রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি লোডিং শুরুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে যে পারমাণবিক যুগে পা রাখল, সেই স্বপ্নের শুরুটা হয়েছিল ১৯৬১ সালে। তখনও স্বাধীন হয়নি দেশ। পাকিস্তান আমলে রূপপুরে জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু কয়েক বছর পরই প্রকল্পটি বাতিল করে দেয় তৎকালীন পাকিস্তান সরকার।
স্বাধীনতার পর দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আজ সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে বসেছে। স্বাধীন দেশে পারমাণবিক শক্তি নিয়ে আবার উদ্যোগ নেওয়া হয় ১৯৯৫ সালে। সে বছরের জাতীয় জ্বালানি নীতিতে পারমাণবিক শক্তিকে একটি সম্ভাবনাময় বিকল্প জ্বালানি উৎস হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এরপর দীর্ঘ পথচলার শুরু।
২০১১ সালে বাংলাদেশ সরকার ও রুশ ফেডারেশন সরকারের মধ্যে একটি আন্তরাষ্ট্রীয় সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এটি ছিল মূল মাইলফলক।
চুক্তির আওতায় ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও রাশিয়ার রোসাটমের ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্টের মধ্যে সাধারণ ঠিকাদারি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। এই চুক্তিতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ, যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও স্থাপন, কমিশনিং, পরীক্ষামূলক পরিচালনা, জনবলের প্রশিক্ষণ এবং প্রাথমিক পর্যায়ে তিন বছরের পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহের বিষয় ছিল।
নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৭ সালে। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে প্রথম ইউনিটের কংক্রিট ঢালাইয়ের কাজ শুরু হয়। এরপর করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ নানা চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে এখন জ্বালানি লোডিংয়ের পর্যায়ে পৌঁছেছে প্রকল্প।
রূপপুরের দুই ইউনিটে ব্যবহার হচ্ছে রাশিয়ার তৈরি ভিভিইআর-১২০০ মডেলের রিঅ্যাক্টর। এটি তৃতীয় প্রজন্মের ‘প্লাস’ প্রযুক্তি, যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিধি মানে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য জ্বালানি বান্ডেল চুল্লির কেন্দ্রে বসানো হবে। প্রথম ইউনিটে একসঙ্গে ১৬৩টি বান্ডিল ব্যবহার করা হবে। ২০২৩ সালে অতিরিক্ত একটি নিয়ে মোট ১৬৪টি বান্ডিল দেশে আনা হয়। একবার জ্বালানি বসালে প্রায় ১৮ মাস নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি মূলত ইউরেনিয়াম থেকে তৈরি হয়। প্রথমে ইউরেনিয়াম অক্সাইড দিয়ে ছোট ট্যাবলেটের মতো জ্বালানি দানা (প্যালেট) তৈরি করা হয়। এগুলোর ব্যাস ৮ থেকে ১৫ মিলিমিটার এবং দৈর্ঘ্য ১০ থেকে ১৫ মিলিমিটার। অনেকগুলো জ্বালানি দানা প্রায় চার মিটার দীর্ঘ ধাতব নলের ভেতরে সাজিয়ে তৈরি হয় জ্বালানি রড। আর নির্দিষ্ট কাঠামোতে অনেকগুলো রড একসঙ্গে যুক্ত করে তৈরি হয় জ্বালানি বান্ডিল বা ফুয়েল অ্যাসেম্বলি। রূপপুরে ব্যবহৃত প্রতিটি বান্ডিলে ৩১২টি জ্বালানি রড আছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুই ইউনিটের কাঠামো তৈরি প্রায় শেষের দিকে। প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে সঞ্চালন লাইনের কাজও শেষ।
জ্বালানি প্রবেশ করানোর আগে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে প্রতিটি ধাপ শেষ করা হয়েছে। জ্বালানি লোডিং শেষে রিঅ্যাক্টর থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রাথমিক প্রক্রিয়া ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’ সম্পন্ন করা হবে।
জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হতে প্রায় ৪৫ দিন সময় লাগবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, আগস্টের শেষ নাগাদ প্রথম ইউনিট থেকে পরীক্ষামূলকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। তবে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়া এক বছর ধরে চলতে পারে। এ সময় নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলবে। প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সংস্থার ছাড়পত্র ও দেশীয় পরমাণু সংস্থার অনুমোদন।
২০২৬ সালের শেষ নাগাদ বা ২০২৭ সালের শুরুতেই প্রথম ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় (১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট) উৎপাদন শুরু করবে বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ। দুই ইউনিট চালু হলে মোট উৎপাদন হবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট, যা দেশের মোট চাহিদার প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ।
১৯৬১ সালে জমি অধিগ্রহণ, পরে বাতিল, আবার স্বাধীন দেশে উদ্যোগ, ২০১১ সালে রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি, ২০১৫ সালে নির্মাণচুক্তি, ২০১৭ সালে কাজের শুরু- এখন ২০২৬ সালে জ্বালানি লোডিং। প্রায় ছয় দশকের সেই স্বপ্ন এখন বাস্তব।

মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ এপ্রিল ২০২৬
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি লোডিং শুরুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে যে পারমাণবিক যুগে পা রাখল, সেই স্বপ্নের শুরুটা হয়েছিল ১৯৬১ সালে। তখনও স্বাধীন হয়নি দেশ। পাকিস্তান আমলে রূপপুরে জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু কয়েক বছর পরই প্রকল্পটি বাতিল করে দেয় তৎকালীন পাকিস্তান সরকার।
স্বাধীনতার পর দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আজ সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে বসেছে। স্বাধীন দেশে পারমাণবিক শক্তি নিয়ে আবার উদ্যোগ নেওয়া হয় ১৯৯৫ সালে। সে বছরের জাতীয় জ্বালানি নীতিতে পারমাণবিক শক্তিকে একটি সম্ভাবনাময় বিকল্প জ্বালানি উৎস হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এরপর দীর্ঘ পথচলার শুরু।
২০১১ সালে বাংলাদেশ সরকার ও রুশ ফেডারেশন সরকারের মধ্যে একটি আন্তরাষ্ট্রীয় সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এটি ছিল মূল মাইলফলক।
চুক্তির আওতায় ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও রাশিয়ার রোসাটমের ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্টের মধ্যে সাধারণ ঠিকাদারি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। এই চুক্তিতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ, যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও স্থাপন, কমিশনিং, পরীক্ষামূলক পরিচালনা, জনবলের প্রশিক্ষণ এবং প্রাথমিক পর্যায়ে তিন বছরের পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহের বিষয় ছিল।
নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৭ সালে। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে প্রথম ইউনিটের কংক্রিট ঢালাইয়ের কাজ শুরু হয়। এরপর করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ নানা চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে এখন জ্বালানি লোডিংয়ের পর্যায়ে পৌঁছেছে প্রকল্প।
রূপপুরের দুই ইউনিটে ব্যবহার হচ্ছে রাশিয়ার তৈরি ভিভিইআর-১২০০ মডেলের রিঅ্যাক্টর। এটি তৃতীয় প্রজন্মের ‘প্লাস’ প্রযুক্তি, যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিধি মানে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য জ্বালানি বান্ডেল চুল্লির কেন্দ্রে বসানো হবে। প্রথম ইউনিটে একসঙ্গে ১৬৩টি বান্ডিল ব্যবহার করা হবে। ২০২৩ সালে অতিরিক্ত একটি নিয়ে মোট ১৬৪টি বান্ডিল দেশে আনা হয়। একবার জ্বালানি বসালে প্রায় ১৮ মাস নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি মূলত ইউরেনিয়াম থেকে তৈরি হয়। প্রথমে ইউরেনিয়াম অক্সাইড দিয়ে ছোট ট্যাবলেটের মতো জ্বালানি দানা (প্যালেট) তৈরি করা হয়। এগুলোর ব্যাস ৮ থেকে ১৫ মিলিমিটার এবং দৈর্ঘ্য ১০ থেকে ১৫ মিলিমিটার। অনেকগুলো জ্বালানি দানা প্রায় চার মিটার দীর্ঘ ধাতব নলের ভেতরে সাজিয়ে তৈরি হয় জ্বালানি রড। আর নির্দিষ্ট কাঠামোতে অনেকগুলো রড একসঙ্গে যুক্ত করে তৈরি হয় জ্বালানি বান্ডিল বা ফুয়েল অ্যাসেম্বলি। রূপপুরে ব্যবহৃত প্রতিটি বান্ডিলে ৩১২টি জ্বালানি রড আছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুই ইউনিটের কাঠামো তৈরি প্রায় শেষের দিকে। প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে সঞ্চালন লাইনের কাজও শেষ।
জ্বালানি প্রবেশ করানোর আগে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে প্রতিটি ধাপ শেষ করা হয়েছে। জ্বালানি লোডিং শেষে রিঅ্যাক্টর থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রাথমিক প্রক্রিয়া ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’ সম্পন্ন করা হবে।
জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হতে প্রায় ৪৫ দিন সময় লাগবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, আগস্টের শেষ নাগাদ প্রথম ইউনিট থেকে পরীক্ষামূলকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। তবে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়া এক বছর ধরে চলতে পারে। এ সময় নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলবে। প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সংস্থার ছাড়পত্র ও দেশীয় পরমাণু সংস্থার অনুমোদন।
২০২৬ সালের শেষ নাগাদ বা ২০২৭ সালের শুরুতেই প্রথম ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় (১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট) উৎপাদন শুরু করবে বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ। দুই ইউনিট চালু হলে মোট উৎপাদন হবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট, যা দেশের মোট চাহিদার প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ।
১৯৬১ সালে জমি অধিগ্রহণ, পরে বাতিল, আবার স্বাধীন দেশে উদ্যোগ, ২০১১ সালে রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি, ২০১৫ সালে নির্মাণচুক্তি, ২০১৭ সালে কাজের শুরু- এখন ২০২৬ সালে জ্বালানি লোডিং। প্রায় ছয় দশকের সেই স্বপ্ন এখন বাস্তব।

আপনার মতামত লিখুন