সংবাদ

‘কিচেন কেবিনেট’ কী, উৎপত্তি কোথায়, কেন বিতর্ক


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৭ মে ২০২৬, ১০:১৭ পিএম

‘কিচেন কেবিনেট’ কী, উৎপত্তি কোথায়, কেন বিতর্ক
প্রতীকী ছবি।

রাজনীতির ভাষায় ‘কিচেন কেবিনেট’ শব্দটি শুনলেই অনেকের চোখের সামনে ভেসে ওঠে ডিপ স্টেটের মতো কোনো একটা চিত্র। যেখানে আনুষ্ঠানিক মন্ত্রিসভার বাইরে থাকা কয়েকজন আস্থাভাজন ব্যক্তি আড়াল থেকেই রাষ্ট্রের নাটাই ধরে রাখেন।

সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনায় শব্দটি বেশ আলোচিত।  তাই এই পরিভাষার উৎপত্তি কোথায়, ইতিহাস কী বলে আর বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এর প্রাসঙ্গিকতা কতটুকু- তা নিয়ে কৌতুহল বাড়ছেই।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘কিচেন কেবিনেট’ বলতে সরকারপ্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধানের ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন ব্যক্তিদের একটি অনানুষ্ঠানিক উপদেষ্টা বলয়কে বোঝায়। সাংবিধানিক বা আনুষ্ঠানিক মন্ত্রিসভার বাইরে অবস্থান করে এই গোষ্ঠীটি আড়াল থেকেই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও নীতিগত সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করে।

এ ধরনের বলয়ে সাধারণত সরকারপ্রধানের পরিবারের সদস্য, ঘনিষ্ঠ বন্ধু, রাজনৈতিকভাবে বিশ্বস্ত ব্যক্তি কিংবা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রের প্রভাবশালী বিশেষজ্ঞরা থাকেন। তাদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য- জনগণের কাছে সরাসরি জবাবদিহির কোনো বাধ্যবাধকতা তাদের নেই। এরাই হলেন প্রকৃত ‘ছায়াশাসক’।

রাজনীতিতে রান্নাঘর কেন: শব্দটির উৎপত্তি ঊনবিংশ শতাব্দীতে যুক্তরাষ্ট্রে। ১৮২৯ থেকে ১৮৩৭ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম প্রেসিডেন্ট ছিলেন অ্যান্ড্রু জ্যাকসন। তিনি ছিলেন এক কঠিন চরিত্রের মানুষ। আনুষ্ঠানিক মন্ত্রিসভার চেয়ে ব্যক্তিগত কিছু বন্ধু ও সাংবাদিকদের পরামর্শকে বেশি গুরুত্ব দিতেন।

সমালোচকেরা তখন ব্যঙ্গ করে বলতেন, এই ব্যক্তিরা হোয়াইট হাউসের মূল দরজা ব্যবহার না করে পেছনের দরজা বা ‘রান্নাঘরের পথ’ দিয়ে যাতায়াত করেন। সেই থেকেই রাজনীতিতে এই ছায়া নীতিনির্ধারক গোষ্ঠীকে বোঝাতে ‘কিচেন কেবিনেট’ বা ‘রান্নাঘরের মন্ত্রিসভা’ শব্দটির ব্যবহার শুরু হয়।

অর্থাৎ, যারা আনুষ্ঠানিক ক্ষমতার আসনে না বসেই আসল ক্ষমতা চালান- তারাই এই কিচেন কেবিনেটের সদস্য।

অ্যান্ড্রু জ্যাকসনের পর বিশ্বের নানা প্রান্তে বিভিন্ন রূপে দেখা গেছে এই কিচেন কেবিনেটের অস্তিত্ব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের ‘চুক্তি কমিটি’ ছিল এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক উপদেষ্টা পরিষদ। আমেরিকার প্রেসিডেন্টদের অনেকেরই নিজস্ব ছায়াসভা ছিল- যেখানে আনুষ্ঠানিক মন্ত্রীরা না জেনেও সিদ্ধান্ত হয়ে যেত।

শীতল যুদ্ধের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিকসনের ‘প্যালেস গার্ড’ কিংবা রোনাল্ড রিগানের ‘গভর্নরের কক্ষ’- এসবই ছিল কিচেন কেবিনেটেরই ভিন্ন নাম। আধুনিক যুগে এসে অনেক দেশেই এই প্রথা রয়ে গেছে, শুধু নাম বদলেছে।

বাংলাদেশে কীভাবে: সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘কিচেন কেবিনেট’ শব্দটি বারবার উচ্চারিত হচ্ছে। বিশেষ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণে কে কতটা প্রভাব রাখছেন- সেই আলোচনায় এটি চলে আসে। যখন আনুষ্ঠানিক মন্ত্রিসভার বাইরের কেউ সরকারের নীতি নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখেন, তখন তাকে কিচেন কেবিনেটের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

যে কোনো দেশের জন্যই এটি উদ্বেগের বিষয়। কারণ জনগণের কাছে জবাবদিহি না থাকা ব্যক্তিরা যখন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করেন, তখন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া দুর্বল হয়। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা- এই দুটি বিষয় সংকটের মুখে পড়ে।

শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের অনেক দেশেই কিচেন কেবিনেট বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসনে তার জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। ভারতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ঘনিষ্ঠ একটি গোষ্ঠী প্রকৃত ক্ষমতা চালায়- এমন অভিযোগ বারবার শোনা যায়।

তবে পার্থক্য হলো, যেসব দেশে সুসংহত প্রতিষ্ঠান ও শক্তিশালী সংসদীয় কমিটি আছে, সেখানে এই ছায়াতন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়। আর যেখানে দুর্বল প্রতিষ্ঠান, সেখানে কিচেন কেবিনেটই হয়ে ওঠে প্রকৃত শাসকচক্র।

কিচেন কেবিনেট শব্দটি আজ থেকে প্রায় ২০০ বছর আগের। অ্যান্ড্রু জ্যাকসনের রান্নাঘরের পথ দিয়ে যে বাস্তবতা শুরু হয়েছিল, তা আজও প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি আলোচিত হওয়ার মানে হলো- জনগণ সচেতন হয়েছে, স্বচ্ছতা চায়, জবাবদিহি চায়।

যদিও প্রতিটি সরকারেরই কিছু ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা থাকাটা অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু সমস্যা তখনই যখন সেই উপদেষ্টারাই প্রকৃত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হয়ে ওঠেন এবং আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু অনুমোদনকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। একটি সুস্থ গণতন্ত্রে কিচেন কেবিনেটের জায়গা হয় না। সেখানে আসনটি কেবল জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জন্য নির্ধারিত। 

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২৬


‘কিচেন কেবিনেট’ কী, উৎপত্তি কোথায়, কেন বিতর্ক

প্রকাশের তারিখ : ২৭ মে ২০২৬

featured Image

রাজনীতির ভাষায় ‘কিচেন কেবিনেট’ শব্দটি শুনলেই অনেকের চোখের সামনে ভেসে ওঠে ডিপ স্টেটের মতো কোনো একটা চিত্র। যেখানে আনুষ্ঠানিক মন্ত্রিসভার বাইরে থাকা কয়েকজন আস্থাভাজন ব্যক্তি আড়াল থেকেই রাষ্ট্রের নাটাই ধরে রাখেন।

সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনায় শব্দটি বেশ আলোচিত।  তাই এই পরিভাষার উৎপত্তি কোথায়, ইতিহাস কী বলে আর বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এর প্রাসঙ্গিকতা কতটুকু- তা নিয়ে কৌতুহল বাড়ছেই।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘কিচেন কেবিনেট’ বলতে সরকারপ্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধানের ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন ব্যক্তিদের একটি অনানুষ্ঠানিক উপদেষ্টা বলয়কে বোঝায়। সাংবিধানিক বা আনুষ্ঠানিক মন্ত্রিসভার বাইরে অবস্থান করে এই গোষ্ঠীটি আড়াল থেকেই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও নীতিগত সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করে।

এ ধরনের বলয়ে সাধারণত সরকারপ্রধানের পরিবারের সদস্য, ঘনিষ্ঠ বন্ধু, রাজনৈতিকভাবে বিশ্বস্ত ব্যক্তি কিংবা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রের প্রভাবশালী বিশেষজ্ঞরা থাকেন। তাদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য- জনগণের কাছে সরাসরি জবাবদিহির কোনো বাধ্যবাধকতা তাদের নেই। এরাই হলেন প্রকৃত ‘ছায়াশাসক’।

রাজনীতিতে রান্নাঘর কেন: শব্দটির উৎপত্তি ঊনবিংশ শতাব্দীতে যুক্তরাষ্ট্রে। ১৮২৯ থেকে ১৮৩৭ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম প্রেসিডেন্ট ছিলেন অ্যান্ড্রু জ্যাকসন। তিনি ছিলেন এক কঠিন চরিত্রের মানুষ। আনুষ্ঠানিক মন্ত্রিসভার চেয়ে ব্যক্তিগত কিছু বন্ধু ও সাংবাদিকদের পরামর্শকে বেশি গুরুত্ব দিতেন।

সমালোচকেরা তখন ব্যঙ্গ করে বলতেন, এই ব্যক্তিরা হোয়াইট হাউসের মূল দরজা ব্যবহার না করে পেছনের দরজা বা ‘রান্নাঘরের পথ’ দিয়ে যাতায়াত করেন। সেই থেকেই রাজনীতিতে এই ছায়া নীতিনির্ধারক গোষ্ঠীকে বোঝাতে ‘কিচেন কেবিনেট’ বা ‘রান্নাঘরের মন্ত্রিসভা’ শব্দটির ব্যবহার শুরু হয়।

অর্থাৎ, যারা আনুষ্ঠানিক ক্ষমতার আসনে না বসেই আসল ক্ষমতা চালান- তারাই এই কিচেন কেবিনেটের সদস্য।

অ্যান্ড্রু জ্যাকসনের পর বিশ্বের নানা প্রান্তে বিভিন্ন রূপে দেখা গেছে এই কিচেন কেবিনেটের অস্তিত্ব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের ‘চুক্তি কমিটি’ ছিল এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক উপদেষ্টা পরিষদ। আমেরিকার প্রেসিডেন্টদের অনেকেরই নিজস্ব ছায়াসভা ছিল- যেখানে আনুষ্ঠানিক মন্ত্রীরা না জেনেও সিদ্ধান্ত হয়ে যেত।

শীতল যুদ্ধের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিকসনের ‘প্যালেস গার্ড’ কিংবা রোনাল্ড রিগানের ‘গভর্নরের কক্ষ’- এসবই ছিল কিচেন কেবিনেটেরই ভিন্ন নাম। আধুনিক যুগে এসে অনেক দেশেই এই প্রথা রয়ে গেছে, শুধু নাম বদলেছে।

বাংলাদেশে কীভাবে: সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘কিচেন কেবিনেট’ শব্দটি বারবার উচ্চারিত হচ্ছে। বিশেষ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণে কে কতটা প্রভাব রাখছেন- সেই আলোচনায় এটি চলে আসে। যখন আনুষ্ঠানিক মন্ত্রিসভার বাইরের কেউ সরকারের নীতি নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখেন, তখন তাকে কিচেন কেবিনেটের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

যে কোনো দেশের জন্যই এটি উদ্বেগের বিষয়। কারণ জনগণের কাছে জবাবদিহি না থাকা ব্যক্তিরা যখন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করেন, তখন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া দুর্বল হয়। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা- এই দুটি বিষয় সংকটের মুখে পড়ে।

শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের অনেক দেশেই কিচেন কেবিনেট বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসনে তার জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। ভারতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ঘনিষ্ঠ একটি গোষ্ঠী প্রকৃত ক্ষমতা চালায়- এমন অভিযোগ বারবার শোনা যায়।

তবে পার্থক্য হলো, যেসব দেশে সুসংহত প্রতিষ্ঠান ও শক্তিশালী সংসদীয় কমিটি আছে, সেখানে এই ছায়াতন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়। আর যেখানে দুর্বল প্রতিষ্ঠান, সেখানে কিচেন কেবিনেটই হয়ে ওঠে প্রকৃত শাসকচক্র।

কিচেন কেবিনেট শব্দটি আজ থেকে প্রায় ২০০ বছর আগের। অ্যান্ড্রু জ্যাকসনের রান্নাঘরের পথ দিয়ে যে বাস্তবতা শুরু হয়েছিল, তা আজও প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি আলোচিত হওয়ার মানে হলো- জনগণ সচেতন হয়েছে, স্বচ্ছতা চায়, জবাবদিহি চায়।

যদিও প্রতিটি সরকারেরই কিছু ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা থাকাটা অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু সমস্যা তখনই যখন সেই উপদেষ্টারাই প্রকৃত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হয়ে ওঠেন এবং আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু অনুমোদনকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। একটি সুস্থ গণতন্ত্রে কিচেন কেবিনেটের জায়গা হয় না। সেখানে আসনটি কেবল জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জন্য নির্ধারিত। 


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত