যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেন বারবার মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। শনিবার রাতে ওয়াশিংটনের হিলটন হোটেলে হোয়াইট হাউস সংবাদদাতাদের বার্ষিক নৈশভোজে গুলির ঘটনা তো প্রথম নয়।এর আগেও কমপক্ষে আরও পাঁচবার তিনি সরাসরি হামলার মুখোমুখি হয়েছেন।
সর্বশেষ ২৫ এপ্রিল ওয়াশিংটনের হিলটন হোটেলে নৈশভোজে মঞ্চে বক্তৃতার সময় গুলির শব্দ হয়। ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়াকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হয়। সাত থেকে আট রাউন্ড গুলি ছোড়া হয় বলে জানিয়েছে নিরাপত্তা কর্মীরা। সবাই অক্ষত।
এর আগের ঘটনা ২০২৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ফ্লোরিডায় ঘটে। ট্রাম্প ওয়েস্ট পাম বিচের নিজ গলফ রিসোর্টে খেলছিলেন। এক সন্দেহভাজন ঝোপের আড়ালে স্বয়ংক্রিয় বন্দুক হাতে লুকিয়ে ছিলেন। নিরাপত্তা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে গেলেও পরে গ্রেপ্তার হন রায়ান ওয়েসলি রুথ।
একই বছরের ১৩ জুলাই পেনসিলভানিয়ায় সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা হয়। নির্বাচনী সমাবেশে মঞ্চ থেকে ভাষণ দেওয়ার সময় পাশের ভবনের ছাদ থেকে গুলি চালানো হয়। ট্রাম্পের ডান কানে আঘাত লাগে, রক্ত ঝরে। এক সমর্থক নিহত, দুইজন গুরুতর আহত। হামলাকারী টমাস ম্যাথিউ ক্রুকস (২০) পাল্টা গুলিতে নিহত।
সেই ঘটনার প্রায় এক দশক আগে ২০১৬ সালের ৫ নভেম্বর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগের দিন রেনোর প্রচারসভায় ভিড় থেকে ‘বন্দুক’ বলে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু হয়। ট্রাম্পকে নামিয়ে নেওয়া হয়। পরে নিশ্চিত হয়, ওই ব্যক্তি নিরস্ত্র ছিলেন।
একই বছরের ১৮ জুন লাস ভেগাসে নির্বাচনী সমাবেশে বক্তৃতার মাঝপথে এক ব্রিটিশ নাগরিক পুলিশের আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। পরে তিনি স্বীকার করেন, ট্রাম্পকে হত্যাই তার উদ্দেশ্য ছিল।
সেই ঘটনার কয়েক মাস আগে ১২ মার্চ ওহাইও রাজ্যের ডেটনের প্রচারসভায় এক ব্যক্তি মঞ্চের দিকে ছুটে গেলে সিক্রেট সার্ভিস তাকে আটক করে। তার কাছে কোনো অস্ত্র না থাকলেও এটিকে ‘গুরুতর নিরাপত্তা হুমকি’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কেন বারবার টার্গেট হচ্ছেন ট্রাম্প? নিছক আবেগের বশবর্তী হয়ে হামলাকারীরা নিশানা করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে, নাকি অন্য আর গভীর কারণ রয়েছে। এ বিষয়ে বিশ্লেষকরা কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করছেন।
প্রথমত, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্যতম বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট। তার বক্তব্য, আচরণ ও নীতিমালা দেশকে চরমভাবে মেরুকৃত করেছে। এক পক্ষ তাকে পছন্দ করলেও বিপরীত পক্ষের অনেকের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ ও বিদ্বেষ কাজ করে।
দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুক আইনের শিথিলতা অনেকের পক্ষে সহজেই আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহ করা সম্ভব করে। ফলে ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা আদর্শিক কারণে কেউ কেউ চরমপন্থায় পৌঁছে যান।
তৃতীয়ত, ট্রাম্প জনসংযোগে বিশ্বাসী। তিনি নির্বাচনী প্রচারে নিয়মিত বিশাল সমাবেশ করেন, মঞ্চে ওঠেন, জনতার সঙ্গে মিশে যান। এটি তাকে যেমন জনপ্রিয় করেছে, তেমনি ঝুঁকিও বাড়িয়েছে।
চতুর্থত, অনেক বিশ্লেষকের মতে, ট্রাম্পবিরোধী গণমাধ্যমের ধারাবাহিক ‘নেতিবাচক’ উপস্থাপনা কিছু মানুষের মধ্যে চরম বিদ্বেষ তৈরি করেছে।
পঞ্চমত, ট্রাম্প নিজেকে ‘প্রতিষ্ঠানের বাইরের’ মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করেন। তিনি ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করেন। এর ফলে কিছু প্রান্তিক গোষ্ঠীর মধ্যে তিনি ‘শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত হন।
ট্রাম্পের ওপর এভাবে বারবার হামলার ঘটনা মার্কিন গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় ফাঁকফোকর তুলে ধরে। প্রেসিডেন্টকে ঘিরে থাকা ‘সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বলয়’ বারবার ভাঙার চেষ্টা হচ্ছে- এটি সত্যিই উদ্বেগজনক।২০২৪ সালের জুলাইয়ে পেনসিলভানিয়ায় হামলার পর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু তার পরও ফ্লোরিডা ও ওয়াশিংটনে আবার ঘাতকরা সুযোগ পেয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, ট্রাম্পের নিরাপত্তায় কি যথেষ্ট সংস্থান ও মনিটরিং হচ্ছে?
ট্রাম্প নিজেই এই প্রসঙ্গে সম্প্রতি বলেছেন, ‘এর চেয়ে বেশি বিপজ্জনক কোনো পেশা আছে, এটা আমি কল্পনাও করতে পারি না।’ তার এই মন্তব্য বারবার হামলার শিকার হওয়া এক প্রেসিডেন্টের যন্ত্রণারই প্রতিচ্ছবি।

রোববার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ এপ্রিল ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেন বারবার মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। শনিবার রাতে ওয়াশিংটনের হিলটন হোটেলে হোয়াইট হাউস সংবাদদাতাদের বার্ষিক নৈশভোজে গুলির ঘটনা তো প্রথম নয়।এর আগেও কমপক্ষে আরও পাঁচবার তিনি সরাসরি হামলার মুখোমুখি হয়েছেন।
সর্বশেষ ২৫ এপ্রিল ওয়াশিংটনের হিলটন হোটেলে নৈশভোজে মঞ্চে বক্তৃতার সময় গুলির শব্দ হয়। ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়াকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হয়। সাত থেকে আট রাউন্ড গুলি ছোড়া হয় বলে জানিয়েছে নিরাপত্তা কর্মীরা। সবাই অক্ষত।
এর আগের ঘটনা ২০২৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ফ্লোরিডায় ঘটে। ট্রাম্প ওয়েস্ট পাম বিচের নিজ গলফ রিসোর্টে খেলছিলেন। এক সন্দেহভাজন ঝোপের আড়ালে স্বয়ংক্রিয় বন্দুক হাতে লুকিয়ে ছিলেন। নিরাপত্তা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে গেলেও পরে গ্রেপ্তার হন রায়ান ওয়েসলি রুথ।
একই বছরের ১৩ জুলাই পেনসিলভানিয়ায় সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা হয়। নির্বাচনী সমাবেশে মঞ্চ থেকে ভাষণ দেওয়ার সময় পাশের ভবনের ছাদ থেকে গুলি চালানো হয়। ট্রাম্পের ডান কানে আঘাত লাগে, রক্ত ঝরে। এক সমর্থক নিহত, দুইজন গুরুতর আহত। হামলাকারী টমাস ম্যাথিউ ক্রুকস (২০) পাল্টা গুলিতে নিহত।
সেই ঘটনার প্রায় এক দশক আগে ২০১৬ সালের ৫ নভেম্বর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগের দিন রেনোর প্রচারসভায় ভিড় থেকে ‘বন্দুক’ বলে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু হয়। ট্রাম্পকে নামিয়ে নেওয়া হয়। পরে নিশ্চিত হয়, ওই ব্যক্তি নিরস্ত্র ছিলেন।
একই বছরের ১৮ জুন লাস ভেগাসে নির্বাচনী সমাবেশে বক্তৃতার মাঝপথে এক ব্রিটিশ নাগরিক পুলিশের আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। পরে তিনি স্বীকার করেন, ট্রাম্পকে হত্যাই তার উদ্দেশ্য ছিল।
সেই ঘটনার কয়েক মাস আগে ১২ মার্চ ওহাইও রাজ্যের ডেটনের প্রচারসভায় এক ব্যক্তি মঞ্চের দিকে ছুটে গেলে সিক্রেট সার্ভিস তাকে আটক করে। তার কাছে কোনো অস্ত্র না থাকলেও এটিকে ‘গুরুতর নিরাপত্তা হুমকি’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কেন বারবার টার্গেট হচ্ছেন ট্রাম্প? নিছক আবেগের বশবর্তী হয়ে হামলাকারীরা নিশানা করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে, নাকি অন্য আর গভীর কারণ রয়েছে। এ বিষয়ে বিশ্লেষকরা কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করছেন।
প্রথমত, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্যতম বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট। তার বক্তব্য, আচরণ ও নীতিমালা দেশকে চরমভাবে মেরুকৃত করেছে। এক পক্ষ তাকে পছন্দ করলেও বিপরীত পক্ষের অনেকের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ ও বিদ্বেষ কাজ করে।
দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুক আইনের শিথিলতা অনেকের পক্ষে সহজেই আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহ করা সম্ভব করে। ফলে ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা আদর্শিক কারণে কেউ কেউ চরমপন্থায় পৌঁছে যান।
তৃতীয়ত, ট্রাম্প জনসংযোগে বিশ্বাসী। তিনি নির্বাচনী প্রচারে নিয়মিত বিশাল সমাবেশ করেন, মঞ্চে ওঠেন, জনতার সঙ্গে মিশে যান। এটি তাকে যেমন জনপ্রিয় করেছে, তেমনি ঝুঁকিও বাড়িয়েছে।
চতুর্থত, অনেক বিশ্লেষকের মতে, ট্রাম্পবিরোধী গণমাধ্যমের ধারাবাহিক ‘নেতিবাচক’ উপস্থাপনা কিছু মানুষের মধ্যে চরম বিদ্বেষ তৈরি করেছে।
পঞ্চমত, ট্রাম্প নিজেকে ‘প্রতিষ্ঠানের বাইরের’ মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করেন। তিনি ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করেন। এর ফলে কিছু প্রান্তিক গোষ্ঠীর মধ্যে তিনি ‘শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত হন।
ট্রাম্পের ওপর এভাবে বারবার হামলার ঘটনা মার্কিন গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় ফাঁকফোকর তুলে ধরে। প্রেসিডেন্টকে ঘিরে থাকা ‘সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বলয়’ বারবার ভাঙার চেষ্টা হচ্ছে- এটি সত্যিই উদ্বেগজনক।২০২৪ সালের জুলাইয়ে পেনসিলভানিয়ায় হামলার পর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু তার পরও ফ্লোরিডা ও ওয়াশিংটনে আবার ঘাতকরা সুযোগ পেয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, ট্রাম্পের নিরাপত্তায় কি যথেষ্ট সংস্থান ও মনিটরিং হচ্ছে?
ট্রাম্প নিজেই এই প্রসঙ্গে সম্প্রতি বলেছেন, ‘এর চেয়ে বেশি বিপজ্জনক কোনো পেশা আছে, এটা আমি কল্পনাও করতে পারি না।’ তার এই মন্তব্য বারবার হামলার শিকার হওয়া এক প্রেসিডেন্টের যন্ত্রণারই প্রতিচ্ছবি।

আপনার মতামত লিখুন