রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলার হাসপাতালগুলোতে জ্বর, কাশি ও শরীরে 'লালচে ফুসকুড়ি' নিয়ে শিশু ভর্তি হওয়ার সংখ্যা বাড়ছে। সন্তানদের অসুস্থতা নিয়ে উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন অভিভাবকরা। হাসপাতালের বহির্বিভাগে বাড়তি চাপও তৈরি হয়েছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগে রবিবার গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকেই শিশুদের নিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন অনেক মা-বাবা। কারও শিশুর কয়েকদিন ধরে জ্বর, কারও আবার শরীরে ইতোমধ্যে ফুসকুড়ি দেখা দিয়েছে। চিকিৎসকদের কক্ষের সামনে উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের ভিড় যেন এক অস্বস্তিকর বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরছে।
চানখারপুল এলাকার বাসিন্দা মাহিয়া আট মাস বয়সী মেয়েকে কোলে নিয়ে চিকিৎসকের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তিনি জানান, শনিবার থেকে শিশুর জ্বর কমছে না, বুকের দুধও ঠিকমতো খাচ্ছে না। অবস্থার অবনতি হওয়ায় দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আসেন। সঙ্গে এসেছেন তার শাশুড়ি। বড় মেয়েকে প্রতিবেশীর কাছে রেখে আসতে হয়েছে। মেয়ের অবস্থা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “রাতভর ঘুম হয়নি। শুধু ভয় লাগছে, যদি আরও খারাপ হয়।”
শনিআখড়ার বাসিন্দা রুমা বেগম চার বছরের ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন। তিনি জানান, প্রথমে সাধারণ জ্বর মনে হলেও দুই দিন পর শিশুর চোখ লাল হয়ে যায় এবং শরীরে ছোট ছোট লাল দাগ দেখা দেয়। পরে চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেন, শিশুটি হামে আক্রান্ত। এখন তাকে হাসপাতালে ভর্তি রাখতে হচ্ছে।
রুমা বেগমের ভাষায়, “ছেলেটা সারারাত কাঁদছে, কিছু খেতেও পারছে না। জ্বর কখনও কমছে, আবার বেড়ে যাচ্ছে। আগে বুঝিনি হাম এত কষ্ট দিবে।”
নারায়ণগঞ্জের পঞ্চপট্টি এলাকা থেকে আসা শাহীন মিয়া দেড় বছরের মেয়েকে নিয়ে শিশু বিভাগের সামনে অপেক্ষা করছিলেন। তিনি জানান, শুরুতে স্থানীয় ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে খাওয়ানো হয়েছিল। কিন্তু অবস্থার উন্নতি না হয়ে বরং শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিলে তারা হাসপাতালে আসেন। হাসপাতালে এসে একই ধরনের উপসর্গে আক্রান্ত আরও অনেক শিশুকে দেখে আতঙ্ক বেড়ে যায় তার।
তিনি বলেন, “এখন বাচ্চার সামান্য জ্বর হলেও ভয় লাগে। হাসপাতালে এসে বুঝলাম, হাম কত দ্রুত ছড়াতে পারে।”
যাত্রাবাড়ীর গৃহিণী নাসিমা আক্তার জানান, তার মেয়ের নির্ধারিত সময়ের একটি টিকা নেওয়া হয়নি। পরে আর সেটি দেওয়া সম্ভব হয়নি। এখন মেয়েটি হামে আক্রান্ত হওয়ায় তিনি আফসোস করছেন। “ডাক্তার বলেছেন সময়মতো টিকা নিলে ঝুঁকি অনেক কমে যায়। এখন বুঝতে পারছি, টিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ,” বলেন তিনি।
হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, আক্রান্ত শিশুদের পাশাপাশি মানসিক চাপে রয়েছেন অভিভাবকরাও। অনেকে কয়েক রাত ধরে ঘুমাতে পারেননি। কারও চোখে ক্লান্তি, কারও মুখে অজানা শঙ্কা।
মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দা সেলিনা আক্তার জানান, তার ছেলের পাঁচ দিন ধরে জ্বর ছিল। পরে শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করতে বলেছে ডাক্তার। তাই এসেছেন হাসপাতালে।
চিকিৎসকদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তি হাঁচি বা কাশি দিলে বাতাসের মাধ্যমে খুব সহজেই অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। শুরুতে জ্বর, সর্দি, কাশি ও চোখ লাল হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলেও কয়েক দিনের মধ্যে শরীরে লালচে ফুসকুড়ি ওঠে। গুরুতর অবস্থায় নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা এবং মস্তিষ্কে সংক্রমণের মতো জটিলতাও দেখা দিতে পারে।
চিকিৎসকদের ভাষ্য, সময়মতো টিকা না নেওয়া, প্রাথমিক উপসর্গকে সাধারণ জ্বর ভেবে অবহেলা করা এবং সচেতনতার ঘাটতির কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মো. শাহেদুর রহমান বলেন, হামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর সুরক্ষা হলো নিয়মিত টিকা। শিশুদের নির্ধারিত বয়সে দুই ডোজ হাম-রুবেলা টিকা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা এবং পরিবারের অন্য শিশুদের সুরক্ষায় সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি।
তার মতে, অনেক পরিবার এখনও হামের প্রাথমিক লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন নয়। ফলে রোগের শুরুতেই চিকিৎসা নেওয়া হয় না। এতে শিশুর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি।
ডা. শাহেদুর রহমান বলেন, “হামকে সাধারণ জ্বর ভেবে অবহেলা করা ঠিক নয়। সময়মতো চিকিৎসা নিলে জটিলতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।”
যেসব শিশুর টিকা সম্পূর্ণ হয়নি, তাদের দ্রুত টিকার আওতায় আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। হাম শুধু শিশুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; ২০ বছরের বেশি বয়সীরাও আক্রান্ত হতে পারেন। তাদের ক্ষেত্রে জটিলতার ঝুঁকিও বেশি থাকে।
চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, হামের লক্ষণ দেখা দিলে আক্রান্ত শিশুকে ভিড় থেকে দূরে রাখতে হবে। পর্যাপ্ত তরল খাবার, বিশ্রাম ও দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে ঘরে বসে চিকিৎসা করতে গিয়ে রোগ জটিল আকার ধারণ করছে বলেও তারা জানান।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আবারও হামের সংক্রমণ বাড়ছে। সংস্থাটি বলছে, টিকাদানের ঘাটতি থাকলে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
জাতিসংঘ শিশু তহবিল ইউনিসেফ বলছে, বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী। সরকারি পরিসংখ্যানে এ বছর এ পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে ৩৫০ এর বেশী শিশু মারা গেছে, আক্রান্তের সংখ্যা ৫৫ হাজার ছাড়িয়েছে।

সোমবার, ১১ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১১ মে ২০২৬
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলার হাসপাতালগুলোতে জ্বর, কাশি ও শরীরে 'লালচে ফুসকুড়ি' নিয়ে শিশু ভর্তি হওয়ার সংখ্যা বাড়ছে। সন্তানদের অসুস্থতা নিয়ে উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন অভিভাবকরা। হাসপাতালের বহির্বিভাগে বাড়তি চাপও তৈরি হয়েছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগে রবিবার গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকেই শিশুদের নিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন অনেক মা-বাবা। কারও শিশুর কয়েকদিন ধরে জ্বর, কারও আবার শরীরে ইতোমধ্যে ফুসকুড়ি দেখা দিয়েছে। চিকিৎসকদের কক্ষের সামনে উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের ভিড় যেন এক অস্বস্তিকর বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরছে।
চানখারপুল এলাকার বাসিন্দা মাহিয়া আট মাস বয়সী মেয়েকে কোলে নিয়ে চিকিৎসকের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তিনি জানান, শনিবার থেকে শিশুর জ্বর কমছে না, বুকের দুধও ঠিকমতো খাচ্ছে না। অবস্থার অবনতি হওয়ায় দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আসেন। সঙ্গে এসেছেন তার শাশুড়ি। বড় মেয়েকে প্রতিবেশীর কাছে রেখে আসতে হয়েছে। মেয়ের অবস্থা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “রাতভর ঘুম হয়নি। শুধু ভয় লাগছে, যদি আরও খারাপ হয়।”
শনিআখড়ার বাসিন্দা রুমা বেগম চার বছরের ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন। তিনি জানান, প্রথমে সাধারণ জ্বর মনে হলেও দুই দিন পর শিশুর চোখ লাল হয়ে যায় এবং শরীরে ছোট ছোট লাল দাগ দেখা দেয়। পরে চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেন, শিশুটি হামে আক্রান্ত। এখন তাকে হাসপাতালে ভর্তি রাখতে হচ্ছে।
রুমা বেগমের ভাষায়, “ছেলেটা সারারাত কাঁদছে, কিছু খেতেও পারছে না। জ্বর কখনও কমছে, আবার বেড়ে যাচ্ছে। আগে বুঝিনি হাম এত কষ্ট দিবে।”
নারায়ণগঞ্জের পঞ্চপট্টি এলাকা থেকে আসা শাহীন মিয়া দেড় বছরের মেয়েকে নিয়ে শিশু বিভাগের সামনে অপেক্ষা করছিলেন। তিনি জানান, শুরুতে স্থানীয় ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে খাওয়ানো হয়েছিল। কিন্তু অবস্থার উন্নতি না হয়ে বরং শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিলে তারা হাসপাতালে আসেন। হাসপাতালে এসে একই ধরনের উপসর্গে আক্রান্ত আরও অনেক শিশুকে দেখে আতঙ্ক বেড়ে যায় তার।
তিনি বলেন, “এখন বাচ্চার সামান্য জ্বর হলেও ভয় লাগে। হাসপাতালে এসে বুঝলাম, হাম কত দ্রুত ছড়াতে পারে।”
যাত্রাবাড়ীর গৃহিণী নাসিমা আক্তার জানান, তার মেয়ের নির্ধারিত সময়ের একটি টিকা নেওয়া হয়নি। পরে আর সেটি দেওয়া সম্ভব হয়নি। এখন মেয়েটি হামে আক্রান্ত হওয়ায় তিনি আফসোস করছেন। “ডাক্তার বলেছেন সময়মতো টিকা নিলে ঝুঁকি অনেক কমে যায়। এখন বুঝতে পারছি, টিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ,” বলেন তিনি।
হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, আক্রান্ত শিশুদের পাশাপাশি মানসিক চাপে রয়েছেন অভিভাবকরাও। অনেকে কয়েক রাত ধরে ঘুমাতে পারেননি। কারও চোখে ক্লান্তি, কারও মুখে অজানা শঙ্কা।
মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দা সেলিনা আক্তার জানান, তার ছেলের পাঁচ দিন ধরে জ্বর ছিল। পরে শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করতে বলেছে ডাক্তার। তাই এসেছেন হাসপাতালে।
চিকিৎসকদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তি হাঁচি বা কাশি দিলে বাতাসের মাধ্যমে খুব সহজেই অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। শুরুতে জ্বর, সর্দি, কাশি ও চোখ লাল হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলেও কয়েক দিনের মধ্যে শরীরে লালচে ফুসকুড়ি ওঠে। গুরুতর অবস্থায় নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা এবং মস্তিষ্কে সংক্রমণের মতো জটিলতাও দেখা দিতে পারে।
চিকিৎসকদের ভাষ্য, সময়মতো টিকা না নেওয়া, প্রাথমিক উপসর্গকে সাধারণ জ্বর ভেবে অবহেলা করা এবং সচেতনতার ঘাটতির কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মো. শাহেদুর রহমান বলেন, হামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর সুরক্ষা হলো নিয়মিত টিকা। শিশুদের নির্ধারিত বয়সে দুই ডোজ হাম-রুবেলা টিকা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা এবং পরিবারের অন্য শিশুদের সুরক্ষায় সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি।
তার মতে, অনেক পরিবার এখনও হামের প্রাথমিক লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন নয়। ফলে রোগের শুরুতেই চিকিৎসা নেওয়া হয় না। এতে শিশুর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি।
ডা. শাহেদুর রহমান বলেন, “হামকে সাধারণ জ্বর ভেবে অবহেলা করা ঠিক নয়। সময়মতো চিকিৎসা নিলে জটিলতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।”
যেসব শিশুর টিকা সম্পূর্ণ হয়নি, তাদের দ্রুত টিকার আওতায় আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। হাম শুধু শিশুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; ২০ বছরের বেশি বয়সীরাও আক্রান্ত হতে পারেন। তাদের ক্ষেত্রে জটিলতার ঝুঁকিও বেশি থাকে।
চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, হামের লক্ষণ দেখা দিলে আক্রান্ত শিশুকে ভিড় থেকে দূরে রাখতে হবে। পর্যাপ্ত তরল খাবার, বিশ্রাম ও দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে ঘরে বসে চিকিৎসা করতে গিয়ে রোগ জটিল আকার ধারণ করছে বলেও তারা জানান।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আবারও হামের সংক্রমণ বাড়ছে। সংস্থাটি বলছে, টিকাদানের ঘাটতি থাকলে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
জাতিসংঘ শিশু তহবিল ইউনিসেফ বলছে, বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী। সরকারি পরিসংখ্যানে এ বছর এ পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে ৩৫০ এর বেশী শিশু মারা গেছে, আক্রান্তের সংখ্যা ৫৫ হাজার ছাড়িয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন