সংবাদ

শিক্ষক হেনস্তা কি চলতেই থাকবে


আনোয়ার হোসেন
আনোয়ার হোসেন
প্রকাশ: ৮ মে ২০২৬, ১১:০৯ এএম

শিক্ষক হেনস্তা কি চলতেই থাকবে
উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক শিক্ষককে হেনস্থা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে

সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক ছিল শ্রদ্ধা আর স্নেহের এক পুণ্যবন্ধন। কিন্তু বর্তমান সময়ের অস্থিরতা সেই সম্পর্কের মূলে কুঠারাঘাত করছে। আমরা এক অদ্ভুত ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছি, যেখানে জ্ঞানের মশালবাহী শিক্ষককে হতে হচ্ছে লাঞ্ছিত। এই অবক্ষয় কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং গোটা সমাজের নৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ার এক অশনি সংকেত। 

সম্প্রতি উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের সিনিয়র শিক্ষক দয়াল চন্দ্র পালের সঙ্গে যা ঘটেছে, তা যেকোনো বিবেকবান মানুষকে স্তব্ধ করে দেয়। ক্লাসরুমে তরুণ ছাত্র কর্তৃক একজন পিতৃসম শিক্ষকের ওপর যে শারীরিক লাঞ্ছনা চালানো হয়েছে, তা কেবল অপরাধ নয়, বরং পৈশাচিকতার বহিঃপ্রকাশ। এই ঘটনাটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের একাংশ কতটা নিচে নেমে যেতে পারে। শিক্ষার যে আঙিনায় মানুষ হওয়ার পাঠ পাওয়ার কথা ছিল, সেখানেই আজ অমানুষের আস্ফালন। 

দুঃখজনক বিষয় হলো, ছাত্রের এই কাজের পর সংশোধন করার বদলে তার পিতা নিজের পদের দাপট দেখিয়েছেন। একজন বিচারপতির আসনে বসে নিজের সন্তানের অপরাধ আড়াল করতে শিক্ষককে নিজ বাসায় তলব করা এবং উল্টো শিক্ষককেই ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা আইনের শাসনের এক প্রহসন। সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখেছিলেন, ‘অবাক পৃথিবী! অবাক করলে তুমি’—সত্যিই আমরা অবাক হই যখন দেখি ন্যায়ের প্রদীপ যারা জ্বালাবেন, তারাই অন্ধকারের পক্ষ নিচ্ছেন। 

প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রীকে কেন্দ্র করে অত্যন্ত অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ স্লোগান বা মন্তব্য আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির ˆদন্যকেই তুলে ধরছে। একজন নারীকে বা দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে সম্বোধন করার সময় যে ন্যূনতম সৌজন্যবোধ প্রয়োজন, তা যেন কর্পূরের মতো উড়ে গেছে 

এই গালিবাজ জেনারেশন বা প্রজন্মের ভাষা শুনলে মনে হয়, তারা যুক্তির চেয়ে অশ্লীলতাকে বেশি শক্তিশালী হাতিয়ার মনে করে। ‘এক দুই তিন চার’ কিংবা ‘টিনের চালে কাউয়া’র মতো স্থুল স্লোগানগুলো রাজনৈতিক উত্তেজনায় ব্যবহৃত হলেও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ছে কিশোর মনের ওপর। তারা শিখছে যে, কাউকে আক্রমণ করতে হলে তার সম্মান বা মর্যাদাকে ধূলিসাৎ করে দেয়াটাই বীরত্ব। 

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বা যেকোনো রাজনৈতিক পালাবদলের সময় যখন মব কালচার বা গণপিটুনির সংস্কৃতি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তখন আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি যখন সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়, তখন বখাটে ছাত্র বা দাপুটে অভিভাবক ভয় পাওয়ার বদলে আস্কারা পায়। এই অস্থির সময়ে শিক্ষকরা হয়ে পড়েছেন সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত, অথচ তারাই ছিলেন জাতির আলোকবর্তিকা। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘শিক্ষা কি কেবলই তথ্য পরিবেশন? তা তো নয়, তা হলো পূর্ণতা দান।’ সেই পূর্ণতা আজ লাঞ্ছিত। 

শিক্ষক হেনস্তার এই ধারা যদি চলতে থাকে, তবে কোনো মেধাবী ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষ আগামীতে শিক্ষকতা পেশায় আসতে চাইবেন না। যখন একজন শিক্ষক ক্লাসে প্রবেশের আগে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত থাকেন, তখন পাঠদান প্রক্রিয়াই মুখ থুবড়ে পড়ে। রাষ্ট্র যদি এই অন্যায়ের গ্যারান্টি দিতে না পারে যে আগামীতে আর কোনো শিক্ষকের সঙ্গে এমন হবে না, তবে সেই রাষ্ট্রের ভবিষ্যত অন্ধকার। জীবনানন্দ দাশের কথায়, ‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ।’

পরিবার হচ্ছে নৈতিকতার প্রাথমিক বিদ্যাপীঠ। কিন্তু বিচারপতির সেই পুত্রের মতো যখন অভিভাবকরাই সন্তানের ভুলকে আস্কারা দেন, তখন সেই সন্তান সমাজের জন্য বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়ায়। জনস্বার্থে আজ এটা বলা জরুরি যে, ক্ষমতার দাপট দিয়ে ন্যায়কে চাপা দেওয়া যায় না। প্রতিটি অন্যায়ের বিচার যদি দৃষ্টান্তমূলক না হয়, তবে সমাজের এই পচন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়বে আপনার এবং আমার ঘরের দরজায়। 

শিক্ষক এবং শিক্ষা মন্ত্রীর সম্মান রক্ষার বিষয়টি কেবল ব্যক্তির সম্মান নয়, বরং এটি একটি প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা। যখন রাষ্ট্রযন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে প্রকাশ্য রাজপথে অশ্লীল কথাবার্তা বলা হয়, তখন তা বিদেশের মাটিতে আমাদের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করে। এই গালিবাজ জেনারেশন তৈরি করার পেছনে যে কারিগররাই থাকুক না কেন, তাদের দায়ভার নিতে হবে। 

যে জাতির নৈতিক ভিত্তি যত দুর্বল, সেই জাতির উন্নয়ন তত বেশি ঠুনকো। আমরা দালানকোঠা আর অবকাঠামো দিয়ে সভ্যতা মাপতে চাই, কিন্তু মানুষের মনুষ্যত্ব যখন হারিয়ে যায়, তখন সেই ইট-পাথরের কোনো মূল্য থাকে না। দয়াল চন্দ্র পালের মতো শিক্ষকদের চোখের জল যদি শুকিয়ে যায়, তবে এই বাংলার মাটি তার উর্বরতা হারাবে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসের সেই গুরুভক্তির দিনগুলো আজ কেবল বইয়ের পাতায় পড়ে আছে। 

মব কালচার বা গণউন্মাদনা এক ধরনের সাময়িক মানসিক বিকার। এটি আইনকে নিজের হাতে তুলে নিতে প্ররোচিত করে। এই মবের শিকার হয়ে যখন সম্মানিরা অপদস্থ হন, তখন অযোগ্যদের দাপট বেড়ে যায়। আজকের এই অস্থির সময়ে আমাদের তরুণ সমাজকে বোঝাতে হবে যে, বিপ্লব মানে অসভ্যতা নয়, পরিবর্তন মানে গালিবাজ হওয়া নয়। 

শিক্ষামন্ত্রীর প্রতি যে ধরনের কুরুচিপূর্ণ সম্বোধন করা হয়েছে, তা নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারী নেতৃত্বের প্রতি এক চরম অপমান। নারীরা যখন কোনো পদে আসীন হন, তখন তাদের মেধা নিয়ে সমালোচনা করা যায়, কিন্তু তাদের চরিত্র বা লিঙ্গ নিয়ে কুৎসিত ইঙ্গিত দেয়া বর্বরতা। সুলতানা রাজিয়া থেকে শুরু করে প্রীতিলতা পর্যন্ত যে সংগ্রামের ইতিহাস, তা এই অসভ্য আচরণের কাছে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। 

আমাদের মনে রাখতে হবে, ‘শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড, ‘আর সেই মেরুদণ্ড যদি অপমানে নুয়ে পড়ে, তবে জাতি হিসেবে আমরা কোনোদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারব না। শিক্ষার্থীদের শাসন আর গুণী শিক্ষকদের সম্মান ফিরিয়ে আনাই হোক আমাদের একমাত্র লক্ষ্য। 

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমরা কী রেখে যাব? কেবল একরাশ ঘৃণা আর গালিবাজ স্লোগান? নাকি শ্রদ্ধাবোধ আর সহমর্মিতা? দয়াল চন্দ্র পালের সেই অপমানিত মুখখানা যেন আমাদের বিবেককে বারবার প্রশ্ন করে। এই প্রশ্নের উত্তর আমাদেরই দিতে হবে কাজের মাধ্যমে। সমাজ সংস্কারের আন্দোলন শুরু হোক ঘর থেকে, তারপর ছড়িয়ে পড়ুক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। 

শিক্ষকদের নিরাপত্তা কেবল পুলিশের লাঠি দিয়ে সম্ভব নয়, এটি দরকার সামাজিক সচেতনতা। প্রতিটি ছাত্রকে বুঝতে হবে, শিক্ষকের পায়ের তলায় বেহেশত না থাকলেও, তার আশীর্বাদের হাতটি মাথার ওপর থাকা ভাগ্যের ব্যাপার। শিক্ষক লাঞ্ছনার সঙ্গে জড়িত প্রতিটি ব্যক্তির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। অভিভাবকের পদের দোহাই দিয়ে পার পাওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ হোক। শিক্ষা মন্ত্রীর সম্মান যেন কোনোভাবেই বাজারের সস্তা তর্কের বিষয় না হয়। চাই এমন এক সোনার বাংলাদেশ, যেখানে গুরুকে দেখলে শিষ্য শ্রদ্ধায় মাথা নত করবে, দম্ভে বুক ফোলাবে না। 

শিক্ষক হেনস্তা রুখতে হলে রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হবে। বিচারপতির পুত্র হোক বা প্রভাবশালী নেতা—শিক্ষকের গায়ে হাত তোলার সাহস যেন কেউ না পায়, তেমন আইন ও তার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। স্কুলের ছোট ক্লাসরুম থেকে শুরু করে রাজপথ পর্যন্ত নৈতিক শিক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। ১৮টি অনুচ্ছেদে বিভক্ত এই নিবন্ধের লক্ষ্য একটাই—বিবেককে জাগ্রত করা। 

অন্ধকার যত গভীর হয়, ভোরের আলো তত কাছে আসে। তবে সেই আলোর জন্য আমাদের লড়াই করতে হবে। মব কালচার আর গালিবাজ জেনারেশনকে প্রত্যাখ্যান করে সুস্থ ধারার সংস্কৃতি চর্চা শুরু করতে হবে। 

[লেখক: প্রেসিডেন্ট, আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী সংগঠন ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্টি অ্যালকোহল]


আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ০৮ মে ২০২৬


শিক্ষক হেনস্তা কি চলতেই থাকবে

প্রকাশের তারিখ : ০৮ মে ২০২৬

featured Image

সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক ছিল শ্রদ্ধা আর স্নেহের এক পুণ্যবন্ধন। কিন্তু বর্তমান সময়ের অস্থিরতা সেই সম্পর্কের মূলে কুঠারাঘাত করছে। আমরা এক অদ্ভুত ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছি, যেখানে জ্ঞানের মশালবাহী শিক্ষককে হতে হচ্ছে লাঞ্ছিত। এই অবক্ষয় কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং গোটা সমাজের নৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ার এক অশনি সংকেত। 

সম্প্রতি উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের সিনিয়র শিক্ষক দয়াল চন্দ্র পালের সঙ্গে যা ঘটেছে, তা যেকোনো বিবেকবান মানুষকে স্তব্ধ করে দেয়। ক্লাসরুমে তরুণ ছাত্র কর্তৃক একজন পিতৃসম শিক্ষকের ওপর যে শারীরিক লাঞ্ছনা চালানো হয়েছে, তা কেবল অপরাধ নয়, বরং পৈশাচিকতার বহিঃপ্রকাশ। এই ঘটনাটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের একাংশ কতটা নিচে নেমে যেতে পারে। শিক্ষার যে আঙিনায় মানুষ হওয়ার পাঠ পাওয়ার কথা ছিল, সেখানেই আজ অমানুষের আস্ফালন। 

দুঃখজনক বিষয় হলো, ছাত্রের এই কাজের পর সংশোধন করার বদলে তার পিতা নিজের পদের দাপট দেখিয়েছেন। একজন বিচারপতির আসনে বসে নিজের সন্তানের অপরাধ আড়াল করতে শিক্ষককে নিজ বাসায় তলব করা এবং উল্টো শিক্ষককেই ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা আইনের শাসনের এক প্রহসন। সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখেছিলেন, ‘অবাক পৃথিবী! অবাক করলে তুমি’—সত্যিই আমরা অবাক হই যখন দেখি ন্যায়ের প্রদীপ যারা জ্বালাবেন, তারাই অন্ধকারের পক্ষ নিচ্ছেন। 

প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রীকে কেন্দ্র করে অত্যন্ত অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ স্লোগান বা মন্তব্য আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির ˆদন্যকেই তুলে ধরছে। একজন নারীকে বা দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে সম্বোধন করার সময় যে ন্যূনতম সৌজন্যবোধ প্রয়োজন, তা যেন কর্পূরের মতো উড়ে গেছে 

এই গালিবাজ জেনারেশন বা প্রজন্মের ভাষা শুনলে মনে হয়, তারা যুক্তির চেয়ে অশ্লীলতাকে বেশি শক্তিশালী হাতিয়ার মনে করে। ‘এক দুই তিন চার’ কিংবা ‘টিনের চালে কাউয়া’র মতো স্থুল স্লোগানগুলো রাজনৈতিক উত্তেজনায় ব্যবহৃত হলেও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ছে কিশোর মনের ওপর। তারা শিখছে যে, কাউকে আক্রমণ করতে হলে তার সম্মান বা মর্যাদাকে ধূলিসাৎ করে দেয়াটাই বীরত্ব। 

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বা যেকোনো রাজনৈতিক পালাবদলের সময় যখন মব কালচার বা গণপিটুনির সংস্কৃতি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তখন আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি যখন সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়, তখন বখাটে ছাত্র বা দাপুটে অভিভাবক ভয় পাওয়ার বদলে আস্কারা পায়। এই অস্থির সময়ে শিক্ষকরা হয়ে পড়েছেন সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত, অথচ তারাই ছিলেন জাতির আলোকবর্তিকা। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘শিক্ষা কি কেবলই তথ্য পরিবেশন? তা তো নয়, তা হলো পূর্ণতা দান।’ সেই পূর্ণতা আজ লাঞ্ছিত। 

শিক্ষক হেনস্তার এই ধারা যদি চলতে থাকে, তবে কোনো মেধাবী ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষ আগামীতে শিক্ষকতা পেশায় আসতে চাইবেন না। যখন একজন শিক্ষক ক্লাসে প্রবেশের আগে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত থাকেন, তখন পাঠদান প্রক্রিয়াই মুখ থুবড়ে পড়ে। রাষ্ট্র যদি এই অন্যায়ের গ্যারান্টি দিতে না পারে যে আগামীতে আর কোনো শিক্ষকের সঙ্গে এমন হবে না, তবে সেই রাষ্ট্রের ভবিষ্যত অন্ধকার। জীবনানন্দ দাশের কথায়, ‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ।’

পরিবার হচ্ছে নৈতিকতার প্রাথমিক বিদ্যাপীঠ। কিন্তু বিচারপতির সেই পুত্রের মতো যখন অভিভাবকরাই সন্তানের ভুলকে আস্কারা দেন, তখন সেই সন্তান সমাজের জন্য বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়ায়। জনস্বার্থে আজ এটা বলা জরুরি যে, ক্ষমতার দাপট দিয়ে ন্যায়কে চাপা দেওয়া যায় না। প্রতিটি অন্যায়ের বিচার যদি দৃষ্টান্তমূলক না হয়, তবে সমাজের এই পচন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়বে আপনার এবং আমার ঘরের দরজায়। 

শিক্ষক এবং শিক্ষা মন্ত্রীর সম্মান রক্ষার বিষয়টি কেবল ব্যক্তির সম্মান নয়, বরং এটি একটি প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা। যখন রাষ্ট্রযন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে প্রকাশ্য রাজপথে অশ্লীল কথাবার্তা বলা হয়, তখন তা বিদেশের মাটিতে আমাদের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করে। এই গালিবাজ জেনারেশন তৈরি করার পেছনে যে কারিগররাই থাকুক না কেন, তাদের দায়ভার নিতে হবে। 

যে জাতির নৈতিক ভিত্তি যত দুর্বল, সেই জাতির উন্নয়ন তত বেশি ঠুনকো। আমরা দালানকোঠা আর অবকাঠামো দিয়ে সভ্যতা মাপতে চাই, কিন্তু মানুষের মনুষ্যত্ব যখন হারিয়ে যায়, তখন সেই ইট-পাথরের কোনো মূল্য থাকে না। দয়াল চন্দ্র পালের মতো শিক্ষকদের চোখের জল যদি শুকিয়ে যায়, তবে এই বাংলার মাটি তার উর্বরতা হারাবে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসের সেই গুরুভক্তির দিনগুলো আজ কেবল বইয়ের পাতায় পড়ে আছে। 

মব কালচার বা গণউন্মাদনা এক ধরনের সাময়িক মানসিক বিকার। এটি আইনকে নিজের হাতে তুলে নিতে প্ররোচিত করে। এই মবের শিকার হয়ে যখন সম্মানিরা অপদস্থ হন, তখন অযোগ্যদের দাপট বেড়ে যায়। আজকের এই অস্থির সময়ে আমাদের তরুণ সমাজকে বোঝাতে হবে যে, বিপ্লব মানে অসভ্যতা নয়, পরিবর্তন মানে গালিবাজ হওয়া নয়। 

শিক্ষামন্ত্রীর প্রতি যে ধরনের কুরুচিপূর্ণ সম্বোধন করা হয়েছে, তা নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারী নেতৃত্বের প্রতি এক চরম অপমান। নারীরা যখন কোনো পদে আসীন হন, তখন তাদের মেধা নিয়ে সমালোচনা করা যায়, কিন্তু তাদের চরিত্র বা লিঙ্গ নিয়ে কুৎসিত ইঙ্গিত দেয়া বর্বরতা। সুলতানা রাজিয়া থেকে শুরু করে প্রীতিলতা পর্যন্ত যে সংগ্রামের ইতিহাস, তা এই অসভ্য আচরণের কাছে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। 

আমাদের মনে রাখতে হবে, ‘শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড, ‘আর সেই মেরুদণ্ড যদি অপমানে নুয়ে পড়ে, তবে জাতি হিসেবে আমরা কোনোদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারব না। শিক্ষার্থীদের শাসন আর গুণী শিক্ষকদের সম্মান ফিরিয়ে আনাই হোক আমাদের একমাত্র লক্ষ্য। 

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমরা কী রেখে যাব? কেবল একরাশ ঘৃণা আর গালিবাজ স্লোগান? নাকি শ্রদ্ধাবোধ আর সহমর্মিতা? দয়াল চন্দ্র পালের সেই অপমানিত মুখখানা যেন আমাদের বিবেককে বারবার প্রশ্ন করে। এই প্রশ্নের উত্তর আমাদেরই দিতে হবে কাজের মাধ্যমে। সমাজ সংস্কারের আন্দোলন শুরু হোক ঘর থেকে, তারপর ছড়িয়ে পড়ুক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। 

শিক্ষকদের নিরাপত্তা কেবল পুলিশের লাঠি দিয়ে সম্ভব নয়, এটি দরকার সামাজিক সচেতনতা। প্রতিটি ছাত্রকে বুঝতে হবে, শিক্ষকের পায়ের তলায় বেহেশত না থাকলেও, তার আশীর্বাদের হাতটি মাথার ওপর থাকা ভাগ্যের ব্যাপার। শিক্ষক লাঞ্ছনার সঙ্গে জড়িত প্রতিটি ব্যক্তির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। অভিভাবকের পদের দোহাই দিয়ে পার পাওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ হোক। শিক্ষা মন্ত্রীর সম্মান যেন কোনোভাবেই বাজারের সস্তা তর্কের বিষয় না হয়। চাই এমন এক সোনার বাংলাদেশ, যেখানে গুরুকে দেখলে শিষ্য শ্রদ্ধায় মাথা নত করবে, দম্ভে বুক ফোলাবে না। 

শিক্ষক হেনস্তা রুখতে হলে রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হবে। বিচারপতির পুত্র হোক বা প্রভাবশালী নেতা—শিক্ষকের গায়ে হাত তোলার সাহস যেন কেউ না পায়, তেমন আইন ও তার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। স্কুলের ছোট ক্লাসরুম থেকে শুরু করে রাজপথ পর্যন্ত নৈতিক শিক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। ১৮টি অনুচ্ছেদে বিভক্ত এই নিবন্ধের লক্ষ্য একটাই—বিবেককে জাগ্রত করা। 

অন্ধকার যত গভীর হয়, ভোরের আলো তত কাছে আসে। তবে সেই আলোর জন্য আমাদের লড়াই করতে হবে। মব কালচার আর গালিবাজ জেনারেশনকে প্রত্যাখ্যান করে সুস্থ ধারার সংস্কৃতি চর্চা শুরু করতে হবে। 

[লেখক: প্রেসিডেন্ট, আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী সংগঠন ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্টি অ্যালকোহল]



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত