আধুনিক পুঁজিবাদের জয়গান যখন চারদিকে, তখনই এই ব্যবস্থার অসংগতিগুলো দেখিয়েছেন এক পণ্ডিত। পুঁজিপতি ও শ্রমিক শ্রেণির মধ্যকার বৈষম্যের দিকে আঙুল তুলেছেন তিনি। পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি সম্পত্তি মাত্র এক শতাংশ পুঁজিপতির দখলে থাকার নির্মম সত্য উঠে এসেছে তার লেখায়।
শ্রমজীবী মানুষের দুঃখ, কষ্ট, হাহাকার, দারিদ্র্যের কষাঘাত নিয়ে আজীবন কাজ করেছেন তিনি। আধুনিক পুঁজিবাদের এক কট্টর সমালোচক এই ব্যক্তি হলেন কার্ল মার্ক্স।
১৮১৮ সালের ৫ মে জার্মানির ট্রিয়র শহরে জন্ম নেওয়া এই চিন্তককে আজও প্রাসঙ্গিক মনে করেন দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। মৃত্যুর ১৪৩ বছর পরও তার লেখা ‘দ্য কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’ ও ‘দাস কাপিটাল’ পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার জটিলতা বুঝতে পাঠককে নতুন করে ভাবায়।
জন্মসূত্রে ইহুদি পণ্ডিত পরিবারের সন্তান মার্ক্স। মাত্র ছয় বছর বয়সে পুরো পরিবার খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করে। বন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে দেনায় জর্জরিত হয়ে পড়েন তিনি। মদ্যপান ও দ্বন্দ্ব-কলহে লিপ্ত হওয়ার কারণে হাজতবাসও করতে হয় তাকে। ইচ্ছা ছিল, নাট্য সমালোচক হবেন। কিন্তু পিতার কঠিন অনুশাসনে বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পাঠানো হয় তাকে। সেখানে তিনি ভিড়েন ‘তরুণ হেগেলিয়ান’ নামের এক সংশয়বাদী দলে।
পরবর্তীতে শ্রেণি ব্যবস্থা ও ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে অবিশ্বাসী বুদ্ধিজীবীদের ছোট একটি দলে যোগ দেন মার্ক্স। দলটির নাম কমিউনিস্ট পার্টি। সেখানে গোপন সাংবাদিক হিসেবে কাজ করার সময় জেনি ভন নামের এক অভিজাত নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন তিনি। রাজনৈতিক কারণে জার্মানি ছেড়ে লন্ডনে পাড়ি জমান তারা।
মার্ক্স মূলত পুঁজিবাদের ওপর অসংখ্য বই ও প্রবন্ধ লিখেছেন। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘ক্রিটিক অব হেগেলস ফিলোসফি অব রাইট’ (১৮৪৩), ‘ইকোনমিক অ্যান্ড ফিলোসফিক ম্যানাসক্রিপ্টস’ (১৮৪৪), ‘দ্য কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’ (১৮৪৮) এবং ‘দাস কাপিটাল’ (১৮৬৭-৯৪)। লেখালিখিতে তিনি তার বন্ধু ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করেছেন।
জীবিত অবস্থায় তেমন জনপ্রিয়তা পাননি মার্ক্স। কিন্তু পরবর্তীতে তার ধারণাগুলো সমগ্র পৃথিবীজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। পশ্চিমা পুঁজিবাদ নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। মৃত্যুর পর কয়েক যুগ থেকে শুরু করে বর্তমান সময়েও মার্ক্সের ধারণা নিয়ে সমালোচকদের আগ্রহের কমতি নেই।
কাজের ব্যাপারে মার্ক্সের ধারণা ছিল অত্যন্ত মৌলিক। আধুনিক উৎপাদনমুখী যান্ত্রিক কর্মজীবনকে তিনি আজীবন ঘৃণা করেছেন। তিনি লিখেছেন, শ্রমিকদের কাজের মধ্যে সৃজনশীলতা থাকা আবশ্যক। যিনি যে কাজটি করছেন, সেই কাজের মধ্যে তার ব্যক্তিত্বের প্রতিফলন থাকা উচিত।
তিনি একজন কাঠমিস্ত্রির উদাহরণ দিয়েছেন। একটি চেয়ার তৈরি করতে পারেন নরমস্বভাবের কিংবা বদমেজাজি কোনো কাঠমিস্ত্রি। কিন্তু চেয়ারটি তার ব্যক্তিত্বের প্রতিফলন নয়, বরং তার পারঙ্গমতার ফল। মার্ক্সের মতে, আধুনিক উৎপাদনমুখী কর্মব্যবস্থা মানুষের প্রতিভাকে কাজে না লাগিয়ে বরং দিনকে দিন শেষ করে দিচ্ছে।
মার্ক্স ভালোভাবেই জানতেন, মানুষ একটি নিরাপদ কর্মজীবন প্রত্যাশা করে। কেউ চায় না হঠাৎ করে কর্মক্ষেত্র থেকে জোরপূর্বক অপসারিত হতে। কিন্তু আমাদের শ্রমব্যবস্থা এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে যেখানে প্রত্যেকের কর্মজীবনই একটি মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে থাকে। হিসাবটা শুধু উৎপাদন খরচ ও উপযোগিতার।
শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় নামমাত্র মূল্যে শ্রমিকের শ্রম কেনা হয়। অধিক মুনাফার আশায় মালিকপক্ষ সস্তায় শ্রম কেনার প্রবণতা দেখায়। দরিদ্র ও স্বল্পোন্নত দেশে কারখানা স্থাপন করে নামমাত্র পারিশ্রমিকে পণ্য উৎপাদন করে তারা লাভের অনুপাত বাড়ায়।
বর্তমান সময়ের অনেক আগেই মার্ক্স বলেছিলেন, পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা কখনো স্থির নয়। পুঁজিপতি অধিক মুনাফার আশায় যেকোনো ঝুঁকি নিতে দ্বিধা বোধ করেন না। মার্ক্স এ বিষয়ে বলেন, ‘পুঁজিপতি হচ্ছেন এক পাগল জাদুকরের মতো, যার নিজের সৃষ্ট জাদুকরী দুনিয়ার ওপর একপর্যায়ে কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না।’
পুঁজিপতি ও বুর্জোয়াদের ‘ভ্যাম্পায়ার’ ও ‘শত্রুপক্ষের ভাই’ বলে আখ্যায়িত করলেও মার্ক্স তাদের হৃদয় পুরোপুরি কলুষিত মনে করতেন না। তার মতে, তারাও একটি বিশেষ ধরনের সামাজিক অব্যবস্থাপনার শিকার। সবসময় ‘পুঁজি ও মুনাফার’ পেছনে ছুটতে ছুটতে তারা পরিবার থেকে দূরে সরে আসেন। অর্থ আছে, সবকিছু ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে, তবুও মানসিক শান্তি নেই। ফলে পুঁজিবাদ তাদের জন্যও হুমকিস্বরূপ।
২০০ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও কার্ল মার্ক্সের লেখনি আজও প্রাসঙ্গিক। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে শ্রমিক অসন্তোষ, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ও পুঁজিবাদবিরোধী স্লোগান উঠলে কোনো না কোনোভাবে চলে আসে মার্ক্সের নাম। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার জটিল বিশ্লেষক হিসেবে তাকে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ও দার্শনিকেরা।‘শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার’, ‘সৃজনশীল কর্মজীবন’ ও ‘শ্রেণি বৈষম্য’র প্রশ্নগুলো আজও যেমন জ্বলন্ত, তেমনই প্রাসঙ্গিক কার্ল মার্ক্সের দর্শন। ২০০ বছর পরও যাকে অতিক্রম করা যায়নি, তিনিই এই চিরকালীন পণ্ডিত ও বিপ্লবী।

মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ মে ২০২৬
আধুনিক পুঁজিবাদের জয়গান যখন চারদিকে, তখনই এই ব্যবস্থার অসংগতিগুলো দেখিয়েছেন এক পণ্ডিত। পুঁজিপতি ও শ্রমিক শ্রেণির মধ্যকার বৈষম্যের দিকে আঙুল তুলেছেন তিনি। পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি সম্পত্তি মাত্র এক শতাংশ পুঁজিপতির দখলে থাকার নির্মম সত্য উঠে এসেছে তার লেখায়।
শ্রমজীবী মানুষের দুঃখ, কষ্ট, হাহাকার, দারিদ্র্যের কষাঘাত নিয়ে আজীবন কাজ করেছেন তিনি। আধুনিক পুঁজিবাদের এক কট্টর সমালোচক এই ব্যক্তি হলেন কার্ল মার্ক্স।
১৮১৮ সালের ৫ মে জার্মানির ট্রিয়র শহরে জন্ম নেওয়া এই চিন্তককে আজও প্রাসঙ্গিক মনে করেন দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। মৃত্যুর ১৪৩ বছর পরও তার লেখা ‘দ্য কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’ ও ‘দাস কাপিটাল’ পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার জটিলতা বুঝতে পাঠককে নতুন করে ভাবায়।
জন্মসূত্রে ইহুদি পণ্ডিত পরিবারের সন্তান মার্ক্স। মাত্র ছয় বছর বয়সে পুরো পরিবার খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করে। বন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে দেনায় জর্জরিত হয়ে পড়েন তিনি। মদ্যপান ও দ্বন্দ্ব-কলহে লিপ্ত হওয়ার কারণে হাজতবাসও করতে হয় তাকে। ইচ্ছা ছিল, নাট্য সমালোচক হবেন। কিন্তু পিতার কঠিন অনুশাসনে বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পাঠানো হয় তাকে। সেখানে তিনি ভিড়েন ‘তরুণ হেগেলিয়ান’ নামের এক সংশয়বাদী দলে।
পরবর্তীতে শ্রেণি ব্যবস্থা ও ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে অবিশ্বাসী বুদ্ধিজীবীদের ছোট একটি দলে যোগ দেন মার্ক্স। দলটির নাম কমিউনিস্ট পার্টি। সেখানে গোপন সাংবাদিক হিসেবে কাজ করার সময় জেনি ভন নামের এক অভিজাত নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন তিনি। রাজনৈতিক কারণে জার্মানি ছেড়ে লন্ডনে পাড়ি জমান তারা।
মার্ক্স মূলত পুঁজিবাদের ওপর অসংখ্য বই ও প্রবন্ধ লিখেছেন। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘ক্রিটিক অব হেগেলস ফিলোসফি অব রাইট’ (১৮৪৩), ‘ইকোনমিক অ্যান্ড ফিলোসফিক ম্যানাসক্রিপ্টস’ (১৮৪৪), ‘দ্য কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’ (১৮৪৮) এবং ‘দাস কাপিটাল’ (১৮৬৭-৯৪)। লেখালিখিতে তিনি তার বন্ধু ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করেছেন।
জীবিত অবস্থায় তেমন জনপ্রিয়তা পাননি মার্ক্স। কিন্তু পরবর্তীতে তার ধারণাগুলো সমগ্র পৃথিবীজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। পশ্চিমা পুঁজিবাদ নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। মৃত্যুর পর কয়েক যুগ থেকে শুরু করে বর্তমান সময়েও মার্ক্সের ধারণা নিয়ে সমালোচকদের আগ্রহের কমতি নেই।
