সংবাদ

রক্তের দামে কেনা বিষণ্ণ জীবন


সৈয়দা বদরুন নেসা
সৈয়দা বদরুন নেসা
প্রকাশ: ৮ মে ২০২৬, ১২:৪৮ পিএম

রক্তের দামে কেনা বিষণ্ণ জীবন

৮ মে, বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস। কিন্তু বাংলাদেশের হাজারো পরিবারের কাছে এটি কোনো আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; এটি রক্তের জন্য চলমান এক নীরব যুদ্ধের প্রতীক। এই দিনে সারা বিশ্ব যখন থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধের অঙ্গীকার নিয়ে আলোচনা সভা আর র‍্যালিতে মেতে ওঠে, তখন এদেশের কিছু নিভৃত কোণে কয়েক হাজার পরিবার এক অমানবিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। এটি কোনো সাধারণ যুদ্ধ নয়; এ যুদ্ধ এক ব্যাগ রক্তের জন্য, এ যুদ্ধ এক ফোঁটা নিশ্বাস কিনে নেওয়ার লড়াই।

বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া কেবল একটি রক্তস্বল্পতার নাম নয়, এটি একটি অদৃশ্য সংকট। যা একটি সাজানো পরিবারকে মুহূর্তেই মরুভূমিতে পরিণত করতে পারে। যখন একটি শিশুকে প্রতি মাসে সুঁইয়ের কঠোর যন্ত্রণা সহ্য করে অন্যের রক্তে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হয়, তখন সেই লড়াই কেবল সেই শিশুর থাকে না, তা হয়ে দাঁড়ায় পুরো পরিবারের এক মরণপণ সংগ্রাম।

রক্ত যখন অন্নের চেয়েও দামি

বাংলাদেশের অসংখ্য পরিবার আজও স্মরণ করে সেই দিনটির কথা, যেদিন চিকিৎসকের রিপোর্টে প্রথম ‘থ্যালাসেমিয়া’ শব্দটি দেখেছিল। একটি ছোট্ট শিশুর ফ্যাকাশে হয়ে আসা মুখ, হঠাৎ দুর্বল হয়ে পড়া শরীর, আর চিকিৎসকের গম্ভীর কণ্ঠ একটি পরিবারকে মুহূর্তেই বদলে দেয়।

আজ সেই শিশুটির মতো হাজারো যোদ্ধা প্রতি মাসে কেবল বেঁচে থাকার আশায় হাসপাতালে যায়। থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য রক্ত কেবল চিকিৎসা নয়, এটিই তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র জ্বালানি।

কিন্তু সমাজের এই অদৃশ্য সংকটের গভীরতা বোঝা যায় হাসপাতালের করিডোরে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসে। ঈদের আনন্দ যখন শহরের প্রতিটি কোণে উপচে পড়ে, তখন একজন থ্যালাসেমিক সন্তানের বাবা মলিন মুখে বলেন, “মানুষ তো ঈদের নতুন জামাকাপড় কেনার চিন্তা করে, আর আমাদের ভাবতে হয় রক্ত কেনার টাকা আসবে কোত্থেকে? সন্তানের জন্য জামা নয়, আমি কি তার জন্য এক ব্যাগ নিশ্বাস কিনতে পারব?”

যখন রক্ত কেনার টাকা জোগাতে গিয়ে ঘরের অন্ন কেনা বন্ধ হয়ে যায়, তখন সেই পরিবারের অবস্থা কেউ কি কল্পনা করতে পারে?

২০২৪ সালের জাতীয় জরিপ ও স্বাস্থ্যখাতের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে একজন থ্যালাসেমিয়া রোগীর চিকিৎসার পেছনে মাসে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে, যা অনেক নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারের মোট আয়ের চেয়েও বেশি। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এদেশে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত পরিবারের আয়ের প্রায় ১৭ থেকে ৬০ শতাংশ ব্যয় হয় শুধু রক্ত ও ওষুধের পেছনে।

নিষেধের ঘেরাটোপে অমানবিক পরিশ্রম

থ্যালাসেমিয়া রোগীদের অতিরিক্ত পরিশ্রম করা কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ। রক্তে হিমোগ্লোবিনের ঘাটতি শরীরকে দ্রুত ক্লান্ত করে তোলে। হৃদপিণ্ড, লিভারসহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে।

অথচ দারিদ্র্যের কষাঘাতে পিষ্ট হয়ে অনেক রোগীকেই জীবনের প্রয়োজনে কঠিন পরিশ্রম করতে হয়। কোথাও একজন রোগী কলসি কাঁধে সিঁড়ি বেয়ে মানুষের বাসায় পানি পৌঁছে দিচ্ছে, কোথাও কেউ সারাদিন শ্রম বিক্রি করছে শুধুমাত্র পরবর্তী রক্ত নেওয়ার টাকা জোগাড় করতে।

এক ভয়াবহ বৈপরীত্য

বাঁচতে হলে রক্ত লাগবে, আর রক্ত কিনতে হলে যে পরিশ্রম করতে হবে, সেই পরিশ্রমই ওই শরীর নিতে পারছে না। এ এক অদ্ভুত মৃত্যুফাঁদ। ২০২৪ সালের সর্বশেষ জাতীয় জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া পরিস্থিতির যে ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে, তা উদ্বেগজনক। বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১১.১৫ শতাংশ বা প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ মানুষ এই রোগের বাহক। অর্থাৎ আমাদের চারপাশের প্রতি ১০ জন মানুষের মধ্যে প্রায় ১ জন অজান্তেই এই জিন বহন করছেন। প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ৬ থেকে ৮ হাজার নতুন শিশু থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্ম নিচ্ছে।

সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো সচেতনতার অভাব। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের অধিকাংশ বাবা-মা সন্তান জন্মের আগে জানতেনই না থ্যালাসেমিয়া কী। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিয়ের আগে কোনো স্ক্রিনিং বা রক্ত পরীক্ষা করা হয়নি। এই অজ্ঞতাই আজ থ্যালাসেমিয়াকে এদেশের অন্যতম বড় নীরব জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত করেছে। অথচ এটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য।

সাইপ্রাস ও ইতালির লড়াই

উন্নত বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যেই থ্যালাসেমিয়া নিয়ন্ত্রণে সফলতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। একসময় সাইপ্রাসে প্রতি ৬ জনের ১ জন থ্যালাসেমিয়ার বাহক ছিল। পরে চার্চ, সরকার ও স্বাস্থ্যখাতের সমন্বয়ে বিয়ের আগে স্ক্রিনিং বাধ্যতামূলক করা হয়। ফলাফল হলো আজ সেখানে নতুন থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুর জন্ম প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।

ইতালির সার্দিনিয়া অঞ্চলও দীর্ঘমেয়াদি গণসচেতনতা, জিনগত পরীক্ষা এবং আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়া প্রায় ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে।

আমাদের পাশের দেশ পাকিস্তানেও বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার আইন পাস হয়েছে। অথচ বাংলাদেশে এখনও বিষয়টি মূলত দিবসভিত্তিক আলোচনা আর সীমিত সচেতনতাতেই আটকে আছে।

আশার আলো

এই অন্ধকারের মাঝেও কিছু প্রতিষ্ঠান মানবিকতার বাতিঘর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ‘বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া সমিতি হাসপাতাল’ তার অন্যতম উদাহরণ। ১৯৮৯ সালে মরহুম ইঞ্জিনিয়ার ওমর গোলাম রাব্বানী নিজের বাড়িতে মাত্র তিনটি বেড নিয়ে এই উদ্যোগ শুরু করেছিলেন। আজ গ্রিন রোডের এই প্রতিষ্ঠান হাজারো রোগীর আশ্রয়স্থল।

বর্তমানে এখানে প্রায় ৫ হাজাারের বেশি নিবন্ধিত রোগী রয়েছে এবং প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ জন রোগীর রক্ত পরিসঞ্চালন করা হয়। হাসপাতালটি যাকাত ফান্ডের মাধ্যমে দরিদ্র রোগীদের সহায়তা দেয় এবং অত্যন্ত কম খরচে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা করে। এটি কেবল একটি হাসপাতাল নয়, মানবিকতার এক জীবন্ত প্রতীক।

মেধার স্বীকৃতি ও কোটার দাবি

থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত মানুষ শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে জীবনের নানা ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়লেও মেধায় তারা পিছিয়ে নেই। নিয়মিত চিকিৎসা ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে অনেকেই প্রতিযোগিতামূলক চাকরির বাজারে টিকে থাকতে পারেন না।

তাই থ্যালাসেমিয়াকে একটি বিশেষ দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক জটিলতা হিসেবে বিবেচনা করে তাদের জন্য কর্মসংস্থান, শিক্ষাসহায়তা ও বিশেষ সুযোগ তৈরির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা প্রয়োজন। যদি তারা নিজের চিকিৎসার খরচ নিজে বহন করার সুযোগ পায়, তবে তারা সমাজের ওপর বোঝা না হয়ে দেশের সম্পদে পরিণত হতে পারে।

মায়ের চোখের জল

হাসপাতালের করিডোরে অনেক কথোপকথন পাথরকেও কাঁদাতে পারে। এক মা তার সন্তানকে বলছেন, “বাবা, আর একটু ধৈর্য ধর, সুঁইটা দিলেই শরীরটা আবার ভালো লাগবে।” সন্তান প্রশ্ন করে, “মা, আমি কেন অন্য বাচ্চাদের মতো দৌড়াতে পারি না? আমার শরীর এত দ্রুত ক্লান্ত হয়ে যায় কেন?” মা চোখের জল লুকিয়ে বলেন, “তুই তো বীরের মতো লড়াই করছিস বাবা।” এই কথোপকথনগুলো কোনো গল্প নয়; এটাই বাস্তবতা। 

এক কিশোর রোগী তার মাকে বলছিল, “মা, আমার ঈদের জামা লাগবে না। তুমি শুধু রক্তের টাকাটা রেখে দিও।” আমাদের উৎসবের বিলাসিতা থেকে কি একটি ব্যাগ রক্তদানের জায়গা তৈরি করা যায় না?

বিনীত নিবেদন

থ্যালাসেমিয়া কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়; এটি মূলত অসচেতনতার ফল। আজ এই লেখা যখন আপনি পড়ছেন, তখন হয়তো কোনো শিশু হাসপাতালের বেডে পরবর্তী রক্তের অপেক্ষায় আছে। আপনি যদি নিয়মিত রক্তদান করেন, তবে হয়তো সেই শিশুটির জীবন আরও কিছুদিন এগিয়ে যাবে। আপনি যদি বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়া স্ক্রিনিং নিশ্চিত করেন, তবে হয়তো ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই কষ্ট থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

আসুন, এই ৮ মে আমরা শুধু দিবস পালন না করে দায়িত্ব গ্রহণ করি। নিয়মিত রক্তদান করি।বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা নিশ্চিত করি।  এই অদৃশ্য সংকটকে দৃশ্যমান করি। কারণ রক্ত শুধু শরীরে প্রবাহিত হয় না, এটি বাঁচিয়ে রাখে একটি পরিবারের স্বপ্ন, একটি মায়ের প্রার্থনা, একটি শিশুর আগামী। সেই জীবন যেন অর্থাভাবে অকালে ঝরে না পড়ে এ দায় আমাদের সবার। 

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, কৃষি ও জলবায়ু গবেষক

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ০৮ মে ২০২৬


রক্তের দামে কেনা বিষণ্ণ জীবন

প্রকাশের তারিখ : ০৮ মে ২০২৬

featured Image

৮ মে, বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস। কিন্তু বাংলাদেশের হাজারো পরিবারের কাছে এটি কোনো আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; এটি রক্তের জন্য চলমান এক নীরব যুদ্ধের প্রতীক। এই দিনে সারা বিশ্ব যখন থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধের অঙ্গীকার নিয়ে আলোচনা সভা আর র‍্যালিতে মেতে ওঠে, তখন এদেশের কিছু নিভৃত কোণে কয়েক হাজার পরিবার এক অমানবিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। এটি কোনো সাধারণ যুদ্ধ নয়; এ যুদ্ধ এক ব্যাগ রক্তের জন্য, এ যুদ্ধ এক ফোঁটা নিশ্বাস কিনে নেওয়ার লড়াই।

বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া কেবল একটি রক্তস্বল্পতার নাম নয়, এটি একটি অদৃশ্য সংকট। যা একটি সাজানো পরিবারকে মুহূর্তেই মরুভূমিতে পরিণত করতে পারে। যখন একটি শিশুকে প্রতি মাসে সুঁইয়ের কঠোর যন্ত্রণা সহ্য করে অন্যের রক্তে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হয়, তখন সেই লড়াই কেবল সেই শিশুর থাকে না, তা হয়ে দাঁড়ায় পুরো পরিবারের এক মরণপণ সংগ্রাম।

রক্ত যখন অন্নের চেয়েও দামি

বাংলাদেশের অসংখ্য পরিবার আজও স্মরণ করে সেই দিনটির কথা, যেদিন চিকিৎসকের রিপোর্টে প্রথম ‘থ্যালাসেমিয়া’ শব্দটি দেখেছিল। একটি ছোট্ট শিশুর ফ্যাকাশে হয়ে আসা মুখ, হঠাৎ দুর্বল হয়ে পড়া শরীর, আর চিকিৎসকের গম্ভীর কণ্ঠ একটি পরিবারকে মুহূর্তেই বদলে দেয়।

আজ সেই শিশুটির মতো হাজারো যোদ্ধা প্রতি মাসে কেবল বেঁচে থাকার আশায় হাসপাতালে যায়। থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য রক্ত কেবল চিকিৎসা নয়, এটিই তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র জ্বালানি।

কিন্তু সমাজের এই অদৃশ্য সংকটের গভীরতা বোঝা যায় হাসপাতালের করিডোরে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসে। ঈদের আনন্দ যখন শহরের প্রতিটি কোণে উপচে পড়ে, তখন একজন থ্যালাসেমিক সন্তানের বাবা মলিন মুখে বলেন, “মানুষ তো ঈদের নতুন জামাকাপড় কেনার চিন্তা করে, আর আমাদের ভাবতে হয় রক্ত কেনার টাকা আসবে কোত্থেকে? সন্তানের জন্য জামা নয়, আমি কি তার জন্য এক ব্যাগ নিশ্বাস কিনতে পারব?”

যখন রক্ত কেনার টাকা জোগাতে গিয়ে ঘরের অন্ন কেনা বন্ধ হয়ে যায়, তখন সেই পরিবারের অবস্থা কেউ কি কল্পনা করতে পারে?

২০২৪ সালের জাতীয় জরিপ ও স্বাস্থ্যখাতের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে একজন থ্যালাসেমিয়া রোগীর চিকিৎসার পেছনে মাসে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে, যা অনেক নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারের মোট আয়ের চেয়েও বেশি। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এদেশে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত পরিবারের আয়ের প্রায় ১৭ থেকে ৬০ শতাংশ ব্যয় হয় শুধু রক্ত ও ওষুধের পেছনে।

নিষেধের ঘেরাটোপে অমানবিক পরিশ্রম

থ্যালাসেমিয়া রোগীদের অতিরিক্ত পরিশ্রম করা কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ। রক্তে হিমোগ্লোবিনের ঘাটতি শরীরকে দ্রুত ক্লান্ত করে তোলে। হৃদপিণ্ড, লিভারসহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে।

অথচ দারিদ্র্যের কষাঘাতে পিষ্ট হয়ে অনেক রোগীকেই জীবনের প্রয়োজনে কঠিন পরিশ্রম করতে হয়। কোথাও একজন রোগী কলসি কাঁধে সিঁড়ি বেয়ে মানুষের বাসায় পানি পৌঁছে দিচ্ছে, কোথাও কেউ সারাদিন শ্রম বিক্রি করছে শুধুমাত্র পরবর্তী রক্ত নেওয়ার টাকা জোগাড় করতে।

এক ভয়াবহ বৈপরীত্য

বাঁচতে হলে রক্ত লাগবে, আর রক্ত কিনতে হলে যে পরিশ্রম করতে হবে, সেই পরিশ্রমই ওই শরীর নিতে পারছে না। এ এক অদ্ভুত মৃত্যুফাঁদ। ২০২৪ সালের সর্বশেষ জাতীয় জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া পরিস্থিতির যে ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে, তা উদ্বেগজনক। বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১১.১৫ শতাংশ বা প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ মানুষ এই রোগের বাহক। অর্থাৎ আমাদের চারপাশের প্রতি ১০ জন মানুষের মধ্যে প্রায় ১ জন অজান্তেই এই জিন বহন করছেন। প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ৬ থেকে ৮ হাজার নতুন শিশু থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্ম নিচ্ছে।

সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো সচেতনতার অভাব। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের অধিকাংশ বাবা-মা সন্তান জন্মের আগে জানতেনই না থ্যালাসেমিয়া কী। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিয়ের আগে কোনো স্ক্রিনিং বা রক্ত পরীক্ষা করা হয়নি। এই অজ্ঞতাই আজ থ্যালাসেমিয়াকে এদেশের অন্যতম বড় নীরব জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত করেছে। অথচ এটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য।

সাইপ্রাস ও ইতালির লড়াই

উন্নত বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যেই থ্যালাসেমিয়া নিয়ন্ত্রণে সফলতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। একসময় সাইপ্রাসে প্রতি ৬ জনের ১ জন থ্যালাসেমিয়ার বাহক ছিল। পরে চার্চ, সরকার ও স্বাস্থ্যখাতের সমন্বয়ে বিয়ের আগে স্ক্রিনিং বাধ্যতামূলক করা হয়। ফলাফল হলো আজ সেখানে নতুন থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুর জন্ম প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।

ইতালির সার্দিনিয়া অঞ্চলও দীর্ঘমেয়াদি গণসচেতনতা, জিনগত পরীক্ষা এবং আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়া প্রায় ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে।

আমাদের পাশের দেশ পাকিস্তানেও বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার আইন পাস হয়েছে। অথচ বাংলাদেশে এখনও বিষয়টি মূলত দিবসভিত্তিক আলোচনা আর সীমিত সচেতনতাতেই আটকে আছে।

আশার আলো

এই অন্ধকারের মাঝেও কিছু প্রতিষ্ঠান মানবিকতার বাতিঘর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ‘বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া সমিতি হাসপাতাল’ তার অন্যতম উদাহরণ। ১৯৮৯ সালে মরহুম ইঞ্জিনিয়ার ওমর গোলাম রাব্বানী নিজের বাড়িতে মাত্র তিনটি বেড নিয়ে এই উদ্যোগ শুরু করেছিলেন। আজ গ্রিন রোডের এই প্রতিষ্ঠান হাজারো রোগীর আশ্রয়স্থল।

বর্তমানে এখানে প্রায় ৫ হাজাারের বেশি নিবন্ধিত রোগী রয়েছে এবং প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ জন রোগীর রক্ত পরিসঞ্চালন করা হয়। হাসপাতালটি যাকাত ফান্ডের মাধ্যমে দরিদ্র রোগীদের সহায়তা দেয় এবং অত্যন্ত কম খরচে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা করে। এটি কেবল একটি হাসপাতাল নয়, মানবিকতার এক জীবন্ত প্রতীক।

মেধার স্বীকৃতি ও কোটার দাবি

থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত মানুষ শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে জীবনের নানা ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়লেও মেধায় তারা পিছিয়ে নেই। নিয়মিত চিকিৎসা ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে অনেকেই প্রতিযোগিতামূলক চাকরির বাজারে টিকে থাকতে পারেন না।

তাই থ্যালাসেমিয়াকে একটি বিশেষ দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক জটিলতা হিসেবে বিবেচনা করে তাদের জন্য কর্মসংস্থান, শিক্ষাসহায়তা ও বিশেষ সুযোগ তৈরির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা প্রয়োজন। যদি তারা নিজের চিকিৎসার খরচ নিজে বহন করার সুযোগ পায়, তবে তারা সমাজের ওপর বোঝা না হয়ে দেশের সম্পদে পরিণত হতে পারে।

মায়ের চোখের জল

হাসপাতালের করিডোরে অনেক কথোপকথন পাথরকেও কাঁদাতে পারে। এক মা তার সন্তানকে বলছেন, “বাবা, আর একটু ধৈর্য ধর, সুঁইটা দিলেই শরীরটা আবার ভালো লাগবে।” সন্তান প্রশ্ন করে, “মা, আমি কেন অন্য বাচ্চাদের মতো দৌড়াতে পারি না? আমার শরীর এত দ্রুত ক্লান্ত হয়ে যায় কেন?” মা চোখের জল লুকিয়ে বলেন, “তুই তো বীরের মতো লড়াই করছিস বাবা।” এই কথোপকথনগুলো কোনো গল্প নয়; এটাই বাস্তবতা। 

এক কিশোর রোগী তার মাকে বলছিল, “মা, আমার ঈদের জামা লাগবে না। তুমি শুধু রক্তের টাকাটা রেখে দিও।” আমাদের উৎসবের বিলাসিতা থেকে কি একটি ব্যাগ রক্তদানের জায়গা তৈরি করা যায় না?

বিনীত নিবেদন

থ্যালাসেমিয়া কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়; এটি মূলত অসচেতনতার ফল। আজ এই লেখা যখন আপনি পড়ছেন, তখন হয়তো কোনো শিশু হাসপাতালের বেডে পরবর্তী রক্তের অপেক্ষায় আছে। আপনি যদি নিয়মিত রক্তদান করেন, তবে হয়তো সেই শিশুটির জীবন আরও কিছুদিন এগিয়ে যাবে। আপনি যদি বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়া স্ক্রিনিং নিশ্চিত করেন, তবে হয়তো ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই কষ্ট থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

আসুন, এই ৮ মে আমরা শুধু দিবস পালন না করে দায়িত্ব গ্রহণ করি। নিয়মিত রক্তদান করি।বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা নিশ্চিত করি।  এই অদৃশ্য সংকটকে দৃশ্যমান করি। কারণ রক্ত শুধু শরীরে প্রবাহিত হয় না, এটি বাঁচিয়ে রাখে একটি পরিবারের স্বপ্ন, একটি মায়ের প্রার্থনা, একটি শিশুর আগামী। সেই জীবন যেন অর্থাভাবে অকালে ঝরে না পড়ে এ দায় আমাদের সবার। 

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, কৃষি ও জলবায়ু গবেষক


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত