সংবাদ

আইলার ১৭ বছর পর ও কাটেনি দুর্যোগের ক্ষত


প্রতিনিধি, সাতক্ষীরা
প্রতিনিধি, সাতক্ষীরা
প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬, ১২:৫৭ পিএম

আইলার ১৭ বছর পর ও কাটেনি দুর্যোগের ক্ষত
আইলার ১৭ বছর পরও সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকায় ভাঙা রাস্তাঘাটের চিত্র। ছবিঃ সংবাদ

আজ ভয়াল ২৫ মে। ২০০৯ সালের এই দিনে প্রলয়ংকরি ঘূর্ণিঝড় আইলার আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছিল সাতক্ষীরাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় জনপদ। ভয়াবহ সেই দুর্যোগের ১৭ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনি এবং খুলনার কয়রা ও দাকোপ এলাকার লাখ লাখ মানুষ। সুপেয় পানি, টেকসই বেড়িবাঁধ, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও নিরাপদ বাসস্থানের সংকটে আজও মানবেতর জীবন কাটছে উপকূলবাসীর।

একসময় সবুজ বনানী, ধান, পাট ও শাকসবজিতে ভরপুর ছিল সাতক্ষীরার গাবুরা, পদ্মপুকুর ও প্রতাপনগর ইউনিয়ন। এখন সেখানে শুধু লবণাক্ত পানির ঘের আর অনাবাদি জমি। আইলার পর লবণাক্ততা এতটাই বেড়েছে যে অধিকাংশ জমি কৃষিকাজের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ধীরে ধীরে বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়ছে পুরো অঞ্চল।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ২০০৯ সালের ২৫ মে সকালে আবহাওয়া স্বাভাবিকই ছিল। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে কেউ বুঝতে পারেননি দুপুরের পর ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাস ধেয়ে আসবে। মুহূর্তের মধ্যে ১৪ থেকে ১৫ ফুট উচ্চতার লোনাপানির ঢেউ ভাসিয়ে নিয়ে যায় ঘরবাড়ি, গবাদিপশু, ফসল ও মানুষের জীবন। স্বজন হারানোর সেই বিভীষিকা এখনো ভুলতে পারেননি অনেকে।

শ্যামনগর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, আইলার আঘাতে শুধু সাতক্ষীরাতেই ৭৩ জন নিহত ও ২ শতাধিক মানুষ আহত হন। তাৎক্ষণিকভাবে প্রায় ৫ লাখ ৯৫ হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে। এর মধ্যে শ্যামনগর উপজেলাতেই ক্ষতিগ্রস্ত হয় ২ লাখ ৪৩ হাজারের বেশি মানুষ। বিধ্বস্ত হয় ১ লাখ ৪২ হাজারের বেশি বসতঘর, শত শত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সড়ক। নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায় প্রায় ১১৭ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ।

উপকূলের মানুষ এখনো সবচেয়ে বেশি ভুগছেন সুপেয় পানির সংকটে। পুকুর ও জলাশয় লোনা হয়ে যাওয়ায় মাইলের পর মাইল হেঁটে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর (এনজিও) স্থাপন করা অনেক পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্টও এখন অকেজো।

স্থানীয়দের অভিযোগ, আইলার পর যেসব বেড়িবাঁধ সংস্কার করা হয়েছে, তার বেশির ভাগই অস্থায়ী। ফলে বর্ষা মৌসুম বা জোয়ারের পানি বাড়লে ভাঙন-আতঙ্কে রাত জেগে পাহারা দিতে হয় উপকূলবাসীকে। কর্মসংস্থানের অভাবও এখানে প্রকট। কৃষিকাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জীবিকার সন্ধানে প্রতিবছর বহু মানুষ এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লবণাক্ততার কারণে এই অঞ্চলে অপুষ্টি, চর্মরোগ, বাল্যবিবাহ ও দারিদ্র্য আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।

সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল আলম বলেন, “জাইকার অর্থায়নে কিছু এলাকায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ২৭ কিলোমিটার বাঁধের কাজ চলমান। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে আরও ১৯৬ কিলোমিটার টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা সম্ভব হলে উপকূলীয় এলাকা অনেকটা সুরক্ষিত হবে।”

আইলার ১৭ বছর পরও নিরাপদ বাঁধ ও সুপেয় পানির স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে এই অঞ্চলের লাখো মানুষের।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ২৫ মে ২০২৬


আইলার ১৭ বছর পর ও কাটেনি দুর্যোগের ক্ষত

প্রকাশের তারিখ : ২৫ মে ২০২৬

featured Image

আজ ভয়াল ২৫ মে। ২০০৯ সালের এই দিনে প্রলয়ংকরি ঘূর্ণিঝড় আইলার আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছিল সাতক্ষীরাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় জনপদ। ভয়াবহ সেই দুর্যোগের ১৭ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনি এবং খুলনার কয়রা ও দাকোপ এলাকার লাখ লাখ মানুষ। সুপেয় পানি, টেকসই বেড়িবাঁধ, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও নিরাপদ বাসস্থানের সংকটে আজও মানবেতর জীবন কাটছে উপকূলবাসীর।

একসময় সবুজ বনানী, ধান, পাট ও শাকসবজিতে ভরপুর ছিল সাতক্ষীরার গাবুরা, পদ্মপুকুর ও প্রতাপনগর ইউনিয়ন। এখন সেখানে শুধু লবণাক্ত পানির ঘের আর অনাবাদি জমি। আইলার পর লবণাক্ততা এতটাই বেড়েছে যে অধিকাংশ জমি কৃষিকাজের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ধীরে ধীরে বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়ছে পুরো অঞ্চল।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ২০০৯ সালের ২৫ মে সকালে আবহাওয়া স্বাভাবিকই ছিল। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে কেউ বুঝতে পারেননি দুপুরের পর ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাস ধেয়ে আসবে। মুহূর্তের মধ্যে ১৪ থেকে ১৫ ফুট উচ্চতার লোনাপানির ঢেউ ভাসিয়ে নিয়ে যায় ঘরবাড়ি, গবাদিপশু, ফসল ও মানুষের জীবন। স্বজন হারানোর সেই বিভীষিকা এখনো ভুলতে পারেননি অনেকে।

শ্যামনগর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, আইলার আঘাতে শুধু সাতক্ষীরাতেই ৭৩ জন নিহত ও ২ শতাধিক মানুষ আহত হন। তাৎক্ষণিকভাবে প্রায় ৫ লাখ ৯৫ হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে। এর মধ্যে শ্যামনগর উপজেলাতেই ক্ষতিগ্রস্ত হয় ২ লাখ ৪৩ হাজারের বেশি মানুষ। বিধ্বস্ত হয় ১ লাখ ৪২ হাজারের বেশি বসতঘর, শত শত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সড়ক। নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায় প্রায় ১১৭ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ।

উপকূলের মানুষ এখনো সবচেয়ে বেশি ভুগছেন সুপেয় পানির সংকটে। পুকুর ও জলাশয় লোনা হয়ে যাওয়ায় মাইলের পর মাইল হেঁটে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর (এনজিও) স্থাপন করা অনেক পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্টও এখন অকেজো।

স্থানীয়দের অভিযোগ, আইলার পর যেসব বেড়িবাঁধ সংস্কার করা হয়েছে, তার বেশির ভাগই অস্থায়ী। ফলে বর্ষা মৌসুম বা জোয়ারের পানি বাড়লে ভাঙন-আতঙ্কে রাত জেগে পাহারা দিতে হয় উপকূলবাসীকে। কর্মসংস্থানের অভাবও এখানে প্রকট। কৃষিকাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জীবিকার সন্ধানে প্রতিবছর বহু মানুষ এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লবণাক্ততার কারণে এই অঞ্চলে অপুষ্টি, চর্মরোগ, বাল্যবিবাহ ও দারিদ্র্য আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।

সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল আলম বলেন, “জাইকার অর্থায়নে কিছু এলাকায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ২৭ কিলোমিটার বাঁধের কাজ চলমান। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে আরও ১৯৬ কিলোমিটার টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা সম্ভব হলে উপকূলীয় এলাকা অনেকটা সুরক্ষিত হবে।”

আইলার ১৭ বছর পরও নিরাপদ বাঁধ ও সুপেয় পানির স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে এই অঞ্চলের লাখো মানুষের।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত