ডিএনএ সিকোয়েন্সের মধ্যে জিনগত সাদৃশ্য ও সম্পর্ক নির্ণয়ের জন্য নতুন একটি সফটওয়্যার উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) গবেষকরা। তাদের দাবি, প্রচলিত জনপ্রিয় সফটওয়্যার ‘মেগা’র তুলনায় এটি ৫৫ থেকে ১ হাজার ৭৪৭ গুণ দ্রুত কাজ করতে সক্ষম। একই সঙ্গে অন্যান্য প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় কম্পিউটারের মেমোরি ব্যবহার কমায় ৩০ থেকে ৯৯ শতাংশ। ডেস্কটপের পাশাপাশি ওয়েবসাইট থেকেও সফটওয়্যারটি ব্যবহার করা যাবে।
সোমবার (২ নভেম্বর) বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের ডিন কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এক কর্মশালায় সফটওয়্যারটির সক্ষমতা ও কার্যপদ্ধতি তুলে ধরেন গবেষকরা।
গবেষণা দলের নেতৃত্বে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ম্যাথমেটিকস (সিএসএম) বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মেছবাহ উদ্দিন। দলের অন্য সদস্যরা হলেন স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী মাইফি-উল আসাদ এবং বায়োইনফরমেটিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের স্নাতক শিক্ষার্থী মুহাম্মদ ইশমামুল হক ও মো. আসিফুজ্জামান।
গবেষকরা জানান, জীবের বংশগত বৈশিষ্ট্য, বিবর্তন ও পারস্পরিক জিনগত সম্পর্ক নির্ণয়ে ডিএনএ বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রচলিত পদ্ধতিতে বিপুলসংখ্যক ডিএনএ সিকোয়েন্স বিশ্লেষণ করতে দীর্ঘ সময়ের পাশাপাশি কম্পিউটারের অধিক মেমোরি প্রয়োজন হয়। এ সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্যেই সরকারের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের সহযোগিতায় সফটওয়্যারটি তৈরি করা হয়েছে।
সফটওয়্যারটির মাধ্যমে দুটি বা একাধিক ডিএনএ সিকোয়েন্সের মধ্যে সাদৃশ্য নির্ণয় করা যায়। প্রচলিত পদ্ধতিতে প্রতিটি ডিএনএ অংশের সঙ্গে অন্য অংশের তুলনা করা হলেও নতুন পদ্ধতিতে ডিএনএর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশের মিল বিশ্লেষণ করা হয়। এ ক্ষেত্রে সিকোয়েন্সের স্বাভাবিক বিন্যাসের পাশাপাশি বিপরীত পরিপূরক বিন্যাসও বিবেচনায় নেওয়া হয়।
বিশ্লেষণের ফলাফলের ভিত্তিতে প্রতিটি ডিএনএ সিকোয়েন্সের জন্য একটি সংখ্যাভিত্তিক তালিকা তৈরি করা হয়। পরে এসব তালিকার তুলনা করে সিকোয়েন্সগুলোর মধ্যকার জিনগত সম্পর্ক নির্ধারণ করা সম্ভব হয়। এ সম্পর্কের ভিত্তিতে তৈরি করা যায় বংশবৃক্ষ, যার মাধ্যমে বিভিন্ন জীবের জিনগত সাদৃশ্য ও পার্থক্য চিহ্নিত করা যায়। গবেষকদের দাবি, পরীক্ষামূলক বিশ্লেষণে এ পদ্ধতিতে তৈরি বংশবৃক্ষের নির্ভুলতার হার ৯৫ থেকে ১০০ শতাংশ পাওয়া গেছে।
এ গবেষণার ফলাফল নিয়ে একটি প্রবন্ধ আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘মলিকিউলার জেনেটিক্স অ্যান্ড জিনোমিক্স’-এ প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষক দলের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ড. মেছবাহ উদ্দিন বলেন, প্রচলিত পদ্ধতিতে ডিএনএ বা প্রোটিনের গাঠনিক সাদৃশ্য বিশ্লেষণে অনেক সময় প্রায় এক মাস পর্যন্ত লেগে যায়। অথচ তাঁদের উদ্ভাবিত সফটওয়্যার ব্যবহার করে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ফলাফল পাওয়া সম্ভব। এটি সময় সাশ্রয়ের পাশাপাশি কম্পিউটারের মেমোরি ব্যবহারের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনে।
তিনি আরও জানান, সফটওয়্যারটির ডেস্কটপ ও ওয়েব সংস্করণ ইতিমধ্যে সবার ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। ফলে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং গবেষকরা এটি কাজে লাগাতে পারবেন।
‘গ্রাফিক্যাল ইউজার ইন্টারফেস ভিত্তিক ডেস্কটপ সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টের মাধ্যমে ডিএনএ সিকোয়েন্সের সাদৃশ্য দক্ষতার সঙ্গে শনাক্তকরণ’ শীর্ষক কর্মশালায় প্রধান অতিথি ছিলেন কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আবদুল মজিদ। এতে সভাপতিত্ব করেন সিএসএম বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক মো. সাইদ ইফতেখার ইউসুফ। অনুষ্ঠানে অনুষদের বিভিন্ন বিভাগের প্রধান, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. আবদুল মজিদ বলেন, প্রোগ্রামিংয়ের মাধ্যমে গবেষণায় ব্যবহারযোগ্য সফটওয়্যার তৈরি করা একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। মাত্র তিন মাসের গবেষণায় তৈরি এ সফটওয়্যার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। তবে নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের পাশাপাশি এর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।
গবেষকদের আশা, সফটওয়্যারটি ডিএনএ বিশ্লেষণে সময় ও কম্পিউটারের মেমোরি ব্যবহারের চাপ কমানোর পাশাপাশি দেশের জীবপ্রযুক্তি ও বায়োইনফরমেটিক্স গবেষণাকে আরও গতিশীল করবে। বিশেষ করে বিপুল পরিমাণ জিনগত তথ্য নিয়ে কাজ করা গবেষকদের জন্য এটি কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ নভেম্বর ২০২৬
ডিএনএ সিকোয়েন্সের মধ্যে জিনগত সাদৃশ্য ও সম্পর্ক নির্ণয়ের জন্য নতুন একটি সফটওয়্যার উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) গবেষকরা। তাদের দাবি, প্রচলিত জনপ্রিয় সফটওয়্যার ‘মেগা’র তুলনায় এটি ৫৫ থেকে ১ হাজার ৭৪৭ গুণ দ্রুত কাজ করতে সক্ষম। একই সঙ্গে অন্যান্য প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় কম্পিউটারের মেমোরি ব্যবহার কমায় ৩০ থেকে ৯৯ শতাংশ। ডেস্কটপের পাশাপাশি ওয়েবসাইট থেকেও সফটওয়্যারটি ব্যবহার করা যাবে।
সোমবার (২ নভেম্বর) বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের ডিন কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এক কর্মশালায় সফটওয়্যারটির সক্ষমতা ও কার্যপদ্ধতি তুলে ধরেন গবেষকরা।
গবেষণা দলের নেতৃত্বে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ম্যাথমেটিকস (সিএসএম) বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মেছবাহ উদ্দিন। দলের অন্য সদস্যরা হলেন স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী মাইফি-উল আসাদ এবং বায়োইনফরমেটিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের স্নাতক শিক্ষার্থী মুহাম্মদ ইশমামুল হক ও মো. আসিফুজ্জামান।
গবেষকরা জানান, জীবের বংশগত বৈশিষ্ট্য, বিবর্তন ও পারস্পরিক জিনগত সম্পর্ক নির্ণয়ে ডিএনএ বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রচলিত পদ্ধতিতে বিপুলসংখ্যক ডিএনএ সিকোয়েন্স বিশ্লেষণ করতে দীর্ঘ সময়ের পাশাপাশি কম্পিউটারের অধিক মেমোরি প্রয়োজন হয়। এ সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্যেই সরকারের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের সহযোগিতায় সফটওয়্যারটি তৈরি করা হয়েছে।
সফটওয়্যারটির মাধ্যমে দুটি বা একাধিক ডিএনএ সিকোয়েন্সের মধ্যে সাদৃশ্য নির্ণয় করা যায়। প্রচলিত পদ্ধতিতে প্রতিটি ডিএনএ অংশের সঙ্গে অন্য অংশের তুলনা করা হলেও নতুন পদ্ধতিতে ডিএনএর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশের মিল বিশ্লেষণ করা হয়। এ ক্ষেত্রে সিকোয়েন্সের স্বাভাবিক বিন্যাসের পাশাপাশি বিপরীত পরিপূরক বিন্যাসও বিবেচনায় নেওয়া হয়।
বিশ্লেষণের ফলাফলের ভিত্তিতে প্রতিটি ডিএনএ সিকোয়েন্সের জন্য একটি সংখ্যাভিত্তিক তালিকা তৈরি করা হয়। পরে এসব তালিকার তুলনা করে সিকোয়েন্সগুলোর মধ্যকার জিনগত সম্পর্ক নির্ধারণ করা সম্ভব হয়। এ সম্পর্কের ভিত্তিতে তৈরি করা যায় বংশবৃক্ষ, যার মাধ্যমে বিভিন্ন জীবের জিনগত সাদৃশ্য ও পার্থক্য চিহ্নিত করা যায়। গবেষকদের দাবি, পরীক্ষামূলক বিশ্লেষণে এ পদ্ধতিতে তৈরি বংশবৃক্ষের নির্ভুলতার হার ৯৫ থেকে ১০০ শতাংশ পাওয়া গেছে।
এ গবেষণার ফলাফল নিয়ে একটি প্রবন্ধ আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘মলিকিউলার জেনেটিক্স অ্যান্ড জিনোমিক্স’-এ প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষক দলের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ড. মেছবাহ উদ্দিন বলেন, প্রচলিত পদ্ধতিতে ডিএনএ বা প্রোটিনের গাঠনিক সাদৃশ্য বিশ্লেষণে অনেক সময় প্রায় এক মাস পর্যন্ত লেগে যায়। অথচ তাঁদের উদ্ভাবিত সফটওয়্যার ব্যবহার করে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ফলাফল পাওয়া সম্ভব। এটি সময় সাশ্রয়ের পাশাপাশি কম্পিউটারের মেমোরি ব্যবহারের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনে।
তিনি আরও জানান, সফটওয়্যারটির ডেস্কটপ ও ওয়েব সংস্করণ ইতিমধ্যে সবার ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। ফলে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং গবেষকরা এটি কাজে লাগাতে পারবেন।
‘গ্রাফিক্যাল ইউজার ইন্টারফেস ভিত্তিক ডেস্কটপ সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টের মাধ্যমে ডিএনএ সিকোয়েন্সের সাদৃশ্য দক্ষতার সঙ্গে শনাক্তকরণ’ শীর্ষক কর্মশালায় প্রধান অতিথি ছিলেন কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আবদুল মজিদ। এতে সভাপতিত্ব করেন সিএসএম বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক মো. সাইদ ইফতেখার ইউসুফ। অনুষ্ঠানে অনুষদের বিভিন্ন বিভাগের প্রধান, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. আবদুল মজিদ বলেন, প্রোগ্রামিংয়ের মাধ্যমে গবেষণায় ব্যবহারযোগ্য সফটওয়্যার তৈরি করা একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। মাত্র তিন মাসের গবেষণায় তৈরি এ সফটওয়্যার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। তবে নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের পাশাপাশি এর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।
গবেষকদের আশা, সফটওয়্যারটি ডিএনএ বিশ্লেষণে সময় ও কম্পিউটারের মেমোরি ব্যবহারের চাপ কমানোর পাশাপাশি দেশের জীবপ্রযুক্তি ও বায়োইনফরমেটিক্স গবেষণাকে আরও গতিশীল করবে। বিশেষ করে বিপুল পরিমাণ জিনগত তথ্য নিয়ে কাজ করা গবেষকদের জন্য এটি কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন