রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে জেগে ওঠে এক ব্যস্ত জনপদ। চারদিকে মানুষের হাঁকডাক, চায়ের দোকানে আড্ডা আর শত শত কৃষকের আনাগোনা। এটি কোনো সাধারণ হাট বা মেলা নয়; মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার রঘুনাথপুর বাজারে বসা কৃষকদের ‘রাতের মরিচ বাজার’। এই বাজারের মরিচ এখন স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে প্রতিদিন পাড়ি জমাচ্ছে দুবাই ও মালয়েশিয়ার মতো দেশে।
সফল এই বাজারটির বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অনুন্নত যোগাযোগব্যবস্থা। ভাঙা ও সরু রাস্তা এবং টেপরী খালের ওপর সেতু না থাকায় পণ্য পরিবহনে বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে। ফলে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে পৌঁছাতে ছোট যানে করে কয়েক দফায় মালামাল সরাতে হয়। বাজার কমিটির সভাপতি ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান সরকারের কাছে দ্রুত ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং রাস্তা ও সেতু মেরামতের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
শিবালয় উপজেলার ৬টি ইউনিয়ন থেকে সন্ধ্যা নামলেই বাইসাইকেল, অটোরিকশা, মোটরসাইকেল, এমনকি ঘোড়ায় চড়ে শত শত কৃষক মরিচের বস্তা নিয়ে এই বাজারে আসেন। বেচাকেনা চলে রাত ১২টা পর্যন্ত।
কৃষকদের মতে, দিনের বেলা খেতে কাজ শেষ করে রাতে পণ্য বিক্রির এই সুযোগ তাদের সময় ও অর্থ সাশ্রয় করছে। প্রায় পাঁচ বছর আগে চেয়ারম্যান মো. শাহজাহানের উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই বাজারটি এখন প্রায় ১৫ কোটি টাকার বাণিজ্যের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, এখানে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ২৫ টন কাঁচামরিচ কেনাবেচা হয়। এর একটি বড় অংশ (প্রায় ১০ টন) সরাসরি দুবাই ও মালয়েশিয়ায় রপ্তানি হচ্ছে।
ব্যবসায়ী আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘এখান থেকে প্রতিদিন ৭-৮ টন দুবাই এবং ২-৩ টন মালয়েশিয়ায় যাচ্ছে। কুয়েতেও রপ্তানি শুরু হয়েছিল, তবে যুদ্ধের কারণে সাময়িকভাবে বন্ধ আছে।’
লাভজনক হলেও মরিচ চাষে বীজের দাম ও বিনিয়োগের অঙ্ক ভাবিয়ে তুলছে কৃষকদের। বাজারে ‘কারেন্ট মরিচ’ হিসেবে পরিচিত ‘অস্থির-১’ জাতের প্রতি কেজি বীজের দাম এখন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এ ছাড়া মালেক সিডের ‘সুপারহট’ ১ লাখ ৪০ হাজার ও ‘কৃষিবিদ-১১০৬’ বিক্রি হচ্ছে ৭০ হাজার টাকায়। চাষি মো. জুয়েল হোসেন এরশাদ জানান, প্রতি ২৭ শতাংশ জমিতে প্রায় এক লাখ টাকা খরচ হয়। রপ্তানি চাঙ্গা থাকায় লাভ হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও সার, কীটনাশক ও মালচিং উপকরণের উচ্চমূল্য কৃষকদের জন্য বড় বাধা।
মানিকগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শাহজাহান সিরাজ বলেন, রপ্তানিমুখী এই পণ্যের উৎপাদন ও বিপণনে সব ধরনের সহযোগিতার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে মানিকগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য এস এ জিন্নাহ কবীর আশ্বাস দিয়ে বলেন, ‘কৃষিপণ্য পরিবহনে রাস্তা ও সেতুর যে সমস্যা রয়েছে, তা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমাধান করা হবে।’
আপনার মতামত লিখুন