সংবাদ

পিকেটির আয়নায় বাংলাদেশ: বৈষম্য ও উন্নয়নের দ্বন্দ্ব


বিকাশ চন্দ্র ঘোষ
বিকাশ চন্দ্র ঘোষ
প্রকাশ: ৯ মে ২০২৬, ০৭:২৪ পিএম

পিকেটির আয়নায় বাংলাদেশ: বৈষম্য ও উন্নয়নের দ্বন্দ্ব
ক্যাপিটাল ইন দ্যা টুয়েন্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরি বইয়ের লেখক থমাস পিকেটি

দ্রুত প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান, উঁচু সেতু, নতুন নগর, প্রযুক্তির প্রসার এসব দেখে অনেক সময় মনে হয় উন্নয়ন যেন সবার দুয়ারে পৌঁছে গেছে। কিন্তু তবে সমাজের গভীরে একটি মৌলিক প্রশ্ন ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়: এই উন্নয়নের ফল কার হাতে যাচ্ছে? কারা সম্পদশালী হচ্ছে, কারা কেবল শ্রম দিয়ে টিকে আছে, আর কারা জন্মসূত্রেই প্রতিযোগিতার বাইরে পড়ে যাচ্ছে? থমাস পিকেটির ‘একবিংশ শতাব্দীতে পুঁজি’ (ক্যাপিটাল ইন দ্যা টুয়েন্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরি) ঠিক এই প্রশ্নগুলোকেই কেন্দ্র করে রচিত এক যুগান্তকারী গ্রন্থ। তিনি দেখান, বৈষম্য কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি ইতিহাস, রাজনীতি, যুদ্ধ, আইন, করনীতি এবং উত্তরাধিকার কাঠামোর ফল। ২০১৩ সালে ফরাসি ভাষায় প্রকাশিত এবং ২০১৪ সালে ইংরেজি অনুবাদের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তোলা এই বই মূলত সম্পদ বৈষম্য, পুঁজির কেন্দ্রীভবন এবং আধুনিক গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে রচিত। অর্থনীতির বই হয়েও এটি সাধারণ পাঠকের মধ্যে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে, কারণ পিকেটি কঠিন অর্থনৈতিক তত্ত্বকে ইতিহাস, সাহিত্য, রাজনীতি ও বাস্তব উদাহরণের সঙ্গে যুক্ত করে সহজবোধ্য ভাষায় উপস্থাপন করেছেন। তার মূল বক্তব্য হলো ‘যখন পুঁজির আয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চেয়ে বেশি হারে বাড়ে, তখন সমাজে বৈষম্য বৃদ্ধি পায় এবং সম্পদ ক্রমশ অল্প কয়েকজন মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়’। এই ধারণাকে তিনি বিখ্যাত সূত্র r > g দ্বারা প্রকাশ করেছেন। এখানে r  হলো পুঁজির ওপর আয় যেমন ভাড়া, সুদ, লভ্যাংশ বা সম্পদের মূল্যবৃদ্ধি; আর g হলো জাতীয় অর্থনীতির সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি। যখন r, g-এর চেয়ে বড় হয়, তখন যারা আগে থেকেই সম্পদশালী, তারা দ্রুত ধনী হয়; আর যারা কেবল শ্রমের ওপর নির্ভরশীল, তারা তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়ে।

এই তত্ত্ব বোঝার জন্য পিকেটি প্রথমেই পুঁজির অর্থ নতুনভাবে নির্ধারণ করেন। তার কাছে পুঁজি মানে শুধু কারখানা, যন্ত্র বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান নয়; বরং জমি, বাড়ি, ব্যাংক আমানত, শেয়ার, বন্ড, ব্যবসায়িক মালিকানা, এমনকি উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পদও পুঁজির অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ পুঁজি কেবল অর্থনৈতিক সম্পদ নয়, এটি সামাজিক মর্যাদা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর নিয়ন্ত্রণের উৎসও বটে। এ কারণেই পিকেটির বিশ্লেষণে পুঁজির প্রশ্ন মানে ক্ষমতার প্রশ্ন। যাদের হাতে অধিক সম্পদ, তাদের সঙ্গে আসে আরও সুযোগ, উচ্চমানের শিক্ষা, সমাজে প্রভাবশালী অবস্থান এবং নিরাপদ ও নিশ্চয়তার সঙ্গে ভরা ভবিষ্যৎ। অর্থাৎ, সম্পদশালীদের জীবনযাত্রা শুধুই আর্থিক সমৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি তাদের ক্ষমতা, প্রভাব ও সামাজিক সুবিধার একটি সুদূরপ্রসারী জালে রূপান্তরিত হয়। এই জায়গায় তার ভাবনা কার্ল মার্ক্সের সঙ্গে সংলাপে প্রবেশ করে। মার্ক্স উৎপাদন সম্পর্ক ও শ্রেণী-সংঘাতকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন; পিকেটি সম্পদের বণ্টন, উত্তরাধিকার এবং করনীতিকে কেন্দ্র করেন। আবার সাইমন কুজনেটস মনে করেছিলেন উন্নয়নের এক পর্যায়ে বৈষম্য কমবে; পিকেটি দীর্ঘমেয়াদি তথ্য দিয়ে দেখান, বৈষম্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে না নীতিগত হস্তক্ষেপ ছাড়া তা আবার ফিরে আসে।

থমাস পিকেটি ১৯৭১ সালে ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করেন এবং অল্প বয়সেই অর্থনীতিতে অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় দেন। তিনি ইকোলি নরম্যাল সুপরিওর-এ অধ্যয়ন করেন এবং খুব কম বয়সে সম্পদ পুনর্বণ্টন বিষয়ে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে তিনি প্যারিস স্কুল অব ইকনোমিকসের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন এবং আয় বৈষম্য, করনীতি ও সম্পদ বণ্টন বিষয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন। ইমানুয়েল সেইজ, গ্যাব্রিয়েল জুখম্যান, আন্থনি অ্যাটকিনসন প্রমুখ অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে কাজ করে তিনি বৈশ্বিক আয় ও সম্পদের দীর্ঘমেয়াদি তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলেন। এই কারণেই তার বইটি মতাদর্শনির্ভর স্লোগান নয়; বরং বহু শতাব্দীর তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ। পিকেটি দেখান যে ইতিহাস জুড়ে বৈষম্য কখনো স্থির ছিল না; বরং রাজনৈতিক ঘটনা, যুদ্ধ, বিপ্লব, সামাজিক আন্দোলন এবং রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ সম্পদের কাঠামোকে বারবার বদলে দিয়েছে। অর্থাৎ ধনীদের ধনী হওয়া কিংবা মধ্যবিত্তের বিস্তার দুটিই ইতিহাসনির্ভর। তিনি এই কারণেই অর্থনীতিকে ইতিহাসের ভেতরে ফিরিয়ে আনেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি ফরাসি বিপ্লবের দিকে ফিরে তাকান। ১৭৮৯ সালের সেই বিপ্লবকে আমরা প্রায়ই রাজতন্ত্রবিরোধী আন্দোলন হিসেবে দেখি, কিন্তু এর গভীরে ছিল সম্পদের চরম বৈষম্য। বিপ্লব পূর্ব ফ্রান্সে জমি, কর ছাড়, প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং সামাজিক মর্যাদা মূলত অভিজাত শ্রেণী ও গির্জার হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল। কৃষকরা উৎপাদন করত, কিন্তু কর, ভাড়া ও খাজনার বড় অংশ চলে যেত শাসকগোষ্ঠীর হাতে। যারা রাষ্ট্রের অর্থ জোগাত, তারাই রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে বঞ্চিত ছিল। ফলে ফরাসি বিপ্লব শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতার আন্দোলন ছিল না; এটি অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারেরও দাবি ছিল।

এই বৈষম্য প্রসূত বিস্ফোরণের উদাহরণ শুধু ফ্রান্সেই সীমাবদ্ধ নয়। রাশিয়ার ১৯১৭ সালের বিপ্লবের পেছনেও জমিদারি কাঠামো, কৃষকের দারিদ্র্য এবং শ্রমিক অসন্তোষ কাজ করেছিল। লাতিন আমেরিকার বহু দেশে ভূমি বৈষম্য দীর্ঘদিন রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করেছে। উপনিবেশিক ভারতেও জমিদারি প্রথা ও ভূমি রাজস্বনীতি কৃষকসমাজে গভীর অসাম্য সৃষ্টি করেছিল। অর্থাৎ যখন সম্পদ, ভূমি ও সুযোগ অল্প কয়েকটি পরিবারের হাতে বন্দী থাকে, তখন সমাজের স্থিতি ভঙ্গুর হয়ে ওঠে। পিকেটির বক্তব্য এখানে স্পষ্ট বৈষম্য কেবল ˆনতিক সমস্যা নয়, এটি রাজনৈতিক ঝুঁকিও। একইভাবে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ইউরোপের পুরনো ধনিকশ্রেণীকে দুর্বল করে দেয়। যুদ্ধের ধ্বংসে শুধু প্রাণহানি হয়নি; বহু প্রাসাদ, শিল্পকারখানা, রেলপথ, অবকাঠামো এবং ব্যক্তিগত সম্পদও ধ্বংস হয়। যুদ্ধোত্তর মুদ্রাস্ফীতিতে পুরনো বন্ড ও আর্থিক সম্পদের মূল্য পড়ে যায়। সরকারগুলো যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে এবং পুনর্গঠনের জন্য উচ্চ আয়কর, উত্তরাধিকার কর ও সম্পদ কর আরোপ করে। ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি সবখানেই কল্যাণরাষ্ট্রের ধারণা শক্তিশালী হয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পেনশন, শ্রমিক অধিকার ও আবাসননীতির মাধ্যমে রাষ্ট্র মধ্যবিত্ত শ্রেণী গঠনে ভূমিকা নেয়। ফলে ’৪৫-’৭৫ পর্যন্ত পশ্চিমা বিশ্বে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ব্যাপক উত্থান ঘটে। বহু শ্রমজীবী পরিবার প্রথমবারের মতো বাড়ি কেনে, সন্তানদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠায়, স্বাস্থ্যসেবা পায় এবং স্থায়ী চাকরির নিরাপত্তা ভোগ করে। এই সময়কে অনেকেই ‘পুঁজিবাদের সোনালি যুগ’ বলেন। কিন্তু পিকেটির মতে এটি বাজারের স্বাভাবিক ফল ছিল না; বরং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, শ্রমিক আন্দোলন, উচ্চ করব্যবস্থা এবং যুদ্ধ পরবর্তী সামাজিক চুক্তির ফল। অর্থাৎ বাজার একা সমতা আনে না; ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ বৈষম্য কমাতে পারে।

কিন্তু ১৯৮০-এর দশক থেকে রোন্যাল্ড রিগ্যান ও মার্গারেট থ্যাচারের নবউদারবাদী অর্থনীতি কর হ্রাস, বেসরকারিকরণ, আর্থিক উদারীকরণ ও বাজারমুখিতা বিশ্বে নতুন বৈষম্যের যুগ শুরু করে। বড় কর্পোরেশন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সম্পদমালিকরা দ্রুত ধনী হতে থাকেন, যখন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের মজুরি সেই গতিতে বাড়েনি। আজকের ডিজিটাল অর্থনীতিতে এই বৈষম্য আরও নতুন রূপ নিয়েছে। প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম, তথ্যনিয়ন্ত্রণ, মেধাস্বত্ব, অ্যালগরিদমিক বাজার এবং বৈশ্বিক আর্থিক প্রবাহ এসবের মাধ্যমে সম্পদ আরও দ্রুত কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। জোসেফ স্টিগলিট বহুদিন ধরেই দেখিয়ে আসছেন, বাজার নিজে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে না; রাষ্ট্রীয় নীতি, করব্যবস্থা ও জনসেবাই সমতা আনে। অমর্ত্য সেন আবার মনে করিয়ে দেন, শুধু আয় নয় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সক্ষমতা ও স্বাধীনতাও বৈষম্যের অংশ। এই দৃষ্টিকোণ থেকে পিকেটি, স্টিগলিটজ ও সেন তিনজনই ভিন্ন ভাষায় একই সতর্কবার্তা দেন। বইটির এক অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, পিকেটি অর্থনীতিকে বোঝাতে সাহিত্য ব্যবহার করেছেন। তিনি অনরে দ্য বালজাকের পেরে গরিওট, জেন অস্টেনের প্রাইড অ্যান্ড প্রিজুডিস এবং চার্লস ডিকেন্সের ‘গ্রেট এক্সপেক্টেশনস’ উপন্যাস থেকে উদাহরণ এনে দেখিয়েছেন যে উনিশ শতকের ইউরোপে কঠোর পরিশ্রমের চেয়ে উত্তরাধিকার, বিবাহ ও পারিবারিক সম্পদ সামাজিক অগ্রগতির বড় মাধ্যম ছিল। পেরে গরিওট-এ তরুণ রাস্তিনিয়াক বুঝতে শেখে, শুধু মেধা নয় ধনী পরিবারে প্রবেশই সাফল্যের দ্রুত পথ। প্রাইড অ্যান্ড প্রিজুডিস-এ বিয়ে অনেকাংশে অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রতিষ্ঠান। গ্রেট এক্সপেক্টেশনস-এ এক তরুণের জীবন বদলে যায় উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পদে। সাহিত্য এখানে কল্পনা নয়, সামাজিক বাস্তবতার দলিল। কারণ উপন্যাসের চরিত্ররা সেই সমাজের ভেতরের সত্য বলে, যা অনেক সময় পরিসংখ্যানের সারণি বলতে পারে না।

পিকেটির আরেকটি গভীর তত্ত্ব হলো আধুনিক সবৎরঃড়পৎধপু বা মেধাতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা। আধুনিক সমাজ দাবি করে যে প্রতিভা ও পরিশ্রমই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। কিন্তু পিকেটি দেখান, অসম সমাজে এই দাবি অনেক সময় অর্ধসত্য। কারণ প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার আগেই অনেকের হাতে বাড়তি সুবিধা জমা থাকে। একজন শিশুর যদি জন্ম থেকেই ভালো পুষ্টি, নিরাপদ বাসস্থান, উন্নত স্কুল, ব্যক্তিগত শিক্ষক, প্রযুক্তি, বই, ভাষাগত দক্ষতা, সাংস্কৃতিক পরিসর এবং পারিবারিক যোগাযোগ থাকে, তবে সে পরীক্ষার হলে বসার আগেই এগিয়ে। অন্যদিকে আরেকজন শিশুকে যদি বিদ্যুৎহীন ঘরে পড়তে হয়, পারিবারিক আয়ের জন্য কাজ করতে হয়, কোচিংয়ের সুযোগ না থাকে, অপুষ্টিতে ভুগতে হয় তবে একই পরীক্ষায় অংশ নিলেও তাদের প্রতিযোগিতা সমান নয়। হার্ভাডে পড়ার স্বপ্ন এবং গ্রামের এক শিশুর সরকারি স্কুলের বাস্তবতা একই প্রতিযোগিতার মাঠ নয়। দক্ষিণ এশিয়ায় এই বৈষম্য আরও স্পষ্ট। শহরের ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করার সুযোগ পায়; গ্রামের বহু শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিকের পরই শ্রমবাজারে ঢুকে পড়ে। একজন উদ্যোক্তা ব্যর্থ হলে পরিবার থেকে আবার পুঁজি পায়; দরিদ্র পরিবারের উদ্যোক্তা একবার ব্যর্থ হলে বহু বছর পিছিয়ে যায়। অর্থাৎ উত্তরাধিকার শুধু টাকা নয়; উত্তরাধিকার হলো ভাষা, আত্মবিশ্বাস, সামাজিক নেটওয়ার্ক, ব্যর্থ হওয়ার পরও আবার দাঁড়ানোর নিরাপত্তা। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির বিশ্বখ্যাত রাজনৈতিক দার্শনিক ও ˆনতিকতাবিদ মাইকেল স্যান্ডেল যেমন বলেছেন, মেধাতন্ত্র অনেক সময় সফলদের অহংকার এবং ব্যর্থদের অপমান তৈরি করে। পিকেটির বিশ্লেষণও সেই সত্যকে অর্থনৈতিক ভাষায় প্রকাশ করে।

তবে এত বিস্তৃত ও তথ্যসমৃদ্ধ কাজ হওয়া সত্ত্বেও পিকেটির বই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। তার তথ্যভাণ্ডারের বড় অংশ ফ্রান্স, ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও পশ্চিম ইউরোপকেন্দ্রিক। ইউরোপীয় সম্পদ-ইতিহাসের দীর্ঘ পরিসংখ্যান তিনি যত নিখুঁতভাবে দেখাতে পেরেছেন, এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা বা উপনিবেশিত বিশ্বের ক্ষেত্রে সেই গভীরতা তুলনামূলক কম। ফলে উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, দাসবাণিজ্য, জোরপূর্বক সম্পদ আহরণ, দুর্ভিক্ষ সৃষ্ট অর্থনীতি, বর্ণভিত্তিক শ্রমবাজার কিংবা ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক বৈষম্যের মতো বিষয়গুলো বইয়ে তুলনামূলকভাবে প্রান্তিক অবস্থানে থাকে। অথচ ইউরোপের বহু পুঁজিসঞ্চয়ের ইতিহাসই গড়ে উঠেছিল উপনিবেশিক শোষণের ওপর। ভারতীয় উপমহাদেশ, আফ্রিকার খনিজভাণ্ডার, ক্যারিবীয় চিনি-বাগান, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যপথ এছাড়া ইউরোপীয় পুঁজির উত্থান পূর্ণাঙ্গভাবে বোঝা যায় না। ফলে, তার বইয়ের সীমাবদ্ধতা আসলে তার তত্ত্বের অস্বীকৃতি নয়; বরং সেই তত্ত্বকে আরও বিস্তৃত ভূগোলে প্রয়োগ করার আহ্বান।

এই সীমাবদ্ধতার কারণে, পিকেটির বিশ্লেষণকে ভারতীয় উপমহাদেশের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে প্রয়োগ করলে সম্পদের সঞ্চয় ও বৈষম্যের একটি নতুন চিত্র সামনে আসে। সপ্তদশ শতাব্দীর শুরুতে ১৬শ’ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধে বিজয়ের পর বাংলার রাজস্ব ও বাণিজ্যের ওপর কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ স্থাপন হয়। ১৭৬৫ সালে দেওয়ানি লাভের মাধ্যমে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার রাজস্ব আহরণের অধিকার কোম্পানির হাতে চলে আসে। অর্থাৎ উৎপাদন স্থানীয় কৃষকের, কিন্তু উদ্বৃত্ত প্রবাহিত হতে থাকে বিদেশি শাসকের কোষাগারে। বহু অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদের মতে, আঠারো শতকের শেষভাগে বাংলার বিপুল সম্পদ ইউরোপে স্থানান্তরিত হয়, যা ব্রিটিশ শিল্পবিপ্লবের পুঁজিসঞ্চয়ে সহায়ক ছিল। পিকেটির ভাষায় বলতে গেলে, স্থানীয় সমাজে ম (জনগণের উৎপাদন বৃদ্ধি) যতটা ছিল, তার বড় অংশ r (সম্পদ-আয়) হিসেবে উপনিবেশিক শক্তির হাতে চলে যেত। ১৭৯৩ সালের স্থায়ী দেওয়ানি ব্যবস্থা জমিদারি কাঠামোকে স্থায়ী রূপ দেয়। জমির মালিকানা ও কর আদায়ের ক্ষমতা এক শ্রেণীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, কৃষক হয়ে পড়ে খাজনাদাতা প্রজা। ফলে উৎপাদক ও মালিকের বিচ্ছেদ তীব্র হয়। উনিশ শতক জুড়ে নীলচাষ, নগদকর, ঋতজাল, দুর্ভিক্ষ এবং বাজার নির্ভর কৃষিনীতি গ্রামীণ বৈষম্য বাড়ায়। ১৮৭০-এর দশক থেকে ১৯০০-এর দশক পর্যন্ত ব্রিটিশ ভারতে বারবার দুর্ভিক্ষ ঘটে; লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়, কিন্তু খাদ্যশস্য রপ্তানি ও রাজস্বনীতি অব্যাহত থাকে। অর্থাৎ বৈষম্য শুধু আয়গত ছিল না; তা জীবন-মৃত্যুর ব্যবধানেও রূপ নেয়।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হলেও অর্থনৈতিক বৈষম্যের অবসান হয়নি; বরং নতুন রূপ নেয়। পূর্ব বাংলা জনসংখ্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও ক্ষমতা, প্রশাসন, সামরিক নেতৃত্ব ও শিল্পপুঁজি পশ্চিম পাকিস্তানকেন্দ্রিক ছিল। ১৯৫০-এর দশক থেকে ১৯৬০-এর দশক পর্যন্ত পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার বড় উৎস ছিল পূর্ব বাংলার পাট রপ্তানি। কিন্তু উন্নয়ন ব্যয়, শিল্পঋত, অবকাঠামো বিনিয়োগ ও প্রতিরক্ষা ব্যয়ের বড় অংশ যেত পশ্চিম পাকিস্তানে। অর্থনীতিবিদদের বহু গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৬০-এর দশকে উন্নয়ন ব্যয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ পশ্চিম পাকিস্তান পেয়েছে, যখন বৈদেশিক আয়ের বড় অংশ এসেছে পূর্ব পাকিস্তান থেকে। মাথাপিছু আয় ব্যবধানও ক্রমে বাড়তে থাকে। ১৯৪৯-৫০ সালে দুই অংশের ব্যবধান তুলনামূলক কম থাকলেও ১৯৬৯-৭০ নাগাদ পশ্চিম পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় পূর্ব পাকিস্তানের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হয়ে যায়। এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান, নুরুল ইসলামসহ বহু চিন্তক ‘দুই অর্থনীতি’ ধারণা তুলে ধরেন। শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফার পেছনেও অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্ন ছিল কেন্দ্রে। অর্থাৎ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ কেবল সাংস্কৃতিক বা রাজনৈতিক মুক্তির আন্দোলন ছিল না; তা ছিল বৈষম্যমূলক অর্থনৈতিক কাঠামোর বিরুদ্ধেও সংগ্রাম।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ নতুন রাষ্ট্র হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও বৈষম্য কমেনি বরং সময়ের সঙ্গে বেড়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, দুর্ভিক্ষ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক শাসন, দুর্বল প্রতিষ্ঠান এসব কারণে প্রথম দশকেই সম্পদ বণ্টনের ন্যায়ভিত্তিক কাঠামো শক্তভাবে গড়ে ওঠেনি। ১৯৮০-এর দশক থেকে বাজারমুখী সংস্কার, বেসরকারিকরণ, নগরকেন্দ্রিক প্রবৃদ্ধি এবং অনিয়ন্ত্রিত ভূমিমূল্য বৃদ্ধি নতুন বৈষম্য তৈরি করে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে প্রবৃদ্ধি প্রশংসনীয় গার্মেন্টস, প্রবাসী আয়, কৃষির উন্নয়ন, নারীর শ্রমঅংশগ্রহণ, অবকাঠামো উন্নয়ন সবই গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য। কিন্তু একই সঙ্গে সম্পদ কেন্দ্রীভবনও বেড়েছে। শহুরে জমির দাম, ব্যাংকঋণে প্রভাবশালী প্রবেশাধিকার, ব্যাবসায়ীদের সিন্ডিকেট, শেয়ারবাজারে সুবিধাভোগী গোষ্ঠী, কর ফাঁকি, খেলাপি ঋত, উত্তরাধিকারভিত্তিক ব্যবসা সম্প্রসারণ এসব মিলিয়ে উচ্চবিত্তের সম্পদ দ্রুত বেড়েছে। অন্যদিকে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তায় আটকে আছে। বিভিন্ন সময়ের জরিপে দেখা যায়, জাতীয় আয় বৈষম্যের গিনি সহগ স্বাধীনতার পরবর্তী দশকগুলোর তুলনায় এখন বেশি। শহর-গ্রাম সম্পদ ব্যবধান, ভূমিমূল্যের বিস্ফোরণ, ব্যাংকঋণে অসম প্রবেশাধিকার, শিক্ষার মানে দ্বৈততা এবং স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য সামাজিক স্তরবিন্যাসকে কঠিন করেছে।

পিকেটির মতোই যদি আমরা ভারতীয় উপমহাদেশের অর্থনীতি বুঝতে সাহিত্যর দিকে তাকাই আমরা দেখবো ভারতীয় উপমহাদেশের সাহিত্য কেবল গল্প নয়, এটি সামাজিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার জীবন্ত দলিল। ইউরোপের মতোই ভারতীয় উপমহাদেশের সাহিত্যেও দেখা যায় কীভাবে জমি, শ্রেণী, জাত, শিক্ষা ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা মানুষের জীবনের পথ নির্ধারণ করে দেয়। যেমন: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গোরা উপন্যাসে পরিচয়ের প্রশ্ন কেবল দার্শনিক নয় এটি সামাজিক স্তরবিন্যাসের গভীর প্রতিফলন। এখানে জাত, ধর্ম ও সামাজিক অবস্থান মানুষের সুযোগ সীমিত করে এবং বৈষম্যের সূক্ষ্ম ছাপ তৈরি করে। ছিন্নপত্র-এ রবীন্দ্রনাথ গ্রামীণ কৃষকের জীবন দেখান অনিশ্চিত অর্থনীতির উদাহরণ হিসেবে শ্রম আছে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ নেই, এবং উৎপাদনের ফল মানুষের হাতে আসে না। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আনন্দমঠ ও কপালকুণ্ডলা কেবল সাহিত্য নয়; এগুলো ঔপনিবেশিক সমাজে ক্ষমতা, উৎপাদন ও ˆনতিকতার সম্পর্ক বোঝার দলিল। বিশেষ করে আনন্দমঠ-এ অনাহার, কর ও রাষ্ট্রীয় শোষণের চিত্র আঠারো-উনিশ শতকের বাংলার অর্থনৈতিক বৈষম্যকে ফুটিয়ে তোলে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দেবদাস, পল্লীসমাজ ও গৃহদাহ উপন্যাসগুলোতে বৈষম্য আরও ব্যক্তিগত এবং আবেগঘন রূপ নেয়। দেবদাস-এ শ্রেণী ও পারিবারিক মর্যাদা মানুষের প্রেম ও জীবন সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। পল্লীসমাজ-এ জমি ও গ্রামের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব দেখানো হয়েছে, যা স্থানীয় অর্থনীতি, সম্পর্ক এবং ন্যায়বিচারকে গ্রাস করে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাঁসুলী বাঁক ও গণদেবতা-তে গ্রামীণ সমাজে জাত, জমি ও ঋণের জটিল কাঠামো মানুষের চলাচল ও সুযোগ সীমিত করে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝি নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি ও প্রাকৃতিক সীমাবদ্ধতার ভেতরে বেঁচে থাকার অনিশ্চয়তা দেখায়, যেখানে মাছ ধরা, নৌকা চালানো এবং ঋত সবই এক ধরনের ধারাবাহিক সংগ্রাম। আধুনিক যুগে শওকত আলী ও ˆসয়দ ওয়ালীউল্লাহর উপন্যাস যেমন প্রদোষে প্রাকৃতজন ও লালসালু ধর্ম, ক্ষমতা ও গ্রামীণ অর্থনীতি একত্রে মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে। এই উপন্যাসগুলো দেখায় যে বৈষম্য কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষমতার পুনরাবৃত্তি, যা মানুষের জীবনকে সীমিত করে এবং সামাজিক কাঠামোর মধ্যে প্রবেশের সুযোগকে সংকুচিত করে। প্রতিটি কাহিনী একসঙ্গে ভারতীয় উপমহাদেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতার একটি সমন্বিত চিত্র ফুটিয়ে তোলে, যেখানে শ্রম, সম্পদ, ক্ষমতা ও ইতিহাসের সম্পর্ক গভীরভাবে স্পষ্ট হয়।

