প্রয়াত নাসরীন কাদের সিদ্দিকী মানে আমাদের ডানুভাবির প্রয়াণের এক বছর পূর্ণ হয়েছে ৭ জুন| এই লেখাটি লিখেছিলাম তাঁর হঠাৎ স্ট্রোকে মৃত্যুর খবর শুনে| এজন্যে একটু পেছন ফিরে দেখছিলাম আমাদের দীর্ঘ সম্পর্কের মিথস্ক্রিয়ায় কীভাবে আমি ও কবি রফিক আজাদ— আমরা জড়িয়ে ছিলাম তাঁদের আনন্দ-বেদনায় ও দুঃখদিবসে|
বঙ্গবীরের স্ত্রী হিসেবেই চিনি এবং জানি তাকে| তারও আগে মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম এক সূর্যসন্তান হিসেবে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীকে স্বচক্ষে প্রথম দেখি ১৯৮৬ সালে| তখন তিনি বর্ধমানে নির্বাসিত জীবন-যাপন করছিলেন|
সে বছর অযোধ্যার বাবরি মসজিদ ভাঙার প্রতিবাদে কলকাতার রবীন্দ্রসদনে দুই বাংলার কবিদের নিয়ে কবিতা পাঠের বিশাল আয়োজন হয়েছিলো| বাংলাদেশ থেকে কবি শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, বেলাল চৌধুরী, রফিক আজাদ, রবিউল হুসাইন, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, ত্রিদিব দস্তিদারসহ আরো অনেকে গেছিলেন|
আবৃত্তি শিল্পী ক্যামেলিয়া মুস্তফা, মারিয়াম মান্নান ছিলেন| ওপার বাংলার অনেকেই| ওদের নাম মনে করতে পারছি না| আমিও নিমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে দুবছর বয়েসী পুত্র অভিন্ন ও আমার মাকে সঙ্গে নিয়ে গেছিলাম| প্রথম দিনের কবিতা পাঠের পরে স্টেজ থেকে নেমেই দেখি— রফিক আজাদের সঙ্গে মুখোমুখি গভীর অভিনিবেশে কথা বলছেন একজন ল¤^া-চওড়া সুদর্শন ব্যক্তিত্ব|
আমি তাদের দিকে এগিয়ে যেতেই কবি রফিক আজাদ খুব গৌরবের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন— ইনি সেই ¯^নামধন্য বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী| যাঁর কথা তোমাকে প্রায়ই বলেছি| ওঁর অধীনেই আমি সম্মুখযুদ্ধ করেছি টাঙ্গাইল ১১ ন¤^র সেক্টরে| তাঁর পরিচয় পেয়ে বিস্মিত, হতবিহ্বল এবং খুব রোমান্সিত বোধ করলাম| সালাম দেবার পর আমার ঠোঁট থেকে কথারা সব হারিয়ে গেলো একযোগে| তিনি এসেছেন মূলত কদিনের জন্যে রফিক আজাদকে সপরিবারে বর্ধমানে নিয়ে যেতে|
কোনো “না” চলবে না— এ জন্যে নিজে এসেছেন|
কিন্তু পরের দিন আমাদের সকলের কবিতা পাঠ ছিলো কুচবিহারে| বিশেষভাবে আমন্ত্রিত প্রধান অতিথি সেদিন রফিক আজাদ— কিছুতেই কবিতা পাঠ বাদ দিয়ে তাঁর সঙ্গে বর্ধমান যেতে রাজি হতে পারছেন না| অগত্যা সপুত্র আমি এবং আমার মাকেসহ ঐদিনই বঙ্গবীরের সঙ্গে আমাদের বর্ধমান পাঠিয়ে দিলেন| নিজে রয়ে গেলেন কবিতার টানে| ২/৩ দিন পরে আমাদের সঙ্গে মিলিত হবেন— এই আশ্বাসে মুক্তি পেলেন|
২.
শিয়ালদা থেকে ট্রেনে চেপে তিনি আমাদের নিয়ে যাচ্ছেন বর্ধমানে| সারা পথ তিনি নিজের বহন করা ফ্লাস্ক থেকে শুধু পানি পান করলেন| বিভিন্ন স্টেশনে ট্রেন থামলেই নানা ধরনের খাবার সাজিয়ে উঠছে দোকানিরা| তিনি আমাদের কিছু খেতে বলছেন না, নিজেও খাচ্ছেন না| একটু অবাকই হলাম|
পরে এই ব্যাপারটি নিয়ে কবিকে প্রশ্ন করে জেনেছিলাম যে, বাংলাদেশের এত বড় নেতা তার খাওয়ার মধ্যে কিছু মিশিয়ে দিতে পারে যে কেউ— এজন্যে এসব বাইরের খাবার তার জন্যে নিষেধ আছে রাষ্ট্রীয়ভাবে| অনেক রাতে বর্ধমানে বঙ্গবীরের বাসায় খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম|
পরদিন তার অত্যন্ত বিশ্বস্ত প্রাইভেট সেক্রেটারি ফরিদ আহমেদ নাস্তার পরে বড় একটা এ্যালবাম এনে মেলে ধরলো| কিছুকাল আগে ডানুভাবির সঙ্গে বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে বঙ্গবীরের| মেহেদি রাঙা হাতে ভাবির সেসব ছবিগুলো দেখালো| এবং জানালো যে, সপ্তাহ খানেক আগেই ভাবি দেশে চলে গেছেন ফিরবেন ৪/৫ দিনের মধ্যে|
আমি ১৯৮১ সালের অক্টোবরে টাঙ্গাইল সরকারি কুমুদিনী কলেজে প্রথম যোগদান করেছিলাম— সেই কলেজের বিদূষী অধ্যক্ষের কন্যা এই ডানু ভাবি| ভাবতেই মনে হলো নিশ্চয় তিনি গুণী মায়ের গুণী সন্তান হিসেবে বঙ্গবীরের যোগ্য সহধর্মিনী হবেন| আমার মাকে নিয়ে তিন দিন ছিলাম সেখানে| ফরিদ ছিলো আমাদের সার্বক্ষণিক সঙ্গী| বঙ্গবীরের নির্দেশে ফরিদ আমাদের সঙ্গে নিয়ে সাইটসিঙ করালো|
মায়ের জন্যে ঝড়ের রাতে সাঁতরে পার হওয়া বিদ্যাসাগরের সেই দামোদর নদী দেখে সত্যি নিজেকে ভাগ্যবতী মনে হলো| মনশ্চক্ষে যেন দেখতে পারছিলাম ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে— ঝড়ো অন্ধকারে সাঁতরে পার হচ্ছেন তিনি দামোদর... সমুখে দাঁড়িয়ে আছেন মা-ঈশ্বর!
ফিরে এসে দুপুরের লাঞ্চে যোগ দিলাম বঙ্গবীরের সঙ্গে| তাকে খুব স্বল্পভাষী মনে হলো| বড় একটি কাঁসার থালায় আহার করেন তিনি| খাবার টেবিলে টুকটাক সংসারের কথা হলো| ডানু ভাবির কথা কিছু বললেন, প্রসঙ্গত আমি জানালাম, ডানুভাবির মাকেও আমি চিনি ও জানি| কুমুদিনী কলেজে চাকুরি সুবাদে তিনি আমার অধ্যক্ষ-বস ছিলেন| যতদূর মনে পড়ে তিনি আমাকে বৌমা বলে সম্বোধন করেছিলেন| আমাদের সন্তান অভিন্নকে কাছে ডেকে নিয়েছেন আদর আহ্লাদে| দুবছর বয়েসী অভিন্ন তখন গুটুগুটু করে হাঁটে-দৌঁড়ায়| ঢাকা এয়ারপোর্টের প্লেন থেকে যারা বা যে দেখেছে— দেবতুল্য এই শিশুটির মায়ায় পড়ে— কাছে ডেকে আদর করেছে| বর্ধমান থেকে যেদিন ফিরে আসবো— ঝকঝকে সোনালি সকালে বঙ্গবীর জলপাই রঙের প্রিন্টের মাহিসুর সিল্কের একটা শাড়ি আমার হাতে দিয়ে বললেন ঢাকায় গিয়ে এটা পরো| জ্বি বলে আমিও তার হাত থেকে নিঃসঙ্কোচ চিত্তে উপহারটি গ্রহণ করলাম| মনে মনে ভাবলাম, এত বড় যোদ্ধা, মহান একাত্তরের রণক্ষেত্র যার ধ্যান-জ্ঞান— তিনি পারিবারিক এসব শিষ্টাচার ও সৌজন্েযর কায়দা-কানুন কী করে জানলেন!
নিশ্চয় মা-বোনদের দেখে আত্মস্থ করেছেন বাঙালি কালচারের ভালোবাসা ও আদান-প্রদানের রীতিনীতি| তাঁর হাত থেকে উপহার পেয়ে আমিও খুব হৃষ্টচিত্তে ফিরে এলাম কলকাতায় খালুর বাড়িতে| পরবর্তী সময়ে তাঁর “স্বাধীনতা-৭১” লেখা শেষ হতেই রফিক আজাদ বর্ধমানে তাঁর বাসভবনে বেশ কয়েকদিন থেকে বইয়ের বানান ও সার্বিক প্রুফ দেখে পাণ্ডুলিপি রেডি করে দিয়ে এসেছিলেন, বঙ্গবীরের একান্ত আগ্রহেই| এরপর অবশ্য তাঁর “কাদেরিয়া বাহিনীর জনযুদ্ধ”, বজ্রকণ্ঠ, পিতা-পুত্র নামে বেশ কয়েকটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে| দেশে ফেরার পরে বইমেলায় দেখা হয়েছে— আমাদের কথা হয়েছে একজন লেখক কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে| রফিক আজাদের প্রয়াণের খবর পাওয়ামাত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যালে যেমন ছুটে এসেছেন, তেমনি কবির চল্লিশ দিনের অনুষ্ঠানে সরাসরি ঢাকা থেকে গুণী গ্রামে উপস্থিত হয়ে কথা বলতে বলতে কেঁদেছেন| দেশপ্রেমিক একজন সহযোদ্ধার প্রতি যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছেন তিনি অকৃপণ হস্তে|
৩.
মাকে নিয়ে ফিরে এলাম বালিগঞ্জের কৃষ্টফার রোডের পীরবাড়ি| সেই সময়ের গদ্দিনসীন পীর সাহেব ছিলেন মায়ের বড়বোন রাশেদা খালার স্বামী| আমার খালার মেয়ে আবেদা আপাকে জন্ম দিয়ে পরপারে চলে গেছেন বহু আগে| পরে আমার খালু খুলনার সম্ভ্রান্ত বংশীয় একজন সুশ্রী ও ফরসা মেয়েকে বিয়ে করেন|
তার গর্ভেও মুন্নী নামে এক কন্যা সন্তান রয়েছে তাদের| কিন্তু বরাবরই আমার মায়ের সঙ্গে খালু-খালার একটা চমৎকার সম্পর্ক সুমধুর গতিতে এগিয়ে গেছে| বাড়িতে দোকানী ডেকে মায়ের নিজের পছন্দ মতো শাড়ি ও দুটো শাল উপহার দিলেন পীরখালু| বলতে গেলে, ভক্ত, শিষ্যদের উপঢৌকন রাখার জন্যে পীরবাড়িতে যখন আর জায়গা থাকে না, তখন সেসব খাদ্যকণায় খাটেরতলা টইটুম্বর হয়ে ওঠে| বেদান-আঙুর-আপেল ছাড়াও নানা রকম ফল-মূলে ঠাসা থাকে সর্বক্ষণ|
এত ফলমূল যে, হঠাৎ দেখি অভিন্ন একটা আপেল দিয়ে ফুটবল খেলছে তার ছোট্ট দুটো পায়ে| এ বাড়িতেও তার আদরের সীমারেখা নেই| কাজেই যা ইচ্ছে, যেখানে ইচ্ছে ঢুকে যাচ্ছে| আমার খালাতো বোন আবেদাবু খুব সুন্দর নীল রঙ্গের একটা ড্রেস কিনে দিয়েছিলো, খুব মানিয়েছিলো ছোট্ট অভিন্নকে|
কলকাতার সর্বশেষ দিনে রবীন্দ্র সদনে একটি অনুষ্ঠানে কবিতা পড়ে সকলের সঙ্গে আমরাও দেশে ফিরে আসি|
৪.
আমরা দেশে ফিরে আসার ২/৩ মাস পরেই ডানুভাবি আমাকে ও রফিক আজাদকে ডেকে পাঠালেন| লক্ষ্য হলো কাদের সিদ্দিকীকে দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রত্যাবর্তন কমিটি গঠিত হয়েছে— সেখানে আমাদের দুজনকে কাজ করতে হবে| পাড়ামহল্লার মিটিং এ উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখতে হবে| চাকুরির কারণে আমি সব মিটিং-এ যেতে পারি না|
কিন্তু অন্যান্য সহযোদ্ধাদেরকে সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন জেলায় জেলায় মিটিং, আলোচনা সভা করতে হয় ডানু ভাবিকে| সঙ্গে থাকেন অধিকাংশ ১১নং সেক্টরের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই| বীরভোগ্যা স্বামীকে দেশে ফিরিয়ে আনার আন্তর গরজে ডানুভাবি লাগাতার মিটিং করে চলেছেন| অনিয়মিত খাওয়া দাওয়া ও পানির অভাবে তিনি এক সময় অসুস্থ হয়ে পড়েন| ইউরিন ইনফেকশন হয়ে ব্লাড যেতে শুরু করেছিলো|
আমি তাকে বললাম, ভাবি, এভাবে ইউরিন চেপে সারাদিন মিটিং করতে পারবেন না| আপনাকে পানি খেতে হবে এবং বাথরুমেও যেতে হবে| এ নিয়ে লজ্জা করলে জানে মারা পড়বেন কিন্তু| এরপর থেকে ভাবি সঙ্গে পানির বোতল ক্যারি করতেন| সদ্য বিবাহিত নারী, উপরন্তু স্বনামধন্য স্বামীকে দেশে ফিরিয়ে আনবার লড়াইয়ে নেমেছেন| আমজনতার সঙ্গে মিলেমিশে রাজনৈতিক দীক্ষাও হয়ে যাচ্ছে তাঁর| কিন্তু নারীর অন্যতম ভূষণ লাজুকতা তাকে ছাড়ছিলো না— এটাই সমস্যা| এজন্যে প্রাকৃতিক কাজ চেপে রেখে— স্বাস্থ্যের বারোটা বাজিয়েছিলেন| পরে অবশ্য আমার কথায় তিনি পানি পান করতেন নিয়মিত| একবার ঢাকার কোনো একটা আঞ্চলিক মিটিং শেষ করে আমাদের বাসায় একদিন দুপুরে খেয়েছিলেন— সে কথা প্রায়ই স্মরণ করতেন| কিছুকাল আগেও ভাবির বাসায় যখন দেখা হলো, ভাবি বলছিলেন, আপনার বাসায় যে কচু দিয়ে ইলিশমাছ রান্না খেয়েছিলাম— মাঝে মধ্যে মনে হয় সে কথা|
আমি বললাম, ভাবি, আসুন না আর একদিন আমি ওমন করেই রান্না করে খাওয়াবো আপনাকে| বললেন, অবশ্যই যাবো|
ডানুভাবির নেতৃত্বে প্রত্যাবর্তন কমিটির উদ্যোগ এবং কার্যকরী পদক্ষেপের কারণেই বঙ্গবীরের বাংলাদেশে ফেরা সম্ভব ও সহজ হয়েছিলো|
যেদিন দেশে আসলেন হাজার জনতার ভিড় ঠেলে ডানুভাবির বারর রোডের বাসায় কবিসহ আমিও উপস্থিত ছিলাম| খবর পেয়ে ডানুভাবি আমাদের উপরে ডেকে নিয়ে আলাদাভাবে আপ্যায়ণ করেছিলেন ভীষণ কৃতজ্ঞচিত্তে|
অতীত না ভোলা মানুষ এই ডানুভাবি, যার যা প্রাপ্য মর্যাদা সেটি তিনি দিতে জানতেন| একজন শিক্ষাবিদের সন্তান হিসেবে পরমত সহিষ্ণুতা শিষ্টাচার ও সৌজন্যবোধে অসাধারণ নমনীয় নারী ব্যক্তিত্বের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিলেন তিনি|
কাদের সিদ্দিকী পরিবারের এক বোনের সঙ্গে আমার ভাসুরের বিয়ে হয়েছিলো, উপরন্তু বঙ্গবীরের অধিনায়কত্বে টাঙ্গাইলের ১১ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেছেন কবি রফিক আজাদ| সেই সূত্রে ঐ পরিবারের সঙ্গে ঘণিষ্ঠতা ছিলো পূর্বাপর|
সেলিনা সিদ্দিকী শুশু এই পরিবারের মেঝো মেয়ে থাকে টরন্টোতে| সেখানেই তার সঙ্গে আমার বন্ধুত্বটি গাঢ় হয়েছে— ফলে শুশু বাংলাদেশে এলে বঙ্গবীরের বাবর রোডের বাড়িতে পুনরায় নতুন করে যাওয়া-আসা হতো| বঙ্গবীরকে ওরা ছোটভাই ডাকতো, আমিও তাই ডাকতাম| কিছুকাল আগে বঙ্গবীরকে আমার কয়েকটি বই দিতে গেছিলাম তাঁর বাবর রোডের বাসায়| সেদিন সন্ধ্যায় তিনি টাঙ্গাইল থেকে ফিরেছেন সবে| ফলে অবিন্যস্ত অবস্থায় ছবি তুলতে কিছুতে রাজি হলেন না| অন্য আর একদিন তুলবো বলে আমাকে নিরস্ত করলেন| সেদিন ডানুভাবির খুব ইচ্ছে ছিলো তিনি ছবি তুলবেন, কিন্তু নটরাজ যখন রাজি হলেন না, তখন পার্বতীও নিজের ইচ্ছে-সাধ চেপে গেলেন|
খুব আফসোস হয়, সেদিন ভাবির সঙ্গে কেন আলাদা করে ছবি তুললাম না| সেদিনই ছিলো তাঁর সঙ্গে আমার শেষ দেখা| তার হাতে তুলে দেয়া শেষ চমচম খাওয়ার সন্ধ্যা! টাঙ্গাইল থেকে সদ্য আসা বড় আকারের একটা চমচম খেতে দিয়েছিলেন ভাবি আমাকে| এর মাস খানেক পরেই বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো জগতের সকল মোহমায়া ত্যাগ করে চলে গেলেন অনন্তবাসের ঠিকানায়| পেছনে আপনার স্বামী ও সন্তানেরা হারালো আপনার মমতাময়ী মুখ, মুখের স্নেহকাতর ভাষা ও ভালোবাসা| অনন্তবাসে তবুও শান্তিতে থাকুন আপনি|

বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১১ জুন ২০২৬
প্রয়াত নাসরীন কাদের সিদ্দিকী মানে আমাদের ডানুভাবির প্রয়াণের এক বছর পূর্ণ হয়েছে ৭ জুন| এই লেখাটি লিখেছিলাম তাঁর হঠাৎ স্ট্রোকে মৃত্যুর খবর শুনে| এজন্যে একটু পেছন ফিরে দেখছিলাম আমাদের দীর্ঘ সম্পর্কের মিথস্ক্রিয়ায় কীভাবে আমি ও কবি রফিক আজাদ— আমরা জড়িয়ে ছিলাম তাঁদের আনন্দ-বেদনায় ও দুঃখদিবসে|
বঙ্গবীরের স্ত্রী হিসেবেই চিনি এবং জানি তাকে| তারও আগে মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম এক সূর্যসন্তান হিসেবে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীকে স্বচক্ষে প্রথম দেখি ১৯৮৬ সালে| তখন তিনি বর্ধমানে নির্বাসিত জীবন-যাপন করছিলেন|
সে বছর অযোধ্যার বাবরি মসজিদ ভাঙার প্রতিবাদে কলকাতার রবীন্দ্রসদনে দুই বাংলার কবিদের নিয়ে কবিতা পাঠের বিশাল আয়োজন হয়েছিলো| বাংলাদেশ থেকে কবি শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, বেলাল চৌধুরী, রফিক আজাদ, রবিউল হুসাইন, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, ত্রিদিব দস্তিদারসহ আরো অনেকে গেছিলেন|
আবৃত্তি শিল্পী ক্যামেলিয়া মুস্তফা, মারিয়াম মান্নান ছিলেন| ওপার বাংলার অনেকেই| ওদের নাম মনে করতে পারছি না| আমিও নিমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে দুবছর বয়েসী পুত্র অভিন্ন ও আমার মাকে সঙ্গে নিয়ে গেছিলাম| প্রথম দিনের কবিতা পাঠের পরে স্টেজ থেকে নেমেই দেখি— রফিক আজাদের সঙ্গে মুখোমুখি গভীর অভিনিবেশে কথা বলছেন একজন ল¤^া-চওড়া সুদর্শন ব্যক্তিত্ব|
আমি তাদের দিকে এগিয়ে যেতেই কবি রফিক আজাদ খুব গৌরবের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন— ইনি সেই ¯^নামধন্য বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী| যাঁর কথা তোমাকে প্রায়ই বলেছি| ওঁর অধীনেই আমি সম্মুখযুদ্ধ করেছি টাঙ্গাইল ১১ ন¤^র সেক্টরে| তাঁর পরিচয় পেয়ে বিস্মিত, হতবিহ্বল এবং খুব রোমান্সিত বোধ করলাম| সালাম দেবার পর আমার ঠোঁট থেকে কথারা সব হারিয়ে গেলো একযোগে| তিনি এসেছেন মূলত কদিনের জন্যে রফিক আজাদকে সপরিবারে বর্ধমানে নিয়ে যেতে|
কোনো “না” চলবে না— এ জন্যে নিজে এসেছেন|
কিন্তু পরের দিন আমাদের সকলের কবিতা পাঠ ছিলো কুচবিহারে| বিশেষভাবে আমন্ত্রিত প্রধান অতিথি সেদিন রফিক আজাদ— কিছুতেই কবিতা পাঠ বাদ দিয়ে তাঁর সঙ্গে বর্ধমান যেতে রাজি হতে পারছেন না| অগত্যা সপুত্র আমি এবং আমার মাকেসহ ঐদিনই বঙ্গবীরের সঙ্গে আমাদের বর্ধমান পাঠিয়ে দিলেন| নিজে রয়ে গেলেন কবিতার টানে| ২/৩ দিন পরে আমাদের সঙ্গে মিলিত হবেন— এই আশ্বাসে মুক্তি পেলেন|
২.
শিয়ালদা থেকে ট্রেনে চেপে তিনি আমাদের নিয়ে যাচ্ছেন বর্ধমানে| সারা পথ তিনি নিজের বহন করা ফ্লাস্ক থেকে শুধু পানি পান করলেন| বিভিন্ন স্টেশনে ট্রেন থামলেই নানা ধরনের খাবার সাজিয়ে উঠছে দোকানিরা| তিনি আমাদের কিছু খেতে বলছেন না, নিজেও খাচ্ছেন না| একটু অবাকই হলাম|
পরে এই ব্যাপারটি নিয়ে কবিকে প্রশ্ন করে জেনেছিলাম যে, বাংলাদেশের এত বড় নেতা তার খাওয়ার মধ্যে কিছু মিশিয়ে দিতে পারে যে কেউ— এজন্যে এসব বাইরের খাবার তার জন্যে নিষেধ আছে রাষ্ট্রীয়ভাবে| অনেক রাতে বর্ধমানে বঙ্গবীরের বাসায় খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম|
পরদিন তার অত্যন্ত বিশ্বস্ত প্রাইভেট সেক্রেটারি ফরিদ আহমেদ নাস্তার পরে বড় একটা এ্যালবাম এনে মেলে ধরলো| কিছুকাল আগে ডানুভাবির সঙ্গে বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে বঙ্গবীরের| মেহেদি রাঙা হাতে ভাবির সেসব ছবিগুলো দেখালো| এবং জানালো যে, সপ্তাহ খানেক আগেই ভাবি দেশে চলে গেছেন ফিরবেন ৪/৫ দিনের মধ্যে|
আমি ১৯৮১ সালের অক্টোবরে টাঙ্গাইল সরকারি কুমুদিনী কলেজে প্রথম যোগদান করেছিলাম— সেই কলেজের বিদূষী অধ্যক্ষের কন্যা এই ডানু ভাবি| ভাবতেই মনে হলো নিশ্চয় তিনি গুণী মায়ের গুণী সন্তান হিসেবে বঙ্গবীরের যোগ্য সহধর্মিনী হবেন| আমার মাকে নিয়ে তিন দিন ছিলাম সেখানে| ফরিদ ছিলো আমাদের সার্বক্ষণিক সঙ্গী| বঙ্গবীরের নির্দেশে ফরিদ আমাদের সঙ্গে নিয়ে সাইটসিঙ করালো|
মায়ের জন্যে ঝড়ের রাতে সাঁতরে পার হওয়া বিদ্যাসাগরের সেই দামোদর নদী দেখে সত্যি নিজেকে ভাগ্যবতী মনে হলো| মনশ্চক্ষে যেন দেখতে পারছিলাম ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে— ঝড়ো অন্ধকারে সাঁতরে পার হচ্ছেন তিনি দামোদর... সমুখে দাঁড়িয়ে আছেন মা-ঈশ্বর!
ফিরে এসে দুপুরের লাঞ্চে যোগ দিলাম বঙ্গবীরের সঙ্গে| তাকে খুব স্বল্পভাষী মনে হলো| বড় একটি কাঁসার থালায় আহার করেন তিনি| খাবার টেবিলে টুকটাক সংসারের কথা হলো| ডানু ভাবির কথা কিছু বললেন, প্রসঙ্গত আমি জানালাম, ডানুভাবির মাকেও আমি চিনি ও জানি| কুমুদিনী কলেজে চাকুরি সুবাদে তিনি আমার অধ্যক্ষ-বস ছিলেন| যতদূর মনে পড়ে তিনি আমাকে বৌমা বলে সম্বোধন করেছিলেন| আমাদের সন্তান অভিন্নকে কাছে ডেকে নিয়েছেন আদর আহ্লাদে| দুবছর বয়েসী অভিন্ন তখন গুটুগুটু করে হাঁটে-দৌঁড়ায়| ঢাকা এয়ারপোর্টের প্লেন থেকে যারা বা যে দেখেছে— দেবতুল্য এই শিশুটির মায়ায় পড়ে— কাছে ডেকে আদর করেছে| বর্ধমান থেকে যেদিন ফিরে আসবো— ঝকঝকে সোনালি সকালে বঙ্গবীর জলপাই রঙের প্রিন্টের মাহিসুর সিল্কের একটা শাড়ি আমার হাতে দিয়ে বললেন ঢাকায় গিয়ে এটা পরো| জ্বি বলে আমিও তার হাত থেকে নিঃসঙ্কোচ চিত্তে উপহারটি গ্রহণ করলাম| মনে মনে ভাবলাম, এত বড় যোদ্ধা, মহান একাত্তরের রণক্ষেত্র যার ধ্যান-জ্ঞান— তিনি পারিবারিক এসব শিষ্টাচার ও সৌজন্েযর কায়দা-কানুন কী করে জানলেন!
নিশ্চয় মা-বোনদের দেখে আত্মস্থ করেছেন বাঙালি কালচারের ভালোবাসা ও আদান-প্রদানের রীতিনীতি| তাঁর হাত থেকে উপহার পেয়ে আমিও খুব হৃষ্টচিত্তে ফিরে এলাম কলকাতায় খালুর বাড়িতে| পরবর্তী সময়ে তাঁর “স্বাধীনতা-৭১” লেখা শেষ হতেই রফিক আজাদ বর্ধমানে তাঁর বাসভবনে বেশ কয়েকদিন থেকে বইয়ের বানান ও সার্বিক প্রুফ দেখে পাণ্ডুলিপি রেডি করে দিয়ে এসেছিলেন, বঙ্গবীরের একান্ত আগ্রহেই| এরপর অবশ্য তাঁর “কাদেরিয়া বাহিনীর জনযুদ্ধ”, বজ্রকণ্ঠ, পিতা-পুত্র নামে বেশ কয়েকটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে| দেশে ফেরার পরে বইমেলায় দেখা হয়েছে— আমাদের কথা হয়েছে একজন লেখক কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে| রফিক আজাদের প্রয়াণের খবর পাওয়ামাত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যালে যেমন ছুটে এসেছেন, তেমনি কবির চল্লিশ দিনের অনুষ্ঠানে সরাসরি ঢাকা থেকে গুণী গ্রামে উপস্থিত হয়ে কথা বলতে বলতে কেঁদেছেন| দেশপ্রেমিক একজন সহযোদ্ধার প্রতি যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছেন তিনি অকৃপণ হস্তে|
৩.
মাকে নিয়ে ফিরে এলাম বালিগঞ্জের কৃষ্টফার রোডের পীরবাড়ি| সেই সময়ের গদ্দিনসীন পীর সাহেব ছিলেন মায়ের বড়বোন রাশেদা খালার স্বামী| আমার খালার মেয়ে আবেদা আপাকে জন্ম দিয়ে পরপারে চলে গেছেন বহু আগে| পরে আমার খালু খুলনার সম্ভ্রান্ত বংশীয় একজন সুশ্রী ও ফরসা মেয়েকে বিয়ে করেন|
তার গর্ভেও মুন্নী নামে এক কন্যা সন্তান রয়েছে তাদের| কিন্তু বরাবরই আমার মায়ের সঙ্গে খালু-খালার একটা চমৎকার সম্পর্ক সুমধুর গতিতে এগিয়ে গেছে| বাড়িতে দোকানী ডেকে মায়ের নিজের পছন্দ মতো শাড়ি ও দুটো শাল উপহার দিলেন পীরখালু| বলতে গেলে, ভক্ত, শিষ্যদের উপঢৌকন রাখার জন্যে পীরবাড়িতে যখন আর জায়গা থাকে না, তখন সেসব খাদ্যকণায় খাটেরতলা টইটুম্বর হয়ে ওঠে| বেদান-আঙুর-আপেল ছাড়াও নানা রকম ফল-মূলে ঠাসা থাকে সর্বক্ষণ|
এত ফলমূল যে, হঠাৎ দেখি অভিন্ন একটা আপেল দিয়ে ফুটবল খেলছে তার ছোট্ট দুটো পায়ে| এ বাড়িতেও তার আদরের সীমারেখা নেই| কাজেই যা ইচ্ছে, যেখানে ইচ্ছে ঢুকে যাচ্ছে| আমার খালাতো বোন আবেদাবু খুব সুন্দর নীল রঙ্গের একটা ড্রেস কিনে দিয়েছিলো, খুব মানিয়েছিলো ছোট্ট অভিন্নকে|
কলকাতার সর্বশেষ দিনে রবীন্দ্র সদনে একটি অনুষ্ঠানে কবিতা পড়ে সকলের সঙ্গে আমরাও দেশে ফিরে আসি|
৪.
আমরা দেশে ফিরে আসার ২/৩ মাস পরেই ডানুভাবি আমাকে ও রফিক আজাদকে ডেকে পাঠালেন| লক্ষ্য হলো কাদের সিদ্দিকীকে দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রত্যাবর্তন কমিটি গঠিত হয়েছে— সেখানে আমাদের দুজনকে কাজ করতে হবে| পাড়ামহল্লার মিটিং এ উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখতে হবে| চাকুরির কারণে আমি সব মিটিং-এ যেতে পারি না|
কিন্তু অন্যান্য সহযোদ্ধাদেরকে সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন জেলায় জেলায় মিটিং, আলোচনা সভা করতে হয় ডানু ভাবিকে| সঙ্গে থাকেন অধিকাংশ ১১নং সেক্টরের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই| বীরভোগ্যা স্বামীকে দেশে ফিরিয়ে আনার আন্তর গরজে ডানুভাবি লাগাতার মিটিং করে চলেছেন| অনিয়মিত খাওয়া দাওয়া ও পানির অভাবে তিনি এক সময় অসুস্থ হয়ে পড়েন| ইউরিন ইনফেকশন হয়ে ব্লাড যেতে শুরু করেছিলো|
আমি তাকে বললাম, ভাবি, এভাবে ইউরিন চেপে সারাদিন মিটিং করতে পারবেন না| আপনাকে পানি খেতে হবে এবং বাথরুমেও যেতে হবে| এ নিয়ে লজ্জা করলে জানে মারা পড়বেন কিন্তু| এরপর থেকে ভাবি সঙ্গে পানির বোতল ক্যারি করতেন| সদ্য বিবাহিত নারী, উপরন্তু স্বনামধন্য স্বামীকে দেশে ফিরিয়ে আনবার লড়াইয়ে নেমেছেন| আমজনতার সঙ্গে মিলেমিশে রাজনৈতিক দীক্ষাও হয়ে যাচ্ছে তাঁর| কিন্তু নারীর অন্যতম ভূষণ লাজুকতা তাকে ছাড়ছিলো না— এটাই সমস্যা| এজন্যে প্রাকৃতিক কাজ চেপে রেখে— স্বাস্থ্যের বারোটা বাজিয়েছিলেন| পরে অবশ্য আমার কথায় তিনি পানি পান করতেন নিয়মিত| একবার ঢাকার কোনো একটা আঞ্চলিক মিটিং শেষ করে আমাদের বাসায় একদিন দুপুরে খেয়েছিলেন— সে কথা প্রায়ই স্মরণ করতেন| কিছুকাল আগেও ভাবির বাসায় যখন দেখা হলো, ভাবি বলছিলেন, আপনার বাসায় যে কচু দিয়ে ইলিশমাছ রান্না খেয়েছিলাম— মাঝে মধ্যে মনে হয় সে কথা|
আমি বললাম, ভাবি, আসুন না আর একদিন আমি ওমন করেই রান্না করে খাওয়াবো আপনাকে| বললেন, অবশ্যই যাবো|
ডানুভাবির নেতৃত্বে প্রত্যাবর্তন কমিটির উদ্যোগ এবং কার্যকরী পদক্ষেপের কারণেই বঙ্গবীরের বাংলাদেশে ফেরা সম্ভব ও সহজ হয়েছিলো|
যেদিন দেশে আসলেন হাজার জনতার ভিড় ঠেলে ডানুভাবির বারর রোডের বাসায় কবিসহ আমিও উপস্থিত ছিলাম| খবর পেয়ে ডানুভাবি আমাদের উপরে ডেকে নিয়ে আলাদাভাবে আপ্যায়ণ করেছিলেন ভীষণ কৃতজ্ঞচিত্তে|
অতীত না ভোলা মানুষ এই ডানুভাবি, যার যা প্রাপ্য মর্যাদা সেটি তিনি দিতে জানতেন| একজন শিক্ষাবিদের সন্তান হিসেবে পরমত সহিষ্ণুতা শিষ্টাচার ও সৌজন্যবোধে অসাধারণ নমনীয় নারী ব্যক্তিত্বের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিলেন তিনি|
কাদের সিদ্দিকী পরিবারের এক বোনের সঙ্গে আমার ভাসুরের বিয়ে হয়েছিলো, উপরন্তু বঙ্গবীরের অধিনায়কত্বে টাঙ্গাইলের ১১ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেছেন কবি রফিক আজাদ| সেই সূত্রে ঐ পরিবারের সঙ্গে ঘণিষ্ঠতা ছিলো পূর্বাপর|
সেলিনা সিদ্দিকী শুশু এই পরিবারের মেঝো মেয়ে থাকে টরন্টোতে| সেখানেই তার সঙ্গে আমার বন্ধুত্বটি গাঢ় হয়েছে— ফলে শুশু বাংলাদেশে এলে বঙ্গবীরের বাবর রোডের বাড়িতে পুনরায় নতুন করে যাওয়া-আসা হতো| বঙ্গবীরকে ওরা ছোটভাই ডাকতো, আমিও তাই ডাকতাম| কিছুকাল আগে বঙ্গবীরকে আমার কয়েকটি বই দিতে গেছিলাম তাঁর বাবর রোডের বাসায়| সেদিন সন্ধ্যায় তিনি টাঙ্গাইল থেকে ফিরেছেন সবে| ফলে অবিন্যস্ত অবস্থায় ছবি তুলতে কিছুতে রাজি হলেন না| অন্য আর একদিন তুলবো বলে আমাকে নিরস্ত করলেন| সেদিন ডানুভাবির খুব ইচ্ছে ছিলো তিনি ছবি তুলবেন, কিন্তু নটরাজ যখন রাজি হলেন না, তখন পার্বতীও নিজের ইচ্ছে-সাধ চেপে গেলেন|
খুব আফসোস হয়, সেদিন ভাবির সঙ্গে কেন আলাদা করে ছবি তুললাম না| সেদিনই ছিলো তাঁর সঙ্গে আমার শেষ দেখা| তার হাতে তুলে দেয়া শেষ চমচম খাওয়ার সন্ধ্যা! টাঙ্গাইল থেকে সদ্য আসা বড় আকারের একটা চমচম খেতে দিয়েছিলেন ভাবি আমাকে| এর মাস খানেক পরেই বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো জগতের সকল মোহমায়া ত্যাগ করে চলে গেলেন অনন্তবাসের ঠিকানায়| পেছনে আপনার স্বামী ও সন্তানেরা হারালো আপনার মমতাময়ী মুখ, মুখের স্নেহকাতর ভাষা ও ভালোবাসা| অনন্তবাসে তবুও শান্তিতে থাকুন আপনি|

আপনার মতামত লিখুন