স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রস্তুতিকাল ‘শর্তসাপেক্ষে’ আরও তিন বছর বাড়ানোর বিষয়টিকে ‘ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত’ হিসেবে দেখছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
তিনি বলেছেন, এই সময়ের মধ্যে দেশের অভ্যন্তরীণ সংস্কার বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে চিঠি দিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের সহযোগিতা চাওয়ায় সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দায় এখন সরাসরি সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর বর্তেছে।
রবিবার ঢাকায় সিপিডির কার্যালয়ে এলডিসি থেকে উত্তরণ ও সরকারের সংস্কার পদক্ষেপ নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দেবপ্রিয় এসব কথা বলেন।
গত ২৯ অক্টোবর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদন করে। এর ফলে এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের নির্ধারিত সময়সীমা ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের পরিবর্তে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ল।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, “আগে যেকোনো সময় এটা হয়ত আমলা, মন্ত্রী ইত্যাদির পর্যায়ে ছিল, এখন এটা সরকারের সামগ্রিকতায় রাজনৈতিক দায়দায়িত্বের ভিতরে চলে এসেছে। উনারা (জাতিসংঘ) এটাকে সেইভাবেই কিন্তু বিবেচনা করে নিয়েছেন, কারণ প্রধানমন্ত্রী চিঠি লিখেছেন। প্রধানমন্ত্রী চিঠি লিখেছেন জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছে, সেহেতু প্রধানমন্ত্রী এই দায়িত্বটা নিয়েছেন যে উনি এই তিন বছরের ভেতরে নির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপের রেখা পার হবেন।”
তিনি বলেন, “এটা আপনারা খেয়াল রাখবেন। এটা যে কোনো সময়ের চেয়ে ভিন্ন রকম কিন্তু। এটা আর কোনো কারিগরি বিষয় বলে বিবেচিত না। কারিগরি বিষয় আছে, বিভিন্ন প্রশাসনিক বিষয় আছে, কিন্তু তার চেয়ে বেশি এটা এখন একটা রাজনৈতিক মালিকানার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।”
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সিদ্ধান্তটিতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে উত্তরণের সময় বাড়ানোর মূল মাপকাঠি করা হয়নি। তবে দেশের অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা ও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, “সেহেতু আপনাদের আমি আজকে মূল কথা যেটা বলতে চাই, সেটা হলো এই পুরো প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে বাংলাদেশের উত্তরণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক মালিকানা, রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিষয়টা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে।”
শর্তসাপেক্ষে
এই সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে ‘শর্তসাপেক্ষ’ হিসেবে বর্ণনা করে দেবপ্রিয় বলেন, “দেশের পক্ষ থেকে সংস্কারের যে প্রতিশ্রুতি ও পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে, তার ওপর আস্থা রেখেই জাতিসংঘ অতিরিক্ত সময় দিয়েছে।”
তিনি বলেন, “সেহেতু ওই সংস্কারের বিষয়টিই সবচেয়ে কেন্দ্রবিন্দুতে আছে। যদি সংস্কার আপনি না করেন, তাহলে কিন্তু আপনার কথার বরখেলাপ হবে। তাহলে কিন্তু দেশ হিসেবে আমাদের যে বিশ্বাসযোগ্যতা, সেটাতে আঘাত আসবে—এটা স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে।”
প্রেস নোটে ঘাটতি
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে বলে নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। সিদ্ধান্তটিকে বাংলাদেশের জন্য ‘গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন’ হিসেবেও বর্ণনা করা হয় সেখানে।
তবে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় মনে করেন, ওই বক্তব্যে সিদ্ধান্তটির ব্যতিক্রমী চরিত্র এবং এর সঙ্গে যুক্ত শর্তগুলো যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি। তিনি বলেন, “আমার প্রথম বিষয় হল, যে কথাগুলো বলছি, এটা কি সরকার অনুধাবন করল? যে কথাগুলো আমরা বলছি যে, আপনি প্রতিশ্রুতি দিতে খুবই পারদর্শী, কিন্তু বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে অত দক্ষতা দেখাতে পারেন না। এটার প্রথম আমরা ইঙ্গিত কোথায় পেলাম? আমরা প্রথম ইঙ্গিত পেলাম সরকারের প্রেস নোটে।”
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, “দেখেন, সরকারের প্রেস নোট কি বলল? উনার প্রেস নোট বলল, সার্বিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে আমরা সিদ্ধান্ত পেয়ে গেছি এবং এটা নভেম্বর ২৯ সাল পর্যন্ত সময় আমাদের দেওয়া হয়েছে। উনারা একবারও উল্লেখ করল না যে এটা একটি ‘ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত’ হিসেবে ওখানে এসেছে।”
দেবপ্রিয়র মতে, সিদ্ধান্তটিকে কেবল সরকারের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করাও যথাযথ নয়। বরং বাংলাদেশের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সদিচ্ছার প্রকাশ হিসেবে বিষয়টিকে দেখা উচিত। তিনি বলেন, “অথচ ঘটনাটা তো হল এই, যে বাংলাদেশের পক্ষে যে একটা বৈশ্বিক সদিচ্ছা, সেটার প্রকাশ পেয়েছে। আপনি মনে করেন যদি বৈশ্বিক সদিচ্ছা না থাকত, তাহলে আপনি যতই দেনদরবার করেন না কেন, এটা তো আপনি পেতেন না।”
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের প্রস্তাবের বিরোধিতা করে কোনো দেশের প্রতিনিধি বক্তব্য না দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন দেবপ্রিয়। পাশাপাশি ফ্রান্স, কানাডা ও আয়ারল্যান্ডের প্রতিনিধিদের সমর্থনের কথাও বলেন। আয়ারল্যান্ড জাতিসংঘে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পক্ষে বক্তব্য দিয়েছিল। বাংলাদেশের পাশাপাশি নেপালও যে একই সুবিধা পেয়েছে, সে কথা তুলে ধরে দেবপ্রিয় বলেন, সিদ্ধান্তটিকে এককভাবে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, “আমাদের কাছে প্রথমত মনে হচ্ছে প্রেস নোটের ভেতরে এই পুরো ঘটনাটার তাৎপর্য অনুধাবন করা, আত্মস্থ করা এবং এটাকে প্রকাশ করা, এই ক্ষেত্রে কিছুটা ঘাটতি রয়ে গেছে বলে আমাদের মনে হয়।”
বড় ৩ চ্যালেঞ্জ
অতিরিক্ত তিন বছরে বাংলাদেশকে একই সঙ্গে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে বলে মনে করেন দেবপ্রিয়। এগুলো হল: এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি বাড়ানো। তিনি বলেন, “একটা হচ্ছে যে আমাদের এইটার প্রস্তুতি নিতে হবে। এই উত্তরণের জন্য, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হওয়ার। একই সাথে আমার সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে হবে। এবং সেটার জন্য আমার কর আদায় বাড়াতে হবে, আমার সরকারি ব্যয়ের গুণমান বাড়াতে হবে, ব্যাংকিং খাত ঠিক করতে হবে, জ্বালানি ঠিক করতে হবে এবং প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হবে।”
অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, টাকার বিনিময়মূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং সুদের হার কমানোর মতো বিষয়েও নজর দিতে হবে বলে মনে করেন দেবপ্রিয়।
তিনি বলেন, একদিকে এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিতে হবে, অন্যদিকে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে হবে। একই সঙ্গে সেই স্থিতিশীলতার ভিত্তিতে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
তিনি বলেন, “সেহেতু এইটার জন্য আমার ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, সুদের হার কমাতে হবে এবং সেটা করতে গিয়ে আমি স্থিতায়নকে নষ্ট করতে পারব না। দেখেন, তিনটে জিনিস কিন্তু একসাথে আসছে।”
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, এই তিনটি লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করা সহজ হবে না। আগামী তিন বছরে সরকার কতটা সংস্কার করতে পারল এবং অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কতটা সফল হলো, তা পরবর্তী নির্বাচনের রাজনৈতিক আলোচনাতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক নাজনীন আহমেদ, সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান এবং গবেষণা বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান প্রমুখ।

সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ নভেম্বর ২০২৬
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রস্তুতিকাল ‘শর্তসাপেক্ষে’ আরও তিন বছর বাড়ানোর বিষয়টিকে ‘ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত’ হিসেবে দেখছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
তিনি বলেছেন, এই সময়ের মধ্যে দেশের অভ্যন্তরীণ সংস্কার বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে চিঠি দিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের সহযোগিতা চাওয়ায় সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দায় এখন সরাসরি সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর বর্তেছে।
রবিবার ঢাকায় সিপিডির কার্যালয়ে এলডিসি থেকে উত্তরণ ও সরকারের সংস্কার পদক্ষেপ নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দেবপ্রিয় এসব কথা বলেন।
গত ২৯ অক্টোবর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদন করে। এর ফলে এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের নির্ধারিত সময়সীমা ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের পরিবর্তে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ল।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, “আগে যেকোনো সময় এটা হয়ত আমলা, মন্ত্রী ইত্যাদির পর্যায়ে ছিল, এখন এটা সরকারের সামগ্রিকতায় রাজনৈতিক দায়দায়িত্বের ভিতরে চলে এসেছে। উনারা (জাতিসংঘ) এটাকে সেইভাবেই কিন্তু বিবেচনা করে নিয়েছেন, কারণ প্রধানমন্ত্রী চিঠি লিখেছেন। প্রধানমন্ত্রী চিঠি লিখেছেন জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছে, সেহেতু প্রধানমন্ত্রী এই দায়িত্বটা নিয়েছেন যে উনি এই তিন বছরের ভেতরে নির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপের রেখা পার হবেন।”
তিনি বলেন, “এটা আপনারা খেয়াল রাখবেন। এটা যে কোনো সময়ের চেয়ে ভিন্ন রকম কিন্তু। এটা আর কোনো কারিগরি বিষয় বলে বিবেচিত না। কারিগরি বিষয় আছে, বিভিন্ন প্রশাসনিক বিষয় আছে, কিন্তু তার চেয়ে বেশি এটা এখন একটা রাজনৈতিক মালিকানার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।”
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সিদ্ধান্তটিতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে উত্তরণের সময় বাড়ানোর মূল মাপকাঠি করা হয়নি। তবে দেশের অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা ও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, “সেহেতু আপনাদের আমি আজকে মূল কথা যেটা বলতে চাই, সেটা হলো এই পুরো প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে বাংলাদেশের উত্তরণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক মালিকানা, রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিষয়টা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে।”
শর্তসাপেক্ষে
এই সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে ‘শর্তসাপেক্ষ’ হিসেবে বর্ণনা করে দেবপ্রিয় বলেন, “দেশের পক্ষ থেকে সংস্কারের যে প্রতিশ্রুতি ও পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে, তার ওপর আস্থা রেখেই জাতিসংঘ অতিরিক্ত সময় দিয়েছে।”
তিনি বলেন, “সেহেতু ওই সংস্কারের বিষয়টিই সবচেয়ে কেন্দ্রবিন্দুতে আছে। যদি সংস্কার আপনি না করেন, তাহলে কিন্তু আপনার কথার বরখেলাপ হবে। তাহলে কিন্তু দেশ হিসেবে আমাদের যে বিশ্বাসযোগ্যতা, সেটাতে আঘাত আসবে—এটা স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে।”
প্রেস নোটে ঘাটতি
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে বলে নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। সিদ্ধান্তটিকে বাংলাদেশের জন্য ‘গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন’ হিসেবেও বর্ণনা করা হয় সেখানে।
তবে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় মনে করেন, ওই বক্তব্যে সিদ্ধান্তটির ব্যতিক্রমী চরিত্র এবং এর সঙ্গে যুক্ত শর্তগুলো যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি। তিনি বলেন, “আমার প্রথম বিষয় হল, যে কথাগুলো বলছি, এটা কি সরকার অনুধাবন করল? যে কথাগুলো আমরা বলছি যে, আপনি প্রতিশ্রুতি দিতে খুবই পারদর্শী, কিন্তু বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে অত দক্ষতা দেখাতে পারেন না। এটার প্রথম আমরা ইঙ্গিত কোথায় পেলাম? আমরা প্রথম ইঙ্গিত পেলাম সরকারের প্রেস নোটে।”
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, “দেখেন, সরকারের প্রেস নোট কি বলল? উনার প্রেস নোট বলল, সার্বিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে আমরা সিদ্ধান্ত পেয়ে গেছি এবং এটা নভেম্বর ২৯ সাল পর্যন্ত সময় আমাদের দেওয়া হয়েছে। উনারা একবারও উল্লেখ করল না যে এটা একটি ‘ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত’ হিসেবে ওখানে এসেছে।”
দেবপ্রিয়র মতে, সিদ্ধান্তটিকে কেবল সরকারের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করাও যথাযথ নয়। বরং বাংলাদেশের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সদিচ্ছার প্রকাশ হিসেবে বিষয়টিকে দেখা উচিত। তিনি বলেন, “অথচ ঘটনাটা তো হল এই, যে বাংলাদেশের পক্ষে যে একটা বৈশ্বিক সদিচ্ছা, সেটার প্রকাশ পেয়েছে। আপনি মনে করেন যদি বৈশ্বিক সদিচ্ছা না থাকত, তাহলে আপনি যতই দেনদরবার করেন না কেন, এটা তো আপনি পেতেন না।”
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের প্রস্তাবের বিরোধিতা করে কোনো দেশের প্রতিনিধি বক্তব্য না দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন দেবপ্রিয়। পাশাপাশি ফ্রান্স, কানাডা ও আয়ারল্যান্ডের প্রতিনিধিদের সমর্থনের কথাও বলেন। আয়ারল্যান্ড জাতিসংঘে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পক্ষে বক্তব্য দিয়েছিল। বাংলাদেশের পাশাপাশি নেপালও যে একই সুবিধা পেয়েছে, সে কথা তুলে ধরে দেবপ্রিয় বলেন, সিদ্ধান্তটিকে এককভাবে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, “আমাদের কাছে প্রথমত মনে হচ্ছে প্রেস নোটের ভেতরে এই পুরো ঘটনাটার তাৎপর্য অনুধাবন করা, আত্মস্থ করা এবং এটাকে প্রকাশ করা, এই ক্ষেত্রে কিছুটা ঘাটতি রয়ে গেছে বলে আমাদের মনে হয়।”
বড় ৩ চ্যালেঞ্জ
অতিরিক্ত তিন বছরে বাংলাদেশকে একই সঙ্গে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে বলে মনে করেন দেবপ্রিয়। এগুলো হল: এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি বাড়ানো। তিনি বলেন, “একটা হচ্ছে যে আমাদের এইটার প্রস্তুতি নিতে হবে। এই উত্তরণের জন্য, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হওয়ার। একই সাথে আমার সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে হবে। এবং সেটার জন্য আমার কর আদায় বাড়াতে হবে, আমার সরকারি ব্যয়ের গুণমান বাড়াতে হবে, ব্যাংকিং খাত ঠিক করতে হবে, জ্বালানি ঠিক করতে হবে এবং প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হবে।”
অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, টাকার বিনিময়মূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং সুদের হার কমানোর মতো বিষয়েও নজর দিতে হবে বলে মনে করেন দেবপ্রিয়।
তিনি বলেন, একদিকে এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিতে হবে, অন্যদিকে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে হবে। একই সঙ্গে সেই স্থিতিশীলতার ভিত্তিতে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
তিনি বলেন, “সেহেতু এইটার জন্য আমার ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, সুদের হার কমাতে হবে এবং সেটা করতে গিয়ে আমি স্থিতায়নকে নষ্ট করতে পারব না। দেখেন, তিনটে জিনিস কিন্তু একসাথে আসছে।”
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, এই তিনটি লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করা সহজ হবে না। আগামী তিন বছরে সরকার কতটা সংস্কার করতে পারল এবং অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কতটা সফল হলো, তা পরবর্তী নির্বাচনের রাজনৈতিক আলোচনাতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক নাজনীন আহমেদ, সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান এবং গবেষণা বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান প্রমুখ।

আপনার মতামত লিখুন