পিকেটির বিশ্লেষণের বড় অংশই ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দীর্ঘমেয়াদি কর-তথ্য, সম্পদ রেকর্ড এবং আয় পরিসংখ্যানের ওপর নির্ভরশীল। ফলে যেখানে রাষ্ট্রীয় তথ্যভাণ্ডার দুর্বল, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি বড়, নগদ লেনদেন বেশি, বা সম্পদ গোপন রাখা সহজ সেসব দেশের বাস্তবতা বইটিতে তুলনামূলক কম প্রতিফলিত হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার বহু অর্থনীতি, বিশেষ করে বাংলাদেশে, জমি, সোনা, অনিবন্ধিত ব্যবসা, পারিবারিক সম্পদ, প্রবাসী আয়ের অনিয়মিত প্রবাহ এসব সবসময় পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না। ফলে পিকেটির কাঠামো প্রয়োগ করতে গেলে স্থানীয় বাস্তবতার জন্য নতুন তথ্যসংগ্রহ অপরিহার্য। তার বিখ্যাত সূত্র r > g বৈষম্যের একটি শক্তিশালী ব্যাখ্যা দিলেও এটি সব সমাজের পূর্ণ ব্যাখ্যা নয়। কারণ বৈষম্য কেবল পুঁজির আয় ও প্রবৃদ্ধির পার্থক্য দিয়ে নির্ধারিত হয় না; শিক্ষা, প্রযুক্তি, দুর্নীতি, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, লিঙ্গবৈষম্য, সামাজিক পরিচয়, ভূমি দখল, শ্রমবাজারের কাঠামো এবং আইনের শাসনের দুর্বলতাও বড় ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে উদাহরণস্বরূপ, কেউ শুধু সম্পদের কারণে নয়, রাজনৈতিক যোগাযোগ, প্রশাসনিক সুবিধা বা বাজারে প্রবেশাধিকার পেয়েও দ্রুত উত্থান ঘটাতে পারে। পিকেটির প্রস্তাবিত বৈশ্বিক সম্পদকর নীতিগতভাবে আকর্ষণীয় হলেও বাস্তবে তা কার্যকর করা কঠিন। উন্নত দেশগুলোর মধ্যেও করস্বর্গ, গোপন ব্যাংক হিসাব ও রাজনৈতিক প্রতিরোধ বড় বাধা। বাংলাদেশের মতো দেশে কর-জিডিপি অনুপাত এখনও সীমিত, কর প্রশাসন পুরোপুরি আধুনিক নয়, এবং সম্পদ মূল্যায়নের স্বচ্ছ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। তাই তার নীতিকে হুবহু নয়, বরং স্থানীয় বাস্তবতায় রূপান্তর করে প্রয়োগ করতে হবে।

তবুও বাংলাদেশের জন্য বইটির ধারণাগত প্রয়োগযোগ্যতা অত্যন্ত গভীর। কারণ বাংলাদেশ দ্রুত প্রবৃদ্ধির দেশ হলেও সম্পদ বণ্টনের প্রশ্ন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। শহরে যারা এক দশক আগে জমি, ফ্ল্যাট বা বাণিজ্যিক সম্পত্তি কিনেছেন, তাদের সম্পদ মূল্য বহুগুণ বেড়েছে; অন্যদিকে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তের বড় অংশ ভাড়া, উচ্চ জীবনযাত্রা ব্যয় ও সীমিত সঞ্চয়ের চাপে আছে। এটি পিকেটির r > g তত্ত্বের স্থানীয় রূপ সম্পদের মূল্যবৃদ্ধি শ্রমের আয়ের চেয়ে দ্রুত। গ্রামীণ বাংলাদেশেও একই চিত্র দেখা যায়। যাদের জমি আছে তারা কৃষিঋণ, সামাজিক মর্যাদা, নিরাপত্তা ও বিনিয়োগ সুযোগে এগিয়ে থাকে; ভূমিহীন পরিবার শ্রম বিক্রি ছাড়া বিকল্প কম পায়। জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন, খরা বা লবণাক্ততা দরিদ্র পরিবারকে আরও সম্পদহীন করে। ফলে বৈষম্য শুধু আয় নয়, সম্পদ ও ঝুঁকির বৈষম্যও। শিক্ষাক্ষেত্রে তার মেরিটোক্রেসি-সমালোচনাও বাংলাদেশের জন্য প্রাসঙ্গিক। রাজধানীর উন্নত স্কুল, ইংরেজি মাধ্যম, কোচিং, প্রযুক্তি সুবিধা ও বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ এক শ্রেণীর হাতে বেশি কেন্দ্রীভূত; অন্যদিকে বহু মেধাবী শিক্ষার্থী গ্রাম বা নিম্নআয়ের পরিবার থেকে এসে শুরুতেই পিছিয়ে থাকে। তখন পরীক্ষার ফলাফলকে নিছক ‘মেধার জয়’ বলা অসম্পূর্ণ হয়ে যায়। পিকেটির ভাষায়, উত্তরাধিকার শুধু টাকা নয় সুযোগের উত্তরাধিকারও।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য কিছু প্রয়োগযোগ্য শিক্ষা স্পষ্ট। বাংলাদেশে বৈষম্য হ্রাসের জন্য প্রথমেই করব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার অপরিহার্য। দেশের কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরে প্রায় ৮-১০ শতাংশে সীমিত থাকায়, উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধি করতে হলে এটি ধীরে ধীরে ১৫ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। তবে শুধু কর বৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়; করের ধরনেও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। বর্তমান পরোক্ষ কর, বিশেষত ভ্যাট, সাধারণ ভোক্তার ওপর ডিসপ্রোপরশনেট চাপ ফেলে। তাই উচ্চ আয়, একাধিক সম্পত্তি, বিলাসী খরচের বস্তু এবং উত্তরাধিকারভিত্তিক বা অপ্রদর্শিত সম্পদের ওপর কার্যকর প্রত্যক্ষ কর আরোপ করতে হবে। এই পদক্ষেপ শুধু আয়ের সমতা বাড়াবে না, বরং রাষ্ট্রীয় নীতি ও ক্ষমতার মাধ্যমে সম্পদ কেন্দ্রীভবন কমাবে। পিকেটি বলতেন যেখানে সম্পদ সঞ্চিত, করনীতিও সেখানে পৌঁছাতে হবে। দ্বিতীয়ত, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং খেলাপি ঋত কমানো জরুরি। দীর্ঘমেয়াদী খেলাপি ঋত, রাজনৈতিক প্রভাব এবং প্রশাসনিক স্বজনপ্রীতি (নেপোটিজম) এর কারণে অর্থনীতি প্রতিযোগিতামূলক থাকে না; বড় ঋণগ্রহীতা সুবিধা পায়, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বা কৃষক জামানতের অভাবে ঋণ পায় না। এই অর্থ কৃষি, ক্ষুদ্র শিল্প, প্রযুক্তি ও তরুণ উদ্যোক্তাদের দিকে সরানো হলে বৈষম্য কমানো সম্ভব হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। রাজধানী ও শহরের উন্নত বেসরকারি শিক্ষা এবং গ্রামীণ স্কুলগুলোর মধ্যে মানের তফাৎ দূর করতে হবে। শিক্ষা ব্যয় জিডিপির ৪-৬ শতাংশে উন্নীত করা, কারিগরি শিক্ষা ও জেলা-উপজেলায় মানসম্মত কলেজ এবং ডিজিটাল ল্যাব তৈরি করা, স্বাস্থ্যসেবা সার্বজনীন করা এগুলো সমান সুযোগ নিশ্চিত করবে। চতুর্থত, ভূমি ও নগর সম্পদের বৈষম্য নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বড় শহরে জমির দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় যারা আগে সম্পদ কিনেছে তারা আরও ধনী হচ্ছে, নতুন প্রজন্ম পিছিয়ে যাচ্ছে। খালি ফ্ল্যাট, অব্যবহৃত জমি এবং জল্পনামূলক সম্পদের ওপর কর আরোপ, সাশ্রয়ী আবাসন প্রকল্প এবং জেলা ভিত্তিক শিল্পায়ন বাস্তবায়ন করতে হবে। পঞ্চমত, সামাজিক সুরক্ষা বিস্তৃত করতে হবে। বয়স্কভাতা, বিধবা ও প্রতিবন্ধী সহায়তা, বেকার প্রশিক্ষণ এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার নগদ সহায়তা প্রণোদনা নিশ্চিত করলে দুর্বল শ্রেণীর মানুষ বৈষম্যের প্রভাব থেকে সুরক্ষা পাবে। ষষ্ঠত, অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়ন অপরিহার্য; শুধু ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডরে প্রবৃদ্ধি কেন্দ্রীভূত হলে উত্তরাঞ্চল, উপকূল, হাওর ও সীমান্ত জেলা পিছিয়ে থাকবে। শিল্পপার্ক, বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল অবকাঠামো এবং রেল-লজিস্টিক নেটওয়ার্ক সব অঞ্চলে বিস্তার করতে হবে। সপ্তমত, শ্রমের মর্যাদা বাড়াতে হবে। ন্যূনতম মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সামাজিক সুরক্ষা, মাতৃত্ব সুবিধা, অনানুষ্ঠানিক খাতের সুরক্ষা—এসব ছাড়া পুঁজির বিপরীতে শ্রম দুর্বলই থাকবে। সবশেষে, দূর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব মোকাবিলা করতে হবে। সরকারি নীতি বা উন্নয়ন প্রকল্পে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা থাকলে সুবিধা প্রভাবশালীদের দিকেই চলে যায়, সাধারণ মানুষ পিছিয়ে পড়ে। তাই কর সংস্কার, সম্পদ রেকর্ড, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুবিধা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কৃষকের ঋণ প্রবেশাধিকার সব পদক্ষেপকে দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের বিরুদ্ধে সমন্বিতভাবে প্রয়োগ করতে হবে। এই সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া শুধু অর্থনৈতিক নীতি যথেষ্ট নয়; কারণ দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক প্রভাব বৈষম্যের মূল চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করে।

পরিশেষে, পিকেটির বই আমাদের একটি স্পষ্ট বার্তা দেয় বৈষম্য কোনো নির্ধারিত ভাগ্য নয়, এটি নীতি ও ব্যবস্থার ফল। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যেখানে নীতির মাধ্যমে সুবিধা-অসুবিধা তৈরি হয়েছে, ঠিক তেমনি নীতির মাধ্যমে তা সমানভাবে বিতরণও করা সম্ভব। যদি বাংলাদেশ কেবল প্রবৃদ্ধির সংখ্যার গল্প না বলে, বরং ন্যায়সঙ্গত, সমতাভিত্তিক উন্নয়নের পথ বেছে নেয়, তবে প্রকৃত উন্নয়ন হবে মানুষের জন্য, সংখ্যার জন্য নয়। উঁচু সেতু, ঝকঝকে নগর, বড় বাজেট এসব যতই চোখে পড়ে, তার চেয়েও বড় ও জরুরি প্রশ্ন একটাই: এই দেশের ভবিষ্যৎ কি সত্যিই সবার জন্য উন্মুক্ত, নাকি কেবল অল্প কয়েকজনের জন্য সংরক্ষিত? পিকেটির বিশ্লেষণের প্রকৃত মূল্য এখানেই নিহিত।

[লেখক: সহকারী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ০৯ মে ২০২৬


পিকেটির আয়নায় বাংলাদেশ: বৈষম্য ও উন্নয়নের দ্বন্দ্ব

প্রকাশের তারিখ : ০৯ মে ২০২৬

featured Image

দ্রুত প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান, উঁচু সেতু, নতুন নগর, প্রযুক্তির প্রসার এসব দেখে অনেক সময় মনে হয় উন্নয়ন যেন সবার দুয়ারে পৌঁছে গেছে। কিন্তু তবে সমাজের গভীরে একটি মৌলিক প্রশ্ন ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়: এই উন্নয়নের ফল কার হাতে যাচ্ছে? কারা সম্পদশালী হচ্ছে, কারা কেবল শ্রম দিয়ে টিকে আছে, আর কারা জন্মসূত্রেই প্রতিযোগিতার বাইরে পড়ে যাচ্ছে? থমাস পিকেটির ‘একবিংশ শতাব্দীতে পুঁজি’ (ক্যাপিটাল ইন দ্যা টুয়েন্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরি) ঠিক এই প্রশ্নগুলোকেই কেন্দ্র করে রচিত এক যুগান্তকারী গ্রন্থ। তিনি দেখান, বৈষম্য কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি ইতিহাস, রাজনীতি, যুদ্ধ, আইন, করনীতি এবং উত্তরাধিকার কাঠামোর ফল। ২০১৩ সালে ফরাসি ভাষায় প্রকাশিত এবং ২০১৪ সালে ইংরেজি অনুবাদের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তোলা এই বই মূলত সম্পদ বৈষম্য, পুঁজির কেন্দ্রীভবন এবং আধুনিক গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে রচিত। অর্থনীতির বই হয়েও এটি সাধারণ পাঠকের মধ্যে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে, কারণ পিকেটি কঠিন অর্থনৈতিক তত্ত্বকে ইতিহাস, সাহিত্য, রাজনীতি ও বাস্তব উদাহরণের সঙ্গে যুক্ত করে সহজবোধ্য ভাষায় উপস্থাপন করেছেন। তার মূল বক্তব্য হলো ‘যখন পুঁজির আয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চেয়ে বেশি হারে বাড়ে, তখন সমাজে বৈষম্য বৃদ্ধি পায় এবং সম্পদ ক্রমশ অল্প কয়েকজন মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়’। এই ধারণাকে তিনি বিখ্যাত সূত্র r > g দ্বারা প্রকাশ করেছেন। এখানে r  হলো পুঁজির ওপর আয় যেমন ভাড়া, সুদ, লভ্যাংশ বা সম্পদের মূল্যবৃদ্ধি; আর g হলো জাতীয় অর্থনীতির সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি। যখন r, g-এর চেয়ে বড় হয়, তখন যারা আগে থেকেই সম্পদশালী, তারা দ্রুত ধনী হয়; আর যারা কেবল শ্রমের ওপর নির্ভরশীল, তারা তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়ে।

এই তত্ত্ব বোঝার জন্য পিকেটি প্রথমেই পুঁজির অর্থ নতুনভাবে নির্ধারণ করেন। তার কাছে পুঁজি মানে শুধু কারখানা, যন্ত্র বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান নয়; বরং জমি, বাড়ি, ব্যাংক আমানত, শেয়ার, বন্ড, ব্যবসায়িক মালিকানা, এমনকি উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পদও পুঁজির অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ পুঁজি কেবল অর্থনৈতিক সম্পদ নয়, এটি সামাজিক মর্যাদা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর নিয়ন্ত্রণের উৎসও বটে। এ কারণেই পিকেটির বিশ্লেষণে পুঁজির প্রশ্ন মানে ক্ষমতার প্রশ্ন। যাদের হাতে অধিক সম্পদ, তাদের সঙ্গে আসে আরও সুযোগ, উচ্চমানের শিক্ষা, সমাজে প্রভাবশালী অবস্থান এবং নিরাপদ ও নিশ্চয়তার সঙ্গে ভরা ভবিষ্যৎ। অর্থাৎ, সম্পদশালীদের জীবনযাত্রা শুধুই আর্থিক সমৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি তাদের ক্ষমতা, প্রভাব ও সামাজিক সুবিধার একটি সুদূরপ্রসারী জালে রূপান্তরিত হয়। এই জায়গায় তার ভাবনা কার্ল মার্ক্সের সঙ্গে সংলাপে প্রবেশ করে। মার্ক্স উৎপাদন সম্পর্ক ও শ্রেণী-সংঘাতকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন; পিকেটি সম্পদের বণ্টন, উত্তরাধিকার এবং করনীতিকে কেন্দ্র করেন। আবার সাইমন কুজনেটস মনে করেছিলেন উন্নয়নের এক পর্যায়ে বৈষম্য কমবে; পিকেটি দীর্ঘমেয়াদি তথ্য দিয়ে দেখান, বৈষম্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে না নীতিগত হস্তক্ষেপ ছাড়া তা আবার ফিরে আসে।

থমাস পিকেটি ১৯৭১ সালে ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করেন এবং অল্প বয়সেই অর্থনীতিতে অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় দেন। তিনি ইকোলি নরম্যাল সুপরিওর-এ অধ্যয়ন করেন এবং খুব কম বয়সে সম্পদ পুনর্বণ্টন বিষয়ে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে তিনি প্যারিস স্কুল অব ইকনোমিকসের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন এবং আয় বৈষম্য, করনীতি ও সম্পদ বণ্টন বিষয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন। ইমানুয়েল সেইজ, গ্যাব্রিয়েল জুখম্যান, আন্থনি অ্যাটকিনসন প্রমুখ অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে কাজ করে তিনি বৈশ্বিক আয় ও সম্পদের দীর্ঘমেয়াদি তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলেন। এই কারণেই তার বইটি মতাদর্শনির্ভর স্লোগান নয়; বরং বহু শতাব্দীর তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ। পিকেটি দেখান যে ইতিহাস জুড়ে বৈষম্য কখনো স্থির ছিল না; বরং রাজনৈতিক ঘটনা, যুদ্ধ, বিপ্লব, সামাজিক আন্দোলন এবং রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ সম্পদের কাঠামোকে বারবার বদলে দিয়েছে। অর্থাৎ ধনীদের ধনী হওয়া কিংবা মধ্যবিত্তের বিস্তার দুটিই ইতিহাসনির্ভর। তিনি এই কারণেই অর্থনীতিকে ইতিহাসের ভেতরে ফিরিয়ে আনেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি ফরাসি বিপ্লবের দিকে ফিরে তাকান। ১৭৮৯ সালের সেই বিপ্লবকে আমরা প্রায়ই রাজতন্ত্রবিরোধী আন্দোলন হিসেবে দেখি, কিন্তু এর গভীরে ছিল সম্পদের চরম বৈষম্য। বিপ্লব পূর্ব ফ্রান্সে জমি, কর ছাড়, প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং সামাজিক মর্যাদা মূলত অভিজাত শ্রেণী ও গির্জার হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল। কৃষকরা উৎপাদন করত, কিন্তু কর, ভাড়া ও খাজনার বড় অংশ চলে যেত শাসকগোষ্ঠীর হাতে। যারা রাষ্ট্রের অর্থ জোগাত, তারাই রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে বঞ্চিত ছিল। ফলে ফরাসি বিপ্লব শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতার আন্দোলন ছিল না; এটি অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারেরও দাবি ছিল।

এই বৈষম্য প্রসূত বিস্ফোরণের উদাহরণ শুধু ফ্রান্সেই সীমাবদ্ধ নয়। রাশিয়ার ১৯১৭ সালের বিপ্লবের পেছনেও জমিদারি কাঠামো, কৃষকের দারিদ্র্য এবং শ্রমিক অসন্তোষ কাজ করেছিল। লাতিন আমেরিকার বহু দেশে ভূমি বৈষম্য দীর্ঘদিন রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করেছে। উপনিবেশিক ভারতেও জমিদারি প্রথা ও ভূমি রাজস্বনীতি কৃষকসমাজে গভীর অসাম্য সৃষ্টি করেছিল। অর্থাৎ যখন সম্পদ, ভূমি ও সুযোগ অল্প কয়েকটি পরিবারের হাতে বন্দী থাকে, তখন সমাজের স্থিতি ভঙ্গুর হয়ে ওঠে। পিকেটির বক্তব্য এখানে স্পষ্ট বৈষম্য কেবল ˆনতিক সমস্যা নয়, এটি রাজনৈতিক ঝুঁকিও। একইভাবে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ইউরোপের পুরনো ধনিকশ্রেণীকে দুর্বল করে দেয়। যুদ্ধের ধ্বংসে শুধু প্রাণহানি হয়নি; বহু প্রাসাদ, শিল্পকারখানা, রেলপথ, অবকাঠামো এবং ব্যক্তিগত সম্পদও ধ্বংস হয়। যুদ্ধোত্তর মুদ্রাস্ফীতিতে পুরনো বন্ড ও আর্থিক সম্পদের মূল্য পড়ে যায়। সরকারগুলো যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে এবং পুনর্গঠনের জন্য উচ্চ আয়কর, উত্তরাধিকার কর ও সম্পদ কর আরোপ করে। ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি সবখানেই কল্যাণরাষ্ট্রের ধারণা শক্তিশালী হয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পেনশন, শ্রমিক অধিকার ও আবাসননীতির মাধ্যমে রাষ্ট্র মধ্যবিত্ত শ্রেণী গঠনে ভূমিকা নেয়। ফলে ’৪৫-’৭৫ পর্যন্ত পশ্চিমা বিশ্বে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ব্যাপক উত্থান ঘটে। বহু শ্রমজীবী পরিবার প্রথমবারের মতো বাড়ি কেনে, সন্তানদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠায়, স্বাস্থ্যসেবা পায় এবং স্থায়ী চাকরির নিরাপত্তা ভোগ করে। এই সময়কে অনেকেই ‘পুঁজিবাদের সোনালি যুগ’ বলেন। কিন্তু পিকেটির মতে এটি বাজারের স্বাভাবিক ফল ছিল না; বরং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, শ্রমিক আন্দোলন, উচ্চ করব্যবস্থা এবং যুদ্ধ পরবর্তী সামাজিক চুক্তির ফল। অর্থাৎ বাজার একা সমতা আনে না; ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ বৈষম্য কমাতে পারে।

কিন্তু ১৯৮০-এর দশক থেকে রোন্যাল্ড রিগ্যান ও মার্গারেট থ্যাচারের নবউদারবাদী অর্থনীতি কর হ্রাস, বেসরকারিকরণ, আর্থিক উদারীকরণ ও বাজারমুখিতা বিশ্বে নতুন বৈষম্যের যুগ শুরু করে। বড় কর্পোরেশন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সম্পদমালিকরা দ্রুত ধনী হতে থাকেন, যখন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের মজুরি সেই গতিতে বাড়েনি। আজকের ডিজিটাল অর্থনীতিতে এই বৈষম্য আরও নতুন রূপ নিয়েছে। প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম, তথ্যনিয়ন্ত্রণ, মেধাস্বত্ব, অ্যালগরিদমিক বাজার এবং বৈশ্বিক আর্থিক প্রবাহ এসবের মাধ্যমে সম্পদ আরও দ্রুত কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। জোসেফ স্টিগলিট বহুদিন ধরেই দেখিয়ে আসছেন, বাজার নিজে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে না; রাষ্ট্রীয় নীতি, করব্যবস্থা ও জনসেবাই সমতা আনে। অমর্ত্য সেন আবার মনে করিয়ে দেন, শুধু আয় নয় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সক্ষমতা ও স্বাধীনতাও বৈষম্যের অংশ। এই দৃষ্টিকোণ থেকে পিকেটি, স্টিগলিটজ ও সেন তিনজনই ভিন্ন ভাষায় একই সতর্কবার্তা দেন। বইটির এক অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, পিকেটি অর্থনীতিকে বোঝাতে সাহিত্য ব্যবহার করেছেন। তিনি অনরে দ্য বালজাকের পেরে গরিওট, জেন অস্টেনের প্রাইড অ্যান্ড প্রিজুডিস এবং চার্লস ডিকেন্সের ‘গ্রেট এক্সপেক্টেশনস’ উপন্যাস থেকে উদাহরণ এনে দেখিয়েছেন যে উনিশ শতকের ইউরোপে কঠোর পরিশ্রমের চেয়ে উত্তরাধিকার, বিবাহ ও পারিবারিক সম্পদ সামাজিক অগ্রগতির বড় মাধ্যম ছিল। পেরে গরিওট-এ তরুণ রাস্তিনিয়াক বুঝতে শেখে, শুধু মেধা নয় ধনী পরিবারে প্রবেশই সাফল্যের দ্রুত পথ। প্রাইড অ্যান্ড প্রিজুডিস-এ বিয়ে অনেকাংশে অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রতিষ্ঠান। গ্রেট এক্সপেক্টেশনস-এ এক তরুণের জীবন বদলে যায় উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পদে। সাহিত্য এখানে কল্পনা নয়, সামাজিক বাস্তবতার দলিল। কারণ উপন্যাসের চরিত্ররা সেই সমাজের ভেতরের সত্য বলে, যা অনেক সময় পরিসংখ্যানের সারণি বলতে পারে না।

পিকেটির আরেকটি গভীর তত্ত্ব হলো আধুনিক সবৎরঃড়পৎধপু বা মেধাতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা। আধুনিক সমাজ দাবি করে যে প্রতিভা ও পরিশ্রমই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। কিন্তু পিকেটি দেখান, অসম সমাজে এই দাবি অনেক সময় অর্ধসত্য। কারণ প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার আগেই অনেকের হাতে বাড়তি সুবিধা জমা থাকে। একজন শিশুর যদি জন্ম থেকেই ভালো পুষ্টি, নিরাপদ বাসস্থান, উন্নত স্কুল, ব্যক্তিগত শিক্ষক, প্রযুক্তি, বই, ভাষাগত দক্ষতা, সাংস্কৃতিক পরিসর এবং পারিবারিক যোগাযোগ থাকে, তবে সে পরীক্ষার হলে বসার আগেই এগিয়ে। অন্যদিকে আরেকজন শিশুকে যদি বিদ্যুৎহীন ঘরে পড়তে হয়, পারিবারিক আয়ের জন্য কাজ করতে হয়, কোচিংয়ের সুযোগ না থাকে, অপুষ্টিতে ভুগতে হয় তবে একই পরীক্ষায় অংশ নিলেও তাদের প্রতিযোগিতা সমান নয়। হার্ভাডে পড়ার স্বপ্ন এবং গ্রামের এক শিশুর সরকারি স্কুলের বাস্তবতা একই প্রতিযোগিতার মাঠ নয়। দক্ষিণ এশিয়ায় এই বৈষম্য আরও স্পষ্ট। শহরের ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করার সুযোগ পায়; গ্রামের বহু শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিকের পরই শ্রমবাজারে ঢুকে পড়ে। একজন উদ্যোক্তা ব্যর্থ হলে পরিবার থেকে আবার পুঁজি পায়; দরিদ্র পরিবারের উদ্যোক্তা একবার ব্যর্থ হলে বহু বছর পিছিয়ে যায়। অর্থাৎ উত্তরাধিকার শুধু টাকা নয়; উত্তরাধিকার হলো ভাষা, আত্মবিশ্বাস, সামাজিক নেটওয়ার্ক, ব্যর্থ হওয়ার পরও আবার দাঁড়ানোর নিরাপত্তা। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির বিশ্বখ্যাত রাজনৈতিক দার্শনিক ও ˆনতিকতাবিদ মাইকেল স্যান্ডেল যেমন বলেছেন, মেধাতন্ত্র অনেক সময় সফলদের অহংকার এবং ব্যর্থদের অপমান তৈরি করে। পিকেটির বিশ্লেষণও সেই সত্যকে অর্থনৈতিক ভাষায় প্রকাশ করে।

তবে এত বিস্তৃত ও তথ্যসমৃদ্ধ কাজ হওয়া সত্ত্বেও পিকেটির বই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। তার তথ্যভাণ্ডারের বড় অংশ ফ্রান্স, ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও পশ্চিম ইউরোপকেন্দ্রিক। ইউরোপীয় সম্পদ-ইতিহাসের দীর্ঘ পরিসংখ্যান তিনি যত নিখুঁতভাবে দেখাতে পেরেছেন, এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা বা উপনিবেশিত বিশ্বের ক্ষেত্রে সেই গভীরতা তুলনামূলক কম। ফলে উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, দাসবাণিজ্য, জোরপূর্বক সম্পদ আহরণ, দুর্ভিক্ষ সৃষ্ট অর্থনীতি, বর্ণভিত্তিক শ্রমবাজার কিংবা ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক বৈষম্যের মতো বিষয়গুলো বইয়ে তুলনামূলকভাবে প্রান্তিক অবস্থানে থাকে। অথচ ইউরোপের বহু পুঁজিসঞ্চয়ের ইতিহাসই গড়ে উঠেছিল উপনিবেশিক শোষণের ওপর। ভারতীয় উপমহাদেশ, আফ্রিকার খনিজভাণ্ডার, ক্যারিবীয় চিনি-বাগান, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যপথ এছাড়া ইউরোপীয় পুঁজির উত্থান পূর্ণাঙ্গভাবে বোঝা যায় না। ফলে, তার বইয়ের সীমাবদ্ধতা আসলে তার তত্ত্বের অস্বীকৃতি নয়; বরং সেই তত্ত্বকে আরও বিস্তৃত ভূগোলে প্রয়োগ করার আহ্বান।

এই সীমাবদ্ধতার কারণে, পিকেটির বিশ্লেষণকে ভারতীয় উপমহাদেশের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে প্রয়োগ করলে সম্পদের সঞ্চয় ও বৈষম্যের একটি নতুন চিত্র সামনে আসে। সপ্তদশ শতাব্দীর শুরুতে ১৬শ’ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধে বিজয়ের পর বাংলার রাজস্ব ও বাণিজ্যের ওপর কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ স্থাপন হয়। ১৭৬৫ সালে দেওয়ানি লাভের মাধ্যমে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার রাজস্ব আহরণের অধিকার কোম্পানির হাতে চলে আসে। অর্থাৎ উৎপাদন স্থানীয় কৃষকের, কিন্তু উদ্বৃত্ত প্রবাহিত হতে থাকে বিদেশি শাসকের কোষাগারে। বহু অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদের মতে, আঠারো শতকের শেষভাগে বাংলার বিপুল সম্পদ ইউরোপে স্থানান্তরিত হয়, যা ব্রিটিশ শিল্পবিপ্লবের পুঁজিসঞ্চয়ে সহায়ক ছিল। পিকেটির ভাষায় বলতে গেলে, স্থানীয় সমাজে ম (জনগণের উৎপাদন বৃদ্ধি) যতটা ছিল, তার বড় অংশ r (সম্পদ-আয়) হিসেবে উপনিবেশিক শক্তির হাতে চলে যেত। ১৭৯৩ সালের স্থায়ী দেওয়ানি ব্যবস্থা জমিদারি কাঠামোকে স্থায়ী রূপ দেয়। জমির মালিকানা ও কর আদায়ের ক্ষমতা এক শ্রেণীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, কৃষক হয়ে পড়ে খাজনাদাতা প্রজা। ফলে উৎপাদক ও মালিকের বিচ্ছেদ তীব্র হয়। উনিশ শতক জুড়ে নীলচাষ, নগদকর, ঋতজাল, দুর্ভিক্ষ এবং বাজার নির্ভর কৃষিনীতি গ্রামীণ বৈষম্য বাড়ায়। ১৮৭০-এর দশক থেকে ১৯০০-এর দশক পর্যন্ত ব্রিটিশ ভারতে বারবার দুর্ভিক্ষ ঘটে; লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়, কিন্তু খাদ্যশস্য রপ্তানি ও রাজস্বনীতি অব্যাহত থাকে। অর্থাৎ বৈষম্য শুধু আয়গত ছিল না; তা জীবন-মৃত্যুর ব্যবধানেও রূপ নেয়।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হলেও অর্থনৈতিক বৈষম্যের অবসান হয়নি; বরং নতুন রূপ নেয়। পূর্ব বাংলা জনসংখ্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও ক্ষমতা, প্রশাসন, সামরিক নেতৃত্ব ও শিল্পপুঁজি পশ্চিম পাকিস্তানকেন্দ্রিক ছিল। ১৯৫০-এর দশক থেকে ১৯৬০-এর দশক পর্যন্ত পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার বড় উৎস ছিল পূর্ব বাংলার পাট রপ্তানি। কিন্তু উন্নয়ন ব্যয়, শিল্পঋত, অবকাঠামো বিনিয়োগ ও প্রতিরক্ষা ব্যয়ের বড় অংশ যেত পশ্চিম পাকিস্তানে। অর্থনীতিবিদদের বহু গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৬০-এর দশকে উন্নয়ন ব্যয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ পশ্চিম পাকিস্তান পেয়েছে, যখন বৈদেশিক আয়ের বড় অংশ এসেছে পূর্ব পাকিস্তান থেকে। মাথাপিছু আয় ব্যবধানও ক্রমে বাড়তে থাকে। ১৯৪৯-৫০ সালে দুই অংশের ব্যবধান তুলনামূলক কম থাকলেও ১৯৬৯-৭০ নাগাদ পশ্চিম পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় পূর্ব পাকিস্তানের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হয়ে যায়। এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান, নুরুল ইসলামসহ বহু চিন্তক ‘দুই অর্থনীতি’ ধারণা তুলে ধরেন। শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফার পেছনেও অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্ন ছিল কেন্দ্রে। অর্থাৎ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ কেবল সাংস্কৃতিক বা রাজনৈতিক মুক্তির আন্দোলন ছিল না; তা ছিল বৈষম্যমূলক অর্থনৈতিক কাঠামোর বিরুদ্ধেও সংগ্রাম।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ নতুন রাষ্ট্র হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও বৈষম্য কমেনি বরং সময়ের সঙ্গে বেড়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, দুর্ভিক্ষ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক শাসন, দুর্বল প্রতিষ্ঠান এসব কারণে প্রথম দশকেই সম্পদ বণ্টনের ন্যায়ভিত্তিক কাঠামো শক্তভাবে গড়ে ওঠেনি। ১৯৮০-এর দশক থেকে বাজারমুখী সংস্কার, বেসরকারিকরণ, নগরকেন্দ্রিক প্রবৃদ্ধি এবং অনিয়ন্ত্রিত ভূমিমূল্য বৃদ্ধি নতুন বৈষম্য তৈরি করে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে প্রবৃদ্ধি প্রশংসনীয় গার্মেন্টস, প্রবাসী আয়, কৃষির উন্নয়ন, নারীর শ্রমঅংশগ্রহণ, অবকাঠামো উন্নয়ন সবই গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য। কিন্তু একই সঙ্গে সম্পদ কেন্দ্রীভবনও বেড়েছে। শহুরে জমির দাম, ব্যাংকঋণে প্রভাবশালী প্রবেশাধিকার, ব্যাবসায়ীদের সিন্ডিকেট, শেয়ারবাজারে সুবিধাভোগী গোষ্ঠী, কর ফাঁকি, খেলাপি ঋত, উত্তরাধিকারভিত্তিক ব্যবসা সম্প্রসারণ এসব মিলিয়ে উচ্চবিত্তের সম্পদ দ্রুত বেড়েছে। অন্যদিকে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তায় আটকে আছে। বিভিন্ন সময়ের জরিপে দেখা যায়, জাতীয় আয় বৈষম্যের গিনি সহগ স্বাধীনতার পরবর্তী দশকগুলোর তুলনায় এখন বেশি। শহর-গ্রাম সম্পদ ব্যবধান, ভূমিমূল্যের বিস্ফোরণ, ব্যাংকঋণে অসম প্রবেশাধিকার, শিক্ষার মানে দ্বৈততা এবং স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য সামাজিক স্তরবিন্যাসকে কঠিন করেছে।

পিকেটির মতোই যদি আমরা ভারতীয় উপমহাদেশের অর্থনীতি বুঝতে সাহিত্যর দিকে তাকাই আমরা দেখবো ভারতীয় উপমহাদেশের সাহিত্য কেবল গল্প নয়, এটি সামাজিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার জীবন্ত দলিল। ইউরোপের মতোই ভারতীয় উপমহাদেশের সাহিত্যেও দেখা যায় কীভাবে জমি, শ্রেণী, জাত, শিক্ষা ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা মানুষের জীবনের পথ নির্ধারণ করে দেয়। যেমন: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গোরা উপন্যাসে পরিচয়ের প্রশ্ন কেবল দার্শনিক নয় এটি সামাজিক স্তরবিন্যাসের গভীর প্রতিফলন। এখানে জাত, ধর্ম ও সামাজিক অবস্থান মানুষের সুযোগ সীমিত করে এবং বৈষম্যের সূক্ষ্ম ছাপ তৈরি করে। ছিন্নপত্র-এ রবীন্দ্রনাথ গ্রামীণ কৃষকের জীবন দেখান অনিশ্চিত অর্থনীতির উদাহরণ হিসেবে শ্রম আছে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ নেই, এবং উৎপাদনের ফল মানুষের হাতে আসে না। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আনন্দমঠ ও কপালকুণ্ডলা কেবল সাহিত্য নয়; এগুলো ঔপনিবেশিক সমাজে ক্ষমতা, উৎপাদন ও ˆনতিকতার সম্পর্ক বোঝার দলিল। বিশেষ করে আনন্দমঠ-এ অনাহার, কর ও রাষ্ট্রীয় শোষণের চিত্র আঠারো-উনিশ শতকের বাংলার অর্থনৈতিক বৈষম্যকে ফুটিয়ে তোলে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দেবদাস, পল্লীসমাজ ও গৃহদাহ উপন্যাসগুলোতে বৈষম্য আরও ব্যক্তিগত এবং আবেগঘন রূপ নেয়। দেবদাস-এ শ্রেণী ও পারিবারিক মর্যাদা মানুষের প্রেম ও জীবন সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। পল্লীসমাজ-এ জমি ও গ্রামের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব দেখানো হয়েছে, যা স্থানীয় অর্থনীতি, সম্পর্ক এবং ন্যায়বিচারকে গ্রাস করে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাঁসুলী বাঁক ও গণদেবতা-তে গ্রামীণ সমাজে জাত, জমি ও ঋণের জটিল কাঠামো মানুষের চলাচল ও সুযোগ সীমিত করে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝি নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি ও প্রাকৃতিক সীমাবদ্ধতার ভেতরে বেঁচে থাকার অনিশ্চয়তা দেখায়, যেখানে মাছ ধরা, নৌকা চালানো এবং ঋত সবই এক ধরনের ধারাবাহিক সংগ্রাম। আধুনিক যুগে শওকত আলী ও ˆসয়দ ওয়ালীউল্লাহর উপন্যাস যেমন প্রদোষে প্রাকৃতজন ও লালসালু ধর্ম, ক্ষমতা ও গ্রামীণ অর্থনীতি একত্রে মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে। এই উপন্যাসগুলো দেখায় যে বৈষম্য কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষমতার পুনরাবৃত্তি, যা মানুষের জীবনকে সীমিত করে এবং সামাজিক কাঠামোর মধ্যে প্রবেশের সুযোগকে সংকুচিত করে। প্রতিটি কাহিনী একসঙ্গে ভারতীয় উপমহাদেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতার একটি সমন্বিত চিত্র ফুটিয়ে তোলে, যেখানে শ্রম, সম্পদ, ক্ষমতা ও ইতিহাসের সম্পর্ক গভীরভাবে স্পষ্ট হয়।

পিকেটির বিশ্লেষণের বড় অংশই ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দীর্ঘমেয়াদি কর-তথ্য, সম্পদ রেকর্ড এবং আয় পরিসংখ্যানের ওপর নির্ভরশীল। ফলে যেখানে রাষ্ট্রীয় তথ্যভাণ্ডার দুর্বল, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি বড়, নগদ লেনদেন বেশি, বা সম্পদ গোপন রাখা সহজ সেসব দেশের বাস্তবতা বইটিতে তুলনামূলক কম প্রতিফলিত হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার বহু অর্থনীতি, বিশেষ করে বাংলাদেশে, জমি, সোনা, অনিবন্ধিত ব্যবসা, পারিবারিক সম্পদ, প্রবাসী আয়ের অনিয়মিত প্রবাহ এসব সবসময় পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না। ফলে পিকেটির কাঠামো প্রয়োগ করতে গেলে স্থানীয় বাস্তবতার জন্য নতুন তথ্যসংগ্রহ অপরিহার্য। তার বিখ্যাত সূত্র r > g বৈষম্যের একটি শক্তিশালী ব্যাখ্যা দিলেও এটি সব সমাজের পূর্ণ ব্যাখ্যা নয়। কারণ বৈষম্য কেবল পুঁজির আয় ও প্রবৃদ্ধির পার্থক্য দিয়ে নির্ধারিত হয় না; শিক্ষা, প্রযুক্তি, দুর্নীতি, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, লিঙ্গবৈষম্য, সামাজিক পরিচয়, ভূমি দখল, শ্রমবাজারের কাঠামো এবং আইনের শাসনের দুর্বলতাও বড় ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে উদাহরণস্বরূপ, কেউ শুধু সম্পদের কারণে নয়, রাজনৈতিক যোগাযোগ, প্রশাসনিক সুবিধা বা বাজারে প্রবেশাধিকার পেয়েও দ্রুত উত্থান ঘটাতে পারে। পিকেটির প্রস্তাবিত বৈশ্বিক সম্পদকর নীতিগতভাবে আকর্ষণীয় হলেও বাস্তবে তা কার্যকর করা কঠিন। উন্নত দেশগুলোর মধ্যেও করস্বর্গ, গোপন ব্যাংক হিসাব ও রাজনৈতিক প্রতিরোধ বড় বাধা। বাংলাদেশের মতো দেশে কর-জিডিপি অনুপাত এখনও সীমিত, কর প্রশাসন পুরোপুরি আধুনিক নয়, এবং সম্পদ মূল্যায়নের স্বচ্ছ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। তাই তার নীতিকে হুবহু নয়, বরং স্থানীয় বাস্তবতায় রূপান্তর করে প্রয়োগ করতে হবে।

তবুও বাংলাদেশের জন্য বইটির ধারণাগত প্রয়োগযোগ্যতা অত্যন্ত গভীর। কারণ বাংলাদেশ দ্রুত প্রবৃদ্ধির দেশ হলেও সম্পদ বণ্টনের প্রশ্ন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। শহরে যারা এক দশক আগে জমি, ফ্ল্যাট বা বাণিজ্যিক সম্পত্তি কিনেছেন, তাদের সম্পদ মূল্য বহুগুণ বেড়েছে; অন্যদিকে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তের বড় অংশ ভাড়া, উচ্চ জীবনযাত্রা ব্যয় ও সীমিত সঞ্চয়ের চাপে আছে। এটি পিকেটির r > g তত্ত্বের স্থানীয় রূপ সম্পদের মূল্যবৃদ্ধি শ্রমের আয়ের চেয়ে দ্রুত। গ্রামীণ বাংলাদেশেও একই চিত্র দেখা যায়। যাদের জমি আছে তারা কৃষিঋণ, সামাজিক মর্যাদা, নিরাপত্তা ও বিনিয়োগ সুযোগে এগিয়ে থাকে; ভূমিহীন পরিবার শ্রম বিক্রি ছাড়া বিকল্প কম পায়। জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন, খরা বা লবণাক্ততা দরিদ্র পরিবারকে আরও সম্পদহীন করে। ফলে বৈষম্য শুধু আয় নয়, সম্পদ ও ঝুঁকির বৈষম্যও। শিক্ষাক্ষেত্রে তার মেরিটোক্রেসি-সমালোচনাও বাংলাদেশের জন্য প্রাসঙ্গিক। রাজধানীর উন্নত স্কুল, ইংরেজি মাধ্যম, কোচিং, প্রযুক্তি সুবিধা ও বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ এক শ্রেণীর হাতে বেশি কেন্দ্রীভূত; অন্যদিকে বহু মেধাবী শিক্ষার্থী গ্রাম বা নিম্নআয়ের পরিবার থেকে এসে শুরুতেই পিছিয়ে থাকে। তখন পরীক্ষার ফলাফলকে নিছক ‘মেধার জয়’ বলা অসম্পূর্ণ হয়ে যায়। পিকেটির ভাষায়, উত্তরাধিকার শুধু টাকা নয় সুযোগের উত্তরাধিকারও।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য কিছু প্রয়োগযোগ্য শিক্ষা স্পষ্ট। বাংলাদেশে বৈষম্য হ্রাসের জন্য প্রথমেই করব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার অপরিহার্য। দেশের কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরে প্রায় ৮-১০ শতাংশে সীমিত থাকায়, উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধি করতে হলে এটি ধীরে ধীরে ১৫ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। তবে শুধু কর বৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়; করের ধরনেও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। বর্তমান পরোক্ষ কর, বিশেষত ভ্যাট, সাধারণ ভোক্তার ওপর ডিসপ্রোপরশনেট চাপ ফেলে। তাই উচ্চ আয়, একাধিক সম্পত্তি, বিলাসী খরচের বস্তু এবং উত্তরাধিকারভিত্তিক বা অপ্রদর্শিত সম্পদের ওপর কার্যকর প্রত্যক্ষ কর আরোপ করতে হবে। এই পদক্ষেপ শুধু আয়ের সমতা বাড়াবে না, বরং রাষ্ট্রীয় নীতি ও ক্ষমতার মাধ্যমে সম্পদ কেন্দ্রীভবন কমাবে। পিকেটি বলতেন যেখানে সম্পদ সঞ্চিত, করনীতিও সেখানে পৌঁছাতে হবে। দ্বিতীয়ত, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং খেলাপি ঋত কমানো জরুরি। দীর্ঘমেয়াদী খেলাপি ঋত, রাজনৈতিক প্রভাব এবং প্রশাসনিক স্বজনপ্রীতি (নেপোটিজম) এর কারণে অর্থনীতি প্রতিযোগিতামূলক থাকে না; বড় ঋণগ্রহীতা সুবিধা পায়, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বা কৃষক জামানতের অভাবে ঋণ পায় না। এই অর্থ কৃষি, ক্ষুদ্র শিল্প, প্রযুক্তি ও তরুণ উদ্যোক্তাদের দিকে সরানো হলে বৈষম্য কমানো সম্ভব হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। রাজধানী ও শহরের উন্নত বেসরকারি শিক্ষা এবং গ্রামীণ স্কুলগুলোর মধ্যে মানের তফাৎ দূর করতে হবে। শিক্ষা ব্যয় জিডিপির ৪-৬ শতাংশে উন্নীত করা, কারিগরি শিক্ষা ও জেলা-উপজেলায় মানসম্মত কলেজ এবং ডিজিটাল ল্যাব তৈরি করা, স্বাস্থ্যসেবা সার্বজনীন করা এগুলো সমান সুযোগ নিশ্চিত করবে। চতুর্থত, ভূমি ও নগর সম্পদের বৈষম্য নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বড় শহরে জমির দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় যারা আগে সম্পদ কিনেছে তারা আরও ধনী হচ্ছে, নতুন প্রজন্ম পিছিয়ে যাচ্ছে। খালি ফ্ল্যাট, অব্যবহৃত জমি এবং জল্পনামূলক সম্পদের ওপর কর আরোপ, সাশ্রয়ী আবাসন প্রকল্প এবং জেলা ভিত্তিক শিল্পায়ন বাস্তবায়ন করতে হবে। পঞ্চমত, সামাজিক সুরক্ষা বিস্তৃত করতে হবে। বয়স্কভাতা, বিধবা ও প্রতিবন্ধী সহায়তা, বেকার প্রশিক্ষণ এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার নগদ সহায়তা প্রণোদনা নিশ্চিত করলে দুর্বল শ্রেণীর মানুষ বৈষম্যের প্রভাব থেকে সুরক্ষা পাবে। ষষ্ঠত, অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়ন অপরিহার্য; শুধু ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডরে প্রবৃদ্ধি কেন্দ্রীভূত হলে উত্তরাঞ্চল, উপকূল, হাওর ও সীমান্ত জেলা পিছিয়ে থাকবে। শিল্পপার্ক, বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল অবকাঠামো এবং রেল-লজিস্টিক নেটওয়ার্ক সব অঞ্চলে বিস্তার করতে হবে। সপ্তমত, শ্রমের মর্যাদা বাড়াতে হবে। ন্যূনতম মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সামাজিক সুরক্ষা, মাতৃত্ব সুবিধা, অনানুষ্ঠানিক খাতের সুরক্ষা—এসব ছাড়া পুঁজির বিপরীতে শ্রম দুর্বলই থাকবে। সবশেষে, দূর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব মোকাবিলা করতে হবে। সরকারি নীতি বা উন্নয়ন প্রকল্পে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা থাকলে সুবিধা প্রভাবশালীদের দিকেই চলে যায়, সাধারণ মানুষ পিছিয়ে পড়ে। তাই কর সংস্কার, সম্পদ রেকর্ড, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুবিধা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কৃষকের ঋণ প্রবেশাধিকার সব পদক্ষেপকে দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের বিরুদ্ধে সমন্বিতভাবে প্রয়োগ করতে হবে। এই সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া শুধু অর্থনৈতিক নীতি যথেষ্ট নয়; কারণ দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক প্রভাব বৈষম্যের মূল চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করে।

পরিশেষে, পিকেটির বই আমাদের একটি স্পষ্ট বার্তা দেয় বৈষম্য কোনো নির্ধারিত ভাগ্য নয়, এটি নীতি ও ব্যবস্থার ফল। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যেখানে নীতির মাধ্যমে সুবিধা-অসুবিধা তৈরি হয়েছে, ঠিক তেমনি নীতির মাধ্যমে তা সমানভাবে বিতরণও করা সম্ভব। যদি বাংলাদেশ কেবল প্রবৃদ্ধির সংখ্যার গল্প না বলে, বরং ন্যায়সঙ্গত, সমতাভিত্তিক উন্নয়নের পথ বেছে নেয়, তবে প্রকৃত উন্নয়ন হবে মানুষের জন্য, সংখ্যার জন্য নয়। উঁচু সেতু, ঝকঝকে নগর, বড় বাজেট এসব যতই চোখে পড়ে, তার চেয়েও বড় ও জরুরি প্রশ্ন একটাই: এই দেশের ভবিষ্যৎ কি সত্যিই সবার জন্য উন্মুক্ত, নাকি কেবল অল্প কয়েকজনের জন্য সংরক্ষিত? পিকেটির বিশ্লেষণের প্রকৃত মূল্য এখানেই নিহিত।

[লেখক: সহকারী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত