সংবাদ

বাজেটে লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে ৭ শতাংশ, বাজারে মূল্যস্ফীতি পৌনে ১০ ছুঁইছুঁই


রেজাউল করিম
রেজাউল করিম
প্রকাশ: ৯ জুন ২০২৬, ১১:৩৬ পিএম

বাজেটে লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে ৭ শতাংশ, বাজারে মূল্যস্ফীতি পৌনে ১০ ছুঁইছুঁই

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকার যখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এক বড় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক তখনই সাধারণ মানুষের পকেট ফাঁকা হওয়ার বাস্তবতা আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। খসড়া বাজেটে আগামী অর্থবছরের জন্য সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে সাড়ে শতাংশ। কিন্তু এই লক্ষ্য যখন নীতিনির্ধারকদের টেবিলে ঘুরপাক খাচ্ছে, তখনই দেশের বাজারে মূল্যস্ফীতি লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, গত মে মাসেই দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে দশমিক ৪২ শতাংশে। এই মূল্যস্ফীতি গত ষোলো মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। খাতা-কলমে দাম কমানোর সরকারি সদিচ্ছা আর বাজারের রূঢ় বাস্তবতার এই বিশাল ব্যবধান দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে এক বড় ধরনের চাপে ফেলে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে একটানা চলতে থাকা এই উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ আসন্ন অর্থবছরের বাজেটের কার্যকারিতাকে শুরুতেই বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

খসড়া বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে পেশ হতে যাচ্ছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট। এবারের বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হচ্ছে প্রায় লাখ ৩০ হাজার থেকে লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল ব্যয়ের বিপরীতে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে প্রায় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এবারের বাজেটে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের বাস্তবায়ন তথা ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট হতে যাচ্ছে সরকারের জন্য এক বিশাল পরীক্ষা। একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সংকটের কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে দেশের ভেতরে ডলারের বিপরীতে টাকার ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন আমদানি করা প্রতিটি পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।

প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর . আহসান এইচ মনসুর সংবাদকে বলেন, ‘সরকার যে লক্ষ্যমাত্রা ধরেছে তা বাস্তবায়ন করতে পারবে না। এর নমুনা এখনই দেখা যাচ্ছে। কারণ, দিন দিন মূল্যস্ফীতি কমছে না বরং বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক যে নীতি গ্রহণ করছে তাতে মূল্যস্ফীতি কমা সম্ভব নয়। আমি দায়িত্বে থাকার সময় সবকিছু গুছিয়ে নিয়েছিলাম। মূল্যস্ফীতি কমতে শুরু করেছিল। এখন আবার আগের জায়গায় চলে গেছে।

সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা খাদ্য মূল্যস্ফীতি। মে মাসের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এপ্রিলের দশমিক ৩৯ শতাংশ থেকে লাফিয়ে মে মাসে দশমিক শূন্য ছয় শতাংশে উঠেছে। চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে যেন আগুন লেগেছে। পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে খাদ্য বহির্ভূত খাতের মূল্যস্ফীতি যা মে মাসে দশমিক ৭১ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। যাতায়াত, বাসা ভাড়া, চিকিৎসা শিক্ষার খরচ মিটাতে গিয়ে সীমিত আয়ের মানুষরা এখন দিশেহারা। টানা কয়েক বছর উচ্চ মূল্যস্ফীতির যে ভিত্তি তৈরি হয়েছে, তার ওপর নতুন করে এই মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে।

বন্ধ কলকারখানা চালু করা এবং বিভিন্ন অনুৎপাদনশীল খাতে সরকারের অর্থ সরবরাহের নীতি বাজারে টাকার প্রবাহ সচল রাখছে, যা মূল্যস্ফীতি উসকে দেওয়ার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। ফলে সরকারের সাড়ে সাত শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা শুধু কঠিনই নয়, বরং এক প্রকার অবাস্তব কল্পনাবিলাসী বলে মনে করছেন গবেষণা সংস্থাগুলো।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশের মধ্যবিত্ত নিম্নআয়ের মানুষের প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধির হার মে মাসে ছিল দশমিক ২১ শতাংশ।। তাই শতাংশের বেশি মূল্যস্ফীতি সরাসরি মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে চাপে ফেলছে। আয়ের চেয়ে ব্যয়ের গতি বেশি হওয়ায় মানুষ এখন টিকে থাকার জন্য জমানো টাকা ভাঙছে অথবা চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে।

বাজারে চলমান এই অস্থিরতার পেছনে কেবল বৈশ্বিক পরিস্থিতি নয়, অভ্যন্তরীণ কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত কাঠামোগত দুর্বলতা বড় ভূমিকা রাখছে। দেশের শক্তি জ্বালানি খাতের ওপর চাপ কমাতে সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল এবং গ্যাসের দাম দফায় দফায় বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন পরিবহন খরচ এক ধাক্কায় অনেক বেড়ে গেছে।

এই উচ্চ উৎপাদন পরিবহন খরচের চাপ সরাসরি এসে পড়ছে সাধারণ ভোক্তার ঘাড়ে। বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি নির্ধারণী সুদের হার বাড়িয়ে ১০ শতাংশে ধরে রাখলেও এবং মুদ্রা সংকোচন নীতি নেওয়ার কথা বললেও, বাজার ব্যবস্থাপনার ত্রুটি এবং অসাধু চক্রের সিন্ডিকেটের কারণে তার কোনো সুফল মিলছে না।

আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থা গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর পূর্বাভাস বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি শেষ পর্যন্ত সাড়ে শতাংশের নিচে নামানো সম্ভব নাও হতে পারে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রা নীতির লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে যাবে।

ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) বাজারদরের তালিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত এক বছরে মোটা চালের দাম প্রায় শতাংশ বেড়ে প্রতি কেজি ৫২ থেকে ৫৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মধ্যবিত্তের প্রিয় বিআর-২৮ চালের দাম শতাংশ বেড়ে মানভেদে ৫৪ থেকে ৬৮ টাকায় ঠেকেছে। এমনকি খোলা সয়াবিন তেলের দাম এক বছরে ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি লিটার ১৮৫ থেকে ১৯০ টাকা এবং পাম তেল ১২ শতাংশ বেড়ে ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সবজির বাজারে সারা বছরই আগুন লেগে থাকছে। শীত বা গ্রীষ্ম যেকোনো ঋতুতেই এখন বাজারে ৭০ থেকে ৮০ টাকার নিচে কোনো সবজি পাওয়া যাচ্ছে না।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, খসড়া বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ কিছুটা বাড়ানোর আভাস থাকলেও, তা মধ্যবিত্তের ক্ষোভ কিংবা নিম্নবিত্তের হাহাকার কমাতে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়েই গেছে। যদি আসন্ন বাজেটে ঘাটতি অর্থায়নের জন্য সরকার ব্যাংক খাত থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়ার ধারা বজায় রাখে, তবে তা বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ কমিয়ে দিবে এবং বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করবে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘আগামী বছর সরকারের প্রধান দুটি চ্যালেঞ্জের একটি হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। আরেকটি হলো, রাজস্ব আহরণ। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি আসবে না। তাই সরকারের উচিত এই দুটি বিষয়ে জোর দেওয়া।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বুধবার, ১০ জুন ২০২৬


বাজেটে লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে ৭ শতাংশ, বাজারে মূল্যস্ফীতি পৌনে ১০ ছুঁইছুঁই

প্রকাশের তারিখ : ০৯ জুন ২০২৬

featured Image

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকার যখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এক বড় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক তখনই সাধারণ মানুষের পকেট ফাঁকা হওয়ার বাস্তবতা আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। খসড়া বাজেটে আগামী অর্থবছরের জন্য সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে সাড়ে শতাংশ। কিন্তু এই লক্ষ্য যখন নীতিনির্ধারকদের টেবিলে ঘুরপাক খাচ্ছে, তখনই দেশের বাজারে মূল্যস্ফীতি লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, গত মে মাসেই দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে দশমিক ৪২ শতাংশে। এই মূল্যস্ফীতি গত ষোলো মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। খাতা-কলমে দাম কমানোর সরকারি সদিচ্ছা আর বাজারের রূঢ় বাস্তবতার এই বিশাল ব্যবধান দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে এক বড় ধরনের চাপে ফেলে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে একটানা চলতে থাকা এই উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ আসন্ন অর্থবছরের বাজেটের কার্যকারিতাকে শুরুতেই বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

খসড়া বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে পেশ হতে যাচ্ছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট। এবারের বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হচ্ছে প্রায় লাখ ৩০ হাজার থেকে লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল ব্যয়ের বিপরীতে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে প্রায় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এবারের বাজেটে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের বাস্তবায়ন তথা ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট হতে যাচ্ছে সরকারের জন্য এক বিশাল পরীক্ষা। একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সংকটের কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে দেশের ভেতরে ডলারের বিপরীতে টাকার ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন আমদানি করা প্রতিটি পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।

প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর . আহসান এইচ মনসুর সংবাদকে বলেন, ‘সরকার যে লক্ষ্যমাত্রা ধরেছে তা বাস্তবায়ন করতে পারবে না। এর নমুনা এখনই দেখা যাচ্ছে। কারণ, দিন দিন মূল্যস্ফীতি কমছে না বরং বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক যে নীতি গ্রহণ করছে তাতে মূল্যস্ফীতি কমা সম্ভব নয়। আমি দায়িত্বে থাকার সময় সবকিছু গুছিয়ে নিয়েছিলাম। মূল্যস্ফীতি কমতে শুরু করেছিল। এখন আবার আগের জায়গায় চলে গেছে।

সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা খাদ্য মূল্যস্ফীতি। মে মাসের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এপ্রিলের দশমিক ৩৯ শতাংশ থেকে লাফিয়ে মে মাসে দশমিক শূন্য ছয় শতাংশে উঠেছে। চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে যেন আগুন লেগেছে। পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে খাদ্য বহির্ভূত খাতের মূল্যস্ফীতি যা মে মাসে দশমিক ৭১ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। যাতায়াত, বাসা ভাড়া, চিকিৎসা শিক্ষার খরচ মিটাতে গিয়ে সীমিত আয়ের মানুষরা এখন দিশেহারা। টানা কয়েক বছর উচ্চ মূল্যস্ফীতির যে ভিত্তি তৈরি হয়েছে, তার ওপর নতুন করে এই মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে।

বন্ধ কলকারখানা চালু করা এবং বিভিন্ন অনুৎপাদনশীল খাতে সরকারের অর্থ সরবরাহের নীতি বাজারে টাকার প্রবাহ সচল রাখছে, যা মূল্যস্ফীতি উসকে দেওয়ার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। ফলে সরকারের সাড়ে সাত শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা শুধু কঠিনই নয়, বরং এক প্রকার অবাস্তব কল্পনাবিলাসী বলে মনে করছেন গবেষণা সংস্থাগুলো।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশের মধ্যবিত্ত নিম্নআয়ের মানুষের প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধির হার মে মাসে ছিল দশমিক ২১ শতাংশ।। তাই শতাংশের বেশি মূল্যস্ফীতি সরাসরি মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে চাপে ফেলছে। আয়ের চেয়ে ব্যয়ের গতি বেশি হওয়ায় মানুষ এখন টিকে থাকার জন্য জমানো টাকা ভাঙছে অথবা চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে।

বাজারে চলমান এই অস্থিরতার পেছনে কেবল বৈশ্বিক পরিস্থিতি নয়, অভ্যন্তরীণ কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত কাঠামোগত দুর্বলতা বড় ভূমিকা রাখছে। দেশের শক্তি জ্বালানি খাতের ওপর চাপ কমাতে সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল এবং গ্যাসের দাম দফায় দফায় বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন পরিবহন খরচ এক ধাক্কায় অনেক বেড়ে গেছে।

এই উচ্চ উৎপাদন পরিবহন খরচের চাপ সরাসরি এসে পড়ছে সাধারণ ভোক্তার ঘাড়ে। বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি নির্ধারণী সুদের হার বাড়িয়ে ১০ শতাংশে ধরে রাখলেও এবং মুদ্রা সংকোচন নীতি নেওয়ার কথা বললেও, বাজার ব্যবস্থাপনার ত্রুটি এবং অসাধু চক্রের সিন্ডিকেটের কারণে তার কোনো সুফল মিলছে না।

আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থা গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর পূর্বাভাস বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি শেষ পর্যন্ত সাড়ে শতাংশের নিচে নামানো সম্ভব নাও হতে পারে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রা নীতির লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে যাবে।

ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) বাজারদরের তালিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত এক বছরে মোটা চালের দাম প্রায় শতাংশ বেড়ে প্রতি কেজি ৫২ থেকে ৫৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মধ্যবিত্তের প্রিয় বিআর-২৮ চালের দাম শতাংশ বেড়ে মানভেদে ৫৪ থেকে ৬৮ টাকায় ঠেকেছে। এমনকি খোলা সয়াবিন তেলের দাম এক বছরে ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি লিটার ১৮৫ থেকে ১৯০ টাকা এবং পাম তেল ১২ শতাংশ বেড়ে ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সবজির বাজারে সারা বছরই আগুন লেগে থাকছে। শীত বা গ্রীষ্ম যেকোনো ঋতুতেই এখন বাজারে ৭০ থেকে ৮০ টাকার নিচে কোনো সবজি পাওয়া যাচ্ছে না।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, খসড়া বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ কিছুটা বাড়ানোর আভাস থাকলেও, তা মধ্যবিত্তের ক্ষোভ কিংবা নিম্নবিত্তের হাহাকার কমাতে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়েই গেছে। যদি আসন্ন বাজেটে ঘাটতি অর্থায়নের জন্য সরকার ব্যাংক খাত থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়ার ধারা বজায় রাখে, তবে তা বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ কমিয়ে দিবে এবং বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করবে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘আগামী বছর সরকারের প্রধান দুটি চ্যালেঞ্জের একটি হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। আরেকটি হলো, রাজস্ব আহরণ। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি আসবে না। তাই সরকারের উচিত এই দুটি বিষয়ে জোর দেওয়া।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত