আজ মে দিবস। রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর বাণী, টেলিভিশনের টক শো, সংবাদপত্রের সম্পাদকীয়-সবখানে শ্রমিকের অধিকারের কথা। আট ঘণ্টা কাজ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যূনতম মজুরি, ওভারটাইমের বোনাস। তাহলে এখন প্রশ্ন, চাকরিজীবী যেসব নারী অফিস শেষে বাকি ১৬ ঘণ্টা ‘প্রেম, স্নেহ, মায়া’ নামক ‘বেতনহীন’ চাকরিতে দিশেহারা, তাদের অধিকার কবে?
শিকাগোর ইতিহাসে ১৮৮৬ সালের ১ মে শ্রমিকেরা দাবি করেছিলেন আট ঘণ্টা কাজ। আজ ২০২৬ সালের ১ মে, সেই দাবি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে ‘অফিসের বাইরে’- সংসারের চার দেওয়ালের ভেতরের কাজ নিয়ে।
নারীরা বাসায় ফিরে শুরু করেন ‘দ্বিতীয় শিফট’। বাচ্চার হোমওয়ার্ক, রান্না, বাসা পরিষ্কার, বাজার, জামা কাপড় ইস্তিরি, অতিথি আপ্যায়ন- এই তালিকার শেষ নেই।
একটি জরিপ বলছে, বাংলাদেশে চাকরিজীবী নারীরা অফিসের বাইরে বাড়ির কাজে প্রতিদিন গড়ে ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা সময় দেন। পুরুষরা দেন ১ থেকে দেড় ঘণ্টা। সেই ১ ঘণ্টাও যদি দেন, তাও বেশির ভাগ বিনোদনমূলক কাজে- যেমন বাচ্চার সঙ্গে ফোনে গেম খেলা, রান্নাঘরে ‘শুধু দেখে যাওয়া’।
চাকরি করছেন বলে বাসার কাজের ‘ওভারটাইমের বিল’ কে দেয়? বোধয় কেউ না। তবুও স্বামী থেকে শুরু করে শাশুড়ি, দেবর, ননদ- সবার প্রত্যাশা, ‘তুমি তো আছো।’
আর যারা গৃহিণী, শুধু সংসার করেন? তারা তো আগে থেকেই ‘অশুল্ক অথচ অনিবার্য’ কর্মী। তাদের কাজ সংসার চালানোর ভিত্তি, কিন্তু বেতন? ‘হায় হায়, কী বলেন!’-উত্তরটা এমনই।
মে দিবসের কোনো বক্তব্যে কি গৃহিণী বা চাকরিজীবী নারীর ‘সংসারিক শ্রমের’ হিসাবের কথা উল্লেখ করা হয়?
ভাববেন না, বেতনের বিষয়টি শুধু ‘টাকা দেওয়া-নেওয়া’। বেতন মানে ‘মূল্যায়ন’। বেতন মানে ‘স্বীকৃতি’। বেতন মানে- ‘আমি তোমার পরিশ্রম দেখছি, তোমাকে সম্মান করছি।’
তাই কথাটা স্পষ্ট বলাই যায়- সংসারে নারীদের কাজের ‘বেতন’ চালু হোক। সেটা ‘নগদ টাকা’ না হলেও ‘হাউজহোল্ড পয়েন্ট’ বা ‘২৪০০ টাকা মিনিমাম মানি’- অন্তত একটা স্বীকৃতি।
পরিসংখ্যান বলছে, দৈনিক অবসর সময়ে পুরুষ গড়ে ২.৫ থেকে ৩ ঘণ্টা টেলিভিশন বা মুঠোফোনে কাটান। আর নারীরা সেই সময় বাসায় ‘অদৃশ্য কাজ’ শেষ করেন। ‘বিনোদন’ তাদের জন্য বিলাসিতা।
আমাদের সমাজ থেকে এটুকু বোঝা যায় না যে, কারো কারো জন্য ‘বিনোদনও অধিকার’, ‘বিশ্রামও প্রাপ্য’। মে দিবসের চেতনা ফিরে এসেছে ‘আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিনোদন, আট ঘণ্টা বিশ্রাম’- এ ফর্মুলা তো শুধু ‘অফিসের বাইরে? না, সংসারের ভেতরেও।
চাকরিজীবী নারী কিংবা গৃহিণী- যে নারী ঘর সামলাচ্ছেন, তারা সবাই একটি ‘গোল্ডেন গেট’ টপকে যাচ্ছেন। যা নামকরা প্রতিষ্ঠানের ‘ওভারটাইম সিস্টেম’ কখনও দিতে পারেনি। আজকের মে দিবসে বেতনের দাবি শুধু ‘কারখানা-অফিসের’ নয়, দাবি বাড়ির চার দেওয়ালেরও।সংসারে নারীদের বেতন চালু হোক- শুধু ১ মে নয়, বরং ১ বৈশাখ হোক নতুন সামাজিক অর্থনীতির সূচনা। ‘সুস্থ শ্রমিক’ শুধু যে কারখানায় থাকবে তা নয়, ঘরেও চাই ‘সুস্থ নারী’। যারা অতিরিক্ত ক্লান্তিতে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছেন।
কারণ, রান্নার হাড়ি আর কর্মক্ষেত্রের কম্পিউটারের মাঝে শ্রমের মর্যাদায় কোনও ভেদাভেদ নেই। বরং রান্নাঘর থেকে বেরোনো সেই মশলা-ধোঁয়া শুধু সংসার নয়, পুরো অর্থনীতির চালিকাশক্তি।

শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ মে ২০২৬
আজ মে দিবস। রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর বাণী, টেলিভিশনের টক শো, সংবাদপত্রের সম্পাদকীয়-সবখানে শ্রমিকের অধিকারের কথা। আট ঘণ্টা কাজ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যূনতম মজুরি, ওভারটাইমের বোনাস। তাহলে এখন প্রশ্ন, চাকরিজীবী যেসব নারী অফিস শেষে বাকি ১৬ ঘণ্টা ‘প্রেম, স্নেহ, মায়া’ নামক ‘বেতনহীন’ চাকরিতে দিশেহারা, তাদের অধিকার কবে?
শিকাগোর ইতিহাসে ১৮৮৬ সালের ১ মে শ্রমিকেরা দাবি করেছিলেন আট ঘণ্টা কাজ। আজ ২০২৬ সালের ১ মে, সেই দাবি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে ‘অফিসের বাইরে’- সংসারের চার দেওয়ালের ভেতরের কাজ নিয়ে।
নারীরা বাসায় ফিরে শুরু করেন ‘দ্বিতীয় শিফট’। বাচ্চার হোমওয়ার্ক, রান্না, বাসা পরিষ্কার, বাজার, জামা কাপড় ইস্তিরি, অতিথি আপ্যায়ন- এই তালিকার শেষ নেই।
একটি জরিপ বলছে, বাংলাদেশে চাকরিজীবী নারীরা অফিসের বাইরে বাড়ির কাজে প্রতিদিন গড়ে ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা সময় দেন। পুরুষরা দেন ১ থেকে দেড় ঘণ্টা। সেই ১ ঘণ্টাও যদি দেন, তাও বেশির ভাগ বিনোদনমূলক কাজে- যেমন বাচ্চার সঙ্গে ফোনে গেম খেলা, রান্নাঘরে ‘শুধু দেখে যাওয়া’।
চাকরি করছেন বলে বাসার কাজের ‘ওভারটাইমের বিল’ কে দেয়? বোধয় কেউ না। তবুও স্বামী থেকে শুরু করে শাশুড়ি, দেবর, ননদ- সবার প্রত্যাশা, ‘তুমি তো আছো।’
আর যারা গৃহিণী, শুধু সংসার করেন? তারা তো আগে থেকেই ‘অশুল্ক অথচ অনিবার্য’ কর্মী। তাদের কাজ সংসার চালানোর ভিত্তি, কিন্তু বেতন? ‘হায় হায়, কী বলেন!’-উত্তরটা এমনই।
মে দিবসের কোনো বক্তব্যে কি গৃহিণী বা চাকরিজীবী নারীর ‘সংসারিক শ্রমের’ হিসাবের কথা উল্লেখ করা হয়?
ভাববেন না, বেতনের বিষয়টি শুধু ‘টাকা দেওয়া-নেওয়া’। বেতন মানে ‘মূল্যায়ন’। বেতন মানে ‘স্বীকৃতি’। বেতন মানে- ‘আমি তোমার পরিশ্রম দেখছি, তোমাকে সম্মান করছি।’
তাই কথাটা স্পষ্ট বলাই যায়- সংসারে নারীদের কাজের ‘বেতন’ চালু হোক। সেটা ‘নগদ টাকা’ না হলেও ‘হাউজহোল্ড পয়েন্ট’ বা ‘২৪০০ টাকা মিনিমাম মানি’- অন্তত একটা স্বীকৃতি।
পরিসংখ্যান বলছে, দৈনিক অবসর সময়ে পুরুষ গড়ে ২.৫ থেকে ৩ ঘণ্টা টেলিভিশন বা মুঠোফোনে কাটান। আর নারীরা সেই সময় বাসায় ‘অদৃশ্য কাজ’ শেষ করেন। ‘বিনোদন’ তাদের জন্য বিলাসিতা।
আমাদের সমাজ থেকে এটুকু বোঝা যায় না যে, কারো কারো জন্য ‘বিনোদনও অধিকার’, ‘বিশ্রামও প্রাপ্য’। মে দিবসের চেতনা ফিরে এসেছে ‘আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিনোদন, আট ঘণ্টা বিশ্রাম’- এ ফর্মুলা তো শুধু ‘অফিসের বাইরে? না, সংসারের ভেতরেও।
চাকরিজীবী নারী কিংবা গৃহিণী- যে নারী ঘর সামলাচ্ছেন, তারা সবাই একটি ‘গোল্ডেন গেট’ টপকে যাচ্ছেন। যা নামকরা প্রতিষ্ঠানের ‘ওভারটাইম সিস্টেম’ কখনও দিতে পারেনি। আজকের মে দিবসে বেতনের দাবি শুধু ‘কারখানা-অফিসের’ নয়, দাবি বাড়ির চার দেওয়ালেরও।সংসারে নারীদের বেতন চালু হোক- শুধু ১ মে নয়, বরং ১ বৈশাখ হোক নতুন সামাজিক অর্থনীতির সূচনা। ‘সুস্থ শ্রমিক’ শুধু যে কারখানায় থাকবে তা নয়, ঘরেও চাই ‘সুস্থ নারী’। যারা অতিরিক্ত ক্লান্তিতে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছেন।
কারণ, রান্নার হাড়ি আর কর্মক্ষেত্রের কম্পিউটারের মাঝে শ্রমের মর্যাদায় কোনও ভেদাভেদ নেই। বরং রান্নাঘর থেকে বেরোনো সেই মশলা-ধোঁয়া শুধু সংসার নয়, পুরো অর্থনীতির চালিকাশক্তি।

আপনার মতামত লিখুন