সংবাদ

বিশ্লেষকদের অভিমত

জ্বালানির ‘ফাঁদে আটকে পড়ার ঝুঁকিতে’ অর্থনীতি


নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
প্রকাশ: ২ মে ২০২৬, ০৮:৪৪ পিএম

জ্বালানির ‘ফাঁদে আটকে পড়ার ঝুঁকিতে’ অর্থনীতি
প্রতীকী ছবি।

জ্বালানি খাতে বৈশ্বিক অস্থিরতার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে হঠাৎ দাম বৃদ্ধি দেশের অর্থনীতিতে চাপ ফেলছে। এছাড়া, দীর্ঘস্থায়ী ডলার সংকট এবং আমদানিনির্ভরতার চাপও পড়ছে অর্থনীতিতে। বিশ্ব বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লেও বিদ্যুৎ, উৎপাদন, কৃষি ও পরিবহন খাতের জন্য সরকারকে বর্ধিত মূল্যে আমদানি অব্যহত রাখতে হচ্ছে। এই প্রেক্ষপটে অর্থনীতি কি সাময়িক ধাক্কা সামাল দিচ্ছে, নাকি ধীরে ধীরে ‘জ্বালানির ফাঁদে’ আটকে পড়ছে- এমন প্রশ্ন উঠে এসেছে নীতি বিশ্লেষকদের আলোচনায়।

শনিবার (২ মে) পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত ‘আজকের এজেন্ডা: জ্বালানির ফাঁদে বন্দি অর্থনীতি?’ শীর্ষক ফ্ল্যাগশিপ ওয়েবিনারে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এতে অংশ নেন জ্বালানি, কৃষি ও শিল্পখাতের বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি এবং নীতিনির্ধারকেরা। আলোচনাটি সঞ্চালনা করেন পিপিআরসি’র নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান।

আলোচনায় বক্তারা বলেন, সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকট কেবল সরবরাহ ঘাটতির ফল নয়; বরং চাহিদা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, তথ্য ও যোগাযোগ ঘাটতি এবং বাজারে অনিশ্চয়তার সম্মিলিত প্রভাব এতে কাজ করেছে। প্রাথমিক সরবরাহ বিঘ্ন দ্রুতই আতঙ্কজনিত কেনাকাটায় রূপ নেয়, ফলে স্বল্প সময়ে চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। রেশনিংসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া হলেও ভোক্তা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মজুত প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

পদ্মা অয়েলের চেয়ারম্যান ও সাবেক জ্বালানি সচিব এ কে এম জাফর উল্লাহ খান বলেন, দেশের জ্বালানি মজুদ সক্ষমতা সীমিত। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে দাম সমন্বয় অবশ্যম্ভাবী হলেও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, আমাদের স্টোরেজ সক্ষমতা এমন নয় যে অতিরিক্ত মজুদ রাখা যাবে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ এম এ সাত্তার মণ্ডল জানান, কৃষিখাতে যান্ত্রিকীকরণ বাড়ায় ডিজেলের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ি, বর্তমানে প্রায় ৪২ লাখ ডিজেলচালিত ইঞ্জিন কৃষিতে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। ফলে কৃষি উৎপাদন টিকিয়ে রাখতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

ট্রেড সার্ভিসেস ইন্টারন্যাশনালের চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহমুদুল হক বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম বাড়লে তা সরাসরি জাতীয় অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে। এ অবস্থায় জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্য করণ এবং নতুন সরবরাহ উৎস খোঁজার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম পারভেজ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত নীতির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। তিনি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা ব্যবহার এবং গ্যাসের কার্যকর বণ্টনের মাধ্যমে শিল্প ও সার উৎপাদন সচল রাখার পরামর্শ দেন।

বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ ও নতুন গ্যাস কূপ খননের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। সম্প্রতি জ্বালানি সংকটে আতঙ্কজনিত মজুত প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও ঘনীভূত করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সমাপনী বক্তব্যে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, জ্বালানি সংকটকে সাময়িক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি মধ্যমেয়াদি কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ। যথাসময়ে কার্যকর নীতি গ্রহণ না হলে এ সংকট পুনরাবৃত্তি হতে পারে। তিনি জ্বালানি সংরক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি, চাহিদা পূর্বাভাস উন্নয়ন এবং সমন্বিত যোগাযোগ কৌশল জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

আলোচনায় সামগ্রিকভাবে উঠে আসে, জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জোরদার করা না গেলে অর্থনীতি প্রকৃত অর্থেই ‘জ্বালানির ফাঁদে’ আটকে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ০৪ মে ২০২৬


জ্বালানির ‘ফাঁদে আটকে পড়ার ঝুঁকিতে’ অর্থনীতি

প্রকাশের তারিখ : ০২ মে ২০২৬

featured Image

জ্বালানি খাতে বৈশ্বিক অস্থিরতার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে হঠাৎ দাম বৃদ্ধি দেশের অর্থনীতিতে চাপ ফেলছে। এছাড়া, দীর্ঘস্থায়ী ডলার সংকট এবং আমদানিনির্ভরতার চাপও পড়ছে অর্থনীতিতে। বিশ্ব বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লেও বিদ্যুৎ, উৎপাদন, কৃষি ও পরিবহন খাতের জন্য সরকারকে বর্ধিত মূল্যে আমদানি অব্যহত রাখতে হচ্ছে। এই প্রেক্ষপটে অর্থনীতি কি সাময়িক ধাক্কা সামাল দিচ্ছে, নাকি ধীরে ধীরে ‘জ্বালানির ফাঁদে’ আটকে পড়ছে- এমন প্রশ্ন উঠে এসেছে নীতি বিশ্লেষকদের আলোচনায়।

শনিবার (২ মে) পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত ‘আজকের এজেন্ডা: জ্বালানির ফাঁদে বন্দি অর্থনীতি?’ শীর্ষক ফ্ল্যাগশিপ ওয়েবিনারে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এতে অংশ নেন জ্বালানি, কৃষি ও শিল্পখাতের বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি এবং নীতিনির্ধারকেরা। আলোচনাটি সঞ্চালনা করেন পিপিআরসি’র নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান।

আলোচনায় বক্তারা বলেন, সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকট কেবল সরবরাহ ঘাটতির ফল নয়; বরং চাহিদা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, তথ্য ও যোগাযোগ ঘাটতি এবং বাজারে অনিশ্চয়তার সম্মিলিত প্রভাব এতে কাজ করেছে। প্রাথমিক সরবরাহ বিঘ্ন দ্রুতই আতঙ্কজনিত কেনাকাটায় রূপ নেয়, ফলে স্বল্প সময়ে চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। রেশনিংসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া হলেও ভোক্তা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মজুত প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

পদ্মা অয়েলের চেয়ারম্যান ও সাবেক জ্বালানি সচিব এ কে এম জাফর উল্লাহ খান বলেন, দেশের জ্বালানি মজুদ সক্ষমতা সীমিত। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে দাম সমন্বয় অবশ্যম্ভাবী হলেও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, আমাদের স্টোরেজ সক্ষমতা এমন নয় যে অতিরিক্ত মজুদ রাখা যাবে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ এম এ সাত্তার মণ্ডল জানান, কৃষিখাতে যান্ত্রিকীকরণ বাড়ায় ডিজেলের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ি, বর্তমানে প্রায় ৪২ লাখ ডিজেলচালিত ইঞ্জিন কৃষিতে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। ফলে কৃষি উৎপাদন টিকিয়ে রাখতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

ট্রেড সার্ভিসেস ইন্টারন্যাশনালের চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহমুদুল হক বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম বাড়লে তা সরাসরি জাতীয় অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে। এ অবস্থায় জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্য করণ এবং নতুন সরবরাহ উৎস খোঁজার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম পারভেজ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত নীতির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। তিনি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা ব্যবহার এবং গ্যাসের কার্যকর বণ্টনের মাধ্যমে শিল্প ও সার উৎপাদন সচল রাখার পরামর্শ দেন।

বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ ও নতুন গ্যাস কূপ খননের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। সম্প্রতি জ্বালানি সংকটে আতঙ্কজনিত মজুত প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও ঘনীভূত করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সমাপনী বক্তব্যে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, জ্বালানি সংকটকে সাময়িক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি মধ্যমেয়াদি কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ। যথাসময়ে কার্যকর নীতি গ্রহণ না হলে এ সংকট পুনরাবৃত্তি হতে পারে। তিনি জ্বালানি সংরক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি, চাহিদা পূর্বাভাস উন্নয়ন এবং সমন্বিত যোগাযোগ কৌশল জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

আলোচনায় সামগ্রিকভাবে উঠে আসে, জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জোরদার করা না গেলে অর্থনীতি প্রকৃত অর্থেই ‘জ্বালানির ফাঁদে’ আটকে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত