সংবাদ

রবীন্দ্রমননে বিজ্ঞান: ‘সত্যের একত্ব’ অন্বেষণ


কানন পুরকায়স্থ
কানন পুরকায়স্থ
প্রকাশ: ৮ মে ২০২৬, ১১:১৮ এএম

রবীন্দ্রমননে বিজ্ঞান: ‘সত্যের একত্ব’ অন্বেষণ
রবীন্দ্রনাথ তার ‘বিশ্ব-পরিচয়’ বইটি বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে উৎসর্গ করেছিলেন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১২৬৮ সালের ২৫ বৈশাখ (৭ মে ১৮৬১) কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার ১৬৫তম জন্মবার্ষিকীতে, আমি বিজ্ঞানে তার কতিপয় ভাবনার ওপর আলোকপাত করব।

১৯১৩ সালে সুইডিশ নোবেল কমিটি উল্লেখ করেছিল যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়েছিল, ‘তার গভীর সংবেদনশীল, সতেজ এবং সুন্দর পদ্যের জন্য— যার মাধ্যমে তিনি অসামান্য দক্ষতার সঙ্গে নিজের ইংরেজি শব্দে প্রকাশিত কাব্যিক চিন্তাকে পাশ্চাত্যের সাহিত্যের একটি অংশ করে তুলেছেন’। তার এই কাব্যিক চিন্তা কীভাবে তার সময়ে এবং তার পরেও আধুনিক বিজ্ঞানের সঙ্গে এক সেতুবন্ধন তৈরি করেছে, তা ইউরোপের অনেক বিজ্ঞানী ও দার্শনিককে বিস্মিত করেছে।

বিজ্ঞানের প্রতি রবীন্দ্রনাথের কৌতূহল ছিল আশৈশব। তার পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে জ্যোতির্বিজ্ঞানের দীক্ষা এবং পরবর্তীকালে জীববিজ্ঞানের প্রতি তার আগ্রহ তাকে মহাবিশ্বের উৎপত্তির অনুসন্ধানে সক্ষম করে তোলে। তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞান ভালোবাসতেন এবং ইংল্যান্ডে থাকাকালীন গ্রিনিচ মানমন্দির পরিদর্শন করেন। প্রখ্যাত জ্যোতিঃপদার্থবিদ মেঘনাদ সাহা তাকে ১৯৩৭ সালে ‘বিশ্ব-পরিচয়’ নামে একটি বই লিখতে অনুপ্রাণিত করেন— যা তিনি বোসন এবং বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যানের জনক সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে উৎসর্গ করেন। তিনি তার এক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ পারিবারিক বন্ধু প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিসের সঙ্গে কাজ করেছিলেন, যিনি ১৯২১ সালে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন। ইউরোপীয় বিজ্ঞানী এবং বিজ্ঞানমনস্ক দার্শনিকদের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়েছে। জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী আর্নল্ড সমারফেল্ড, যার সঙ্গে ১৯২৮ সালে কলকাতায় তার দেখা হয়েছিল। বিখ্যাত জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী ও দার্শনিক ওয়ার্নার হাইজেনবার্গও ১৯২৮ সালে কলকাতায় তার জোড়াসাঁকোর বাড়িতে তার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। হাইজেনবার্গ ১৯৭২ সালে বলেছিলেন যে, পদার্থবিজ্ঞানী হিসেবে রবীন্দ্রনাথের দার্শনিক ধারণা তার সহায়ক হয়েছিল। হাইজেনবার্গ সেই পরিণত বয়সের কবির সঙ্গে আপেক্ষিকতা, অসামঞ্জস্যতা, আন্তঃসংযুক্তি এবং অনিত্যতা— এসব ভৌত বাস্তবতার মৌলিক দিক নিয়ে বেশ কয়েকবার আলোচনা করেছিলেন। কথোপকথনের পর তিনি বলেছিলেন, ‘কিছু ধারণা যা এত উদ্ভট মনে হয়েছিল, হঠাৎ করেই সেগুলোর অনেক অর্থ খুঁজে পাওয়া গেল। এটা আমার জন্য খুব সহায়ক ছিল।’

রবীন্দ্রনাথ তার বিশ্ব-পরিচয় গ্রন্থ বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে উৎসর্গ করেছিলেন। এই উৎসর্গপত্রে রবীন্দ্রনাথ উল্লেখ করেন, ‘আমি বিজ্ঞানের সাধক নই, সে কথা বলা বাহুল্য। কিন্তু বালককাল থেকে বিজ্ঞানের রস আস্বাদনে আমার লোভের অন্ত ছিল না।’ বিজ্ঞান চর্চার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ উল্লেখ করেন, ‘বুদ্ধিকে মোহমুক্তি ও সতর্ক করবার জন্য প্রধান প্রয়োজন বিজ্ঞান চর্চার। জ্ঞানের এই পরিবেশন কার্যে পাণ্ডিত্য যথাসাধ্য বর্জনীয় মনে করি।’ আমরা লক্ষ্য করি বিশ্ব-পরিচয় গ্রন্থে বিজ্ঞানের নানা তত্ত্ব ও তথ্য যেমন পরমাণুলোক, নক্ষত্রলোক, সৌরজগৎ, ভূলোক— এভাবে ভাগ করা হয়েছে বিভিন্ন অধ্যায়ে। তা ছাড়া সহজ ভাষায় এবং অনেক ক্ষেত্রে নতুন পরিভাষা তৈরি করে এই গ্রন্থটি রচনা করা হয়েছে। সে সময় বাংলায় বিজ্ঞানের বইয়ের অভাব ছিল এবং সে অভাব দূরীকরণে তার যে সামান্য প্রচেষ্টা রবীন্দ্রনাথ নিজেই বইটির উৎসর্গপত্রে তা উল্লেখ করেছেন।

আমরা আইনস্টাইনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের নানা কথোপকথন সম্পর্কে জানি। রবীন্দ্রনাথের ভাবনায় এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড মানুষ থেকে আলাদা কিছু নয় বরং মহাবিশ্বের সঙ্গে মানুষের সম্প্রীতি সত্য সুন্দরের ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত। এখানে উল্লেখ্য, নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী ইলিয়া প্রিগোজিন রবীন্দ্রনাথ এবং আইনস্টাইনের ‘বাস্তবতার প্রকৃতি’ সম্পর্কে যে ভিন্নমত রয়েছে, তা তার গ্রন্থ ‘Order out of choas: Men's new dialogue with nature’-এ উল্লেখ করেন, ‘Curiously enough, the present evolution of science is running in the direction stated by the great Indian poet. Whatever we call reality, it is revealed to us through the active construction in which we participate.’ অর্থাৎ প্রিগোজিন বলতে চেয়েছেন যে বিজ্ঞানের বর্তমান বিবর্তন রবীন্দ্রনাথের নির্দেশিত পথেই এগোচ্ছে।

এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে যে রবীন্দ্র ভাবনায় পরিবেশ প্রাচীন ভারতের তপোবনের পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। মহাকবি কালিদাস উজ্জয়িনীতে বসে বৈদিক যুগের তপোবন তথা বিশিষ্ট মুনির আশ্রমের যে বর্ণনা দেন, তাতে দেখা যায় যে, সে সময় তপোবনগুলোর পরিবেশ ছিল মানুষের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। গাছপালাকে বাদ দিয়ে কোনো জীবন টিকে থাকতে পারে না। এই ধারণা সঞ্জাতবোধ রবীন্দ্রভাবনায় পরিলক্ষিত হয়। কলকাতার নগরায়ণের বিরূপ প্রতিক্রিয়া রবীন্দ্রনাথ উপলব্ধি করেছিলেন প্রায় ১০০ বছর আগে। আমরা তার কবিতায় তাই দেখি তিনি লিখেছেন— ইটের পরে ইট, মাঝে মানুষ কীট/ নাইকো ভালোবাসা নাইকো খেলা।

রবীন্দ্রনাথের ভাবনা-চিন্তায় ছিল পরিবেশ ও প্রকৃতি। তাই তার কবিতায় লক্ষ করি বৃক্ষকে বন্দনা করার কথা, যেমন— অন্ধ ভূমিগর্ভ হতে শুনেছিলে সূর্যের আহ্বান,/ প্রাণের প্রথম জাগরণে তুমি বৃক্ষ, আধি প্রাণ। ‘আকাশ’ নামের কবিতায় কবি উল্লেখ করেন- শিশুকালের থেকে/আকাশ আমার মুখে চেয়ে একলা গেছে ডেকে।

প্রকৃতির সঙ্গে মানব চেতনার একীভূত হওয়ার বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের গভীর বিশ্বাস শান্তিনিকেতনে থাকাকালীন তার পরিবেশ উপলব্ধির মধ্যে নানাভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। শান্তিনিকেতনের আশ্রম ও তার পরিবেশ পর্যালোচনা করলে আমরা রবীন্দ্রনাথের পরিবেশ চিন্তার যে স্বরূপ লক্ষ্য করি তা হলো এই যে কবি চেয়েছিলেন, ‘এখনকার কালের বিদ্যা ও তখনকার কালের প্রকৃতি’। তবে এটা সত্য যে রবীন্দ্রনাথ প্রাচীন ভারতের তপোবনের আদর্শ এবং আধুনিকতার মধ্যে সাযুজ্য বিধানের সঙ্গে সঙ্গে এক ধরনের অভিযোজনের চিন্তা-ভাবনাও করেছিলেন।

রবীন্দ্রমননে বিজ্ঞান প্রাচীন ভারতের অধ্যাত্ম ভাবনার সঙ্গে মিশে এক চতুর্মাত্রিক রূপ পরিগ্রহ করেছে। আইনস্টাইনের চতুর্থ মাত্রা হচ্ছে সময় বা কাল। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের চতুর্থ মাত্রা হচ্ছে ভারতবর্ষের ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক জীবন ও বিজ্ঞানের সমন্বয়ের চেষ্টা রবীন্দ্রনাথ করেছেন। সমন্বয়ের এই রবীন্দ্র-দর্শন থেকে আমরা পেতে পারি প্রাণ ও অপ্রাণের মধ্যে ঐক্যের সন্ধান। রবীন্দ্রমননে এই ঐক্যই সত্যের একত্ব অন্বেষণের নিয়ামক।

[লেখক: গবেষক ও অধ্যাপক, যুক্তরাজ্য]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ০৮ মে ২০২৬


রবীন্দ্রমননে বিজ্ঞান: ‘সত্যের একত্ব’ অন্বেষণ

প্রকাশের তারিখ : ০৮ মে ২০২৬

featured Image

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১২৬৮ সালের ২৫ বৈশাখ (৭ মে ১৮৬১) কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার ১৬৫তম জন্মবার্ষিকীতে, আমি বিজ্ঞানে তার কতিপয় ভাবনার ওপর আলোকপাত করব।

১৯১৩ সালে সুইডিশ নোবেল কমিটি উল্লেখ করেছিল যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়েছিল, ‘তার গভীর সংবেদনশীল, সতেজ এবং সুন্দর পদ্যের জন্য— যার মাধ্যমে তিনি অসামান্য দক্ষতার সঙ্গে নিজের ইংরেজি শব্দে প্রকাশিত কাব্যিক চিন্তাকে পাশ্চাত্যের সাহিত্যের একটি অংশ করে তুলেছেন’। তার এই কাব্যিক চিন্তা কীভাবে তার সময়ে এবং তার পরেও আধুনিক বিজ্ঞানের সঙ্গে এক সেতুবন্ধন তৈরি করেছে, তা ইউরোপের অনেক বিজ্ঞানী ও দার্শনিককে বিস্মিত করেছে।

বিজ্ঞানের প্রতি রবীন্দ্রনাথের কৌতূহল ছিল আশৈশব। তার পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে জ্যোতির্বিজ্ঞানের দীক্ষা এবং পরবর্তীকালে জীববিজ্ঞানের প্রতি তার আগ্রহ তাকে মহাবিশ্বের উৎপত্তির অনুসন্ধানে সক্ষম করে তোলে। তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞান ভালোবাসতেন এবং ইংল্যান্ডে থাকাকালীন গ্রিনিচ মানমন্দির পরিদর্শন করেন। প্রখ্যাত জ্যোতিঃপদার্থবিদ মেঘনাদ সাহা তাকে ১৯৩৭ সালে ‘বিশ্ব-পরিচয়’ নামে একটি বই লিখতে অনুপ্রাণিত করেন— যা তিনি বোসন এবং বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যানের জনক সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে উৎসর্গ করেন। তিনি তার এক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ পারিবারিক বন্ধু প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিসের সঙ্গে কাজ করেছিলেন, যিনি ১৯২১ সালে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন। ইউরোপীয় বিজ্ঞানী এবং বিজ্ঞানমনস্ক দার্শনিকদের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়েছে। জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী আর্নল্ড সমারফেল্ড, যার সঙ্গে ১৯২৮ সালে কলকাতায় তার দেখা হয়েছিল। বিখ্যাত জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী ও দার্শনিক ওয়ার্নার হাইজেনবার্গও ১৯২৮ সালে কলকাতায় তার জোড়াসাঁকোর বাড়িতে তার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। হাইজেনবার্গ ১৯৭২ সালে বলেছিলেন যে, পদার্থবিজ্ঞানী হিসেবে রবীন্দ্রনাথের দার্শনিক ধারণা তার সহায়ক হয়েছিল। হাইজেনবার্গ সেই পরিণত বয়সের কবির সঙ্গে আপেক্ষিকতা, অসামঞ্জস্যতা, আন্তঃসংযুক্তি এবং অনিত্যতা— এসব ভৌত বাস্তবতার মৌলিক দিক নিয়ে বেশ কয়েকবার আলোচনা করেছিলেন। কথোপকথনের পর তিনি বলেছিলেন, ‘কিছু ধারণা যা এত উদ্ভট মনে হয়েছিল, হঠাৎ করেই সেগুলোর অনেক অর্থ খুঁজে পাওয়া গেল। এটা আমার জন্য খুব সহায়ক ছিল।’

রবীন্দ্রনাথ তার বিশ্ব-পরিচয় গ্রন্থ বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে উৎসর্গ করেছিলেন। এই উৎসর্গপত্রে রবীন্দ্রনাথ উল্লেখ করেন, ‘আমি বিজ্ঞানের সাধক নই, সে কথা বলা বাহুল্য। কিন্তু বালককাল থেকে বিজ্ঞানের রস আস্বাদনে আমার লোভের অন্ত ছিল না।’ বিজ্ঞান চর্চার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ উল্লেখ করেন, ‘বুদ্ধিকে মোহমুক্তি ও সতর্ক করবার জন্য প্রধান প্রয়োজন বিজ্ঞান চর্চার। জ্ঞানের এই পরিবেশন কার্যে পাণ্ডিত্য যথাসাধ্য বর্জনীয় মনে করি।’ আমরা লক্ষ্য করি বিশ্ব-পরিচয় গ্রন্থে বিজ্ঞানের নানা তত্ত্ব ও তথ্য যেমন পরমাণুলোক, নক্ষত্রলোক, সৌরজগৎ, ভূলোক— এভাবে ভাগ করা হয়েছে বিভিন্ন অধ্যায়ে। তা ছাড়া সহজ ভাষায় এবং অনেক ক্ষেত্রে নতুন পরিভাষা তৈরি করে এই গ্রন্থটি রচনা করা হয়েছে। সে সময় বাংলায় বিজ্ঞানের বইয়ের অভাব ছিল এবং সে অভাব দূরীকরণে তার যে সামান্য প্রচেষ্টা রবীন্দ্রনাথ নিজেই বইটির উৎসর্গপত্রে তা উল্লেখ করেছেন।

আমরা আইনস্টাইনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের নানা কথোপকথন সম্পর্কে জানি। রবীন্দ্রনাথের ভাবনায় এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড মানুষ থেকে আলাদা কিছু নয় বরং মহাবিশ্বের সঙ্গে মানুষের সম্প্রীতি সত্য সুন্দরের ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত। এখানে উল্লেখ্য, নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী ইলিয়া প্রিগোজিন রবীন্দ্রনাথ এবং আইনস্টাইনের ‘বাস্তবতার প্রকৃতি’ সম্পর্কে যে ভিন্নমত রয়েছে, তা তার গ্রন্থ ‘Order out of choas: Men's new dialogue with nature’-এ উল্লেখ করেন, ‘Curiously enough, the present evolution of science is running in the direction stated by the great Indian poet. Whatever we call reality, it is revealed to us through the active construction in which we participate.’ অর্থাৎ প্রিগোজিন বলতে চেয়েছেন যে বিজ্ঞানের বর্তমান বিবর্তন রবীন্দ্রনাথের নির্দেশিত পথেই এগোচ্ছে।

এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে যে রবীন্দ্র ভাবনায় পরিবেশ প্রাচীন ভারতের তপোবনের পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। মহাকবি কালিদাস উজ্জয়িনীতে বসে বৈদিক যুগের তপোবন তথা বিশিষ্ট মুনির আশ্রমের যে বর্ণনা দেন, তাতে দেখা যায় যে, সে সময় তপোবনগুলোর পরিবেশ ছিল মানুষের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। গাছপালাকে বাদ দিয়ে কোনো জীবন টিকে থাকতে পারে না। এই ধারণা সঞ্জাতবোধ রবীন্দ্রভাবনায় পরিলক্ষিত হয়। কলকাতার নগরায়ণের বিরূপ প্রতিক্রিয়া রবীন্দ্রনাথ উপলব্ধি করেছিলেন প্রায় ১০০ বছর আগে। আমরা তার কবিতায় তাই দেখি তিনি লিখেছেন— ইটের পরে ইট, মাঝে মানুষ কীট/ নাইকো ভালোবাসা নাইকো খেলা।

রবীন্দ্রনাথের ভাবনা-চিন্তায় ছিল পরিবেশ ও প্রকৃতি। তাই তার কবিতায় লক্ষ করি বৃক্ষকে বন্দনা করার কথা, যেমন— অন্ধ ভূমিগর্ভ হতে শুনেছিলে সূর্যের আহ্বান,/ প্রাণের প্রথম জাগরণে তুমি বৃক্ষ, আধি প্রাণ। ‘আকাশ’ নামের কবিতায় কবি উল্লেখ করেন- শিশুকালের থেকে/আকাশ আমার মুখে চেয়ে একলা গেছে ডেকে।

প্রকৃতির সঙ্গে মানব চেতনার একীভূত হওয়ার বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের গভীর বিশ্বাস শান্তিনিকেতনে থাকাকালীন তার পরিবেশ উপলব্ধির মধ্যে নানাভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। শান্তিনিকেতনের আশ্রম ও তার পরিবেশ পর্যালোচনা করলে আমরা রবীন্দ্রনাথের পরিবেশ চিন্তার যে স্বরূপ লক্ষ্য করি তা হলো এই যে কবি চেয়েছিলেন, ‘এখনকার কালের বিদ্যা ও তখনকার কালের প্রকৃতি’। তবে এটা সত্য যে রবীন্দ্রনাথ প্রাচীন ভারতের তপোবনের আদর্শ এবং আধুনিকতার মধ্যে সাযুজ্য বিধানের সঙ্গে সঙ্গে এক ধরনের অভিযোজনের চিন্তা-ভাবনাও করেছিলেন।

রবীন্দ্রমননে বিজ্ঞান প্রাচীন ভারতের অধ্যাত্ম ভাবনার সঙ্গে মিশে এক চতুর্মাত্রিক রূপ পরিগ্রহ করেছে। আইনস্টাইনের চতুর্থ মাত্রা হচ্ছে সময় বা কাল। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের চতুর্থ মাত্রা হচ্ছে ভারতবর্ষের ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক জীবন ও বিজ্ঞানের সমন্বয়ের চেষ্টা রবীন্দ্রনাথ করেছেন। সমন্বয়ের এই রবীন্দ্র-দর্শন থেকে আমরা পেতে পারি প্রাণ ও অপ্রাণের মধ্যে ঐক্যের সন্ধান। রবীন্দ্রমননে এই ঐক্যই সত্যের একত্ব অন্বেষণের নিয়ামক।

[লেখক: গবেষক ও অধ্যাপক, যুক্তরাজ্য]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত