সংবাদ

জ্বালানির দামবৃদ্ধিতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে: সিপিডি


অর্থনৈতিক বার্তা পরিবেশক
অর্থনৈতিক বার্তা পরিবেশক
প্রকাশ: ৪ জুন ২০২৬, ০৯:২০ পিএম

জ্বালানির দামবৃদ্ধিতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে: সিপিডি
সিপিডির কার্যালয়ে আয়োজিত ‘২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ অর্থনীতি: উত্তরণকালীন সময়ে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন

বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি দেশের মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করছে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। প্রতিষ্ঠানটির মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম নিম্নমুখী হওয়ার প্রবণতা থাকা সত্ত্বেও দ্বিতীয় দফায় দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত প্রয়োজনীয় ছিল না। একই সঙ্গে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব উৎপাদন, পরিবহন ও ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৪ জুন) রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে আয়োজিত ‘২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ অর্থনীতি: উত্তরণকালীন সময়ে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘দেশের অর্থনীতি এখনও বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকির মুখোমুখি। অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ আরও জটিল হয়ে উঠেছে।’ 

তিনি জানান, মূল্যস্ফীতি বর্তমানে অন্যতম বড় উদ্বেগের বিষয়। এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতির হার ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে পৌঁছেছে। জ্বালানি, পরিবহন ও বিভিন্ন সেবার ব্যয় বাড়তে থাকায় মূল্যস্ফীতির চাপও অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে, মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে না বাড়ায় সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমছে।

সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত ডিজেলের দাম প্রায় ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতে। ফলে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে বাজারে বিভিন্ন পণ্যের দামও বাড়তি চাপের মুখে পড়েছে।

রান্নার গ্যাসের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। সংস্থাটির তথ্য বলছে, মার্চ মাসে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৩৪১ টাকা, যা জুন মাসে বেড়ে ১ হাজার ৮৮৫ টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে দাম বেড়েছে ৪০ শতাংশেরও বেশি।

সিপিডির মতে, মূল্যস্ফীতি বাড়ার পেছনে শুধু জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিই নয়, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও ভূমিকা রাখছে। ফাহমিদা খাতুন বলেন, উৎপাদক থেকে ভোক্তার হাতে পণ্য পৌঁছাতে মধ্যস্বত্বভোগীর একাধিক স্তর থাকায় খুচরা বাজারে অনেক পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন সীমিত আয়ের মানুষ।

সংবাদ সম্মেলনে সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী হেলেন মাশিয়াত বলেন, ‘দ্বিতীয় দফায় জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতা স্পষ্ট নয়। তার মতে, কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী গ্রাহকদের সুরক্ষা দিয়ে উচ্চ ব্যবহারকারীদের জন্য ভিন্ন মূল্যহার নির্ধারণ করা যেতে পারত।’

সংস্থাটি আরও মনে করে, বিদ্যুতের দাম বাড়ার ফলে শিল্প ও উৎপাদন খাতে ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। শেষ পর্যন্ত সেই অতিরিক্ত ব্যয় পণ্যের দামের মাধ্যমে ভোক্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে এবং মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে। একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণে ঘাটতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং আর্থিক খাতের বিভিন্ন সমস্যাও অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির বোঝা সরাসরি ভোক্তাদের ওপর পড়বে। তবে যথাযথ নীতিগত উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে এর নেতিবাচক প্রভাব কিছুটা কমিয়ে আনা সম্ভব।’

সংস্থাটি আরও উল্লেখ করেছে যে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এখনও রাজস্ব আহরণের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পিছিয়ে রয়েছে। পাশাপাশি খেলাপি ঋণের পরিমাণ কিছুটা কমলেও ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।

এদিকে, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম পে-স্কেল কার্যকর করা হলে বাজারে অর্থের প্রবাহ ও চাহিদা বৃদ্ধি পেতে পারে। সিপিডির আশঙ্কা, এর ফলে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬


জ্বালানির দামবৃদ্ধিতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে: সিপিডি

প্রকাশের তারিখ : ০৪ জুন ২০২৬

featured Image

বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি দেশের মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করছে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। প্রতিষ্ঠানটির মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম নিম্নমুখী হওয়ার প্রবণতা থাকা সত্ত্বেও দ্বিতীয় দফায় দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত প্রয়োজনীয় ছিল না। একই সঙ্গে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব উৎপাদন, পরিবহন ও ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৪ জুন) রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে আয়োজিত ‘২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ অর্থনীতি: উত্তরণকালীন সময়ে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘দেশের অর্থনীতি এখনও বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকির মুখোমুখি। অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ আরও জটিল হয়ে উঠেছে।’ 

তিনি জানান, মূল্যস্ফীতি বর্তমানে অন্যতম বড় উদ্বেগের বিষয়। এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতির হার ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে পৌঁছেছে। জ্বালানি, পরিবহন ও বিভিন্ন সেবার ব্যয় বাড়তে থাকায় মূল্যস্ফীতির চাপও অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে, মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে না বাড়ায় সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমছে।

সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত ডিজেলের দাম প্রায় ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতে। ফলে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে বাজারে বিভিন্ন পণ্যের দামও বাড়তি চাপের মুখে পড়েছে।

রান্নার গ্যাসের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। সংস্থাটির তথ্য বলছে, মার্চ মাসে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৩৪১ টাকা, যা জুন মাসে বেড়ে ১ হাজার ৮৮৫ টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে দাম বেড়েছে ৪০ শতাংশেরও বেশি।

সিপিডির মতে, মূল্যস্ফীতি বাড়ার পেছনে শুধু জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিই নয়, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও ভূমিকা রাখছে। ফাহমিদা খাতুন বলেন, উৎপাদক থেকে ভোক্তার হাতে পণ্য পৌঁছাতে মধ্যস্বত্বভোগীর একাধিক স্তর থাকায় খুচরা বাজারে অনেক পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন সীমিত আয়ের মানুষ।

সংবাদ সম্মেলনে সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী হেলেন মাশিয়াত বলেন, ‘দ্বিতীয় দফায় জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতা স্পষ্ট নয়। তার মতে, কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী গ্রাহকদের সুরক্ষা দিয়ে উচ্চ ব্যবহারকারীদের জন্য ভিন্ন মূল্যহার নির্ধারণ করা যেতে পারত।’

সংস্থাটি আরও মনে করে, বিদ্যুতের দাম বাড়ার ফলে শিল্প ও উৎপাদন খাতে ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। শেষ পর্যন্ত সেই অতিরিক্ত ব্যয় পণ্যের দামের মাধ্যমে ভোক্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে এবং মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে। একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণে ঘাটতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং আর্থিক খাতের বিভিন্ন সমস্যাও অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির বোঝা সরাসরি ভোক্তাদের ওপর পড়বে। তবে যথাযথ নীতিগত উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে এর নেতিবাচক প্রভাব কিছুটা কমিয়ে আনা সম্ভব।’

সংস্থাটি আরও উল্লেখ করেছে যে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এখনও রাজস্ব আহরণের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পিছিয়ে রয়েছে। পাশাপাশি খেলাপি ঋণের পরিমাণ কিছুটা কমলেও ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।

এদিকে, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম পে-স্কেল কার্যকর করা হলে বাজারে অর্থের প্রবাহ ও চাহিদা বৃদ্ধি পেতে পারে। সিপিডির আশঙ্কা, এর ফলে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত