সংবাদ

৩২ পদের বিপরীতে ১২ ডাক্তার, মেঝেতেই চলছে চিকিৎসা


প্রতিনিধি, চুনারুঘাট (হবিগঞ্জ)
প্রতিনিধি, চুনারুঘাট (হবিগঞ্জ)
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১:২৭ এএম

৩২ পদের বিপরীতে ১২ ডাক্তার, মেঝেতেই চলছে চিকিৎসা
ছবি : সংবাদ

হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তীব্র জনবলসংকট ও শয্যার তুলনায় অতিরিক্ত রোগীর চাপে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এক প্রকার ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। ৩২ জন চিকিৎসকের পদ ফাঁকা পড়ে থাকলেও কর্মরত আছেন মাত্র ১২ জন। এর ওপর ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ১৬০ থেকে ১৭০ জন রোগী ভর্তি থাকছেন এবং বহির্বিভাগে সেবা নিচ্ছেন শত শত মানুষ। বাধ্য হয়ে মেঝে ও বারান্দায় গাদাগাদি করে চিকিৎসা নিচ্ছেন রোগীরা।

সম্প্রতি হাসপাতালটিতে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক চিত্র। ৫০টি বেডের প্রতিটিতে দুজন করে রোগী গাদাগাদি করে শুয়ে আছেন। ওয়ার্ডে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। জায়গা না পেয়ে বহু রোগী বাধ্য হয়ে মেঝে, বারান্দা এমনকি সিঁড়ির নিচে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। জানালার গ্রিলে ঝুলছে স্যালাইন।

উপজেলার গাজীপুর ইউনিয়ন থেকে বাবাকে নিয়ে আসা ষাটোর্ধ্ব জমির আলী আক্ষেপ করে বলেন, “তিন দিন ধইরা বাবারে লইয়া আইছি। একটা সিট পাইছি না, নিচেই শুইয়া আছে।”

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন হাসপাতালের বহির্বিভাগে (আউটডোর) ৫শ থেকে ৬শ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। এর মধ্যে ৩০ থেকে ৪০ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। এ ছাড়া জরুরি বিভাগে ২৪ ঘণ্টায় আসেন আরও শতাধিক রোগী। অথচ বর্তমানে ১২ জন চিকিৎসকের মধ্যে ২ জন প্রশিক্ষণে এবং ১ জন ছুটিতে রয়েছেন। মাত্র ৯ জন চিকিৎসক দিয়ে পুরো হাসপাতালের সেবা সামলাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্তব্যরত চিকিৎসক বলেন, 'আমরা ২৪ ঘণ্টা ডিউটি করেও কুলিয়ে উঠতে পারছি না। একজন চিকিৎসককে তিনজনের কাজ করতে হচ্ছে।'

শুধু চিকিৎসক নয়, হাসপাতালটিতে রয়েছে তীব্র নার্স ও কর্মী সংকট। ৩২টি নার্স পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ২২ জন। বহির্বিভাগে ওষুধ বিতরণের জন্য ফার্মাসিস্টের পদ শূন্য রয়েছে। ১৫ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর জায়গায় কাজ করছেন মাত্র তিনজন। এ ছাড়া টিকিট কাউন্টারে কোনো ক্লার্ক না থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগীরা।

চুনারুঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোজাম্মেল হোসেন বলেন, 'ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বারবার চিঠি দিয়েও সুফল মিলছে না। ৩২ জনের জায়গায় ১২ জন দিয়ে তিন লক্ষাধিক মানুষের সেবা দেওয়া অসম্ভব। মানবিক কারণে আমরা কোনো রোগীকে ফেরাতে পারি না, তাই বাধ্য হয়ে মেঝেতেই চিকিৎসা দিচ্ছি। ৫০ শয্যা থেকে হাসপাতালটিকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা এখন সময়ের দাবি।'

চুনারুঘাট প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, 'চুনারুঘাট একটি বড় উপজেলা, যেখানে চা-শ্রমিকসহ নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাস বেশি। তাদের একমাত্র ভরসা এই সরকারি হাসপাতাল। কিন্তু এখানে চিকিৎসক ও শয্যা নেই। আমরা অবিলম্বে পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও জনবল নিয়োগের দাবি জানাচ্ছি।'

পাশাপাশি হাসপাতালের পুরোনো ভবনটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকলেও স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। দ্রুত এই সংকট নিরসন না হলে উপজেলার চিকিৎসাসেবা পুরোপুরি ধসে পড়ার আশঙ্কা করছেন সচেতন মহল।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬


৩২ পদের বিপরীতে ১২ ডাক্তার, মেঝেতেই চলছে চিকিৎসা

প্রকাশের তারিখ : ২৭ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তীব্র জনবলসংকট ও শয্যার তুলনায় অতিরিক্ত রোগীর চাপে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এক প্রকার ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। ৩২ জন চিকিৎসকের পদ ফাঁকা পড়ে থাকলেও কর্মরত আছেন মাত্র ১২ জন। এর ওপর ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ১৬০ থেকে ১৭০ জন রোগী ভর্তি থাকছেন এবং বহির্বিভাগে সেবা নিচ্ছেন শত শত মানুষ। বাধ্য হয়ে মেঝে ও বারান্দায় গাদাগাদি করে চিকিৎসা নিচ্ছেন রোগীরা।

সম্প্রতি হাসপাতালটিতে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক চিত্র। ৫০টি বেডের প্রতিটিতে দুজন করে রোগী গাদাগাদি করে শুয়ে আছেন। ওয়ার্ডে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। জায়গা না পেয়ে বহু রোগী বাধ্য হয়ে মেঝে, বারান্দা এমনকি সিঁড়ির নিচে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। জানালার গ্রিলে ঝুলছে স্যালাইন।

উপজেলার গাজীপুর ইউনিয়ন থেকে বাবাকে নিয়ে আসা ষাটোর্ধ্ব জমির আলী আক্ষেপ করে বলেন, “তিন দিন ধইরা বাবারে লইয়া আইছি। একটা সিট পাইছি না, নিচেই শুইয়া আছে।”

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন হাসপাতালের বহির্বিভাগে (আউটডোর) ৫শ থেকে ৬শ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। এর মধ্যে ৩০ থেকে ৪০ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। এ ছাড়া জরুরি বিভাগে ২৪ ঘণ্টায় আসেন আরও শতাধিক রোগী। অথচ বর্তমানে ১২ জন চিকিৎসকের মধ্যে ২ জন প্রশিক্ষণে এবং ১ জন ছুটিতে রয়েছেন। মাত্র ৯ জন চিকিৎসক দিয়ে পুরো হাসপাতালের সেবা সামলাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্তব্যরত চিকিৎসক বলেন, 'আমরা ২৪ ঘণ্টা ডিউটি করেও কুলিয়ে উঠতে পারছি না। একজন চিকিৎসককে তিনজনের কাজ করতে হচ্ছে।'

শুধু চিকিৎসক নয়, হাসপাতালটিতে রয়েছে তীব্র নার্স ও কর্মী সংকট। ৩২টি নার্স পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ২২ জন। বহির্বিভাগে ওষুধ বিতরণের জন্য ফার্মাসিস্টের পদ শূন্য রয়েছে। ১৫ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর জায়গায় কাজ করছেন মাত্র তিনজন। এ ছাড়া টিকিট কাউন্টারে কোনো ক্লার্ক না থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগীরা।

চুনারুঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোজাম্মেল হোসেন বলেন, 'ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বারবার চিঠি দিয়েও সুফল মিলছে না। ৩২ জনের জায়গায় ১২ জন দিয়ে তিন লক্ষাধিক মানুষের সেবা দেওয়া অসম্ভব। মানবিক কারণে আমরা কোনো রোগীকে ফেরাতে পারি না, তাই বাধ্য হয়ে মেঝেতেই চিকিৎসা দিচ্ছি। ৫০ শয্যা থেকে হাসপাতালটিকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা এখন সময়ের দাবি।'

চুনারুঘাট প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, 'চুনারুঘাট একটি বড় উপজেলা, যেখানে চা-শ্রমিকসহ নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাস বেশি। তাদের একমাত্র ভরসা এই সরকারি হাসপাতাল। কিন্তু এখানে চিকিৎসক ও শয্যা নেই। আমরা অবিলম্বে পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও জনবল নিয়োগের দাবি জানাচ্ছি।'

পাশাপাশি হাসপাতালের পুরোনো ভবনটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকলেও স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। দ্রুত এই সংকট নিরসন না হলে উপজেলার চিকিৎসাসেবা পুরোপুরি ধসে পড়ার আশঙ্কা করছেন সচেতন মহল।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত