণকাটি গ্রাম এবং ৭ নম্বর ওয়ার্ডের শ্রীমন্তকাটি গ্রামের পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ।’

সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আব্দুর রহমান জানান, দীর্ঘদিন আর্সেনিকযুক্ত পানি পানে ত্বকের রোগ ও ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে। আর্সেনিকের নির্দিষ্ট চিকিৎসা না থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসায় উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তিনি বলেন, ‘অনেকের ভুল ধারণা থাকে যে আর্সেনিকযুক্ত পানি ফোটালে বিশুদ্ধ হয়। কিন্তু আর্সেনিকযুক্ত পানি ফোটালে তা আরও বেশি বিষাক্ত হয়ে ওঠে। তাই এই পানি পান পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে।’

সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন ডা. আব্দুস সালাম বলেন, ‘আর্সেনিকের নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নেই। সাধারণত আমরা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ভিটামিন দিয়ে থাকি, যা এই মুহূর্তে সরবরাহ নেই। মাঠকর্মীদের মাধ্যমে আক্রান্তদের তথ্য সংগ্রহ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হচ্ছে।’

সাতক্ষীরা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহিদ পারভেজ বলেন, ‘ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা গ্রহণযোগ্য সীমার চেয়ে অনেক বেশি। এ কারণে দূরবর্তী এলাকা থেকে প্রোডাকশন টিউবওয়েলের মাধ্যমে পাইপলাইনে সুপেয় পানি সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

বিপর্যস্ত কৃষ্ণকাটি গ্রামের প্রায় তিন হাজার মানুষের জন্য বর্তমানে একটিমাত্র গভীর নলকূপের পানি ভরসা। এই দূরবস্থা কাটাতে দ্রুত নিরাপদ পানি সরবরাহ ও আক্রান্তদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত