রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যার মামলায় প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনের মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেছে আদালত। ঘটনার মাত্র ঊনিশ দিনের মাথায় (৬ কার্যদিবস) এই রায় বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে এক বিরল নজির স্থাপন করেছে।
কিন্তু এই দ্রুত রায় কি সত্যিই ধর্ষণের বিরুদ্ধে একটি টেকসই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে? বছরের পর বছর ধরে যখনই দেশে কোনো ভয়াবহ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে, সমাজের একটি বড় অংশ একটিই দাবি তোলে ‘ধর্ষকের ফাঁসি চাই’। কুমিল্লার তনু, মাগুরার আছিয়া কিংবা নরসিংদীর আমেনার ঘটনার পর ‘ফাঁসি চাই’ স্লোগানে মুখরিত হয়েছিলো রাজপথ।
একটি ভয়াবহ চিত্র
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে যেখানে ৫১৬ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন, সেখানে ২০২৫-২৬ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৮৬-তে। মাত্র এক বছরে ৫২ শতাংশ বৃদ্ধি। আর প্রতিদিন গড়ে ১৩ জন নারী ও শিশু এই নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।
► ৭৮৬ জন ভুক্তভোগীর মধ্যে ৫৪৩ জনই ছিল অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু।
► মাত্র দুই বছরে নথিভুক্ত ধর্ষণ মামলার সংখ্যা প্রায় দশ হাজার।
► সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে অসংখ্য ঘটনা অপ্রকাশিতই থেকে যাচ্ছে।
মাগুরার শিশু আছিয়ার ধর্ষণ, পরবর্তিতে হাসপাতালে মৃত্যু সব-ই আমরা নীরব সাক্ষী হয়ে দেখেছি।হয়তো রায়ও হয়েছে। তবে বছর পার হলেও কার্যকর হয়নি ফাঁসি । কুমিল্লার তনু হত্যার ৯ বছর পরেও তদন্ত শেষ হয়নি। কাউকে সাজা দেওয়া যায়নি। ঢাকার খিলক্ষেতে স্বামী-স্ত্রীকে অপহরণ করে নারীকে দলবদ্ধ ধর্ষণ ঘটনায় গ্রেপ্তার সাতজনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তবে ২ বছরেও মেলেনি রায়। কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজ ছাত্রীকে অপহরণ, ধর্ষণ ও ভারতে পাচারের চেষ্টায় সানমুন নামে একজন গ্রেপ্তার ও রণি নামে একজন পলাতক।
এই সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়, সমাজের এক ভয়াল চিত্র। সাম্প্রতিক আলোচিত মামলাগুলোর দিকে তাকালে ছবিটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মৃত্যুদণ্ড কেন যথেষ্ট নয়?
প্রায় আড়াইশো বছর আগেই ইতালীয় আইনদার্শনিক সেসারে বেকারিয়া তার বিখ্যাত ‘অন ক্রাইমস অ্যান্ড পানিশমেন্টস’ (১৭৬৪) বইয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলেছিলেন। মানুষকে বেশি ভয় পায় কোনটি- ক্ষণিক মৃত্যু, নাকি দীর্ঘস্থায়ী কষ্ট? তার উত্তর ছিল স্পষ্ট, “মানুষের মনে প্রকৃত ভয় তৈরি করে শাস্তির তীব্রতা নয়, তার অনিবার্যতা ও স্থায়িত্ব।” (It is not the intensity of the punishment that has the greatest effect on the human spirit, but its duration. - Cesare Beccaria)
বাংলাদেশে ২০০৮ সালের এক ধর্ষণ মামলার রায় কার্যকর হয়েছে ২০২৪ সালে, প্রায় ১৬ বছর পর। এই দীর্ঘসূত্রিতাই শাস্তিকে অর্থহীন করে দেয়। একজন সম্ভাব্য অপরাধীর কাছে ১৬ বছর পরের ফাঁসির ভয় কতটুকু বাস্তব? বেকারিয়া বলেছেন, শাস্তি অপরাধের সঙ্গে সঙ্গে ঘটলে তবেই সেটি প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে।
শাস্তির ‘নিশ্চয়তা’ কেন ‘তীব্রতার’ চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
ব্রিটিশ দার্শনিক জেরেমি বেন্থাম তার ‘সুখ-দুঃখের গণনা’ তত্ত্বে বলেছিলেন, “মানুষ অপরাধ করার আগে একটি অচেতন হিসাব কষে। সম্ভাব্য সুবিধা কি সম্ভাব্য শাস্তির চেয়ে বেশি? যদি অপরাধীর মনে থাকে এই বিশ্বাস যে ‘ধরা পড়লেও পার পাওয়া যাবে’ তাহলে শাস্তি যতই কঠোর হোক, তা কাজ করে না। "শাস্তির কঠোরতার চেয়ে শাস্তির সুনিশ্চিততাই অনেক বেশি কার্যকর (The certainty of punishment is far more effective than its severity. - Jeremy Bentham)।
বাংলাদেশে এই ‘পার পাওয়ার’ সংস্কৃতি অত্যন্ত প্রকট। ২০১১ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ছয়টি জেলায় ৪ হাজার ৩৭২টি ধর্ষণ মামলার মধ্যে মাত্র পাঁচজন আসামি দোষী সাব্যস্ত হয়েছিল। অর্থাৎ সাজার হার মাত্র ০.১ শতাংশ। আর জাতিসংঘের ২০১০-২০১৩ সালের জরিপ বলছে, বাংলাদেশের ৯৫.১ শতাংশ শহুরে ধর্ষক কোনো আইনি পরিণতির মুখোমুখিই হয়নি। যে সমাজে শাস্তি পাওয়ার সম্ভাবনা ০.১ শতাংশ, সেখানে মৃত্যুদণ্ডের হুমকি কতটুকু কাজ করবে?
দৃশ্যমান ও স্থায়ী শাস্তির প্রয়োজনীয়তা
ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো তার ‘ডিসিপ্লিন অ্যান্ড পুনিশ: দি বার্থ অব দি প্রিজন’(১৯৭৫) বইয়ে শাস্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা তুলে ধরেছেন। “শাস্তি কেবল অপরাধীর জন্য নয়, সমাজের জন্যও। শাস্তি যদি দৃশ্যমান, দীর্ঘস্থায়ী ও সামাজিকভাবে কার্যকর না হয়, তার প্রতিরোধক শক্তি থাকে না। ”
ফুকো মনে করতেন আধুনিক শাস্তির মূল অস্ত্র হওয়া উচিত ‘নজরদারি ও স্থায়ী চিহ্নায়ন’। অপরাধীকে সমাজের সামনে চিরকালের জন্য চিহ্নিত রাখা। ফাঁসি একটি চূড়ান্ত মুহূর্ত, কিন্তু সমাজ কয়েক সপ্তাহেই ভুলে যায়। পক্ষান্তরে, একজন অপরাধী যদি মুক্তির পরও সারাজীবন ‘যৌন অপরাধী’ হিসেবে চিহ্নিত থাকে, চাকরি পায় না, বিয়ে হয় না, এই দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক মৃত্যুই হবে প্রকৃত প্রতিরোধক।
বিকল্প শাস্তি মডেল-১: সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণ ও পারিবারিক জবাবদিহিতা
জন স্টুয়ার্ট মিলের ‘সামাজিক প্রতিরোধ তত্ত্ব’ অনুযায়ী, একটি শাস্তি তখনই কার্যকর যখন তার প্রভাব অপরাধীতে সীমাবদ্ধ না থেকে তার সামাজিক বৃত্তেও ছড়িয়ে পড়ে। এই ধারণার ভিত্তিতে প্রস্তাব: যদি কোনো ব্যক্তি ধর্ষণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়, তাহলে তার পরিবারের সম্পত্তির একটি নির্দিষ্ট অংশ ৩০-৫০ শতাংশ বাজেয়াপ্ত করে ভুক্তভোগীর পুনর্বাসন তহবিলে জমা হবে।
এই ব্যবস্থার মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব অত্যন্ত গভীর। একজন বাবা যখন জানবেন তার ছেলের একটি অপরাধ পরিবারের সমস্ত সঞ্চয় ধ্বংস করে দেবে, তিনি নিজেই ছেলেকে অপরাধ থেকে বিরত রাখতে সক্রিয় হবেন। এভাবে পরিবার হয়ে উঠবে প্রথম ও সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধক ব্যবস্থা।
বিকল্প শাস্তি মডেল-২: সামাজিক চিহ্নায়ন ও জাতীয় তালিকা
যুক্তরাষ্ট্রে ‘ম্যাগানস ল’ (১৯৯৪) এবং যুক্তরাজ্যে 'সারাহস ল’-এর আওতায় যৌন অপরাধীদের নাম ও ঠিকানা সর্বজনীন তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রাখা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এই তালিকা পুণরায় অপরাধের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে।
বাংলাদেশে প্রস্তাবিত মডেল
ধর্ষণে দোষী সাব্যস্ত প্রতিটি অপরাধীর নাম, ছবি ও পরিচয় একটি জাতীয় ডেটাবেসে স্থায়ীভাবে অন্তর্ভুক্ত হবে। যা নিয়োগকর্তা, বিয়ের ক্ষেত্রে ও সাধারণ মানুষ যাচাই করতে পারবে। এই ব্যবস্থায় অপরাধী মুক্তি পেলেও সারাজীবন একটি অমোচনীয় কালো দাগ বহন করবে। কারণ ‘সমাজের স্মৃতি মুছে যায়, কিন্তু ডেটাবেস মুছে যায় না।’
বিকল্প শাস্তি মডেল-৩ : দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ড ও পুনর্মিলনমূলক বিচার
নরওয়ের ‘রেস্টোরেটিভ জাস্টিস’ বা পুনর্মিলনমূলক বিচার মডেল বিশ্বে সবচেয়ে কার্যকর বলে প্রমাণিত। সেখানে অপরাধীকে কারাগারে আটকে না রেখে বাধ্যতামূলক মনোচিকিৎসা, শিক্ষা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করানো হয়।
ফলাফল: নরওয়েতে মুক্তির পর পুণরায় যৌন অপরাধের হার মাত্র ২০ শতাংশ। যেখানে মৃত্যুদণ্ডপ্রবণ অনেক দেশে এই হার ৪০-৬০ শতাংশ।
পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা ধর্ষণের অন্যতম কারণ
ধর্ষণ মামলায় ন্যূনতম ২০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড, কারাবাসকালীন বাধ্যতামূলক মনোচিকিৎসা ও শিক্ষাকার্যক্রম এবং মুক্তির পর কমপক্ষে ১০ বছর রাষ্ট্রীয় নজরদারি। কারণটি সরল। মৃত্যুদণ্ড ভবিষ্যৎ অপরাধীকে প্রতিরোধ করে না, কিন্তু একটি কার্যকর পুনর্বাসন ব্যবস্থা পুনরাবৃত্তি কমায়।
বিকল্প শাস্তি মডেল-৪: তিন প্রজন্মের শাস্তি ও সামাজিক বর্জন
উত্তর কোরিয়ার শাস্তি ব্যবস্থা একটি চরম উদাহরণ হতে পারে। সেখানে শুধু অপরাধী নয়, তার তিন প্রজন্ম (সন্তান, নাতি-নাতনি) পর্যন্ত রাষ্ট্রের কঠোর নজরদারিতে থাকে এবং সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে।
এর ফলাফল কী
১. পরিবারই হয়ে ওঠবে প্রথম প্রতিরোধক: কোনো ব্যক্তি যখন জানে তার একটি ভুল পদক্ষেপ তার সন্তান ও নাতির ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দেবে, তখন সে অপরাধ করার আগে শতবার ভাবে। পরিবারও সদস্যকে অপরাধ করা থেকে বিরত রাখতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। কারণ তাদের অস্তিত্বই ঝুঁকির মুখে পড়ে।
২. স্মৃতিতে গেঁথে থাকা শাস্তি: ফাঁসি এক মুহূর্তের ঘটনা। দেশে ফাঁসির পর আলোচনা কিছুদিন থাকে। তারপর ইতিহাসের পাতায় চলে যায়। কিন্তু উত্তর কোরিয়ায় শাস্তিটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। এটি সমাজে একটি জীবন্ত উদাহরণ হিসেবে কাজ করে, যা মানুষকে ভয় দেখায় এবং সতর্ক রাখে।
বিকল্প শাস্তি মডেল-৫: ‘লিঙ্গচ্ছেদন’ সব থেকে কার্যকরি মডেল
লিঙ্গচ্ছেদনের প্রস্তাবটি অত্যন্ত বিতর্কিত এবং নিষ্ঠুর। তবে এর পেছনের মনস্তত্ত্ব বোঝা জরুরি। এটি শারীরিক শাস্তির একটি চরম রূপ, যার লক্ষ্য হলো:
অপরাধীর পুরুষত্ব ও পরিচয় মুছে ফেলা: পিতৃতান্ত্রিক সমাজে পুরুষের লিঙ্গই তার ক্ষমতা ও আধিপত্যের প্রতীক। ধর্ষণ যেমন নারীর ওপর ক্ষমতা প্রয়োগের একটি হাতিয়ার, তেমনই এই শাস্তি হবে সেই ক্ষমতার উৎসকে চিরতরে ধ্বংস করে দেওয়া।
চিরস্থায়ী কলঙ্ক ও অপমান: ফাঁসির পর অপরাধী মারা যায়, কিন্তু এই শাস্তি তাকে সমাজে জীবিত রেখে চিরকালের জন্য লাঞ্ছিত করে। সে আর কখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে না। এটি একটি চলমান মানসিক মৃত্যুদণ্ড।
প্রতিরোধের দৃষ্টান্ত: সমাজে একটি বার্তা যায়, এই অপরাধ করলে শুধু প্রাণ যাবে না, বরং ইজ্জত ও পরিচয়ও চিরতরে নষ্ট হবে। অপরাধীকে ‘পুরুষ’ হিসেবেই বাঁচতে দেওয়া হবে না। তবে বাস্তবতা হলো, আধুনিক আইন ও মানবাধিকারের দৃষ্টিতে এই ধরনের শারীরিক শাস্তি নির্যাতনের শামিল। অধিকাংশ সভ্য দেশেই নিষিদ্ধ।
বিচার প্রক্রিয়ার সংস্কার: ‘৯০ দিনের বিচার’ কেন জরুরি
২০২৫ সালে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল জানিয়েছিলেন, ধর্ষণ মামলার তদন্তকাল ৩০ দিন থেকে ১৫ দিনে এবং বিচার ৯০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার বিধান আনা হবে। এই উদ্যোগ সঠিক দিকে একটি পদক্ষেপ। দার্শনিক জন রলস তার ‘থিওরি অব জাস্টিস’ বইয়ে বলেছেন ন্যায়বিচার কেবল ফলাফলে নয়, প্রক্রিয়াতেও নিহিত। বেন্থামের সূত্র মনে রাখলে বোঝা যায়, দ্রুত ও অনিবার্য বিচারই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধক। যদি অপরাধ করার তিন মাসের মধ্যে সাজা কার্যকর হয়, তাহলে সম্ভাব্য অপরাধীর মনে এটি সত্যিকারের ভয় তৈরি করবে।
প্রয়োজন: প্রতিটি জেলায় বিশেষ নারী ও শিশু ধর্ষণ দমন ট্রাইব্যুনাল এবং ডিএনএ প্রমাণকে প্রধান সাক্ষ্য হিসেবে স্বীকৃতি।
মাদক ও পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ
ইমানুয়েল কান্ট বলেছিলেন, “মানুষকে কখনও শুধু উপায় হিসেবে নয়, সর্বদা ‘উদ্দেশ্য’ হিসেবে দেখতে হবে। পর্নোগ্রাফি এই নীতির সবচেয়ে বড় লঙ্ঘন, এটি নারীকে শুধুই ভোগের বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করে। বাংলাদেশে ধর্ষণের ৮০ শতাংশ ঘটনার সঙ্গে মাদকের সংযোগ রয়েছে (মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর)।
বিশেষত ইয়াবা যৌন উত্তেজনা বৃদ্ধিকারী হিসেবে পরিচিত। অনিয়ন্ত্রিত পর্নোগ্রাফি ও মাদকের সমন্বয় একজন মানুষকে অপরাধের দিকে ঠেলে দেয়। শাস্তির পাশাপাশি মাদকের চোরাচালান কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ, হিংসাত্মক পর্নোগ্রাফি নিষিদ্ধকরণ এবং মাদকাসক্তদের পুনর্বাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য।
সমাজ পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদী সমাধান
ফরাসি দার্শনিক রুশো বলেছিলেন, ‘মানুষ স্বভাবতই ভালো; সমাজই তাকে খারাপ করে।' তাহলে সমাজকে পরিবর্তন করতে হবে। আর সমাজ পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার শিক্ষা। বাংলাদেশের পাঠ্যক্রমে আজও ‘কনসেন্ট’ বা সম্মতির ধারণা নেই। ছেলেশিশুরা বড় হচ্ছে এই ধারণা নিয়ে যে নারীর শরীর পুরুষের অধিকার। এই মানসিকতা পরিবর্তন না হলে শাস্তি যতই কঠোর হোক, নতুন অপরাধী তৈরি হতেই থাকবে। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই বয়সোপযোগী যৌন শিক্ষা, সম্মতির ধারণা এবং লিঙ্গসমতার পাঠ বাধ্যতামূলক করা জরুরি।
ভুক্তভোগীর ক্ষমতায়ন
সিমোন দ্য বোভোয়া বলেছিলেন, ‘নারী জন্ম নেয় না, তৈরি হয়।' একইভাবে বলা যায়, ভুক্তভোগী নীরব থাকতে বাধ্য হয় না, সমাজ তাকে নীরব করে রাখে। যতক্ষণ ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার চাইতে ভয় পাবেন, ততক্ষণ অপরাধীরা নিরাপদ থাকবে।
প্রয়োজন বিনামূল্যে আইনি সহায়তা কেন্দ্র, ২৪ ঘণ্টা হেল্পলাইন, ভুক্তভোগীর পরিচয় সুরক্ষার কঠোর আইন এবং ভুক্তভোগীকে দোষারোপের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে জিরো-টলারেন্স নীতি। পুলিশ, চিকিৎসক ও বিচারকদের জন্য বিশেষ সংবেদনশীলতা প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে বিচার সম্পন্নই হবে না।
আরিস্টটল বলেছিলেন, ‘আমরা যা বারবার করি, তা-ই আমরা।' একটি সমাজ যদি বারবার ধর্ষণকে ক্ষমা করে, ভুক্তভোগীকে দোষ দেয়, বিচারকে বিলম্বিত করে এবং অপরাধীকে পুরস্কৃত করে তাহলে সেই সমাজ নিজেই ধর্ষণ-উৎপাদনকারী যন্ত্রে পরিণত হয়।মৃত্যুদণ্ড একটি মানুষকে সরিয়ে দেয়, কিন্তু সমস্যার শিকড় থেকে উপড়ে ফেলে না । আড়াইশো বছরের দার্শনিক ঐতিহ্য বেকারিয়া, বেন্থাম, ফুকো, ডুর্খেইম, কান্ট, মিল, রলস, রুশো, বোভোয়া- সবাই একটাই সত্য বলেন, ন্যায়বিচার কেবল প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার হলো প্রতিরোধ। শাস্তিকে নিশ্চিত, দ্রুত, দীর্ঘস্থায়ী ও সামাজিকভাবে অপমানজনক করতে হবে। সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণ, সামাজিক চিহ্নায়ন, দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ড, দ্রুত বিচার, শিক্ষা সংস্কার এবং ভুক্তভোগীর ক্ষমতায়ন- এই সমন্বিত কাঠামোই পারে বাংলাদেশকে ধর্ষণমুক্ত সমাজের দিকে নিয়ে যেতে। প্রয়োজন শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সামাজিক জাগরণ।
লেখক: ভিডিও বিভাগ প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল

শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ জুন ২০২৬
রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যার মামলায় প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনের মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেছে আদালত। ঘটনার মাত্র ঊনিশ দিনের মাথায় (৬ কার্যদিবস) এই রায় বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে এক বিরল নজির স্থাপন করেছে।
কিন্তু এই দ্রুত রায় কি সত্যিই ধর্ষণের বিরুদ্ধে একটি টেকসই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে? বছরের পর বছর ধরে যখনই দেশে কোনো ভয়াবহ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে, সমাজের একটি বড় অংশ একটিই দাবি তোলে ‘ধর্ষকের ফাঁসি চাই’। কুমিল্লার তনু, মাগুরার আছিয়া কিংবা নরসিংদীর আমেনার ঘটনার পর ‘ফাঁসি চাই’ স্লোগানে মুখরিত হয়েছিলো রাজপথ।
একটি ভয়াবহ চিত্র
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে যেখানে ৫১৬ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন, সেখানে ২০২৫-২৬ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৮৬-তে। মাত্র এক বছরে ৫২ শতাংশ বৃদ্ধি। আর প্রতিদিন গড়ে ১৩ জন নারী ও শিশু এই নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।
► ৭৮৬ জন ভুক্তভোগীর মধ্যে ৫৪৩ জনই ছিল অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু।
► মাত্র দুই বছরে নথিভুক্ত ধর্ষণ মামলার সংখ্যা প্রায় দশ হাজার।
► সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে অসংখ্য ঘটনা অপ্রকাশিতই থেকে যাচ্ছে।
মাগুরার শিশু আছিয়ার ধর্ষণ, পরবর্তিতে হাসপাতালে মৃত্যু সব-ই আমরা নীরব সাক্ষী হয়ে দেখেছি।হয়তো রায়ও হয়েছে। তবে বছর পার হলেও কার্যকর হয়নি ফাঁসি । কুমিল্লার তনু হত্যার ৯ বছর পরেও তদন্ত শেষ হয়নি। কাউকে সাজা দেওয়া যায়নি। ঢাকার খিলক্ষেতে স্বামী-স্ত্রীকে অপহরণ করে নারীকে দলবদ্ধ ধর্ষণ ঘটনায় গ্রেপ্তার সাতজনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তবে ২ বছরেও মেলেনি রায়। কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজ ছাত্রীকে অপহরণ, ধর্ষণ ও ভারতে পাচারের চেষ্টায় সানমুন নামে একজন গ্রেপ্তার ও রণি নামে একজন পলাতক।
এই সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়, সমাজের এক ভয়াল চিত্র। সাম্প্রতিক আলোচিত মামলাগুলোর দিকে তাকালে ছবিটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মৃত্যুদণ্ড কেন যথেষ্ট নয়?
প্রায় আড়াইশো বছর আগেই ইতালীয় আইনদার্শনিক সেসারে বেকারিয়া তার বিখ্যাত ‘অন ক্রাইমস অ্যান্ড পানিশমেন্টস’ (১৭৬৪) বইয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলেছিলেন। মানুষকে বেশি ভয় পায় কোনটি- ক্ষণিক মৃত্যু, নাকি দীর্ঘস্থায়ী কষ্ট? তার উত্তর ছিল স্পষ্ট, “মানুষের মনে প্রকৃত ভয় তৈরি করে শাস্তির তীব্রতা নয়, তার অনিবার্যতা ও স্থায়িত্ব।” (It is not the intensity of the punishment that has the greatest effect on the human spirit, but its duration. - Cesare Beccaria)
বাংলাদেশে ২০০৮ সালের এক ধর্ষণ মামলার রায় কার্যকর হয়েছে ২০২৪ সালে, প্রায় ১৬ বছর পর। এই দীর্ঘসূত্রিতাই শাস্তিকে অর্থহীন করে দেয়। একজন সম্ভাব্য অপরাধীর কাছে ১৬ বছর পরের ফাঁসির ভয় কতটুকু বাস্তব? বেকারিয়া বলেছেন, শাস্তি অপরাধের সঙ্গে সঙ্গে ঘটলে তবেই সেটি প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে।
শাস্তির ‘নিশ্চয়তা’ কেন ‘তীব্রতার’ চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
ব্রিটিশ দার্শনিক জেরেমি বেন্থাম তার ‘সুখ-দুঃখের গণনা’ তত্ত্বে বলেছিলেন, “মানুষ অপরাধ করার আগে একটি অচেতন হিসাব কষে। সম্ভাব্য সুবিধা কি সম্ভাব্য শাস্তির চেয়ে বেশি? যদি অপরাধীর মনে থাকে এই বিশ্বাস যে ‘ধরা পড়লেও পার পাওয়া যাবে’ তাহলে শাস্তি যতই কঠোর হোক, তা কাজ করে না। "শাস্তির কঠোরতার চেয়ে শাস্তির সুনিশ্চিততাই অনেক বেশি কার্যকর (The certainty of punishment is far more effective than its severity. - Jeremy Bentham)।
বাংলাদেশে এই ‘পার পাওয়ার’ সংস্কৃতি অত্যন্ত প্রকট। ২০১১ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ছয়টি জেলায় ৪ হাজার ৩৭২টি ধর্ষণ মামলার মধ্যে মাত্র পাঁচজন আসামি দোষী সাব্যস্ত হয়েছিল। অর্থাৎ সাজার হার মাত্র ০.১ শতাংশ। আর জাতিসংঘের ২০১০-২০১৩ সালের জরিপ বলছে, বাংলাদেশের ৯৫.১ শতাংশ শহুরে ধর্ষক কোনো আইনি পরিণতির মুখোমুখিই হয়নি। যে সমাজে শাস্তি পাওয়ার সম্ভাবনা ০.১ শতাংশ, সেখানে মৃত্যুদণ্ডের হুমকি কতটুকু কাজ করবে?
দৃশ্যমান ও স্থায়ী শাস্তির প্রয়োজনীয়তা
ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো তার ‘ডিসিপ্লিন অ্যান্ড পুনিশ: দি বার্থ অব দি প্রিজন’(১৯৭৫) বইয়ে শাস্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা তুলে ধরেছেন। “শাস্তি কেবল অপরাধীর জন্য নয়, সমাজের জন্যও। শাস্তি যদি দৃশ্যমান, দীর্ঘস্থায়ী ও সামাজিকভাবে কার্যকর না হয়, তার প্রতিরোধক শক্তি থাকে না। ”
ফুকো মনে করতেন আধুনিক শাস্তির মূল অস্ত্র হওয়া উচিত ‘নজরদারি ও স্থায়ী চিহ্নায়ন’। অপরাধীকে সমাজের সামনে চিরকালের জন্য চিহ্নিত রাখা। ফাঁসি একটি চূড়ান্ত মুহূর্ত, কিন্তু সমাজ কয়েক সপ্তাহেই ভুলে যায়। পক্ষান্তরে, একজন অপরাধী যদি মুক্তির পরও সারাজীবন ‘যৌন অপরাধী’ হিসেবে চিহ্নিত থাকে, চাকরি পায় না, বিয়ে হয় না, এই দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক মৃত্যুই হবে প্রকৃত প্রতিরোধক।
বিকল্প শাস্তি মডেল-১: সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণ ও পারিবারিক জবাবদিহিতা
জন স্টুয়ার্ট মিলের ‘সামাজিক প্রতিরোধ তত্ত্ব’ অনুযায়ী, একটি শাস্তি তখনই কার্যকর যখন তার প্রভাব অপরাধীতে সীমাবদ্ধ না থেকে তার সামাজিক বৃত্তেও ছড়িয়ে পড়ে। এই ধারণার ভিত্তিতে প্রস্তাব: যদি কোনো ব্যক্তি ধর্ষণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়, তাহলে তার পরিবারের সম্পত্তির একটি নির্দিষ্ট অংশ ৩০-৫০ শতাংশ বাজেয়াপ্ত করে ভুক্তভোগীর পুনর্বাসন তহবিলে জমা হবে।
এই ব্যবস্থার মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব অত্যন্ত গভীর। একজন বাবা যখন জানবেন তার ছেলের একটি অপরাধ পরিবারের সমস্ত সঞ্চয় ধ্বংস করে দেবে, তিনি নিজেই ছেলেকে অপরাধ থেকে বিরত রাখতে সক্রিয় হবেন। এভাবে পরিবার হয়ে উঠবে প্রথম ও সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধক ব্যবস্থা।
বিকল্প শাস্তি মডেল-২: সামাজিক চিহ্নায়ন ও জাতীয় তালিকা
যুক্তরাষ্ট্রে ‘ম্যাগানস ল’ (১৯৯৪) এবং যুক্তরাজ্যে 'সারাহস ল’-এর আওতায় যৌন অপরাধীদের নাম ও ঠিকানা সর্বজনীন তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রাখা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এই তালিকা পুণরায় অপরাধের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে।
বাংলাদেশে প্রস্তাবিত মডেল
ধর্ষণে দোষী সাব্যস্ত প্রতিটি অপরাধীর নাম, ছবি ও পরিচয় একটি জাতীয় ডেটাবেসে স্থায়ীভাবে অন্তর্ভুক্ত হবে। যা নিয়োগকর্তা, বিয়ের ক্ষেত্রে ও সাধারণ মানুষ যাচাই করতে পারবে। এই ব্যবস্থায় অপরাধী মুক্তি পেলেও সারাজীবন একটি অমোচনীয় কালো দাগ বহন করবে। কারণ ‘সমাজের স্মৃতি মুছে যায়, কিন্তু ডেটাবেস মুছে যায় না।’
বিকল্প শাস্তি মডেল-৩ : দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ড ও পুনর্মিলনমূলক বিচার
নরওয়ের ‘রেস্টোরেটিভ জাস্টিস’ বা পুনর্মিলনমূলক বিচার মডেল বিশ্বে সবচেয়ে কার্যকর বলে প্রমাণিত। সেখানে অপরাধীকে কারাগারে আটকে না রেখে বাধ্যতামূলক মনোচিকিৎসা, শিক্ষা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করানো হয়।
ফলাফল: নরওয়েতে মুক্তির পর পুণরায় যৌন অপরাধের হার মাত্র ২০ শতাংশ। যেখানে মৃত্যুদণ্ডপ্রবণ অনেক দেশে এই হার ৪০-৬০ শতাংশ।
পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা ধর্ষণের অন্যতম কারণ
ধর্ষণ মামলায় ন্যূনতম ২০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড, কারাবাসকালীন বাধ্যতামূলক মনোচিকিৎসা ও শিক্ষাকার্যক্রম এবং মুক্তির পর কমপক্ষে ১০ বছর রাষ্ট্রীয় নজরদারি। কারণটি সরল। মৃত্যুদণ্ড ভবিষ্যৎ অপরাধীকে প্রতিরোধ করে না, কিন্তু একটি কার্যকর পুনর্বাসন ব্যবস্থা পুনরাবৃত্তি কমায়।
বিকল্প শাস্তি মডেল-৪: তিন প্রজন্মের শাস্তি ও সামাজিক বর্জন
উত্তর কোরিয়ার শাস্তি ব্যবস্থা একটি চরম উদাহরণ হতে পারে। সেখানে শুধু অপরাধী নয়, তার তিন প্রজন্ম (সন্তান, নাতি-নাতনি) পর্যন্ত রাষ্ট্রের কঠোর নজরদারিতে থাকে এবং সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে।
এর ফলাফল কী
১. পরিবারই হয়ে ওঠবে প্রথম প্রতিরোধক: কোনো ব্যক্তি যখন জানে তার একটি ভুল পদক্ষেপ তার সন্তান ও নাতির ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দেবে, তখন সে অপরাধ করার আগে শতবার ভাবে। পরিবারও সদস্যকে অপরাধ করা থেকে বিরত রাখতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। কারণ তাদের অস্তিত্বই ঝুঁকির মুখে পড়ে।
২. স্মৃতিতে গেঁথে থাকা শাস্তি: ফাঁসি এক মুহূর্তের ঘটনা। দেশে ফাঁসির পর আলোচনা কিছুদিন থাকে। তারপর ইতিহাসের পাতায় চলে যায়। কিন্তু উত্তর কোরিয়ায় শাস্তিটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। এটি সমাজে একটি জীবন্ত উদাহরণ হিসেবে কাজ করে, যা মানুষকে ভয় দেখায় এবং সতর্ক রাখে।
বিকল্প শাস্তি মডেল-৫: ‘লিঙ্গচ্ছেদন’ সব থেকে কার্যকরি মডেল
লিঙ্গচ্ছেদনের প্রস্তাবটি অত্যন্ত বিতর্কিত এবং নিষ্ঠুর। তবে এর পেছনের মনস্তত্ত্ব বোঝা জরুরি। এটি শারীরিক শাস্তির একটি চরম রূপ, যার লক্ষ্য হলো:
অপরাধীর পুরুষত্ব ও পরিচয় মুছে ফেলা: পিতৃতান্ত্রিক সমাজে পুরুষের লিঙ্গই তার ক্ষমতা ও আধিপত্যের প্রতীক। ধর্ষণ যেমন নারীর ওপর ক্ষমতা প্রয়োগের একটি হাতিয়ার, তেমনই এই শাস্তি হবে সেই ক্ষমতার উৎসকে চিরতরে ধ্বংস করে দেওয়া।
চিরস্থায়ী কলঙ্ক ও অপমান: ফাঁসির পর অপরাধী মারা যায়, কিন্তু এই শাস্তি তাকে সমাজে জীবিত রেখে চিরকালের জন্য লাঞ্ছিত করে। সে আর কখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে না। এটি একটি চলমান মানসিক মৃত্যুদণ্ড।
প্রতিরোধের দৃষ্টান্ত: সমাজে একটি বার্তা যায়, এই অপরাধ করলে শুধু প্রাণ যাবে না, বরং ইজ্জত ও পরিচয়ও চিরতরে নষ্ট হবে। অপরাধীকে ‘পুরুষ’ হিসেবেই বাঁচতে দেওয়া হবে না। তবে বাস্তবতা হলো, আধুনিক আইন ও মানবাধিকারের দৃষ্টিতে এই ধরনের শারীরিক শাস্তি নির্যাতনের শামিল। অধিকাংশ সভ্য দেশেই নিষিদ্ধ।
বিচার প্রক্রিয়ার সংস্কার: ‘৯০ দিনের বিচার’ কেন জরুরি
২০২৫ সালে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল জানিয়েছিলেন, ধর্ষণ মামলার তদন্তকাল ৩০ দিন থেকে ১৫ দিনে এবং বিচার ৯০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার বিধান আনা হবে। এই উদ্যোগ সঠিক দিকে একটি পদক্ষেপ। দার্শনিক জন রলস তার ‘থিওরি অব জাস্টিস’ বইয়ে বলেছেন ন্যায়বিচার কেবল ফলাফলে নয়, প্রক্রিয়াতেও নিহিত। বেন্থামের সূত্র মনে রাখলে বোঝা যায়, দ্রুত ও অনিবার্য বিচারই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধক। যদি অপরাধ করার তিন মাসের মধ্যে সাজা কার্যকর হয়, তাহলে সম্ভাব্য অপরাধীর মনে এটি সত্যিকারের ভয় তৈরি করবে।
প্রয়োজন: প্রতিটি জেলায় বিশেষ নারী ও শিশু ধর্ষণ দমন ট্রাইব্যুনাল এবং ডিএনএ প্রমাণকে প্রধান সাক্ষ্য হিসেবে স্বীকৃতি।
মাদক ও পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ
ইমানুয়েল কান্ট বলেছিলেন, “মানুষকে কখনও শুধু উপায় হিসেবে নয়, সর্বদা ‘উদ্দেশ্য’ হিসেবে দেখতে হবে। পর্নোগ্রাফি এই নীতির সবচেয়ে বড় লঙ্ঘন, এটি নারীকে শুধুই ভোগের বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করে। বাংলাদেশে ধর্ষণের ৮০ শতাংশ ঘটনার সঙ্গে মাদকের সংযোগ রয়েছে (মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর)।
বিশেষত ইয়াবা যৌন উত্তেজনা বৃদ্ধিকারী হিসেবে পরিচিত। অনিয়ন্ত্রিত পর্নোগ্রাফি ও মাদকের সমন্বয় একজন মানুষকে অপরাধের দিকে ঠেলে দেয়। শাস্তির পাশাপাশি মাদকের চোরাচালান কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ, হিংসাত্মক পর্নোগ্রাফি নিষিদ্ধকরণ এবং মাদকাসক্তদের পুনর্বাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য।
সমাজ পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদী সমাধান
ফরাসি দার্শনিক রুশো বলেছিলেন, ‘মানুষ স্বভাবতই ভালো; সমাজই তাকে খারাপ করে।' তাহলে সমাজকে পরিবর্তন করতে হবে। আর সমাজ পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার শিক্ষা। বাংলাদেশের পাঠ্যক্রমে আজও ‘কনসেন্ট’ বা সম্মতির ধারণা নেই। ছেলেশিশুরা বড় হচ্ছে এই ধারণা নিয়ে যে নারীর শরীর পুরুষের অধিকার। এই মানসিকতা পরিবর্তন না হলে শাস্তি যতই কঠোর হোক, নতুন অপরাধী তৈরি হতেই থাকবে। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই বয়সোপযোগী যৌন শিক্ষা, সম্মতির ধারণা এবং লিঙ্গসমতার পাঠ বাধ্যতামূলক করা জরুরি।
ভুক্তভোগীর ক্ষমতায়ন
সিমোন দ্য বোভোয়া বলেছিলেন, ‘নারী জন্ম নেয় না, তৈরি হয়।' একইভাবে বলা যায়, ভুক্তভোগী নীরব থাকতে বাধ্য হয় না, সমাজ তাকে নীরব করে রাখে। যতক্ষণ ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার চাইতে ভয় পাবেন, ততক্ষণ অপরাধীরা নিরাপদ থাকবে।
প্রয়োজন বিনামূল্যে আইনি সহায়তা কেন্দ্র, ২৪ ঘণ্টা হেল্পলাইন, ভুক্তভোগীর পরিচয় সুরক্ষার কঠোর আইন এবং ভুক্তভোগীকে দোষারোপের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে জিরো-টলারেন্স নীতি। পুলিশ, চিকিৎসক ও বিচারকদের জন্য বিশেষ সংবেদনশীলতা প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে বিচার সম্পন্নই হবে না।
আরিস্টটল বলেছিলেন, ‘আমরা যা বারবার করি, তা-ই আমরা।' একটি সমাজ যদি বারবার ধর্ষণকে ক্ষমা করে, ভুক্তভোগীকে দোষ দেয়, বিচারকে বিলম্বিত করে এবং অপরাধীকে পুরস্কৃত করে তাহলে সেই সমাজ নিজেই ধর্ষণ-উৎপাদনকারী যন্ত্রে পরিণত হয়।মৃত্যুদণ্ড একটি মানুষকে সরিয়ে দেয়, কিন্তু সমস্যার শিকড় থেকে উপড়ে ফেলে না । আড়াইশো বছরের দার্শনিক ঐতিহ্য বেকারিয়া, বেন্থাম, ফুকো, ডুর্খেইম, কান্ট, মিল, রলস, রুশো, বোভোয়া- সবাই একটাই সত্য বলেন, ন্যায়বিচার কেবল প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার হলো প্রতিরোধ। শাস্তিকে নিশ্চিত, দ্রুত, দীর্ঘস্থায়ী ও সামাজিকভাবে অপমানজনক করতে হবে। সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণ, সামাজিক চিহ্নায়ন, দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ড, দ্রুত বিচার, শিক্ষা সংস্কার এবং ভুক্তভোগীর ক্ষমতায়ন- এই সমন্বিত কাঠামোই পারে বাংলাদেশকে ধর্ষণমুক্ত সমাজের দিকে নিয়ে যেতে। প্রয়োজন শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সামাজিক জাগরণ।
লেখক: ভিডিও বিভাগ প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল

আপনার মতামত লিখুন