পরিবারের কেউ মারা গেলে তাঁর রেখে যাওয়া সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন আইন অনুযায়ী নির্ধারিত ওয়ারিশরা। কিন্তু উত্তরাধিকার সূত্রে জমির মালিকানা পাওয়ার পরও সরকারি ভূমি রেকর্ডে নিজের নাম যুক্ত করতে আলাদা প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। এ জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে নামজারির আবেদন করতে হবে।
ওয়ারিশি জমির নামজারিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো, জমি ভাগ না করেও সব ওয়ারিশের নামে যৌথভাবে খতিয়ান করা যায়। এ ক্ষেত্রে বণ্টননামা দলিলের প্রয়োজন হয় না। তবে জমি ভাগ করে প্রত্যেকের নামে পৃথক খতিয়ান করতে চাইলে নিবন্ধিত বণ্টননামা দলিল করতে হবে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারির পরিপত্রেও এ বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, শুধু বণ্টননামা দলিল নেই - এমন কারণে সব ওয়ারিশের যৌথ নামজারির আবেদন বাতিল করা যাবে না।
ওয়ারিশি জমির নামজারি করতে হলে প্রথমে কোন কাজগুলো করতে হবে, কী কী নথি লাগবে এবং অনলাইনে কীভাবে আবেদন করবেন, তা জেনে নিন।
নামজারির প্রস্তুতি শুরু করতে হবে মৃত ব্যক্তির বৈধ উত্তরাধিকারীদের তালিকা তৈরির মাধ্যমে। শুধু যাঁরা জমি দেখাশোনা করেন বা পরিবারের সঙ্গে বসবাস করেন, তাঁদের নাম তালিকাভুক্ত করলেই হবে না। প্রযোজ্য উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী যাঁরা সম্পত্তির অংশ পাবেন, তাঁদের সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির স্ত্রী বা স্বামী, সন্তান, বাবা-মা এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অন্য উত্তরাধিকারীদের তথ্য যাচাই করতে হবে। কোনো ওয়ারিশ আগে মারা গিয়ে থাকলে তাঁর উত্তরাধিকারীদের বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী বিবেচনায় নিতে হবে।
সব ওয়ারিশের নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, ঠিকানা এবং মৃত ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কের তথ্য সংগ্রহ করে রাখুন। পরবর্তী সময়ে ওয়ারিশ সনদ ও নামজারির আবেদন করতে এগুলো প্রয়োজন হবে।
মৃত ব্যক্তির মৃত্যুর প্রমাণ হিসেবে মৃত্যুসনদ সংগ্রহ করতে হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র অথবা সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয় থেকে ওয়ারিশ সনদ নিতে হবে।
সনদে সব বৈধ ওয়ারিশের নাম ও পরিচয় সঠিকভাবে উল্লেখ রয়েছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি। কারও নাম বাদ পড়লে বা তথ্যে ভুল থাকলে নামজারির প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হতে পারে।
মনে রাখতে হবে, ওয়ারিশ সনদ উত্তরাধিকারীদের পরিচয় ও সম্পর্কের প্রমাণ। এটি সম্পত্তি ভাগ করার দলিল নয়। প্রত্যেকে কতটুকু জমি পাবেন, তা নির্ধারিত হবে প্রযোজ্য উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী।
ওয়ারিশদের তালিকা প্রস্তুতের পর মৃত ব্যক্তির নামে থাকা জমির দলিল ও সরকারি রেকর্ড পরীক্ষা করতে হবে। পরিবারের জানা জমির পরিমাণের সঙ্গে সরকারি খতিয়ান, দাগ নম্বর বা দলিলের তথ্যের অমিল থাকতে পারে। তাই আবেদন করার আগেই এসব তথ্য মিলিয়ে নেওয়া ভালো।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের মধ্যে রয়েছে:
· মৃত ব্যক্তির নামে থাকা সর্বশেষ খতিয়ান বা পর্চা
· জমির মূল দলিল অথবা সার্টিফায়েড কপি
· প্রয়োজনে আগের মালিকানার দলিল বা বায়া দলিল
· জমির দাগ নম্বর, মৌজা ও পরিমাণের তথ্য
· ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের দাখিলা
· মৃত ব্যক্তির মৃত্যুসনদ ও ওয়ারিশ সনদ
· সব ওয়ারিশের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি
· আদালতের কোনো রায় বা ডিক্রি থাকলে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র
দলিল, খতিয়ান ও দাগ নম্বরের তথ্যে অসংগতি থাকলে তা আগে যাচাই করে নেওয়া উচিত। এতে আবেদন নিষ্পত্তির সময় অতিরিক্ত জটিলতা এড়ানো সহজ হবে।
সব বৈধ ওয়ারিশের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর কে কতটুকু জমি পাবেন, তা হিসাব করতে হবে। এ ক্ষেত্রে পারিবারিক সিদ্ধান্ত বা মৌখিক সমঝোতার পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট উত্তরাধিকার আইন অনুসরণ করা জরুরি।
বাংলাদেশে উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পত্তির অংশ নির্ধারিত হয় মৃত ব্যক্তির ধর্ম ও প্রযোজ্য ব্যক্তিগত আইন অনুযায়ী। তাই সব পরিবারের জন্য একই বণ্টননীতি প্রযোজ্য নয়। মৃত ব্যক্তির জীবিত উত্তরাধিকারী, তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং সংশ্লিষ্ট আইন বিবেচনায় নিয়ে হিস্যা নির্ধারণ করতে হবে।
অংশের হিসাব নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। ভুল হিস্যা ধরে জমি ভাগ করলে ভবিষ্যতে বিরোধ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ওয়ারিশি জমির নামজারির ক্ষেত্রে জমি ভাগ করা হবে কি না, তার ওপর ভিত্তি করে দুটি পদ্ধতিতে আবেদন করা যায়।
যৌথ নামজারি - জমি ভাগ না করলে
ওয়ারিশরা যদি আপাতত জমি ভাগ করতে না চান, তাহলে সবাই মিলে যৌথ নামজারির আবেদন করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির জমির বিপরীতে সব ওয়ারিশের নাম একই খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত হবে এবং প্রত্যেকের আইনগত হিস্যা উল্লেখ থাকবে।
এ ধরনের আবেদনের জন্য বণ্টননামা দলিল প্রয়োজন নেই। তবে সব বৈধ ওয়ারিশের তথ্য ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হবে।
পৃথক নামজারি - জমি ভাগ করতে চাইলে
ওয়ারিশরা যদি জমি ভাগ করে প্রত্যেকে নির্দিষ্ট অংশের জন্য আলাদা খতিয়ান করতে চান, তাহলে প্রথমে তাঁদের মধ্যে জমি বণ্টন করতে হবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট ওয়ারিশদের সম্মতিতে বণ্টননামা দলিল তৈরি করে নিবন্ধন করতে হবে।
নিবন্ধিত বণ্টননামার ভিত্তিতে প্রত্যেকে নিজের বরাদ্দ করা অংশের জন্য পৃথক নামজারি ও খতিয়ানের আবেদন করতে পারবেন।
অর্থাৎ, জমি ভাগ না করেও যৌথ নামজারি সম্ভব। তবে পৃথক খতিয়ান করতে চাইলে নিবন্ধিত বণ্টননামা প্রয়োজন।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত হলে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ই-নামজারি পোর্টালে আবেদন করা যাবে। এ জন্য নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করতে হবে।
১. প্রথমে ই-নামজারি পোর্টালে প্রবেশ করুন।
২. নামজারির আবেদনসংক্রান্ত অপশন নির্বাচন করুন।
৩. আবেদনকারী ও জমির প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ করুন।
৪. মৃত ব্যক্তির নামে থাকা খতিয়ান, দাগ নম্বর, মৌজা ও জমির পরিমাণ উল্লেখ করুন।
৫. উত্তরাধিকার সূত্রে নামজারির ক্ষেত্রে সব ওয়ারিশের তথ্য ও ওয়ারিশ সনদ যুক্ত করুন।
৬. প্রয়োজনীয় দলিল, খতিয়ান, ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা এবং অন্যান্য প্রমাণক আপলোড করুন।
৭. নির্ধারিত আবেদন ও নোটিশ জারির ফি পরিশোধ করুন।
৮. আবেদন জমা দেওয়ার পর পাওয়া নম্বর ও রসিদ সংরক্ষণ করুন।
আবেদন জমা হলে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস কাগজপত্র যাচাই করবে। প্রয়োজন অনুযায়ী তদন্ত বা শুনানির ব্যবস্থা হতে পারে। যাচাই শেষে সহকারী কমিশনার (ভূমি) নামজারির বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন।
আবেদন অনুমোদিত হলে নতুন খতিয়ান প্রস্তুত এবং নির্ধারিত ফি পরিশোধের কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে। এরপর নামজারি খতিয়ান ও সংশ্লিষ্ট রসিদ সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করুন।
নিজের নামে ভূমি উন্নয়ন করের হিসাব হালনাগাদ হয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করতে হবে। খতিয়ানে নাম, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ কিংবা হিস্যার তথ্যে ভুল থাকলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত।
তবে নামজারি হলো সরকারি ভূমি রেকর্ড হালনাগাদের প্রক্রিয়া। শুধু নামজারি সম্পন্ন হলেই জমির মালিকানা নিয়ে সব ধরনের বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়ে যায় না। উত্তরাধিকার বা মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকলে তা প্রচলিত আইন অনুযায়ী নিষ্পত্তি করতে হবে।
ওয়ারিশি জমি নিয়ে ভবিষ্যতের জটিলতা
এড়াতে কয়েকটি
বিষয়ে সতর্ক
থাকা প্রয়োজন:
· কোনো বৈধ ওয়ারিশকে বাদ দিয়ে পুরো জমি নিজের নামে নামজারির চেষ্টা করবেন না।
· ওয়ারিশ সনদে সব উত্তরাধিকারীর নাম রয়েছে কি না, যাচাই করুন।
· আইন অনুযায়ী হিস্যা নির্ধারণ না করে জমি ভাগ করবেন না।
· নিবন্ধিত বণ্টননামা ছাড়া পৃথক খতিয়ান পাওয়ার প্রত্যাশা করবেন না।
· দলিল, দাগ নম্বর ও খতিয়ানের তথ্য যাচাই না করে কোনো দলিলে স্বাক্ষর করবেন না।
· জমি নিয়ে বিরোধ থাকলে একতরফা বণ্টন বা দখলের চেষ্টা না করে আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

রোববার, ০১ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ নভেম্বর ২০২৬
পরিবারের কেউ মারা গেলে তাঁর রেখে যাওয়া সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন আইন অনুযায়ী নির্ধারিত ওয়ারিশরা। কিন্তু উত্তরাধিকার সূত্রে জমির মালিকানা পাওয়ার পরও সরকারি ভূমি রেকর্ডে নিজের নাম যুক্ত করতে আলাদা প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। এ জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে নামজারির আবেদন করতে হবে।
ওয়ারিশি জমির নামজারিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো, জমি ভাগ না করেও সব ওয়ারিশের নামে যৌথভাবে খতিয়ান করা যায়। এ ক্ষেত্রে বণ্টননামা দলিলের প্রয়োজন হয় না। তবে জমি ভাগ করে প্রত্যেকের নামে পৃথক খতিয়ান করতে চাইলে নিবন্ধিত বণ্টননামা দলিল করতে হবে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারির পরিপত্রেও এ বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, শুধু বণ্টননামা দলিল নেই - এমন কারণে সব ওয়ারিশের যৌথ নামজারির আবেদন বাতিল করা যাবে না।
ওয়ারিশি জমির নামজারি করতে হলে প্রথমে কোন কাজগুলো করতে হবে, কী কী নথি লাগবে এবং অনলাইনে কীভাবে আবেদন করবেন, তা জেনে নিন।
নামজারির প্রস্তুতি শুরু করতে হবে মৃত ব্যক্তির বৈধ উত্তরাধিকারীদের তালিকা তৈরির মাধ্যমে। শুধু যাঁরা জমি দেখাশোনা করেন বা পরিবারের সঙ্গে বসবাস করেন, তাঁদের নাম তালিকাভুক্ত করলেই হবে না। প্রযোজ্য উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী যাঁরা সম্পত্তির অংশ পাবেন, তাঁদের সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির স্ত্রী বা স্বামী, সন্তান, বাবা-মা এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অন্য উত্তরাধিকারীদের তথ্য যাচাই করতে হবে। কোনো ওয়ারিশ আগে মারা গিয়ে থাকলে তাঁর উত্তরাধিকারীদের বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী বিবেচনায় নিতে হবে।
সব ওয়ারিশের নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, ঠিকানা এবং মৃত ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কের তথ্য সংগ্রহ করে রাখুন। পরবর্তী সময়ে ওয়ারিশ সনদ ও নামজারির আবেদন করতে এগুলো প্রয়োজন হবে।
মৃত ব্যক্তির মৃত্যুর প্রমাণ হিসেবে মৃত্যুসনদ সংগ্রহ করতে হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র অথবা সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয় থেকে ওয়ারিশ সনদ নিতে হবে।
সনদে সব বৈধ ওয়ারিশের নাম ও পরিচয় সঠিকভাবে উল্লেখ রয়েছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি। কারও নাম বাদ পড়লে বা তথ্যে ভুল থাকলে নামজারির প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হতে পারে।
মনে রাখতে হবে, ওয়ারিশ সনদ উত্তরাধিকারীদের পরিচয় ও সম্পর্কের প্রমাণ। এটি সম্পত্তি ভাগ করার দলিল নয়। প্রত্যেকে কতটুকু জমি পাবেন, তা নির্ধারিত হবে প্রযোজ্য উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী।
ওয়ারিশদের তালিকা প্রস্তুতের পর মৃত ব্যক্তির নামে থাকা জমির দলিল ও সরকারি রেকর্ড পরীক্ষা করতে হবে। পরিবারের জানা জমির পরিমাণের সঙ্গে সরকারি খতিয়ান, দাগ নম্বর বা দলিলের তথ্যের অমিল থাকতে পারে। তাই আবেদন করার আগেই এসব তথ্য মিলিয়ে নেওয়া ভালো।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের মধ্যে রয়েছে:
· মৃত ব্যক্তির নামে থাকা সর্বশেষ খতিয়ান বা পর্চা
· জমির মূল দলিল অথবা সার্টিফায়েড কপি
· প্রয়োজনে আগের মালিকানার দলিল বা বায়া দলিল
· জমির দাগ নম্বর, মৌজা ও পরিমাণের তথ্য
· ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের দাখিলা
· মৃত ব্যক্তির মৃত্যুসনদ ও ওয়ারিশ সনদ
· সব ওয়ারিশের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি
· আদালতের কোনো রায় বা ডিক্রি থাকলে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র
দলিল, খতিয়ান ও দাগ নম্বরের তথ্যে অসংগতি থাকলে তা আগে যাচাই করে নেওয়া উচিত। এতে আবেদন নিষ্পত্তির সময় অতিরিক্ত জটিলতা এড়ানো সহজ হবে।
সব বৈধ ওয়ারিশের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর কে কতটুকু জমি পাবেন, তা হিসাব করতে হবে। এ ক্ষেত্রে পারিবারিক সিদ্ধান্ত বা মৌখিক সমঝোতার পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট উত্তরাধিকার আইন অনুসরণ করা জরুরি।
বাংলাদেশে উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পত্তির অংশ নির্ধারিত হয় মৃত ব্যক্তির ধর্ম ও প্রযোজ্য ব্যক্তিগত আইন অনুযায়ী। তাই সব পরিবারের জন্য একই বণ্টননীতি প্রযোজ্য নয়। মৃত ব্যক্তির জীবিত উত্তরাধিকারী, তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং সংশ্লিষ্ট আইন বিবেচনায় নিয়ে হিস্যা নির্ধারণ করতে হবে।
অংশের হিসাব নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। ভুল হিস্যা ধরে জমি ভাগ করলে ভবিষ্যতে বিরোধ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ওয়ারিশি জমির নামজারির ক্ষেত্রে জমি ভাগ করা হবে কি না, তার ওপর ভিত্তি করে দুটি পদ্ধতিতে আবেদন করা যায়।
যৌথ নামজারি - জমি ভাগ না করলে
ওয়ারিশরা যদি আপাতত জমি ভাগ করতে না চান, তাহলে সবাই মিলে যৌথ নামজারির আবেদন করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির জমির বিপরীতে সব ওয়ারিশের নাম একই খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত হবে এবং প্রত্যেকের আইনগত হিস্যা উল্লেখ থাকবে।
এ ধরনের আবেদনের জন্য বণ্টননামা দলিল প্রয়োজন নেই। তবে সব বৈধ ওয়ারিশের তথ্য ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হবে।
পৃথক নামজারি - জমি ভাগ করতে চাইলে
ওয়ারিশরা যদি জমি ভাগ করে প্রত্যেকে নির্দিষ্ট অংশের জন্য আলাদা খতিয়ান করতে চান, তাহলে প্রথমে তাঁদের মধ্যে জমি বণ্টন করতে হবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট ওয়ারিশদের সম্মতিতে বণ্টননামা দলিল তৈরি করে নিবন্ধন করতে হবে।
নিবন্ধিত বণ্টননামার ভিত্তিতে প্রত্যেকে নিজের বরাদ্দ করা অংশের জন্য পৃথক নামজারি ও খতিয়ানের আবেদন করতে পারবেন।
অর্থাৎ, জমি ভাগ না করেও যৌথ নামজারি সম্ভব। তবে পৃথক খতিয়ান করতে চাইলে নিবন্ধিত বণ্টননামা প্রয়োজন।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত হলে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ই-নামজারি পোর্টালে আবেদন করা যাবে। এ জন্য নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করতে হবে।
১. প্রথমে ই-নামজারি পোর্টালে প্রবেশ করুন।
২. নামজারির আবেদনসংক্রান্ত অপশন নির্বাচন করুন।
৩. আবেদনকারী ও জমির প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ করুন।
৪. মৃত ব্যক্তির নামে থাকা খতিয়ান, দাগ নম্বর, মৌজা ও জমির পরিমাণ উল্লেখ করুন।
৫. উত্তরাধিকার সূত্রে নামজারির ক্ষেত্রে সব ওয়ারিশের তথ্য ও ওয়ারিশ সনদ যুক্ত করুন।
৬. প্রয়োজনীয় দলিল, খতিয়ান, ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা এবং অন্যান্য প্রমাণক আপলোড করুন।
৭. নির্ধারিত আবেদন ও নোটিশ জারির ফি পরিশোধ করুন।
৮. আবেদন জমা দেওয়ার পর পাওয়া নম্বর ও রসিদ সংরক্ষণ করুন।
আবেদন জমা হলে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস কাগজপত্র যাচাই করবে। প্রয়োজন অনুযায়ী তদন্ত বা শুনানির ব্যবস্থা হতে পারে। যাচাই শেষে সহকারী কমিশনার (ভূমি) নামজারির বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন।
আবেদন অনুমোদিত হলে নতুন খতিয়ান প্রস্তুত এবং নির্ধারিত ফি পরিশোধের কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে। এরপর নামজারি খতিয়ান ও সংশ্লিষ্ট রসিদ সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করুন।
নিজের নামে ভূমি উন্নয়ন করের হিসাব হালনাগাদ হয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করতে হবে। খতিয়ানে নাম, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ কিংবা হিস্যার তথ্যে ভুল থাকলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত।
তবে নামজারি হলো সরকারি ভূমি রেকর্ড হালনাগাদের প্রক্রিয়া। শুধু নামজারি সম্পন্ন হলেই জমির মালিকানা নিয়ে সব ধরনের বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়ে যায় না। উত্তরাধিকার বা মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকলে তা প্রচলিত আইন অনুযায়ী নিষ্পত্তি করতে হবে।
ওয়ারিশি জমি নিয়ে ভবিষ্যতের জটিলতা
এড়াতে কয়েকটি
বিষয়ে সতর্ক
থাকা প্রয়োজন:
· কোনো বৈধ ওয়ারিশকে বাদ দিয়ে পুরো জমি নিজের নামে নামজারির চেষ্টা করবেন না।
· ওয়ারিশ সনদে সব উত্তরাধিকারীর নাম রয়েছে কি না, যাচাই করুন।
· আইন অনুযায়ী হিস্যা নির্ধারণ না করে জমি ভাগ করবেন না।
· নিবন্ধিত বণ্টননামা ছাড়া পৃথক খতিয়ান পাওয়ার প্রত্যাশা করবেন না।
· দলিল, দাগ নম্বর ও খতিয়ানের তথ্য যাচাই না করে কোনো দলিলে স্বাক্ষর করবেন না।
· জমি নিয়ে বিরোধ থাকলে একতরফা বণ্টন বা দখলের চেষ্টা না করে আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

আপনার মতামত লিখুন