সংবাদ

১৫ শ্রমজীবীর লাশে ভারী মান্দা, ঈদ উধাও


কাজী কামাল হোসেন, প্রতিনিধি, নওগাঁ
কাজী কামাল হোসেন, প্রতিনিধি, নওগাঁ
প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬, ০৭:২৭ পিএম

১৫ শ্রমজীবীর লাশে ভারী মান্দা, ঈদ উধাও
নিহতদের স্বজনদের কান্নায় ভারী গোটা রাজেন্দ্রবাটি ডেবরা গ্রাম।

ঈদকে সামনে রেখে বাড়ি ফেরার আনন্দে বুক ভরা স্বপ্ন ছিল তাদের। কেউ সন্তানকে নতুন জামা কিনে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। কেউ বৃদ্ধ মায়ের হাতে ঈদের বাজার তুলে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই স্বপ্নগুলো মুহূর্তেই থেমে গেল টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায়। এক ট্রাক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন নওগাঁর মান্দা উপজেলার একই গ্রামের ৯ জনসহ অন্তত ১৫ জন।

এখন মান্দার ভারশো ইউনিয়নের রাজেন্দ্রবাটি ডেবরা গ্রামে নেই কোনো ঈদের আমেজ। চারদিকে শুধু স্বজন হারানোর আহাজারি। গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে বইছে শোকের মাতম।

সোমবার (২৫ মে) দুপুরে গ্রামটিতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির উঠানে, রাস্তায়, গাছতলায়-যেদিকেই চোখ যায় সেখানেই কান্নার শব্দ। নিহতদের স্বজনদের সান্ত্বনা দিতে আশেপাশের গ্রামের মানুষ ছুটে আসছেন। কিন্তু কোনো সান্ত্বনাই যেন থামাতে পারছে না স্বজন হারানোর আর্তনাদ।

নিহতরা হলেন- তারেক (২১), আব্দুল বারেক (২৪), বাদশাহ (২৮), সোহাগ (২১), রবিউল ইসলাম (২৬), মাইনুল (৩০), দুই ভাই ময়নুল ও গিয়াস এবং সাগর (২৬)। তাদের সবার বাড়িই রাজেন্দ্রবাটি ডেবরা গ্রামে। এছাড়া নিহতদের মধ্যে নিয়ামতপুর উপজেলার মালঞ্চি গ্রামের সারিকুলও রয়েছেন।

স্থানীয়রা জানান, নিহতদের অধিকাংশই হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান। বর্ষা মৌসুম ছাড়া এলাকায় কাজের সুযোগ কম থাকায় তারা নোয়াখালীতে গিয়ে ফেরি করে প্লাস্টিক ও বিভিন্ন মালামাল বিক্রি করতেন। ঈদ উপলক্ষে পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতে কয়েকদিনের জন্য বাড়ি ফিরছিলেন তারা।

কিন্তু বাড়ি ফেরা আর হলো না। ফেনী থেকে রডবোঝাই একটি ট্রাকে চড়ে রওনা দেন তারা। ভোরে টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে ট্রাকটি উল্টে গেলে রডের নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারান অনেকে।

একই গ্রামের জসিম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “আমরা সবাই একসঙ্গেই নোয়াখালীতে ছিলাম। তারা আগের গাড়িতে উঠছিল। আমরা ছিলাম পরের গাড়িতে। টাঙ্গাইল পার হওয়ার পর দেখি একটা ট্রাক উল্টে আছে। পরে যমুনা সেতু পার হয়ে জানতে পারি আমাদের গ্রামের ছেলেগুলো আর বেঁচে নেই।”

গ্রামের বাসিন্দা নাসির উদ্দিন বলেন,“এরা সবাই খুব গরিব মানুষ। বিলের পানি শুকিয়ে গেলে সংসার চালাতে বাইরে গিয়ে ফেরি করত। আমাদের গ্রামে একসঙ্গে এত মানুষের মৃত্যু কখনও হয়নি। পুরো গ্রামটাই এখন শোকে স্তব্ধ।”

গ্রামজুড়ে কান্নার রোল।

নিহত রবিউলের বৃদ্ধ মা বারবার ছেলের নাম ধরে মূর্ছা যাচ্ছিলেন। পাশেই বসে থাকা এক স্বজন বলছিলেন, “ঈদে বাড়ি আসবে বলে গতকালও ফোন করেছিল। কে জানত এটাই শেষ কথা!”

মান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খোরশেদ আলম বলেন, “এখন পর্যন্ত ৯ জনের বাড়ি মান্দায় বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। নিহতদের মধ্যে আরও কেউ মান্দার হতে পারেন। পরিচয় শনাক্তে পুলিশ কাজ করছে।”

প্রসঙ্গত, সোমবার ভোর ৫টার দিকে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কালিহাতীর সরাতৈল দক্ষিণপাড়া এলাকায় রডবোঝাই একটি ট্রাক উল্টে অন্তত ১৫ জন নিহত হন। নিহতরা সবাই ঈদ উদযাপনের জন্য বাড়ি ফিরছিলেন।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ২৫ মে ২০২৬


১৫ শ্রমজীবীর লাশে ভারী মান্দা, ঈদ উধাও

প্রকাশের তারিখ : ২৫ মে ২০২৬

featured Image

ঈদকে সামনে রেখে বাড়ি ফেরার আনন্দে বুক ভরা স্বপ্ন ছিল তাদের। কেউ সন্তানকে নতুন জামা কিনে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। কেউ বৃদ্ধ মায়ের হাতে ঈদের বাজার তুলে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই স্বপ্নগুলো মুহূর্তেই থেমে গেল টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায়। এক ট্রাক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন নওগাঁর মান্দা উপজেলার একই গ্রামের ৯ জনসহ অন্তত ১৫ জন।

এখন মান্দার ভারশো ইউনিয়নের রাজেন্দ্রবাটি ডেবরা গ্রামে নেই কোনো ঈদের আমেজ। চারদিকে শুধু স্বজন হারানোর আহাজারি। গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে বইছে শোকের মাতম।

সোমবার (২৫ মে) দুপুরে গ্রামটিতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির উঠানে, রাস্তায়, গাছতলায়-যেদিকেই চোখ যায় সেখানেই কান্নার শব্দ। নিহতদের স্বজনদের সান্ত্বনা দিতে আশেপাশের গ্রামের মানুষ ছুটে আসছেন। কিন্তু কোনো সান্ত্বনাই যেন থামাতে পারছে না স্বজন হারানোর আর্তনাদ।

নিহতরা হলেন- তারেক (২১), আব্দুল বারেক (২৪), বাদশাহ (২৮), সোহাগ (২১), রবিউল ইসলাম (২৬), মাইনুল (৩০), দুই ভাই ময়নুল ও গিয়াস এবং সাগর (২৬)। তাদের সবার বাড়িই রাজেন্দ্রবাটি ডেবরা গ্রামে। এছাড়া নিহতদের মধ্যে নিয়ামতপুর উপজেলার মালঞ্চি গ্রামের সারিকুলও রয়েছেন।

স্থানীয়রা জানান, নিহতদের অধিকাংশই হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান। বর্ষা মৌসুম ছাড়া এলাকায় কাজের সুযোগ কম থাকায় তারা নোয়াখালীতে গিয়ে ফেরি করে প্লাস্টিক ও বিভিন্ন মালামাল বিক্রি করতেন। ঈদ উপলক্ষে পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতে কয়েকদিনের জন্য বাড়ি ফিরছিলেন তারা।

কিন্তু বাড়ি ফেরা আর হলো না। ফেনী থেকে রডবোঝাই একটি ট্রাকে চড়ে রওনা দেন তারা। ভোরে টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে ট্রাকটি উল্টে গেলে রডের নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারান অনেকে।

একই গ্রামের জসিম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “আমরা সবাই একসঙ্গেই নোয়াখালীতে ছিলাম। তারা আগের গাড়িতে উঠছিল। আমরা ছিলাম পরের গাড়িতে। টাঙ্গাইল পার হওয়ার পর দেখি একটা ট্রাক উল্টে আছে। পরে যমুনা সেতু পার হয়ে জানতে পারি আমাদের গ্রামের ছেলেগুলো আর বেঁচে নেই।”

গ্রামের বাসিন্দা নাসির উদ্দিন বলেন,“এরা সবাই খুব গরিব মানুষ। বিলের পানি শুকিয়ে গেলে সংসার চালাতে বাইরে গিয়ে ফেরি করত। আমাদের গ্রামে একসঙ্গে এত মানুষের মৃত্যু কখনও হয়নি। পুরো গ্রামটাই এখন শোকে স্তব্ধ।”

গ্রামজুড়ে কান্নার রোল।

নিহত রবিউলের বৃদ্ধ মা বারবার ছেলের নাম ধরে মূর্ছা যাচ্ছিলেন। পাশেই বসে থাকা এক স্বজন বলছিলেন, “ঈদে বাড়ি আসবে বলে গতকালও ফোন করেছিল। কে জানত এটাই শেষ কথা!”

মান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খোরশেদ আলম বলেন, “এখন পর্যন্ত ৯ জনের বাড়ি মান্দায় বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। নিহতদের মধ্যে আরও কেউ মান্দার হতে পারেন। পরিচয় শনাক্তে পুলিশ কাজ করছে।”

প্রসঙ্গত, সোমবার ভোর ৫টার দিকে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কালিহাতীর সরাতৈল দক্ষিণপাড়া এলাকায় রডবোঝাই একটি ট্রাক উল্টে অন্তত ১৫ জন নিহত হন। নিহতরা সবাই ঈদ উদযাপনের জন্য বাড়ি ফিরছিলেন।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত