দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি এখন এক ভয়াবহ মহামারির রূপ নিয়েছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। পরপর দুদিনে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মোট ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে, আগের দিনে আক্রান্ত হয়েছে ২ হাজার ৭১ জন আর গেল ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতাল রোগী ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৯৮২ রোগী।
সব মিলিয়ে দুদিনে আক্রান্ত হয়েছে ৪ হাজার ৫৩ জন রোগী। যা চলতি মৌসুমে একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড। শুধু মৃতের সংখ্যা নয়, হাসপাতালে নতুন রোগীর ভিড়ও বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে। এডিস মশাবাহিত এই রোগটি এখন সব বয়সী মানুষের জন্যই বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ বুলেটিন অনুযায়ী, বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৯৮২ জন। এর আগের দিন মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ডেঙ্গুতে একদিনে সর্বোচ্চ ১১ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট প্রাণহানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০৯ জনে।
মৃতদের মধ্যে বুধবারের ২৪ ঘণ্টায় ছয়জনই ঢাকা বিভাগের। এছাড়া একজন করে মারা গেছেন চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহী বিভাগে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মোট হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৩০ হাজার ২১৯ জন। যার মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ লাখ ২৩ হাজার ৬০৫ জন।
নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে ঢাকা বিভাগেই সবচেয়ে বেশি—৮১৬ জন। অন্যান্য বিভাগের মধ্যে বরিশালে ১৯৪ জন, চট্টগ্রামে ৩১৩ জন, খুলনায় ২১৪ জন, ময়মনসিংহে ৮৪ জন, রাজশাহীতে ২১৭ জন, রংপুরে ১১৬ জন এবং সিলেট বিভাগের হাসপাতালগুলোতে ২৮ জন ভর্তি হয়েছেন।
দেখা যাচ্ছে, শুধু রাজধানী নয়, ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতেও ডেঙ্গুর প্রকোপ ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ছে, অনেকে বেড না পেয়ে মেঝেতে বা করিডোরে চিকিৎসা নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষা মৌসুম শেষ হলেও ডেঙ্গুর প্রকোপ একেবারেই কমেনি। এর প্রধান দুটি কারণ—এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস না হওয়া এবং সিটি করপোরেশনগুলোর মশক নিধন কার্যক্রমে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি। বর্তমানে যেসব জায়গায় মশক নিধনে অভিযান চালানো হচ্ছে, সেগুলোতে কয়েকদিন পর আবারই এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জটিল রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। অনেকেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে দেরি করছেন। এ কারণে মৃত্যুর হারও বেড়ে যাচ্ছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, হঠাৎ করে তীব্র জ্বরের সঙ্গে শরীর ব্যথা, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা বা গায়ে লালচে দাগ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর প্লেটলেট কাউন্ট কমে গেলেও অনেক সময় রোগী নিজে বুঝতে পারেন না। তাই জ্বরকে অবহেলা করা যাবে না।
এডিস মশার প্রজনন রোধে ঘরের ভেতরে ও আশপাশে জমে থাকা পানি পরিষ্কার রাখা, ফুলের টব, পুরনো টায়ার বা কৌটায় পানি জমতে না দেওয়া এবং নিয়মিত মশারি ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল—১ হাজার ৭০৫ জন। ওই বছর ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন। গত বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয় চার শতাধিক মানুষের, শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২ হাজারের বেশি।
এ বছর এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়ে গেলেও, আক্রান্ত ও মৃত্যুর গতিপথ দেখে আশঙ্কা করা হচ্ছে—ডিসেম্বরের আগেই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। ডেঙ্গু মোকাবিলায় সিটি করপোরেশনগুলোকে আরও কার্যকর মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ অক্টোবর ২০২৬
দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি এখন এক ভয়াবহ মহামারির রূপ নিয়েছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। পরপর দুদিনে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মোট ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে, আগের দিনে আক্রান্ত হয়েছে ২ হাজার ৭১ জন আর গেল ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতাল রোগী ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৯৮২ রোগী।
সব মিলিয়ে দুদিনে আক্রান্ত হয়েছে ৪ হাজার ৫৩ জন রোগী। যা চলতি মৌসুমে একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড। শুধু মৃতের সংখ্যা নয়, হাসপাতালে নতুন রোগীর ভিড়ও বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে। এডিস মশাবাহিত এই রোগটি এখন সব বয়সী মানুষের জন্যই বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ বুলেটিন অনুযায়ী, বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৯৮২ জন। এর আগের দিন মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ডেঙ্গুতে একদিনে সর্বোচ্চ ১১ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট প্রাণহানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০৯ জনে।
মৃতদের মধ্যে বুধবারের ২৪ ঘণ্টায় ছয়জনই ঢাকা বিভাগের। এছাড়া একজন করে মারা গেছেন চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহী বিভাগে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মোট হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৩০ হাজার ২১৯ জন। যার মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ লাখ ২৩ হাজার ৬০৫ জন।
নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে ঢাকা বিভাগেই সবচেয়ে বেশি—৮১৬ জন। অন্যান্য বিভাগের মধ্যে বরিশালে ১৯৪ জন, চট্টগ্রামে ৩১৩ জন, খুলনায় ২১৪ জন, ময়মনসিংহে ৮৪ জন, রাজশাহীতে ২১৭ জন, রংপুরে ১১৬ জন এবং সিলেট বিভাগের হাসপাতালগুলোতে ২৮ জন ভর্তি হয়েছেন।
দেখা যাচ্ছে, শুধু রাজধানী নয়, ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতেও ডেঙ্গুর প্রকোপ ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ছে, অনেকে বেড না পেয়ে মেঝেতে বা করিডোরে চিকিৎসা নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষা মৌসুম শেষ হলেও ডেঙ্গুর প্রকোপ একেবারেই কমেনি। এর প্রধান দুটি কারণ—এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস না হওয়া এবং সিটি করপোরেশনগুলোর মশক নিধন কার্যক্রমে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি। বর্তমানে যেসব জায়গায় মশক নিধনে অভিযান চালানো হচ্ছে, সেগুলোতে কয়েকদিন পর আবারই এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জটিল রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। অনেকেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে দেরি করছেন। এ কারণে মৃত্যুর হারও বেড়ে যাচ্ছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, হঠাৎ করে তীব্র জ্বরের সঙ্গে শরীর ব্যথা, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা বা গায়ে লালচে দাগ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর প্লেটলেট কাউন্ট কমে গেলেও অনেক সময় রোগী নিজে বুঝতে পারেন না। তাই জ্বরকে অবহেলা করা যাবে না।
এডিস মশার প্রজনন রোধে ঘরের ভেতরে ও আশপাশে জমে থাকা পানি পরিষ্কার রাখা, ফুলের টব, পুরনো টায়ার বা কৌটায় পানি জমতে না দেওয়া এবং নিয়মিত মশারি ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল—১ হাজার ৭০৫ জন। ওই বছর ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন। গত বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয় চার শতাধিক মানুষের, শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২ হাজারের বেশি।
এ বছর এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়ে গেলেও, আক্রান্ত ও মৃত্যুর গতিপথ দেখে আশঙ্কা করা হচ্ছে—ডিসেম্বরের আগেই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। ডেঙ্গু মোকাবিলায় সিটি করপোরেশনগুলোকে আরও কার্যকর মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

আপনার মতামত লিখুন