আজ পহেলা মে। মে দিবস। শ্রমিকের অধিকার আদায়ের দিন, রাজপথ কাঁপানো স্লোগান আর উৎসবের দিন। মে দিবস শ্রমিকের অধিকার আদায়ের দিন হলেও, আমাদের চারপাশের রিকশাচালক রুবেল বা চায়ের দোকানি জিহাদ বা ভ্যানচালক চাঁনমিয়ার কাছে এই দিনটি কেবলই ক্যালেন্ডারের আরেকটি তারিখ।
রুবেলের চাকার ঘূর্ণিতে
সন্তানের ভবিষ্যৎ
ভোর ৬টায় যখন খিলগাঁওয়ের গলি থেকে রিকশা নিয়ে বের হন রুবেল মিয়া, তখন তার মাথায় মে দিবসের কোনো স্লোগান থাকে না। তার হিসেবে থাকে কেবল কতবার প্যাডেল ঘুরলে গাইবান্ধায় থাকা স্ত্রীর হাতে কিস্তির টাকা পৌঁছাবে, চট্টগ্রামে মাদ্রাসা পড়ুয়া ছেলের ৬ হাজার টাকা মাসিক খরচ আর নার্সারি পড়ুয়া মেয়ের ২ হাজার টাকার খরচ জুটবে।
গাইবান্ধা থেকে আসা এই মানুষটি জানেন না ১৮৮৬ সালের শিকাগোর সেই রক্তাক্ত ইতিহাস। তিনি জানেন, প্রতিদিন রিকশা নিয়ে বের না হলে তার সংসার চলবে না।
থাকেন খিলগাঁওতে, চালান রিকশা। নিজের থাকা-খাওয়ার সাড়ে চার হাজার টাকা খরচ করে বাকি সবটুকু পাঠিয়ে দেন গ্রামে। যেখানে তার স্ত্রী হাঁস-মুরগি পালন করে অভাবের সংসারে হাল ধরেছেন।
রুবেল মিয়ার কাঁধে এখন ৮০ হাজার টাকার এনজিও ঋণের বোঝা। বাড়ি বানাবার জন্য নিয়েছেন এই ঋণ। প্রতি সপ্তাহে ২ হাজার টাকা কিস্তির অংকটা তার মাথায় সারাক্ষণ হাতুড়ি পেটায়।
প্রতিদিন ৮শ’-৯শ’ টাকা আয় থেকে ১শ’ টাকা মহাজনকে জমা দিয়ে রুবেল যখন ক্লান্ত শরীরে ঘরে ফেরেন, তখন মে দিবসের অধিকার নয়, বরং আগামীকালের কিস্তির চিন্তা তাকে আচ্ছন্ন করে রাখে।
তার চাওয়া সহজ: ‘যেন রোগে না পড়ি, রিকশা চালাতে পারি, বাচ্চারা লেখাপড়া শিখে বড় হয়।’
চাঁনমিয়ার অনিশ্চিত আয় আর ভ্যানগাড়ির চাকা
পল্টন মোড়ে ভ্যান নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মোহাম্মদ চাঁনমিয়ার গল্পটাও অন্যরকম নয়। ৫ সদস্যের সংসার। গাজীপুরে ভাড়া বাসায় থাকেন তার স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলে।
প্রতিদিনের উপার্জনের ওপর ভিত্তি করে তাকে মহাজনকে কমিশন দিতে হয় প্রতি ১শ’ টাকায় ২০ টাকা। কোনোদিন আয় হয় ৫ হাজার, আবার কোনোদিন এক টাকাও জোটে না।
গড়ে মাসে ১৫ হাজার টাকা আয় হলেও তার ব্যয় ২৫ হাজার টাকা। এই যে মাসিক ১০ হাজার টাকার ঘাটতি, তা পূরণ করতে তাকে প্রতিদিন অসম লড়াই করতে হয়।
মে দিবস সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। অধিকারের চেয়েও তার কাছে বেশি জরুরি মহাজনের কমিশন আর দিনশেষে গাজীপুরে থাকা সন্তানদের জন্য দুমুঠো চাল।
কৈশোর বন্দী চায়ের কাপে
জিহাদের ১৯ বছর বয়স। বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ থেকে রাজধানীতে আসা এই তরুণ এখন পল্টন টাওয়ারের পাশের এক চায়ের দোকানের কর্মী।
ভোর ৬টায় যখন শহর ঘুমিয়ে থাকে, তখন জিহাদকে চুলা জ্বালাতে হয়, দুধ গরম করতে হয়। রাত অবধি একটানা ১৫ ঘণ্টা কাজ করতে হয় তাকে। মাসে বেতন ৯ হাজার টাকা। মে দিবস কী, তা না জানলেও জিহাদ জানে ‘দায়িত্ব’ কী।
বড় ভাই জুতার কারখানায় কাজ করেন। সপ্তাহে মজুরি পান কাজের ভিত্তিতে, যা স্থির নয়। দুই ভাইয়ের উপার্জনেই সংসার চলে। মাসে খরচ ৩০ হাজার টাকা।
জিহাদ বলেন, ‘বাবা যদি চাকরি করতে যান, তিনি অসুস্থ। তাই আমরা দেইনা কাজ করতে।’ নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে ভাই-বোনদের শিক্ষিত করার নেশা জিহাদের চোখে।
জিহাদের হাতে বানানো চায়ে যখন হাজারো মানুষের ক্লান্তি দূর হয়, তখন হয়তো কেউ খেয়াল করেন না ঐ এক কাপ চায়ের স্বাদের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক তরুণের ঘুমহীন রাতের ক্লান্তি।

শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ মে ২০২৬
আজ পহেলা মে। মে দিবস। শ্রমিকের অধিকার আদায়ের দিন, রাজপথ কাঁপানো স্লোগান আর উৎসবের দিন। মে দিবস শ্রমিকের অধিকার আদায়ের দিন হলেও, আমাদের চারপাশের রিকশাচালক রুবেল বা চায়ের দোকানি জিহাদ বা ভ্যানচালক চাঁনমিয়ার কাছে এই দিনটি কেবলই ক্যালেন্ডারের আরেকটি তারিখ।
রুবেলের চাকার ঘূর্ণিতে
সন্তানের ভবিষ্যৎ
ভোর ৬টায় যখন খিলগাঁওয়ের গলি থেকে রিকশা নিয়ে বের হন রুবেল মিয়া, তখন তার মাথায় মে দিবসের কোনো স্লোগান থাকে না। তার হিসেবে থাকে কেবল কতবার প্যাডেল ঘুরলে গাইবান্ধায় থাকা স্ত্রীর হাতে কিস্তির টাকা পৌঁছাবে, চট্টগ্রামে মাদ্রাসা পড়ুয়া ছেলের ৬ হাজার টাকা মাসিক খরচ আর নার্সারি পড়ুয়া মেয়ের ২ হাজার টাকার খরচ জুটবে।
গাইবান্ধা থেকে আসা এই মানুষটি জানেন না ১৮৮৬ সালের শিকাগোর সেই রক্তাক্ত ইতিহাস। তিনি জানেন, প্রতিদিন রিকশা নিয়ে বের না হলে তার সংসার চলবে না।
থাকেন খিলগাঁওতে, চালান রিকশা। নিজের থাকা-খাওয়ার সাড়ে চার হাজার টাকা খরচ করে বাকি সবটুকু পাঠিয়ে দেন গ্রামে। যেখানে তার স্ত্রী হাঁস-মুরগি পালন করে অভাবের সংসারে হাল ধরেছেন।
রুবেল মিয়ার কাঁধে এখন ৮০ হাজার টাকার এনজিও ঋণের বোঝা। বাড়ি বানাবার জন্য নিয়েছেন এই ঋণ। প্রতি সপ্তাহে ২ হাজার টাকা কিস্তির অংকটা তার মাথায় সারাক্ষণ হাতুড়ি পেটায়।
প্রতিদিন ৮শ’-৯শ’ টাকা আয় থেকে ১শ’ টাকা মহাজনকে জমা দিয়ে রুবেল যখন ক্লান্ত শরীরে ঘরে ফেরেন, তখন মে দিবসের অধিকার নয়, বরং আগামীকালের কিস্তির চিন্তা তাকে আচ্ছন্ন করে রাখে।
তার চাওয়া সহজ: ‘যেন রোগে না পড়ি, রিকশা চালাতে পারি, বাচ্চারা লেখাপড়া শিখে বড় হয়।’
চাঁনমিয়ার অনিশ্চিত আয় আর ভ্যানগাড়ির চাকা
পল্টন মোড়ে ভ্যান নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মোহাম্মদ চাঁনমিয়ার গল্পটাও অন্যরকম নয়। ৫ সদস্যের সংসার। গাজীপুরে ভাড়া বাসায় থাকেন তার স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলে।
প্রতিদিনের উপার্জনের ওপর ভিত্তি করে তাকে মহাজনকে কমিশন দিতে হয় প্রতি ১শ’ টাকায় ২০ টাকা। কোনোদিন আয় হয় ৫ হাজার, আবার কোনোদিন এক টাকাও জোটে না।
গড়ে মাসে ১৫ হাজার টাকা আয় হলেও তার ব্যয় ২৫ হাজার টাকা। এই যে মাসিক ১০ হাজার টাকার ঘাটতি, তা পূরণ করতে তাকে প্রতিদিন অসম লড়াই করতে হয়।
মে দিবস সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। অধিকারের চেয়েও তার কাছে বেশি জরুরি মহাজনের কমিশন আর দিনশেষে গাজীপুরে থাকা সন্তানদের জন্য দুমুঠো চাল।
কৈশোর বন্দী চায়ের কাপে
জিহাদের ১৯ বছর বয়স। বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ থেকে রাজধানীতে আসা এই তরুণ এখন পল্টন টাওয়ারের পাশের এক চায়ের দোকানের কর্মী।
ভোর ৬টায় যখন শহর ঘুমিয়ে থাকে, তখন জিহাদকে চুলা জ্বালাতে হয়, দুধ গরম করতে হয়। রাত অবধি একটানা ১৫ ঘণ্টা কাজ করতে হয় তাকে। মাসে বেতন ৯ হাজার টাকা। মে দিবস কী, তা না জানলেও জিহাদ জানে ‘দায়িত্ব’ কী।
বড় ভাই জুতার কারখানায় কাজ করেন। সপ্তাহে মজুরি পান কাজের ভিত্তিতে, যা স্থির নয়। দুই ভাইয়ের উপার্জনেই সংসার চলে। মাসে খরচ ৩০ হাজার টাকা।
জিহাদ বলেন, ‘বাবা যদি চাকরি করতে যান, তিনি অসুস্থ। তাই আমরা দেইনা কাজ করতে।’ নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে ভাই-বোনদের শিক্ষিত করার নেশা জিহাদের চোখে।
জিহাদের হাতে বানানো চায়ে যখন হাজারো মানুষের ক্লান্তি দূর হয়, তখন হয়তো কেউ খেয়াল করেন না ঐ এক কাপ চায়ের স্বাদের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক তরুণের ঘুমহীন রাতের ক্লান্তি।

আপনার মতামত লিখুন