এ কোন্ বাংলাদেশ, এ কোন্ ভারতবর্ষ আজ আমরা দেখছি? ধর্মীয় বিভাজন আর ভেদবিভেদের নোংরা রাজনীতি সমাজকে বিষাক্ত করে তুলছে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান শারদীয় দুর্গাপূজার সময় আমরা দেখলাম, রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের নামে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রশিবির ক্যাম্পাসে গরু জবাই করে ভোজের আয়োজন করেছে। এর আগে গরু নিয়ে ভোজ মিছিলও করেছে। সঙ্গে ছিল রংবেরঙের তরুণ ইউনূস বাহিনী। এসব ঘটনায় সাহসী হয়ে জামাত শিবির বাহিনী পিরোজপুরে মুক্তিযোদ্ধা মানিক পসারির দাফন কার্যক্রমসহ পরিবারের স্বাভাবিক ধর্মীয় আচারে এবং মুক্তিযোদ্ধার অন্তিম সম্মান প্রদানে বাধা দিলো। আর কয়েক দিন আগে পত্রিকায় দেখলাম, পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি শহরজুড়ে পোস্টার সাঁটানো হয়েছে—‘হিন্দুর দোকান থেকে মাংস কিনুন। বিরিয়ানি খান, তবে হিন্দু রেস্টুরেন্টে’। আমাদের কিংবা আমাদের জ্যেষ্ঠ প্রজন্মের কাছে এসব কথা ও দৃশ্য তো একান্তই অজানা, অচেনা।
পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুত্ববাদী নতুন মুখ্যমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পরে প্রথম যে কাজটি করলেন, তা হলো প্রায় একশ বছর ধরে কলকাতায় ঈদের প্রধান জামাত রেড রোডে অনুষ্ঠিত হয়ে এলেও যানজটের অজুহাতে সেখানে এর আয়োজন বন্ধ করে দেওয়া। অথচ, কয়েক দিন পরেই এই রেড রোড তিন দিনের যোগ দিবসের জন্য সপ্তাহব্যাপী বন্ধ রাখা হলো।
এদিকে আবার শারদোৎসবে কেন মুসলিম সম্প্রদায়ের কেউ ভিন্ন ধর্মের প্রতি সম্মান জানাতে পূজামণ্ডপে যাবেন, তা নিয়ে ইসলামি উগ্রবাদীরা বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অবিরাম কুরুচিপূর্ণ প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ ইসলাম ধর্মে বহুত্ববাদ ও ভিন্ন ধর্মের প্রতি সহিষ্ণুতা ও সম্মান প্রদর্শন অত্যন্ত মৌলিক এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি নীতি। ইসলাম মনে করে, পৃথিবীতে বিভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মের মানুষের উপস্থিতি আল্লাহর ইচ্ছারই অংশ।
নড়াইল শহরের চিত্রা নদীর পাড় ঘেঁষে সুন্দর, ছিমছাম একটি রিসোর্ট আছে—নাম চিত্রা রিসোর্ট। প্রথমবার সেখানে গিয়ে নদীর অপর পাড়ের মহিষখোলা পুরোনো রেজিস্ট্রি অফিসের পাশে একটি টং দোকানে চা খাওয়ার সময় আমার স্ত্রী দোকানিকে জিজ্ঞেস করলেন, এখানে দেখার মতো কী আছে? দোকানি সরাসরি সামনের দিকে আঙুল নির্দেশ করে বললেন, “অই মন্দির আর মসজিদডা দেহেন।” চার দশক ধরে একেবারে পাশাপাশি অবস্থিত সাব-রেজিস্ট্রি অফিস জামে মসজিদ এবং মহিষখোলা সার্বজনীন পূজামন্দির সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। বুঝলাম, ধর্মীয় সম্প্রীতির এমন উজ্জ্বল নিদর্শন এলাকার সাধারণ মানুষের কাছেও গর্বের, অহংকারের। দোকানির কাছ থেকেই শুনলাম, শহরের কুড়িগ্রাম এলাকায় নিশিনাথতলা মন্দির ও পুলিশ ফাঁড়ি জামে মসজিদ এবং পুলিশ লাইন জামে মসজিদ ও সর্বমঙ্গলা মন্দিরও পাশাপাশি অবস্থিত।
এ ছাড়া পত্রিকায় তো এ ধরনের সংবাদ প্রায়ই প্রকাশিত হয়। টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলা সদরে একই সীমানাপ্রাচীরের মধ্যে বাঁ পাশে মসজিদ ও ডান পাশে মন্দির অবস্থিত। প্রায় ৫৬ বছর ধরে একই প্রাঙ্গণে সহাবস্থান করছে এই দুই উপাসনালয়। ফেনী শহরের প্রাণকেন্দ্রে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে শতবর্ষী জয় কালী মন্দির এবং ফেনী কেন্দ্রীয় বড় জামে মসজিদ। লালমনিরহাটের পুরোনো বাজার এলাকায় রয়েছে প্রায় দুই শত বছরের প্রাচীন কালীমন্দির। তার পাশেই রয়েছে এক শত বছরের পুরোনো বাজার জামে মসজিদ। মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার ভূঁয়াই বাজার এলাকায় প্রায় ৫০ বছর আগে পাশাপাশি নির্মাণ করা হয় মসজিদ ও মন্দির—যা এলাকায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সাক্ষী হয়ে আছে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাশাপাশি এ ধরনের আরও মসজিদ ও মন্দির রয়েছে। এসব স্থানে একই আঙিনায় পূজার্চনা ও নামাজ আদায় চলছে। স্থানীয় হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায় এসব মন্দির ও মসজিদকে কেন্দ্র করে নিজ নিজ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে পালন করছেন। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কথা শোনা যায় না। মসজিদে নামাজের সময় এসব মন্দিরের ঢাক, উলুধ্বনি ও সাউন্ড সিস্টেম বন্ধ রাখা হয়। ফলে মুসল্লিরা সম্পূর্ণ নিরবচ্ছিন্নভাবে নামাজ আদায় করতে পারেন। আবার পূজা-পার্বণেও মসজিদের মুসল্লিরা সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসেন। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও ভিন্ন ধর্মের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের সংস্কৃতিকে ধারণ করে একই আঙিনায় এভাবে চলছে আজান ও উলুধ্বনি। একই উঠানে জ্বলতে থাকা প্রদীপ আর মিনারের সুর দুই সম্প্রদায়কে বেঁধে রেখেছে শতবর্ষের সম্প্রীতির বন্ধনে। অথচ মসজিদের সামনে শূকরের মাংস রান্নার আয়োজন হলে যারা আপত্তি করতেন, মন্দিরের কাছে গরুর মাংস রান্নায় হিন্দু শিক্ষার্থীদের আপত্তি বুঝতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই সব তরুণের অসুবিধা কোথায়?
ভারতবর্ষেও বিভিন্ন স্থানে—যেমন কলকাতা, হুগলি, ঝাড়গ্রাম, মথুরা, বারাণসী, নয়ডা, শ্রীনগর এবং কর্ণাটক ও কেরালার বিভিন্ন এলাকাসহ বহু স্থানে—মন্দির ও মসজিদ পাশাপাশি, একই সীমানার মধ্যে রয়েছে। সে আলোচনায় না গিয়ে ভিন্ন একটি ঘটনার উল্লেখ করছি, যা ২০২২ সালে পত্রপত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বহুল প্রচারিত হয়েছিল। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে গোটা ভারতবর্ষ যখন বিপর্যস্ত, সেই সময় কেরালার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মৃত্যুপথযাত্রী এক মুসলিম নারীকে কলেমা পড়ে শুনিয়েছিলেন এক নারী চিকিৎসক। ৫৬ বছর বয়সী কোভিড রোগী বিভাথু ১৭ দিন আইসিইউতে কেরালার একটি হাসপাতালে ভেন্টিলেটর সাপোর্টে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তিনি যখন নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঢলে পড়ছিলেন, তখন ধর্মবিশ্বাসে হিন্দু চিকিৎসক রেখা কৃষ্ণান মুসলিমদের জন্য দোয়া বা প্রার্থনার কলেমা পাঠ করতে থাকেন। তিনি যখন কলেমার পঙ্ক্তিগুলো পড়ছিলেন, রোগী ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
ডাক্তার রেখা বলেন, “প্রায় ১৭ দিন ধরে বিভাথুর চিকিৎসা চলছিল। এ সময় তার ছেলে ও জামাই প্রবল বৃষ্টি কিংবা লকডাউন উপেক্ষা করে প্রতিদিন হাসপাতালে আসতেন, শুধু তাদের মায়ের খোঁজখবর নিতে। ভেতরে ঢুকতে না পারলেও তারা শুধু আমাকে দেখতে এবং তার অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ নিতে পার্কিং লটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকতেন। তারা এও জানতেন যে তার স্বাস্থ্যের উন্নতি হবে না। তবুও মনের শান্তি পেতে তারা প্রতিদিন ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। যখন আমি ভাবলাম, তার শেষ মুহূর্তে তারা পাশে থাকলে কী করতেন, তখন আমি প্রার্থনাটি জপ করতে শুরু করলাম।” ডক্টর রেখা বলেন, তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতে বড় হয়েছেন। এ কারণে তিনি ইসলামি প্রার্থনা জানতেন।
কেরালায় যখন ডা. রেখা এ মানবিক দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করলেন, তখন নরেন্দ্র মোদির গুজরাটে ঘটল উল্টো ঘটনা। সেখানে হিন্দু-মুসলিম বিভাজন করে করোনা আক্রান্ত হিন্দুদের রাখার জন্য একটি ওয়ার্ড এবং মুসলিম রোগীদের জন্য পৃথক ওয়ার্ড তৈরি করা হলো। হিন্দুদের ওয়ার্ডে ঠাঁই পেতেন না মুসলিম রোগীরা, আর মুসলিমদের ওয়ার্ডে রাখা হতো না হিন্দুদের। এটি শুধু অমানবিক ঘটনা নয়, অসাংবিধানিকও। কারণ, ভারতীয় সংবিধান অনুসারে ধর্মের ভিত্তিতে যত ভারতীয়কে এভাবে আলাদা করে দেখা যায় না। কিন্তু মোদির ভারতে সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে, গায়ের জোরে ও কৌশলী ভোটের জোরে এ বিভাজন আজ চরম পর্যায়ে চলে গেছে।
নিরঙ্কুশ বিজয় নিশ্চিত করার লক্ষ্য থেকে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) নামে লক্ষ লক্ষ ভোটারকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক নির্বাচনে এসআইআরের আওতায় পরিকল্পিতভাবে ২০ লক্ষেরও বেশি ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দিয়ে বিজেপির বিজয় নিশ্চিত করা হয়েছে। এর আগে একই ঘটনা ঘটেছে বিহারে। সেখানে ৫২ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়েছে। আসামে নাগরিকপঞ্জি হওয়ার পর ১৯ লাখ মানুষ তার বাইরে রয়েছেন। সারা দেশজুড়ে এ প্রক্রিয়া চলছে। সব ক্ষেত্রেই সংখ্যালঘু, বিশেষত মুসলিম সম্প্রদায়, আদিবাসী ও দলিত সম্প্রদায় এবং জনজাতিগোষ্ঠীর মানুষেরা এই তথাকথিত এসআইআরের শিকারে পরিণত হচ্ছেন। নির্বাচন কমিশনের এসব সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বাদ-প্রতিবাদ করলেও বিশেষ সুবিধা করতে পারেনি।
কিন্তু অতিসম্প্রতি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বিরোধী আন্দোলনে এক নাটকীয় পরিবর্তন ও নতুন গতি সৃষ্টি করে। নিয়ম অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের শীর্ষে নিযুক্ত তিনজন সম-পদমর্যাদার নির্বাচন কমিশনার মতবিনিময় করে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে বা সর্বসম্মতিক্রমে নির্বাচনপ্রক্রিয়া-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, বহু ক্ষেত্রে দুজন নির্বাচন কমিশনারের আপত্তি সত্ত্বেও, এমনকি তাদের অন্ধকারে রেখে, গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ও অনেক নির্দেশ জারি করা হয়েছে। সেসব নির্দেশের বেশির ভাগই ছিল ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর-সংক্রান্ত, যার সঙ্গে ভোটার তালিকা থেকে ভোটারদের বাদ পড়ার বিষয়টি সরাসরি যুক্ত। অনেকটা আগুনে ঘি ঢালার মতো এ সংবাদ বিরোধী আন্দোলনে নতুন গতি সঞ্চার করে।
গোটা ভারতবর্ষে সাড়া জাগানো তরুণদের একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ককরোচ জনতা পার্টি, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে নানামুখী কর্মসূচি গ্রহণ করে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও তাতে সমর্থন জানালে দিল্লিসহ সারা ভারতবর্ষজুড়ে ছাত্র-তরুণ, বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা রাজপথে নেমে আসেন। লক্ষণীয় বিষয় হলো, ধীরে ধীরে রাজনৈতিক নেতৃত্ব আন্দোলনের স্টিয়ারিংয়ে আসছেন। তরুণদের নেতৃত্বে শুধু ‘ককরোচ’রাই নয়, বরং বামপন্থী ছাত্রী নেত্রী নেহা বোরাও আইকন হয়ে উঠছেন। বাংলাদেশ প্রসঙ্গে একটি মন্তব্য (যা খণ্ডিতভাবে প্রচার করা হয়, পরে তিনি ব্যাখ্যা দিয়ে শুধরে নিয়েছেন) করা ছাড়া তিনি এ আন্দোলনে গভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। ঐশী ঘোষসহ আরও বেশ কয়েকজন বামপন্থী ছাত্রনেতা-নেত্রীও আন্দোলনের মুখ হয়ে উঠছেন।
যুদ্ধ পরিস্থিতির মতো প্রস্তুতি নিয়ে দিল্লিতে বিরোধী আন্দোলন সামাল দিলেও মোদি সরকার ও তার অনুসৃত সাম্প্রদায়িক নীতিসমূহ সরাসরি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। মোদি ও অমিত শাহর কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ছে। ভারতবর্ষের সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি তুলে দেওয়ার যে স্বপ্ন তারা দেখছেন, তা কি কার্যকর করা যাবে? এই তরুণদের বড় অংশই আগামী নির্বাচনে নতুন ভোটার হিসেবে অংশ নেবেন। এই তরুণদের বাবা-মা, কাকা-কাকিরাই তো বিগত দুটি নির্বাচনে বিজেপিকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসিয়েছিলেন। তাদের সন্তানেরাই আজ নতুন পথের সন্ধান করছেন—যা তাদের অভিভাবকদের চিন্তার জগৎকেও প্রভাবিত করছে।
বাংলাদেশেও শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর উগ্র ধর্মান্ধ শক্তি ও ছাত্রনেতৃত্বের একাংশ ক্ষমতা দখলের যে স্বপ্নে বিভোর হয়েছিল, তাতে এখন অনেকটাই ভাটার টান। ইউনূস আমলে সরকারের ওপর তাদের যে নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব ছিল, তা ক্রমেই শিথিল হচ্ছে। আর নিয়ন্ত্রণের রাশ যত আলগা হচ্ছে, ততই তাদের আচরণ, বক্তব্য ও শারীরিক ভাষায় ফুটে উঠছে এক অদ্ভুত দ্বৈততা—একদিকে উগ্রতার আস্ফালন, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান ভীতি ও অস্থিরতা।
অন্যদিকে, হিন্দুধর্মের বহুত্ববাদী ও যুক্তিনির্ভর ঐতিহ্যকে আড়াল করে উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি ভারতের বহুভাষিক, বহুধর্মীয়, বহুজাতিসত্তার ও বহুসংস্কৃতির বৈচিত্র্যময় সমাজকে কর্তৃত্ববাদী সাম্প্রদায়িকতার ছাঁচে বন্দি করতে চাইছে। কিন্তু ভারতবর্ষের নতুন প্রজন্ম সেই বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে আসছে। এই প্রতিরোধ কেবল ভারতের ভবিষ্যতের জন্য নয়, উপমহাদেশের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার জন্যও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
সাম্প্রদায়িকতার এই অন্ধকার ভেদ করার এক অন্তর্নিহিত শক্তি মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের মধ্যেও রয়েছে। রয়েছে বলেই তো জুলাই আন্দোলনে যেসব ছদ্মবেশী ছাত্রনেতৃত্বের মধ্যে কৌশলী অবস্থান নিয়েছিলেন, তাদেরও মাথায় লাল-সবুজের পট্টি বাঁধতে হয়েছিল, আর সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের মতো তাদেরও কণ্ঠে তুলে নিতে হয়েছিল ‘আমার সোনার বাংলা ….’-এর পাশাপাশি ‘ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা …’, ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে …’, ‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে …’, ‘মোরা একটি ফুলকে …’, ‘ও আমার দেশের মাটি …’—এসব দেশাত্মবোধক গান। আজ খুব বেশি প্রয়োজন দেশাত্মবোধের সেই শক্তিকে জাগিয়ে তোলা এবং বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
বাংলাদেশ ও ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতা এক নয়। তবে ধর্মীয় বিদ্বেষ ও বিভাজনের বিরুদ্ধে দুই দেশের লড়াই অনেকখানি একই জায়গায় এসে মেলে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গরুভোজ ও গরু নিয়ে ভোজ মিছিলের নামে ভিন্ন ধর্মীয় অনুভূতিকে আঘাত করা হোক, কিংবা শিলিগুড়িতে ‘বিরিয়ানি খান, তবে হিন্দু রেস্টুরেন্টে’—এমন আহ্বানের মধ্য দিয়ে খাদ্যাভ্যাস ও ধর্মের ভিত্তিতে মানুষকে বিভক্ত করার অপচেষ্টা হোক, উভয়ের অন্তর্নিহিত রাজনীতি একই; মানুষের মধ্যে ঘৃণা, হিংসা, অবিশ্বাস আর বিভাজনের দেয়াল তুলে দেওয়া। এই দেয়াল ভাঙতে হবে সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মানবিকতার শক্তিতে।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৭ অক্টোবর ২০২৬
এ কোন্ বাংলাদেশ, এ কোন্ ভারতবর্ষ আজ আমরা দেখছি? ধর্মীয় বিভাজন আর ভেদবিভেদের নোংরা রাজনীতি সমাজকে বিষাক্ত করে তুলছে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান শারদীয় দুর্গাপূজার সময় আমরা দেখলাম, রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের নামে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রশিবির ক্যাম্পাসে গরু জবাই করে ভোজের আয়োজন করেছে। এর আগে গরু নিয়ে ভোজ মিছিলও করেছে। সঙ্গে ছিল রংবেরঙের তরুণ ইউনূস বাহিনী। এসব ঘটনায় সাহসী হয়ে জামাত শিবির বাহিনী পিরোজপুরে মুক্তিযোদ্ধা মানিক পসারির দাফন কার্যক্রমসহ পরিবারের স্বাভাবিক ধর্মীয় আচারে এবং মুক্তিযোদ্ধার অন্তিম সম্মান প্রদানে বাধা দিলো। আর কয়েক দিন আগে পত্রিকায় দেখলাম, পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি শহরজুড়ে পোস্টার সাঁটানো হয়েছে—‘হিন্দুর দোকান থেকে মাংস কিনুন। বিরিয়ানি খান, তবে হিন্দু রেস্টুরেন্টে’। আমাদের কিংবা আমাদের জ্যেষ্ঠ প্রজন্মের কাছে এসব কথা ও দৃশ্য তো একান্তই অজানা, অচেনা।
পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুত্ববাদী নতুন মুখ্যমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পরে প্রথম যে কাজটি করলেন, তা হলো প্রায় একশ বছর ধরে কলকাতায় ঈদের প্রধান জামাত রেড রোডে অনুষ্ঠিত হয়ে এলেও যানজটের অজুহাতে সেখানে এর আয়োজন বন্ধ করে দেওয়া। অথচ, কয়েক দিন পরেই এই রেড রোড তিন দিনের যোগ দিবসের জন্য সপ্তাহব্যাপী বন্ধ রাখা হলো।
এদিকে আবার শারদোৎসবে কেন মুসলিম সম্প্রদায়ের কেউ ভিন্ন ধর্মের প্রতি সম্মান জানাতে পূজামণ্ডপে যাবেন, তা নিয়ে ইসলামি উগ্রবাদীরা বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অবিরাম কুরুচিপূর্ণ প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ ইসলাম ধর্মে বহুত্ববাদ ও ভিন্ন ধর্মের প্রতি সহিষ্ণুতা ও সম্মান প্রদর্শন অত্যন্ত মৌলিক এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি নীতি। ইসলাম মনে করে, পৃথিবীতে বিভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মের মানুষের উপস্থিতি আল্লাহর ইচ্ছারই অংশ।
নড়াইল শহরের চিত্রা নদীর পাড় ঘেঁষে সুন্দর, ছিমছাম একটি রিসোর্ট আছে—নাম চিত্রা রিসোর্ট। প্রথমবার সেখানে গিয়ে নদীর অপর পাড়ের মহিষখোলা পুরোনো রেজিস্ট্রি অফিসের পাশে একটি টং দোকানে চা খাওয়ার সময় আমার স্ত্রী দোকানিকে জিজ্ঞেস করলেন, এখানে দেখার মতো কী আছে? দোকানি সরাসরি সামনের দিকে আঙুল নির্দেশ করে বললেন, “অই মন্দির আর মসজিদডা দেহেন।” চার দশক ধরে একেবারে পাশাপাশি অবস্থিত সাব-রেজিস্ট্রি অফিস জামে মসজিদ এবং মহিষখোলা সার্বজনীন পূজামন্দির সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। বুঝলাম, ধর্মীয় সম্প্রীতির এমন উজ্জ্বল নিদর্শন এলাকার সাধারণ মানুষের কাছেও গর্বের, অহংকারের। দোকানির কাছ থেকেই শুনলাম, শহরের কুড়িগ্রাম এলাকায় নিশিনাথতলা মন্দির ও পুলিশ ফাঁড়ি জামে মসজিদ এবং পুলিশ লাইন জামে মসজিদ ও সর্বমঙ্গলা মন্দিরও পাশাপাশি অবস্থিত।
এ ছাড়া পত্রিকায় তো এ ধরনের সংবাদ প্রায়ই প্রকাশিত হয়। টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলা সদরে একই সীমানাপ্রাচীরের মধ্যে বাঁ পাশে মসজিদ ও ডান পাশে মন্দির অবস্থিত। প্রায় ৫৬ বছর ধরে একই প্রাঙ্গণে সহাবস্থান করছে এই দুই উপাসনালয়। ফেনী শহরের প্রাণকেন্দ্রে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে শতবর্ষী জয় কালী মন্দির এবং ফেনী কেন্দ্রীয় বড় জামে মসজিদ। লালমনিরহাটের পুরোনো বাজার এলাকায় রয়েছে প্রায় দুই শত বছরের প্রাচীন কালীমন্দির। তার পাশেই রয়েছে এক শত বছরের পুরোনো বাজার জামে মসজিদ। মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার ভূঁয়াই বাজার এলাকায় প্রায় ৫০ বছর আগে পাশাপাশি নির্মাণ করা হয় মসজিদ ও মন্দির—যা এলাকায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সাক্ষী হয়ে আছে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাশাপাশি এ ধরনের আরও মসজিদ ও মন্দির রয়েছে। এসব স্থানে একই আঙিনায় পূজার্চনা ও নামাজ আদায় চলছে। স্থানীয় হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায় এসব মন্দির ও মসজিদকে কেন্দ্র করে নিজ নিজ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে পালন করছেন। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কথা শোনা যায় না। মসজিদে নামাজের সময় এসব মন্দিরের ঢাক, উলুধ্বনি ও সাউন্ড সিস্টেম বন্ধ রাখা হয়। ফলে মুসল্লিরা সম্পূর্ণ নিরবচ্ছিন্নভাবে নামাজ আদায় করতে পারেন। আবার পূজা-পার্বণেও মসজিদের মুসল্লিরা সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসেন। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও ভিন্ন ধর্মের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের সংস্কৃতিকে ধারণ করে একই আঙিনায় এভাবে চলছে আজান ও উলুধ্বনি। একই উঠানে জ্বলতে থাকা প্রদীপ আর মিনারের সুর দুই সম্প্রদায়কে বেঁধে রেখেছে শতবর্ষের সম্প্রীতির বন্ধনে। অথচ মসজিদের সামনে শূকরের মাংস রান্নার আয়োজন হলে যারা আপত্তি করতেন, মন্দিরের কাছে গরুর মাংস রান্নায় হিন্দু শিক্ষার্থীদের আপত্তি বুঝতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই সব তরুণের অসুবিধা কোথায়?
ভারতবর্ষেও বিভিন্ন স্থানে—যেমন কলকাতা, হুগলি, ঝাড়গ্রাম, মথুরা, বারাণসী, নয়ডা, শ্রীনগর এবং কর্ণাটক ও কেরালার বিভিন্ন এলাকাসহ বহু স্থানে—মন্দির ও মসজিদ পাশাপাশি, একই সীমানার মধ্যে রয়েছে। সে আলোচনায় না গিয়ে ভিন্ন একটি ঘটনার উল্লেখ করছি, যা ২০২২ সালে পত্রপত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বহুল প্রচারিত হয়েছিল। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে গোটা ভারতবর্ষ যখন বিপর্যস্ত, সেই সময় কেরালার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মৃত্যুপথযাত্রী এক মুসলিম নারীকে কলেমা পড়ে শুনিয়েছিলেন এক নারী চিকিৎসক। ৫৬ বছর বয়সী কোভিড রোগী বিভাথু ১৭ দিন আইসিইউতে কেরালার একটি হাসপাতালে ভেন্টিলেটর সাপোর্টে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তিনি যখন নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঢলে পড়ছিলেন, তখন ধর্মবিশ্বাসে হিন্দু চিকিৎসক রেখা কৃষ্ণান মুসলিমদের জন্য দোয়া বা প্রার্থনার কলেমা পাঠ করতে থাকেন। তিনি যখন কলেমার পঙ্ক্তিগুলো পড়ছিলেন, রোগী ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
ডাক্তার রেখা বলেন, “প্রায় ১৭ দিন ধরে বিভাথুর চিকিৎসা চলছিল। এ সময় তার ছেলে ও জামাই প্রবল বৃষ্টি কিংবা লকডাউন উপেক্ষা করে প্রতিদিন হাসপাতালে আসতেন, শুধু তাদের মায়ের খোঁজখবর নিতে। ভেতরে ঢুকতে না পারলেও তারা শুধু আমাকে দেখতে এবং তার অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ নিতে পার্কিং লটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকতেন। তারা এও জানতেন যে তার স্বাস্থ্যের উন্নতি হবে না। তবুও মনের শান্তি পেতে তারা প্রতিদিন ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। যখন আমি ভাবলাম, তার শেষ মুহূর্তে তারা পাশে থাকলে কী করতেন, তখন আমি প্রার্থনাটি জপ করতে শুরু করলাম।” ডক্টর রেখা বলেন, তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতে বড় হয়েছেন। এ কারণে তিনি ইসলামি প্রার্থনা জানতেন।
কেরালায় যখন ডা. রেখা এ মানবিক দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করলেন, তখন নরেন্দ্র মোদির গুজরাটে ঘটল উল্টো ঘটনা। সেখানে হিন্দু-মুসলিম বিভাজন করে করোনা আক্রান্ত হিন্দুদের রাখার জন্য একটি ওয়ার্ড এবং মুসলিম রোগীদের জন্য পৃথক ওয়ার্ড তৈরি করা হলো। হিন্দুদের ওয়ার্ডে ঠাঁই পেতেন না মুসলিম রোগীরা, আর মুসলিমদের ওয়ার্ডে রাখা হতো না হিন্দুদের। এটি শুধু অমানবিক ঘটনা নয়, অসাংবিধানিকও। কারণ, ভারতীয় সংবিধান অনুসারে ধর্মের ভিত্তিতে যত ভারতীয়কে এভাবে আলাদা করে দেখা যায় না। কিন্তু মোদির ভারতে সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে, গায়ের জোরে ও কৌশলী ভোটের জোরে এ বিভাজন আজ চরম পর্যায়ে চলে গেছে।
নিরঙ্কুশ বিজয় নিশ্চিত করার লক্ষ্য থেকে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) নামে লক্ষ লক্ষ ভোটারকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক নির্বাচনে এসআইআরের আওতায় পরিকল্পিতভাবে ২০ লক্ষেরও বেশি ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দিয়ে বিজেপির বিজয় নিশ্চিত করা হয়েছে। এর আগে একই ঘটনা ঘটেছে বিহারে। সেখানে ৫২ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়েছে। আসামে নাগরিকপঞ্জি হওয়ার পর ১৯ লাখ মানুষ তার বাইরে রয়েছেন। সারা দেশজুড়ে এ প্রক্রিয়া চলছে। সব ক্ষেত্রেই সংখ্যালঘু, বিশেষত মুসলিম সম্প্রদায়, আদিবাসী ও দলিত সম্প্রদায় এবং জনজাতিগোষ্ঠীর মানুষেরা এই তথাকথিত এসআইআরের শিকারে পরিণত হচ্ছেন। নির্বাচন কমিশনের এসব সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বাদ-প্রতিবাদ করলেও বিশেষ সুবিধা করতে পারেনি।
কিন্তু অতিসম্প্রতি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বিরোধী আন্দোলনে এক নাটকীয় পরিবর্তন ও নতুন গতি সৃষ্টি করে। নিয়ম অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের শীর্ষে নিযুক্ত তিনজন সম-পদমর্যাদার নির্বাচন কমিশনার মতবিনিময় করে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে বা সর্বসম্মতিক্রমে নির্বাচনপ্রক্রিয়া-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, বহু ক্ষেত্রে দুজন নির্বাচন কমিশনারের আপত্তি সত্ত্বেও, এমনকি তাদের অন্ধকারে রেখে, গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ও অনেক নির্দেশ জারি করা হয়েছে। সেসব নির্দেশের বেশির ভাগই ছিল ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর-সংক্রান্ত, যার সঙ্গে ভোটার তালিকা থেকে ভোটারদের বাদ পড়ার বিষয়টি সরাসরি যুক্ত। অনেকটা আগুনে ঘি ঢালার মতো এ সংবাদ বিরোধী আন্দোলনে নতুন গতি সঞ্চার করে।
গোটা ভারতবর্ষে সাড়া জাগানো তরুণদের একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ককরোচ জনতা পার্টি, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে নানামুখী কর্মসূচি গ্রহণ করে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও তাতে সমর্থন জানালে দিল্লিসহ সারা ভারতবর্ষজুড়ে ছাত্র-তরুণ, বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা রাজপথে নেমে আসেন। লক্ষণীয় বিষয় হলো, ধীরে ধীরে রাজনৈতিক নেতৃত্ব আন্দোলনের স্টিয়ারিংয়ে আসছেন। তরুণদের নেতৃত্বে শুধু ‘ককরোচ’রাই নয়, বরং বামপন্থী ছাত্রী নেত্রী নেহা বোরাও আইকন হয়ে উঠছেন। বাংলাদেশ প্রসঙ্গে একটি মন্তব্য (যা খণ্ডিতভাবে প্রচার করা হয়, পরে তিনি ব্যাখ্যা দিয়ে শুধরে নিয়েছেন) করা ছাড়া তিনি এ আন্দোলনে গভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। ঐশী ঘোষসহ আরও বেশ কয়েকজন বামপন্থী ছাত্রনেতা-নেত্রীও আন্দোলনের মুখ হয়ে উঠছেন।
যুদ্ধ পরিস্থিতির মতো প্রস্তুতি নিয়ে দিল্লিতে বিরোধী আন্দোলন সামাল দিলেও মোদি সরকার ও তার অনুসৃত সাম্প্রদায়িক নীতিসমূহ সরাসরি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। মোদি ও অমিত শাহর কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ছে। ভারতবর্ষের সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি তুলে দেওয়ার যে স্বপ্ন তারা দেখছেন, তা কি কার্যকর করা যাবে? এই তরুণদের বড় অংশই আগামী নির্বাচনে নতুন ভোটার হিসেবে অংশ নেবেন। এই তরুণদের বাবা-মা, কাকা-কাকিরাই তো বিগত দুটি নির্বাচনে বিজেপিকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসিয়েছিলেন। তাদের সন্তানেরাই আজ নতুন পথের সন্ধান করছেন—যা তাদের অভিভাবকদের চিন্তার জগৎকেও প্রভাবিত করছে।
বাংলাদেশেও শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর উগ্র ধর্মান্ধ শক্তি ও ছাত্রনেতৃত্বের একাংশ ক্ষমতা দখলের যে স্বপ্নে বিভোর হয়েছিল, তাতে এখন অনেকটাই ভাটার টান। ইউনূস আমলে সরকারের ওপর তাদের যে নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব ছিল, তা ক্রমেই শিথিল হচ্ছে। আর নিয়ন্ত্রণের রাশ যত আলগা হচ্ছে, ততই তাদের আচরণ, বক্তব্য ও শারীরিক ভাষায় ফুটে উঠছে এক অদ্ভুত দ্বৈততা—একদিকে উগ্রতার আস্ফালন, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান ভীতি ও অস্থিরতা।
অন্যদিকে, হিন্দুধর্মের বহুত্ববাদী ও যুক্তিনির্ভর ঐতিহ্যকে আড়াল করে উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি ভারতের বহুভাষিক, বহুধর্মীয়, বহুজাতিসত্তার ও বহুসংস্কৃতির বৈচিত্র্যময় সমাজকে কর্তৃত্ববাদী সাম্প্রদায়িকতার ছাঁচে বন্দি করতে চাইছে। কিন্তু ভারতবর্ষের নতুন প্রজন্ম সেই বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে আসছে। এই প্রতিরোধ কেবল ভারতের ভবিষ্যতের জন্য নয়, উপমহাদেশের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার জন্যও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
সাম্প্রদায়িকতার এই অন্ধকার ভেদ করার এক অন্তর্নিহিত শক্তি মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের মধ্যেও রয়েছে। রয়েছে বলেই তো জুলাই আন্দোলনে যেসব ছদ্মবেশী ছাত্রনেতৃত্বের মধ্যে কৌশলী অবস্থান নিয়েছিলেন, তাদেরও মাথায় লাল-সবুজের পট্টি বাঁধতে হয়েছিল, আর সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের মতো তাদেরও কণ্ঠে তুলে নিতে হয়েছিল ‘আমার সোনার বাংলা ….’-এর পাশাপাশি ‘ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা …’, ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে …’, ‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে …’, ‘মোরা একটি ফুলকে …’, ‘ও আমার দেশের মাটি …’—এসব দেশাত্মবোধক গান। আজ খুব বেশি প্রয়োজন দেশাত্মবোধের সেই শক্তিকে জাগিয়ে তোলা এবং বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
বাংলাদেশ ও ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতা এক নয়। তবে ধর্মীয় বিদ্বেষ ও বিভাজনের বিরুদ্ধে দুই দেশের লড়াই অনেকখানি একই জায়গায় এসে মেলে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গরুভোজ ও গরু নিয়ে ভোজ মিছিলের নামে ভিন্ন ধর্মীয় অনুভূতিকে আঘাত করা হোক, কিংবা শিলিগুড়িতে ‘বিরিয়ানি খান, তবে হিন্দু রেস্টুরেন্টে’—এমন আহ্বানের মধ্য দিয়ে খাদ্যাভ্যাস ও ধর্মের ভিত্তিতে মানুষকে বিভক্ত করার অপচেষ্টা হোক, উভয়ের অন্তর্নিহিত রাজনীতি একই; মানুষের মধ্যে ঘৃণা, হিংসা, অবিশ্বাস আর বিভাজনের দেয়াল তুলে দেওয়া। এই দেয়াল ভাঙতে হবে সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মানবিকতার শক্তিতে।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

আপনার মতামত লিখুন