কাজের ব্যাপারে মার্ক্সের ধারণা ছিল অত্যন্ত মৌলিক। আধুনিক উৎপাদনমুখী যান্ত্রিক কর্মজীবনকে তিনি আজীবন ঘৃণা করেছেন। তিনি লিখেছেন, শ্রমিকদের কাজের মধ্যে সৃজনশীলতা থাকা আবশ্যক। যিনি যে কাজটি করছেন, সেই কাজের মধ্যে তার ব্যক্তিত্বের প্রতিফলন থাকা উচিত।
তিনি একজন কাঠমিস্ত্রির উদাহরণ দিয়েছেন। একটি চেয়ার তৈরি করতে পারেন নরমস্বভাবের কিংবা বদমেজাজি কোনো কাঠমিস্ত্রি। কিন্তু চেয়ারটি তার ব্যক্তিত্বের প্রতিফলন নয়, বরং তার পারঙ্গমতার ফল। মার্ক্সের মতে, আধুনিক উৎপাদনমুখী কর্মব্যবস্থা মানুষের প্রতিভাকে কাজে না লাগিয়ে বরং দিনকে দিন শেষ করে দিচ্ছে।
মার্ক্স ভালোভাবেই জানতেন, মানুষ একটি নিরাপদ কর্মজীবন প্রত্যাশা করে। কেউ চায় না হঠাৎ করে কর্মক্ষেত্র থেকে জোরপূর্বক অপসারিত হতে। কিন্তু আমাদের শ্রমব্যবস্থা এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে যেখানে প্রত্যেকের কর্মজীবনই একটি মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে থাকে। হিসাবটা শুধু উৎপাদন খরচ ও উপযোগিতার।
শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় নামমাত্র মূল্যে শ্রমিকের শ্রম কেনা হয়। অধিক মুনাফার আশায় মালিকপক্ষ সস্তায় শ্রম কেনার প্রবণতা দেখায়। দরিদ্র ও স্বল্পোন্নত দেশে কারখানা স্থাপন করে নামমাত্র পারিশ্রমিকে পণ্য উৎপাদন করে তারা লাভের অনুপাত বাড়ায়।
বর্তমান সময়ের অনেক আগেই মার্ক্স বলেছিলেন, পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা কখনো স্থির নয়। পুঁজিপতি অধিক মুনাফার আশায় যেকোনো ঝুঁকি নিতে দ্বিধা বোধ করেন না। মার্ক্স এ বিষয়ে বলেন, ‘পুঁজিপতি হচ্ছেন এক পাগল জাদুকরের মতো, যার নিজের সৃষ্ট জাদুকরী দুনিয়ার ওপর একপর্যায়ে কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না।’
পুঁজিপতি ও বুর্জোয়াদের ‘ভ্যাম্পায়ার’ ও ‘শত্রুপক্ষের ভাই’ বলে আখ্যায়িত করলেও মার্ক্স তাদের হৃদয় পুরোপুরি কলুষিত মনে করতেন না। তার মতে, তারাও একটি বিশেষ ধরনের সামাজিক অব্যবস্থাপনার শিকার। সবসময় ‘পুঁজি ও মুনাফার’ পেছনে ছুটতে ছুটতে তারা পরিবার থেকে দূরে সরে আসেন। অর্থ আছে, সবকিছু ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে, তবুও মানসিক শান্তি নেই। ফলে পুঁজিবাদ তাদের জন্যও হুমকিস্বরূপ।
২০০ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও কার্ল মার্ক্সের লেখনি আজও প্রাসঙ্গিক। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে শ্রমিক অসন্তোষ, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ও পুঁজিবাদবিরোধী স্লোগান উঠলে কোনো না কোনোভাবে চলে আসে মার্ক্সের নাম। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার জটিল বিশ্লেষক হিসেবে তাকে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ও দার্শনিকেরা।‘শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার’, ‘সৃজনশীল কর্মজীবন’ ও ‘শ্রেণি বৈষম্য’র প্রশ্নগুলো আজও যেমন জ্বলন্ত, তেমনই প্রাসঙ্গিক কার্ল মার্ক্সের দর্শন। ২০০ বছর পরও যাকে অতিক্রম করা যায়নি, তিনিই এই চিরকালীন পণ্ডিত ও বিপ্লবী।

আপনার মতামত লিখুন