ঈদুল আজহা আসলেই চারপাশে আলোচনা শুরু হয় গরু, ছাগল আর কোরবানির পশু নিয়ে। কিন্তু কখনো কি ভেবেছেন, মানবসভ্যতার ইতিহাসে এই দুটি প্রাণীর মধ্যে কে আগে মানুষের হাতে গৃহপালিত হলো? কে প্রথম আমাদের পূর্বপুরুষের আঙিনায় পা রেখেছিল? উত্তরের সন্ধানে ফিরে যেতে হবে প্রায় দশ হাজার বছর আগে, যখন মানুষ প্রথম কৃষিজীবী হওয়ার পথে পা বাড়াচ্ছিল।
ইরানের জাগরোস পর্বতমালার গঞ্জ দারেহ প্রত্নস্থলটি যেন ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী। এখানে পাওয়া গেছে প্রায় ১০ হাজার ২০০ বছর আগের ছাগলের হাড়। সেই হাড়গুলো শুধু সময়ের হিসাব দেয়নি, বলেছে আরও অনেক কিছু।
কীভাবে বুঝলেন এগুলো গৃহপালিত ছাগলের হাড়? গবেষকদের চোখ ফসকায়নি। তারা দেখেছেন, এখানে পুরুষ ছাগলকে নির্দিষ্ট বয়সে জবাই করা হতো। কিন্তু স্ত্রী ছাগলকে বাঁচিয়ে রাখা হতো। এই কৌশলটা আজকের মাঠের রাখালদের মতো- অর্থাৎ মানুষের ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ, বন্য প্রাণীতে যা ছিল না।
আরও মজার তথ্য হলো, এই প্রাচীন ছাগলগুলো দেখতে আজকের ছাগলের মতো ছিল না। তাদের ছিল বন্য বেজোয়ার আইবেক্সের মতো বড় বাঁকা শিং, আর শক্ত মজবুত দেহ। সেটেলমেন্টের ইটগুলোর ওপর এখনও দেখা যায় ছাগলের খুরের ছাপ- যেন ইতিহাসের এক ফ্রেমবন্দি ছবি।
জিন বিজ্ঞানের আরেকটি গবেষণা জানায়, বেশির ভাগ আধুনিক গৃহপালিত ছাগলের শিকড় এসেছে দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্ক ও জাগরোস পর্বতমালা থেকে। প্রায় ১০ হাজার ৫০০ বছর আগে তুরস্কের একটি অঞ্চল আর প্রায় ১০ হাজার বছর আগে জাগরোসের আরেকটি অঞ্চল- দুটি জায়গাতেই স্বাধীনভাবে হয়েছিল ছাগল গৃহপালনের ঘটনা।
আরও চমক লাগার মতো তথ্য হলো, বিজ্ঞানীরা হিসেব করে দেখেছেন, আজকের প্রায় ৯০ ভাগ গৃহপালিত ছাগলই এসেছে তুরস্কের সেই একটি অঞ্চল থেকে।
ছাগলের গল্প শুনে ভাবছেন, তাহলে গরু কোন যুদ্ধে হেরে গেল? না, হেরে যায়নি। গরু এসেছে প্রায় একই সময় পরিধিতে কিন্তু পরিসংখ্যানে একটু ‘পিছিয়ে’।
গরুর গৃহপালনের ঘটনা ঘটেছে দুটি ভিন্ন স্থানে। প্রথমটি ‘টরিন’ গরু - যাদের আমরা ইউরোপ ও শীতল অঞ্চলে দেখি। এদের গৃহপালন শুরু হয় প্রায় ১০ হাজার ৫০০ বছর আগে উর্বর চন্দ্রক্ষেতে, যার অংশ আজ ইরাক, সিরিয়া, তুরস্ক। দ্বিতীয়টি ‘জেবু’ বা কুঁজোওয়ালা গরু- যারা উষ্ণ আবহাওয়ায় বাস করে। এদের গৃহপালিত হতে শুরু করে প্রায় ৮ হাজার বছর আগে সিন্ধু সভ্যতার এলাকায়, আজকের পাকিস্তান ও ভারত।
তবে গবেষকেরা ‘উন্নত’ প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ দেখতে চান ‘গৃহপালিত কৌশলের’ ছবি। যেখানে গরুর সংখ্যা স্পষ্টভাবে নিয়ন্ত্রিত। সেই সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়ার নিরিখে ছাগল (১০,২০০ বছর আগে) কিছুটা হলেও গরুকে (১০,৫০০ বছর আগে) টেকনিক্যালি হারিয়ে দেয়। কারণ গরু যেখানে প্রায় ৮০টি মাত্র স্ত্রী উরো (বন্য গরু) থেকে গৃহপালিত হয়েছিল, সেখানে ছাগলের নিয়ন্ত্রিত কৌশল ও সংখ্যার প্রমাণ আরও সুনির্দিষ্ট ও পুরোনো।
তাহলে কেন ছাগল এগিয়ে গেল? কারণটা খুব মজার। গবেষকেরা মনে করেন, ছাগল ছিল ‘আদর্শ পরীক্ষামূলক প্রাণী’। তাদের ছোট আকার, সহজে নিয়ন্ত্রণযোগ্য স্বভাব আর নানা পরিবেশে খাপ খাওয়ানোর ক্ষমতা- এই সব কারণেই মানুষ প্রথমে ছাগলের দিকে হাত বাড়ায়। অন্যদিকে বন্য গরু (উরো) ছিল ভয়ংকর। পূর্ণবয়স্ক একটি উরো ওজনে প্রায় এক টন! শিকারে যাওয়া বিপজ্জনক, পোষ মানাতো তো দূরের কথা। তাই মানুষ প্রথমে বেছে নিয়েছে সহজ শিকার ছাগলকে।
গরু যদিও শুরুতে পিছিয়ে ছিল, একবার গৃহপালিত হওয়ার পর প্রভাব ছাপিয়ে যায়। গরুর মাংস ও দুধের উৎপাদনশীলতা অনেক বেশি। একইসঙ্গে গরু চাষের ‘ইঞ্জিন’ হিসেবে কাজ করেছে, যা কৃষি বিপ্লবের ধারক। ছাগল ‘অগ্রদূত’ হয়ে এলেও, গরু পরিণত হয়েছিল ‘প্রযুক্তির’ প্রতীকে। এই প্রতিযোগিতায় ‘কে আগে’- ধু ইতিহাসের হিসাব, ব্যবহারিক সাফল্যের নয়।
শুধু সময়ের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে নয়, ছাগল আরেকটি জায়গায় বিস্ময় বটে। গবেষকরা ছাগলের জিনোম বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, প্রায় ৭ হাজার ২০০ বছর আগে এক বন্য ছাগলের প্রজাতি (ওয়েস্ট ককেশিয়ান টার) থেকে ‘মিউকিন’ নামে এক জিন ছাগলে ঢুকে পড়ে। এই জিনটি ছাগলের পাকস্থলীর আস্তরণে কাজ করে, আর এটি পরজীবী প্রতিরোধে দারুণ কার্যকর।
এই জিনটি ছাগলের দেহে এতটাই কার্যকরী প্রমাণিত হয় যে মাত্র হাজার বছরের মধ্যেই তা ছাগলের ৬০ ভাগ জনগোষ্ঠীতে ছড়িয়ে পড়ে। গবেষকেরা বলছেন, এটি এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার মানে হলো- মানুষের ‘সুস্থ প্রাণী পাওয়ার তীব্র ইচ্ছা’। অর্থাৎ, সহজে পোষ মানার পরেও ছাগলকে টিকে থাকতে হয়েছে রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করে, আর মানুষ সেদিকেও সাহায্য করেছে।
তাহলে ছাগলই প্রথম। সময়ের নিরিখে, প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের সুনির্দিষ্টতার নিরিখে ছাগল এগিয়ে। গরু এসেছে তার কিছু পরে। কিন্তু আরও বিস্তৃত ভৌগোলিক পরিধিতে।
তবে ইতিহাসের এই প্রতিযোগিতা শেষ পর্যন্ত জিতেছে মানবসভ্যতা। ছাগলের দুধ, মাংস আর চামড়া যেমন পথ দেখিয়েছে, গরু তেমনি কৃষির চাকা ঘুরিয়েছে। আজকের বিশ্বে যখন কোরবানি হয়, প্লেটে মাংস আসে- সেখানেই বেঁচে আছে গরু-ছাগলের সেই দশ হাজার বছরের পুরোনো গল্প। গল্পটা সময়ের, বিবর্তনের আর এক সুন্দর সহাবস্থানের।

বুধবার, ২৭ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৭ মে ২০২৬
ঈদুল আজহা আসলেই চারপাশে আলোচনা শুরু হয় গরু, ছাগল আর কোরবানির পশু নিয়ে। কিন্তু কখনো কি ভেবেছেন, মানবসভ্যতার ইতিহাসে এই দুটি প্রাণীর মধ্যে কে আগে মানুষের হাতে গৃহপালিত হলো? কে প্রথম আমাদের পূর্বপুরুষের আঙিনায় পা রেখেছিল? উত্তরের সন্ধানে ফিরে যেতে হবে প্রায় দশ হাজার বছর আগে, যখন মানুষ প্রথম কৃষিজীবী হওয়ার পথে পা বাড়াচ্ছিল।
ইরানের জাগরোস পর্বতমালার গঞ্জ দারেহ প্রত্নস্থলটি যেন ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী। এখানে পাওয়া গেছে প্রায় ১০ হাজার ২০০ বছর আগের ছাগলের হাড়। সেই হাড়গুলো শুধু সময়ের হিসাব দেয়নি, বলেছে আরও অনেক কিছু।
কীভাবে বুঝলেন এগুলো গৃহপালিত ছাগলের হাড়? গবেষকদের চোখ ফসকায়নি। তারা দেখেছেন, এখানে পুরুষ ছাগলকে নির্দিষ্ট বয়সে জবাই করা হতো। কিন্তু স্ত্রী ছাগলকে বাঁচিয়ে রাখা হতো। এই কৌশলটা আজকের মাঠের রাখালদের মতো- অর্থাৎ মানুষের ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ, বন্য প্রাণীতে যা ছিল না।
আরও মজার তথ্য হলো, এই প্রাচীন ছাগলগুলো দেখতে আজকের ছাগলের মতো ছিল না। তাদের ছিল বন্য বেজোয়ার আইবেক্সের মতো বড় বাঁকা শিং, আর শক্ত মজবুত দেহ। সেটেলমেন্টের ইটগুলোর ওপর এখনও দেখা যায় ছাগলের খুরের ছাপ- যেন ইতিহাসের এক ফ্রেমবন্দি ছবি।
জিন বিজ্ঞানের আরেকটি গবেষণা জানায়, বেশির ভাগ আধুনিক গৃহপালিত ছাগলের শিকড় এসেছে দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্ক ও জাগরোস পর্বতমালা থেকে। প্রায় ১০ হাজার ৫০০ বছর আগে তুরস্কের একটি অঞ্চল আর প্রায় ১০ হাজার বছর আগে জাগরোসের আরেকটি অঞ্চল- দুটি জায়গাতেই স্বাধীনভাবে হয়েছিল ছাগল গৃহপালনের ঘটনা।
আরও চমক লাগার মতো তথ্য হলো, বিজ্ঞানীরা হিসেব করে দেখেছেন, আজকের প্রায় ৯০ ভাগ গৃহপালিত ছাগলই এসেছে তুরস্কের সেই একটি অঞ্চল থেকে।
ছাগলের গল্প শুনে ভাবছেন, তাহলে গরু কোন যুদ্ধে হেরে গেল? না, হেরে যায়নি। গরু এসেছে প্রায় একই সময় পরিধিতে কিন্তু পরিসংখ্যানে একটু ‘পিছিয়ে’।
গরুর গৃহপালনের ঘটনা ঘটেছে দুটি ভিন্ন স্থানে। প্রথমটি ‘টরিন’ গরু - যাদের আমরা ইউরোপ ও শীতল অঞ্চলে দেখি। এদের গৃহপালন শুরু হয় প্রায় ১০ হাজার ৫০০ বছর আগে উর্বর চন্দ্রক্ষেতে, যার অংশ আজ ইরাক, সিরিয়া, তুরস্ক। দ্বিতীয়টি ‘জেবু’ বা কুঁজোওয়ালা গরু- যারা উষ্ণ আবহাওয়ায় বাস করে। এদের গৃহপালিত হতে শুরু করে প্রায় ৮ হাজার বছর আগে সিন্ধু সভ্যতার এলাকায়, আজকের পাকিস্তান ও ভারত।
তবে গবেষকেরা ‘উন্নত’ প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ দেখতে চান ‘গৃহপালিত কৌশলের’ ছবি। যেখানে গরুর সংখ্যা স্পষ্টভাবে নিয়ন্ত্রিত। সেই সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়ার নিরিখে ছাগল (১০,২০০ বছর আগে) কিছুটা হলেও গরুকে (১০,৫০০ বছর আগে) টেকনিক্যালি হারিয়ে দেয়। কারণ গরু যেখানে প্রায় ৮০টি মাত্র স্ত্রী উরো (বন্য গরু) থেকে গৃহপালিত হয়েছিল, সেখানে ছাগলের নিয়ন্ত্রিত কৌশল ও সংখ্যার প্রমাণ আরও সুনির্দিষ্ট ও পুরোনো।
তাহলে কেন ছাগল এগিয়ে গেল? কারণটা খুব মজার। গবেষকেরা মনে করেন, ছাগল ছিল ‘আদর্শ পরীক্ষামূলক প্রাণী’। তাদের ছোট আকার, সহজে নিয়ন্ত্রণযোগ্য স্বভাব আর নানা পরিবেশে খাপ খাওয়ানোর ক্ষমতা- এই সব কারণেই মানুষ প্রথমে ছাগলের দিকে হাত বাড়ায়। অন্যদিকে বন্য গরু (উরো) ছিল ভয়ংকর। পূর্ণবয়স্ক একটি উরো ওজনে প্রায় এক টন! শিকারে যাওয়া বিপজ্জনক, পোষ মানাতো তো দূরের কথা। তাই মানুষ প্রথমে বেছে নিয়েছে সহজ শিকার ছাগলকে।
গরু যদিও শুরুতে পিছিয়ে ছিল, একবার গৃহপালিত হওয়ার পর প্রভাব ছাপিয়ে যায়। গরুর মাংস ও দুধের উৎপাদনশীলতা অনেক বেশি। একইসঙ্গে গরু চাষের ‘ইঞ্জিন’ হিসেবে কাজ করেছে, যা কৃষি বিপ্লবের ধারক। ছাগল ‘অগ্রদূত’ হয়ে এলেও, গরু পরিণত হয়েছিল ‘প্রযুক্তির’ প্রতীকে। এই প্রতিযোগিতায় ‘কে আগে’- ধু ইতিহাসের হিসাব, ব্যবহারিক সাফল্যের নয়।
শুধু সময়ের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে নয়, ছাগল আরেকটি জায়গায় বিস্ময় বটে। গবেষকরা ছাগলের জিনোম বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, প্রায় ৭ হাজার ২০০ বছর আগে এক বন্য ছাগলের প্রজাতি (ওয়েস্ট ককেশিয়ান টার) থেকে ‘মিউকিন’ নামে এক জিন ছাগলে ঢুকে পড়ে। এই জিনটি ছাগলের পাকস্থলীর আস্তরণে কাজ করে, আর এটি পরজীবী প্রতিরোধে দারুণ কার্যকর।
এই জিনটি ছাগলের দেহে এতটাই কার্যকরী প্রমাণিত হয় যে মাত্র হাজার বছরের মধ্যেই তা ছাগলের ৬০ ভাগ জনগোষ্ঠীতে ছড়িয়ে পড়ে। গবেষকেরা বলছেন, এটি এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার মানে হলো- মানুষের ‘সুস্থ প্রাণী পাওয়ার তীব্র ইচ্ছা’। অর্থাৎ, সহজে পোষ মানার পরেও ছাগলকে টিকে থাকতে হয়েছে রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করে, আর মানুষ সেদিকেও সাহায্য করেছে।
তাহলে ছাগলই প্রথম। সময়ের নিরিখে, প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের সুনির্দিষ্টতার নিরিখে ছাগল এগিয়ে। গরু এসেছে তার কিছু পরে। কিন্তু আরও বিস্তৃত ভৌগোলিক পরিধিতে।
তবে ইতিহাসের এই প্রতিযোগিতা শেষ পর্যন্ত জিতেছে মানবসভ্যতা। ছাগলের দুধ, মাংস আর চামড়া যেমন পথ দেখিয়েছে, গরু তেমনি কৃষির চাকা ঘুরিয়েছে। আজকের বিশ্বে যখন কোরবানি হয়, প্লেটে মাংস আসে- সেখানেই বেঁচে আছে গরু-ছাগলের সেই দশ হাজার বছরের পুরোনো গল্প। গল্পটা সময়ের, বিবর্তনের আর এক সুন্দর সহাবস্থানের।

আপনার মতামত লিখুন