সংবাদ

প্রবন্ধ

মণিপুর-রাজেন্দ্রনন্দিনী, ওগো তাপসিনী


বাদল বিহারী চক্রবর্তী
বাদল বিহারী চক্রবর্তী
প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬, ১২:৩৮ এএম

মণিপুর-রাজেন্দ্রনন্দিনী, ওগো তাপসিনী
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

‘গুরু গুরু গুরু গুরু ঘন মেঘ গরজে পর্বতশিখরে,/ অরণ্যে তমশ্ছায়া|/ মুখর নির্ঝরকলকল্লোলে/ব্যাধের চরণধ্বনি শুনিতে না পায় ভীরু হরিণদম্পতি|/চিত্রব্যাঘ্র পদনখচিহ্নরেখাশ্রেণী/রেখে গেছে ওই পথপঙ্ক-পরে,/দিয়ে গেছে পদে পদে গুহার সন্ধান॥’

শুরুটা এমনভাবেই করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ| বলছিলাম তাঁর কালজয়ী গীতিনৃত্যনাট্য  ‘চিত্রঙ্গদা’র কথা| বহুবার মঞ্চায়িত ও বিশ^ময় পরিচিত এ গীতিনৃত্যনাট্যটি নাটক ও নাচ-গান পিপাসু কার না চিত্ত পরিতৃপ্তিতে ভরে দিয়েছে? যদিও কবিগুরুর ‘চণ্ডালিকা’ ও ‘শ্যামা’র মতো গীতিনৃত্যনাট্যও রয়েছে, তবু ‘চিত্রাঙ্গদা’ যেন অধিকতর রসগ্রাহী তা নিঃসন্দেহে বলার অপেক্ষা রাখে না| আমরা কখনো কখনো কোনো নাটক বা চলচ্চিত্রে ‘চিত্রাঙ্গদা’র কিছু অংশ পরিবেশিত হতে দেখি, যা নাটক সিনেমা এমনকি রবিসৃষ্টিরও সৌন্দর্য এবং মহিমা বৃদ্ধি করে আসছে|... এ প্রসঙ্গে প্রয়াত ঔপন্যাসিক শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘দাদার কীর্তি’ চলচ্চিত্রে রূপায়ন করতে গিয়ে প্রয়াত শক্তিমান পরিচালক তরুণ মজুমদার অত্যন্ত নান্দনিক মননেই ‘চিত্রাঙ্গদা’ গীতিনৃত্যনাট্যের অনেকটাই প্রদর্শন করিয়েছেন, যে প্রয়াসে দর্শক-শ্রোতাগণ এক অদ্ভুত বুