শহরের আলো যখন রাতে সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, তখন ফুটপাতের এক কোণে কুঁকড়ে থাকে একটি ছোট্ট শরীর। গায়ে ছেঁড়া জামা, পেটে ক্ষুধার জ্বালা, চোখে ঘুমের বদলে সতর্ক দৃষ্টি। অন্য শিশুরা যখন মায়ের কোলে রূপকথা শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ে, তখন সে শিখে যায় কীভাবে রাতের অন্ধকারে নিজেকে আড়াল করে রাখতে হয়। তার নামের পাশে কোনো ঠিকানা নেই। জন্মদিনে কেক কাটার আনন্দ নেই। ‘সাবধানে যেয়ো’ বলে বিদায় জানানোর কেউ নেই। আমরা প্রতিদিন তাদের পাশ দিয়ে হেঁটে যাই। সিগন্যালে গাড়ির কাচে তাদের হাত বাড়াতে দেখে চোখ ফিরিয়ে নিই। অথচ প্রশ্নটি থেকেই যায়—যাদের কোনো অভিভাবক নেই, তাদের অভিভাবক হবে কে?
বাংলাদেশের বড় শহরগুলোতে অসংখ্য শিশু রাস্তাকেই ঘর বানিয়েছে। কেউ দারিদ্র্যরে চাপে, কেউ নদীভাঙনে সব হারিয়ে, কেউ বাবা-মায়ের মৃত্যুতে, আবার কেউ নির্যাতনের ভয়ে ঘর ছেড়েছে। ঢাকার রেলস্টেশন, চট্টগ্রামের বাসস্ট্যান্ড কিংবা শহরের ফুটপাত—এসব জায়গাই তাদের ঠিকানা। এই শিশুরা কেবল কোনো পরিসংখ্যানের অংশ নয়। প্রতিটি শিশুর পেছনে রয়েছে একটি মুখ, একটি জীবন এবং অপূর্ণ থেকে যাওয়া শৈশব।
রাস্তা তাদের কাছে একই সঙ্গে ঘর, বিদ্যালয় ও কর্মক্ষেত্র। অথচ সেই ঘরের কোনো দরজা নেই, কোনো নিরাপত্তাও নেই। রাত নামলে ঘুমন্ত শিশুরা হয়ে ওঠে সহজ শিকার। চুরি, মারধর ও যৌন নির্যাতনের ঝুঁকি তাদের নিত্যসঙ্গী। মেয়েশিশুদের বিপদ আরও বেশি। কেউ ফুল বিক্রি করে, কেউ কাগজ কুড়ায়, কেউ ভিক্ষা করে। আবার কেউ অপরাধচক্রের ফাঁদে পড়ে মাদক বহনের মতো কাজে জড়িয়ে যায়। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, দূষিত পানি ও অপুষ্টির কারণে তারা নানা রোগে ভোগে। চিকিৎসার সুযোগও সীমিত। ক্ষুধা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে কেউ কেউ নেশার দিকে ঝুঁকে পড়ে। বিদ্যালয়ের দরজাও তাদের অনেকের জন্য বন্ধ। জন্মনিবন্ধন না থাকাসহ নানা বাধায় তারা শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। এভাবে দারিদ্র্য ও শিক্ষাবঞ্চনার চক্র এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে।
শারীরিক ক্ষতের চেয়েও গভীর হতে পারে মনের ক্ষত। অবহেলা, ঘৃণা ও সহিংসতার মধ্যে বড় হতে হতে শিশুদের মনে জন্ম নেয় অবিশ্বাস, ক্ষোভ ও অসহায়ত্ব। সমাজ তাদের ‘টোকাই’ বলে অবজ্ঞা করে। অথচ এই শিশুরাই আমাদের সামাজিক ব্যর্থতার নীরব সাক্ষী। নিরাপদ আশ্রয়, শিক্ষা, চিকিৎসা ও ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার তাদেরও আছে। জন্মপরিচয়, পারিবারিক অবস্থা কিংবা আর্থিক সামর্থ্য কোনো শিশুর মর্যাদা নির্ধারণ করতে পারে না। অথচ বাস্তবে এই শিশুরাই সবচেয়ে বেশি বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার।
শিশুদের সুরক্ষায় আইনি অঙ্গীকারের অভাব নেই। বাংলাদেশ জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে স্বাক্ষর করেছে। দেশের শিশু আইনেও শিশুর সুরক্ষা ও বিকাশের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। কিন্তু কাগজের অঙ্গীকার ও ফুটপাতের বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান রয়ে গেছে। সরকারি সংস্থা, বেসরকারি সংগঠন ও স্থানীয় প্রশাসন নানা উদ্যোগ নিলেও সমন্বয়ের অভাবে অনেক ক্ষেত্রেই তা শিশুদের কাছে পৌঁছায় না। এই দায় কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নয়; রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিক—সবারই দায়িত্ব রয়েছে। তাই শুধু বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা।
এই পরিস্থিতি বদলানোর পথ রয়েছে। রাষ্ট্রকে শহরগুলোতে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। পথশিশুদের জন্য বিনা মূল্যে শিক্ষা, চিকিৎসা ও জন্মনিবন্ধনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। শিশু সুরক্ষা কার্যক্রমে তদারকি ও জবাবদিহি বাড়াতে হবে। পুলিশকে পথশিশুদের সঙ্গে সংবেদনশীল ও মানবিক আচরণের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। যারা শিশুদের শোষণ করে, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। বেসরকারি সংগঠন ও ব্যবসায়ী সমাজ বিকল্প শিক্ষা, দক্ষতা প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসনে ভূমিকা রাখতে পারে। গণমাধ্যমের কাজ হবে করুণা জাগানোর পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্বের বিষয়টি সামনে আনা। নাগরিক হিসেবেও আমরা ‘টোকাই’ বলে কোনো শিশুকে অবজ্ঞা না করে তার সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করতে পারি। কোনো শিশুকে বিপদে দেখলে সহায়তা করতে পারি কিংবা শিশু সহায়তা নম্বর ১০৯৮-এ জানাতে পারি। তবে বিচ্ছিন্ন সহায়তার পাশাপাশি প্রয়োজন এমন ব্যবস্থা, যাতে কোনো শিশুকে বেঁচে থাকার জন্য প্রতিদিন রাস্তায় লড়াই করতে না হয়।
শিশুরা পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ফুল—কবিরা যুগে যুগে এ কথাই বলে এসেছেন। কিন্তু সব ফুল বাগানে ফোটে না। কিছু ফুল ফোটে ফুটপাতের ধুলোয়, অবহেলার উত্তাপে পুড়ে, বিনা যত্নে। একটি সমাজকে চেনা যায় তার সবচেয়ে অসহায় সন্তানদের সঙ্গে আচরণের মধ্য দিয়ে। আমরা যতই আকাশছোঁয়া ভবন গড়ি, উন্নয়নের যত ফিরিস্তিই দিই, কোনো শিশু যদি রাতে অনাহারে ও নিরাপত্তাহীনতায় ঘুমাতে যায়, তবে সেই উন্নয়ন পূর্ণতা পায় না।
তাই দায় চাপানোর খেলা বন্ধ করে এখনই এগিয়ে আসতে হবে। কারণ প্রতিটি পথশিশুর চোখে জমে থাকা প্রশ্নটির উত্তর আমাদেরই দিতে হবে—‘আমারও কি একটা ঘর হতে পারে না?’
লেখক: শিক্ষার্থী, বাংলা সাহিত্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৪ অক্টোবর ২০২৬
শহরের আলো যখন রাতে সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, তখন ফুটপাতের এক কোণে কুঁকড়ে থাকে একটি ছোট্ট শরীর। গায়ে ছেঁড়া জামা, পেটে ক্ষুধার জ্বালা, চোখে ঘুমের বদলে সতর্ক দৃষ্টি। অন্য শিশুরা যখন মায়ের কোলে রূপকথা শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ে, তখন সে শিখে যায় কীভাবে রাতের অন্ধকারে নিজেকে আড়াল করে রাখতে হয়। তার নামের পাশে কোনো ঠিকানা নেই। জন্মদিনে কেক কাটার আনন্দ নেই। ‘সাবধানে যেয়ো’ বলে বিদায় জানানোর কেউ নেই। আমরা প্রতিদিন তাদের পাশ দিয়ে হেঁটে যাই। সিগন্যালে গাড়ির কাচে তাদের হাত বাড়াতে দেখে চোখ ফিরিয়ে নিই। অথচ প্রশ্নটি থেকেই যায়—যাদের কোনো অভিভাবক নেই, তাদের অভিভাবক হবে কে?
বাংলাদেশের বড় শহরগুলোতে অসংখ্য শিশু রাস্তাকেই ঘর বানিয়েছে। কেউ দারিদ্র্যরে চাপে, কেউ নদীভাঙনে সব হারিয়ে, কেউ বাবা-মায়ের মৃত্যুতে, আবার কেউ নির্যাতনের ভয়ে ঘর ছেড়েছে। ঢাকার রেলস্টেশন, চট্টগ্রামের বাসস্ট্যান্ড কিংবা শহরের ফুটপাত—এসব জায়গাই তাদের ঠিকানা। এই শিশুরা কেবল কোনো পরিসংখ্যানের অংশ নয়। প্রতিটি শিশুর পেছনে রয়েছে একটি মুখ, একটি জীবন এবং অপূর্ণ থেকে যাওয়া শৈশব।
রাস্তা তাদের কাছে একই সঙ্গে ঘর, বিদ্যালয় ও কর্মক্ষেত্র। অথচ সেই ঘরের কোনো দরজা নেই, কোনো নিরাপত্তাও নেই। রাত নামলে ঘুমন্ত শিশুরা হয়ে ওঠে সহজ শিকার। চুরি, মারধর ও যৌন নির্যাতনের ঝুঁকি তাদের নিত্যসঙ্গী। মেয়েশিশুদের বিপদ আরও বেশি। কেউ ফুল বিক্রি করে, কেউ কাগজ কুড়ায়, কেউ ভিক্ষা করে। আবার কেউ অপরাধচক্রের ফাঁদে পড়ে মাদক বহনের মতো কাজে জড়িয়ে যায়। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, দূষিত পানি ও অপুষ্টির কারণে তারা নানা রোগে ভোগে। চিকিৎসার সুযোগও সীমিত। ক্ষুধা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে কেউ কেউ নেশার দিকে ঝুঁকে পড়ে। বিদ্যালয়ের দরজাও তাদের অনেকের জন্য বন্ধ। জন্মনিবন্ধন না থাকাসহ নানা বাধায় তারা শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। এভাবে দারিদ্র্য ও শিক্ষাবঞ্চনার চক্র এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে।
শারীরিক ক্ষতের চেয়েও গভীর হতে পারে মনের ক্ষত। অবহেলা, ঘৃণা ও সহিংসতার মধ্যে বড় হতে হতে শিশুদের মনে জন্ম নেয় অবিশ্বাস, ক্ষোভ ও অসহায়ত্ব। সমাজ তাদের ‘টোকাই’ বলে অবজ্ঞা করে। অথচ এই শিশুরাই আমাদের সামাজিক ব্যর্থতার নীরব সাক্ষী। নিরাপদ আশ্রয়, শিক্ষা, চিকিৎসা ও ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার তাদেরও আছে। জন্মপরিচয়, পারিবারিক অবস্থা কিংবা আর্থিক সামর্থ্য কোনো শিশুর মর্যাদা নির্ধারণ করতে পারে না। অথচ বাস্তবে এই শিশুরাই সবচেয়ে বেশি বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার।
শিশুদের সুরক্ষায় আইনি অঙ্গীকারের অভাব নেই। বাংলাদেশ জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে স্বাক্ষর করেছে। দেশের শিশু আইনেও শিশুর সুরক্ষা ও বিকাশের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। কিন্তু কাগজের অঙ্গীকার ও ফুটপাতের বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান রয়ে গেছে। সরকারি সংস্থা, বেসরকারি সংগঠন ও স্থানীয় প্রশাসন নানা উদ্যোগ নিলেও সমন্বয়ের অভাবে অনেক ক্ষেত্রেই তা শিশুদের কাছে পৌঁছায় না। এই দায় কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নয়; রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিক—সবারই দায়িত্ব রয়েছে। তাই শুধু বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা।
এই পরিস্থিতি বদলানোর পথ রয়েছে। রাষ্ট্রকে শহরগুলোতে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। পথশিশুদের জন্য বিনা মূল্যে শিক্ষা, চিকিৎসা ও জন্মনিবন্ধনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। শিশু সুরক্ষা কার্যক্রমে তদারকি ও জবাবদিহি বাড়াতে হবে। পুলিশকে পথশিশুদের সঙ্গে সংবেদনশীল ও মানবিক আচরণের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। যারা শিশুদের শোষণ করে, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। বেসরকারি সংগঠন ও ব্যবসায়ী সমাজ বিকল্প শিক্ষা, দক্ষতা প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসনে ভূমিকা রাখতে পারে। গণমাধ্যমের কাজ হবে করুণা জাগানোর পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্বের বিষয়টি সামনে আনা। নাগরিক হিসেবেও আমরা ‘টোকাই’ বলে কোনো শিশুকে অবজ্ঞা না করে তার সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করতে পারি। কোনো শিশুকে বিপদে দেখলে সহায়তা করতে পারি কিংবা শিশু সহায়তা নম্বর ১০৯৮-এ জানাতে পারি। তবে বিচ্ছিন্ন সহায়তার পাশাপাশি প্রয়োজন এমন ব্যবস্থা, যাতে কোনো শিশুকে বেঁচে থাকার জন্য প্রতিদিন রাস্তায় লড়াই করতে না হয়।
শিশুরা পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ফুল—কবিরা যুগে যুগে এ কথাই বলে এসেছেন। কিন্তু সব ফুল বাগানে ফোটে না। কিছু ফুল ফোটে ফুটপাতের ধুলোয়, অবহেলার উত্তাপে পুড়ে, বিনা যত্নে। একটি সমাজকে চেনা যায় তার সবচেয়ে অসহায় সন্তানদের সঙ্গে আচরণের মধ্য দিয়ে। আমরা যতই আকাশছোঁয়া ভবন গড়ি, উন্নয়নের যত ফিরিস্তিই দিই, কোনো শিশু যদি রাতে অনাহারে ও নিরাপত্তাহীনতায় ঘুমাতে যায়, তবে সেই উন্নয়ন পূর্ণতা পায় না।
তাই দায় চাপানোর খেলা বন্ধ করে এখনই এগিয়ে আসতে হবে। কারণ প্রতিটি পথশিশুর চোখে জমে থাকা প্রশ্নটির উত্তর আমাদেরই দিতে হবে—‘আমারও কি একটা ঘর হতে পারে না?’
লেখক: শিক্ষার্থী, বাংলা সাহিত্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

আপনার মতামত লিখুন