ক্রমবর্ধমান খাদ্যচাহিদা ও সীমিত কৃষিজমির বাস্তবতায় প্রতি একক জমির উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। এ ক্ষেত্রে উচ্চফলনশীল জাতের সম্প্রসারণ জরুরি। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ কৃষির জন্য মূল্যবান স্থানীয় জাতের জিনগত সম্পদ সংরক্ষণ করাও প্রয়োজন। এ জন্য দরকার বুদ্ধিমান ও ভারসাম্যপূর্ণ জাতনীতি।
বাংলাদেশের কৃষি আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রশ্নটি আর শুধু ‘কী চাষ করব’—এতে সীমাবদ্ধ নেই। বড় প্রশ্ন হলো, ক্রমশ কমতে থাকা কৃষিজমি থেকে ক্রমবর্ধমান মানুষের জন্য কীভাবে আরও বেশি খাদ্য উৎপাদন করা যাবে? একদিকে বাড়ছে জনসংখ্যা, খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদা। অন্যদিকে কৃষিজমি সীমিত, উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং জলবায়ু পরিবর্তন কৃষিকে নতুন নতুন ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এই বাস্তবতায় কৃষিজমির পরিমাণ বাড়ানোর সুযোগ যতটা সীমিত, প্রতি একক জমির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর প্রয়োজন ততটাই অনিবার্য।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় উচ্চফলনশীল জাতের সম্প্রসারণ কোনো সাময়িক প্রবণতা নয়। এটি খাদ্যনিরাপত্তার বৃহত্তর প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত একটি কৃষিগত বাস্তবতা। একই জমিতে বেশি ফলন, স্বল্প জীবনকাল, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা এবং অঞ্চলভেদে উপযোগী বৈশিষ্ট্যের কারণে উচ্চফলনশীল জাত কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। তবে এই পরিবর্তনের অর্থ স্থানীয় জাতকে অস্বীকার করা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, কোন জাত কোথায় কৃষকের জন্য বেশি লাভজনক, জাতীয় খাদ্যচাহিদা পূরণে বেশি কার্যকর এবং ভবিষ্যৎ কৃষির জন্য বেশি মূল্যবান?
সুতরাং উচ্চফলনশীল জাত ও স্থানীয় জাতের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি করার চেয়ে প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক একটি বুদ্ধিমান জাতনীতি। যেখানে অধিক উৎপাদন জরুরি, সেখানে উচ্চফলনশীল জাতের সম্প্রসারণ করতে হবে। আর যেসব স্থানীয় জাতের মধ্যে ভবিষ্যতে নতুন জাত উদ্ভাবন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া কিংবা পুষ্টি ও খাদ্যসংস্কৃতির জন্য মূল্যবান বৈশিষ্ট্য রয়েছে, সেগুলো সংরক্ষণ করতে হবে। কারণ কৃষির ভবিষ্যৎ শুধু বেশি উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে না। এর জন্য উৎপাদনশীলতা, লাভজনকতা, অভিযোজনক্ষমতা ও জিনগত বৈচিত্র্যরে মধ্যে সঠিক ভারসাম্যও জরুরি।
বাংলাদেশের কৃষিতে স্থানীয় জাতের অবদান ঐতিহাসিক। কৃষকের বাছাই ও সংরক্ষণের মধ্য দিয়ে অঞ্চলভেদে নানা বৈশিষ্ট্যের জাত গড়ে উঠেছে। কোনোটি খরা সহনশীল, কোনোটি জলাবদ্ধতা বা লবণাক্ততা সহনশীল। কোনোটি আবার স্বাদ, পুষ্টিমান কিংবা স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত। এসব জাত আমাদের কৃষির ঐতিহ্য এবং মূল্যবান জিনগত সম্পদ। কিন্তু কৃষির প্রয়োজনও স্থির নয়। যে জাত একসময় একটি অঞ্চলের চাহিদা পূরণে যথেষ্ট ছিল, বৃহত্তর খাদ্যচাহিদার বাস্তবতায় তা সব ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নাও হতে পারে। বেশি ফলন, স্বল্প জীবনকাল, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ও বাজারের চাহিদা পূরণের সুবিধার কারণে উচ্চফলনশীল জাত কৃষির স্বাভাবিক বিবর্তনের অংশ হয়ে উঠেছে।
উচ্চফলনশীল জাতের সঙ্গে সেচ, সুষম সার, যান্ত্রিকীকরণ, উন্নত বালাই ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক চাষপদ্ধতির সমন্বয় কৃষির উৎপাদনক্ষমতায় বড় পরিবর্তন এনেছে। একই জমি থেকে বেশি ফলন এবং স্বল্প জীবনকালের জাতের মাধ্যমে একাধিক ফসল উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। সীমিত কৃষিজমির দেশে এই পরিবর্তনের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। অধিক ফলনের তাগিদে জমির উল্লম্ব উৎপাদন বৃদ্ধির এটিই একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ।
তবে বেশি ফলনই শেষ কথা নয়। কোনো জাতের ফলন বেশি হলেও উৎপাদন ব্যয় বেশি হলে, ঝুঁকি বাড়লে কিংবা বাজারমূল্য কমে গেলে কৃষকের প্রকৃত লাভ নাও বাড়তে পারে। তাই জাতের সাফল্য মাপতে হবে ফলনের পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয়, বাজারমূল্য, ঝুঁকি ও নিট আয়ের ভিত্তিতে। ভবিষ্যতের জাতনীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতি হেক্টরে সর্বোচ্চ ফলনের পাশাপাশি টেকসই সর্বোচ্চ নিট আয় নিশ্চিত করা।
জাত উন্নয়ন কর্মসূচির প্রত্যক্ষ ফল হলো নতুন জাত উদ্ভাবন, বীজ উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ ও সম্প্রসারণ। কিন্তু এর প্রকৃত সুফল আরও বিস্তৃত। এর মধ্যে রয়েছে কৃষকের আয় বৃদ্ধি, জাতীয় উৎপাদন বাড়ানো, খাদ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা, বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, উৎপাদনের ঝুঁকি কমানো এবং খাদ্যনিরাপত্তা শক্তিশালী করা। তাই শুধু কতটি নতুন জাত উদ্ভাবিত হলো, সেটিই বিবেচ্য হওয়া উচিত নয়। বরং দেখতে হবে, কৃষকের মাঠে এসব জাত কী পরিবর্তন আনতে পারল।
এখানে স্থানীয় জাত ও উচ্চফলনশীল জাতকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর প্রয়োজন নেই। উচ্চফলনশীল জাত যেখানে উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্য বেশি উপযোগী, সেখানে তার সম্প্রসারণ অগ্রাধিকার পাবে। অন্যদিকে স্থানীয় জাতের যেসব বৈশিষ্ট্য ভবিষ্যতের কৃষির জন্য মূল্যবান, সেগুলো সংরক্ষণ করতে হবে। অর্থাৎ প্রতিস্থাপন মানে বিলুপ্তি নয়; বরং প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন।
স্থানীয় জাতের গুরুত্ব এখানেই নতুনভাবে সামনে আসে। খরা, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা, তাপমাত্রা কিংবা নির্দিষ্ট রোগ সহনশীলতার মতো বৈশিষ্ট্য ভবিষ্যতে নতুন জাত উদ্ভাবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই সব স্থানীয় জাতকে বাণিজ্যিক চাষে ধরে রাখার প্রয়োজন না থাকলেও মূল্যবান জিনগত বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলা যাবে না। জিনব্যাংক, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মাঠপর্যায়ে সংরক্ষণের মাধ্যমে এই সম্পদ নিরাপদ রাখতে হবে।
জাত পরিবর্তনের সঙ্গে কৃষকের বীজ ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন এসেছে। একসময় কৃষক নিজের উৎপাদিত ফসল থেকে বীজ সংরক্ষণ করতেন, প্রতিবেশীর সঙ্গে বিনিময় করতেন। এখন প্রাতিষ্ঠানিক ও বাণিজ্যিক বীজব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। এর সুফল হলো মানসম্মত বীজ ও উন্নত প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার। তবে একই সঙ্গে বীজের মান, দাম, প্রাপ্যতা এবং কৃষকের পছন্দের স্বাধীনতা নিশ্চিত করাও জরুরি। ভবিষ্যতের উচ্চফলনশীল জাতকে তাই শুধু বেশি ফলন দিলেই চলবে না। সেগুলোকে হতে হবে জলবায়ু সহনশীল, রোগ প্রতিরোধী, পানি ও অন্যান্য উপকরণ সাশ্রয়ী এবং কৃষকের জন্য লাভজনক।
খরা, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা, তাপপ্রবাহ, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও নতুন রোগবালাইয়ের ঝুঁকি বিবেচনায় জাত উন্নয়নের লক্ষ্য আরও বিস্তৃত করতে হবে। এ জন্য প্রচলিত প্রজনন পদ্ধতির পাশাপাশি দ্রুত প্রজননপ্রযুক্তি (স্পিড ব্রিডিং) ও চিহ্নকনির্ভর নির্বাচন পদ্ধতির (মার্কার অ্যাসিস্টেড সিলেকশন) ব্যবহার বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জাতের মূল্যবান বৈশিষ্ট্য আধুনিক প্রজননপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। উৎপাদনশীলতা ও অভিযোজনক্ষমতার এই সমন্বয়ই হতে পারে ভবিষ্যতের জাত উন্নয়নের মূল শক্তি।
এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অঞ্চলভেদে জাতের ফলন, উৎপাদন ব্যয়, নিট আয়, ঝুঁকি ও পরিবেশের উপযোগিতা মূল্যায়ন করতে হবে। নতুন জাত অবমুক্তির ক্ষেত্রে কৃষকের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। মানসম্মত বীজের উৎপাদন ও সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি), গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি বীজ খাতের মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে মূল্যবান স্থানীয় জাত শনাক্ত করে সংরক্ষণ করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, জাতের সাফল্য মূল্যায়নের পদ্ধতিও বদলাতে হবে। শুধু ফলন নয়, কৃষকের নিট আয়, খাদ্যনিরাপত্তা, সম্পদের দক্ষ ব্যবহার, পরিবেশের ওপর প্রভাব ও জলবায়ু সহনশীলতাকেও মূল্যায়নের অংশ করতে হবে।
বাংলাদেশের কৃষিতে উচ্চফলনশীল জাতের গুরুত্ব ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। খাদ্যচাহিদা বাড়ছে, অথচ কৃষিজমি বাড়ছে না। ফলে প্রতি একক জমির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। তবে এই পরিবর্তন যেন একমুখী না হয়। সব অঞ্চলের মাটি, পানি, জলবায়ু ও বাজারের অবস্থা এক নয়। কোথাও সর্বোচ্চ ফলন গুরুত্বপূর্ণ, কোথাও খরা বা লবণাক্ততা সহনশীলতা। আবার কোথাও পুষ্টিমান কিংবা বাজারমূল্য বেশি গুরুত্ব পেতে পারে। তাই ভবিষ্যতের কৃষিনীতির মূল কথা হওয়া উচিত—‘এক জাত সবার জন্য’ নয়, বরং ‘উপযোগী অঞ্চলে উপযোগী জাত’।
কৃষির এই পরিবর্তনকে শুধু স্থানীয় জাতের জায়গায় উচ্চফলনশীল জাত বসানোর প্রক্রিয়া হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি আসলে সীমিত সম্পদে অধিক উৎপাদন, কৃষকের আয় বৃদ্ধি, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পরিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার একটি দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ। একটি ভালো জাত এক মৌসুমের ফলন বাড়াতে পারে। কিন্তু একটি দূরদর্শী জাতনীতি বদলে দিতে পারে একটি দেশের খাদ্যব্যবস্থার ভবিষ্যৎ।
আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত উৎপাদনে উচ্চফলন, কৃষকের জন্য বেশি নিট লাভ, জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা এবং ভবিষ্যতের জন্য জিনগত বৈচিত্র্য সংরক্ষণ। স্থানীয় জাত আমাদের কৃষির শিকড়, আর উচ্চফলনশীল জাত তার নতুন ডানা। শিকড়কে অস্বীকার করে নয়, বরং তার শক্তিকে কাজে লাগিয়েই কৃষিকে ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে নিতে হবে।
[লেখক: ব্যবস্থাপক (উদ্যান), বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)]

রোববার, ০১ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ নভেম্বর ২০২৬
ক্রমবর্ধমান খাদ্যচাহিদা ও সীমিত কৃষিজমির বাস্তবতায় প্রতি একক জমির উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। এ ক্ষেত্রে উচ্চফলনশীল জাতের সম্প্রসারণ জরুরি। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ কৃষির জন্য মূল্যবান স্থানীয় জাতের জিনগত সম্পদ সংরক্ষণ করাও প্রয়োজন। এ জন্য দরকার বুদ্ধিমান ও ভারসাম্যপূর্ণ জাতনীতি।
বাংলাদেশের কৃষি আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রশ্নটি আর শুধু ‘কী চাষ করব’—এতে সীমাবদ্ধ নেই। বড় প্রশ্ন হলো, ক্রমশ কমতে থাকা কৃষিজমি থেকে ক্রমবর্ধমান মানুষের জন্য কীভাবে আরও বেশি খাদ্য উৎপাদন করা যাবে? একদিকে বাড়ছে জনসংখ্যা, খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদা। অন্যদিকে কৃষিজমি সীমিত, উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং জলবায়ু পরিবর্তন কৃষিকে নতুন নতুন ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এই বাস্তবতায় কৃষিজমির পরিমাণ বাড়ানোর সুযোগ যতটা সীমিত, প্রতি একক জমির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর প্রয়োজন ততটাই অনিবার্য।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় উচ্চফলনশীল জাতের সম্প্রসারণ কোনো সাময়িক প্রবণতা নয়। এটি খাদ্যনিরাপত্তার বৃহত্তর প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত একটি কৃষিগত বাস্তবতা। একই জমিতে বেশি ফলন, স্বল্প জীবনকাল, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা এবং অঞ্চলভেদে উপযোগী বৈশিষ্ট্যের কারণে উচ্চফলনশীল জাত কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। তবে এই পরিবর্তনের অর্থ স্থানীয় জাতকে অস্বীকার করা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, কোন জাত কোথায় কৃষকের জন্য বেশি লাভজনক, জাতীয় খাদ্যচাহিদা পূরণে বেশি কার্যকর এবং ভবিষ্যৎ কৃষির জন্য বেশি মূল্যবান?
সুতরাং উচ্চফলনশীল জাত ও স্থানীয় জাতের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি করার চেয়ে প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক একটি বুদ্ধিমান জাতনীতি। যেখানে অধিক উৎপাদন জরুরি, সেখানে উচ্চফলনশীল জাতের সম্প্রসারণ করতে হবে। আর যেসব স্থানীয় জাতের মধ্যে ভবিষ্যতে নতুন জাত উদ্ভাবন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া কিংবা পুষ্টি ও খাদ্যসংস্কৃতির জন্য মূল্যবান বৈশিষ্ট্য রয়েছে, সেগুলো সংরক্ষণ করতে হবে। কারণ কৃষির ভবিষ্যৎ শুধু বেশি উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে না। এর জন্য উৎপাদনশীলতা, লাভজনকতা, অভিযোজনক্ষমতা ও জিনগত বৈচিত্র্যরে মধ্যে সঠিক ভারসাম্যও জরুরি।
বাংলাদেশের কৃষিতে স্থানীয় জাতের অবদান ঐতিহাসিক। কৃষকের বাছাই ও সংরক্ষণের মধ্য দিয়ে অঞ্চলভেদে নানা বৈশিষ্ট্যের জাত গড়ে উঠেছে। কোনোটি খরা সহনশীল, কোনোটি জলাবদ্ধতা বা লবণাক্ততা সহনশীল। কোনোটি আবার স্বাদ, পুষ্টিমান কিংবা স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত। এসব জাত আমাদের কৃষির ঐতিহ্য এবং মূল্যবান জিনগত সম্পদ। কিন্তু কৃষির প্রয়োজনও স্থির নয়। যে জাত একসময় একটি অঞ্চলের চাহিদা পূরণে যথেষ্ট ছিল, বৃহত্তর খাদ্যচাহিদার বাস্তবতায় তা সব ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নাও হতে পারে। বেশি ফলন, স্বল্প জীবনকাল, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ও বাজারের চাহিদা পূরণের সুবিধার কারণে উচ্চফলনশীল জাত কৃষির স্বাভাবিক বিবর্তনের অংশ হয়ে উঠেছে।
উচ্চফলনশীল জাতের সঙ্গে সেচ, সুষম সার, যান্ত্রিকীকরণ, উন্নত বালাই ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক চাষপদ্ধতির সমন্বয় কৃষির উৎপাদনক্ষমতায় বড় পরিবর্তন এনেছে। একই জমি থেকে বেশি ফলন এবং স্বল্প জীবনকালের জাতের মাধ্যমে একাধিক ফসল উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। সীমিত কৃষিজমির দেশে এই পরিবর্তনের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। অধিক ফলনের তাগিদে জমির উল্লম্ব উৎপাদন বৃদ্ধির এটিই একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ।
তবে বেশি ফলনই শেষ কথা নয়। কোনো জাতের ফলন বেশি হলেও উৎপাদন ব্যয় বেশি হলে, ঝুঁকি বাড়লে কিংবা বাজারমূল্য কমে গেলে কৃষকের প্রকৃত লাভ নাও বাড়তে পারে। তাই জাতের সাফল্য মাপতে হবে ফলনের পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয়, বাজারমূল্য, ঝুঁকি ও নিট আয়ের ভিত্তিতে। ভবিষ্যতের জাতনীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতি হেক্টরে সর্বোচ্চ ফলনের পাশাপাশি টেকসই সর্বোচ্চ নিট আয় নিশ্চিত করা।
জাত উন্নয়ন কর্মসূচির প্রত্যক্ষ ফল হলো নতুন জাত উদ্ভাবন, বীজ উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ ও সম্প্রসারণ। কিন্তু এর প্রকৃত সুফল আরও বিস্তৃত। এর মধ্যে রয়েছে কৃষকের আয় বৃদ্ধি, জাতীয় উৎপাদন বাড়ানো, খাদ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা, বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, উৎপাদনের ঝুঁকি কমানো এবং খাদ্যনিরাপত্তা শক্তিশালী করা। তাই শুধু কতটি নতুন জাত উদ্ভাবিত হলো, সেটিই বিবেচ্য হওয়া উচিত নয়। বরং দেখতে হবে, কৃষকের মাঠে এসব জাত কী পরিবর্তন আনতে পারল।
এখানে স্থানীয় জাত ও উচ্চফলনশীল জাতকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর প্রয়োজন নেই। উচ্চফলনশীল জাত যেখানে উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্য বেশি উপযোগী, সেখানে তার সম্প্রসারণ অগ্রাধিকার পাবে। অন্যদিকে স্থানীয় জাতের যেসব বৈশিষ্ট্য ভবিষ্যতের কৃষির জন্য মূল্যবান, সেগুলো সংরক্ষণ করতে হবে। অর্থাৎ প্রতিস্থাপন মানে বিলুপ্তি নয়; বরং প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন।
স্থানীয় জাতের গুরুত্ব এখানেই নতুনভাবে সামনে আসে। খরা, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা, তাপমাত্রা কিংবা নির্দিষ্ট রোগ সহনশীলতার মতো বৈশিষ্ট্য ভবিষ্যতে নতুন জাত উদ্ভাবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই সব স্থানীয় জাতকে বাণিজ্যিক চাষে ধরে রাখার প্রয়োজন না থাকলেও মূল্যবান জিনগত বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলা যাবে না। জিনব্যাংক, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মাঠপর্যায়ে সংরক্ষণের মাধ্যমে এই সম্পদ নিরাপদ রাখতে হবে।
জাত পরিবর্তনের সঙ্গে কৃষকের বীজ ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন এসেছে। একসময় কৃষক নিজের উৎপাদিত ফসল থেকে বীজ সংরক্ষণ করতেন, প্রতিবেশীর সঙ্গে বিনিময় করতেন। এখন প্রাতিষ্ঠানিক ও বাণিজ্যিক বীজব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। এর সুফল হলো মানসম্মত বীজ ও উন্নত প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার। তবে একই সঙ্গে বীজের মান, দাম, প্রাপ্যতা এবং কৃষকের পছন্দের স্বাধীনতা নিশ্চিত করাও জরুরি। ভবিষ্যতের উচ্চফলনশীল জাতকে তাই শুধু বেশি ফলন দিলেই চলবে না। সেগুলোকে হতে হবে জলবায়ু সহনশীল, রোগ প্রতিরোধী, পানি ও অন্যান্য উপকরণ সাশ্রয়ী এবং কৃষকের জন্য লাভজনক।
খরা, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা, তাপপ্রবাহ, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও নতুন রোগবালাইয়ের ঝুঁকি বিবেচনায় জাত উন্নয়নের লক্ষ্য আরও বিস্তৃত করতে হবে। এ জন্য প্রচলিত প্রজনন পদ্ধতির পাশাপাশি দ্রুত প্রজননপ্রযুক্তি (স্পিড ব্রিডিং) ও চিহ্নকনির্ভর নির্বাচন পদ্ধতির (মার্কার অ্যাসিস্টেড সিলেকশন) ব্যবহার বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জাতের মূল্যবান বৈশিষ্ট্য আধুনিক প্রজননপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। উৎপাদনশীলতা ও অভিযোজনক্ষমতার এই সমন্বয়ই হতে পারে ভবিষ্যতের জাত উন্নয়নের মূল শক্তি।
এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অঞ্চলভেদে জাতের ফলন, উৎপাদন ব্যয়, নিট আয়, ঝুঁকি ও পরিবেশের উপযোগিতা মূল্যায়ন করতে হবে। নতুন জাত অবমুক্তির ক্ষেত্রে কৃষকের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। মানসম্মত বীজের উৎপাদন ও সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি), গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি বীজ খাতের মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে মূল্যবান স্থানীয় জাত শনাক্ত করে সংরক্ষণ করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, জাতের সাফল্য মূল্যায়নের পদ্ধতিও বদলাতে হবে। শুধু ফলন নয়, কৃষকের নিট আয়, খাদ্যনিরাপত্তা, সম্পদের দক্ষ ব্যবহার, পরিবেশের ওপর প্রভাব ও জলবায়ু সহনশীলতাকেও মূল্যায়নের অংশ করতে হবে।
বাংলাদেশের কৃষিতে উচ্চফলনশীল জাতের গুরুত্ব ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। খাদ্যচাহিদা বাড়ছে, অথচ কৃষিজমি বাড়ছে না। ফলে প্রতি একক জমির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। তবে এই পরিবর্তন যেন একমুখী না হয়। সব অঞ্চলের মাটি, পানি, জলবায়ু ও বাজারের অবস্থা এক নয়। কোথাও সর্বোচ্চ ফলন গুরুত্বপূর্ণ, কোথাও খরা বা লবণাক্ততা সহনশীলতা। আবার কোথাও পুষ্টিমান কিংবা বাজারমূল্য বেশি গুরুত্ব পেতে পারে। তাই ভবিষ্যতের কৃষিনীতির মূল কথা হওয়া উচিত—‘এক জাত সবার জন্য’ নয়, বরং ‘উপযোগী অঞ্চলে উপযোগী জাত’।
কৃষির এই পরিবর্তনকে শুধু স্থানীয় জাতের জায়গায় উচ্চফলনশীল জাত বসানোর প্রক্রিয়া হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি আসলে সীমিত সম্পদে অধিক উৎপাদন, কৃষকের আয় বৃদ্ধি, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পরিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার একটি দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ। একটি ভালো জাত এক মৌসুমের ফলন বাড়াতে পারে। কিন্তু একটি দূরদর্শী জাতনীতি বদলে দিতে পারে একটি দেশের খাদ্যব্যবস্থার ভবিষ্যৎ।
আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত উৎপাদনে উচ্চফলন, কৃষকের জন্য বেশি নিট লাভ, জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা এবং ভবিষ্যতের জন্য জিনগত বৈচিত্র্য সংরক্ষণ। স্থানীয় জাত আমাদের কৃষির শিকড়, আর উচ্চফলনশীল জাত তার নতুন ডানা। শিকড়কে অস্বীকার করে নয়, বরং তার শক্তিকে কাজে লাগিয়েই কৃষিকে ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে নিতে হবে।
[লেখক: ব্যবস্থাপক (উদ্যান), বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)]

আপনার মতামত লিখুন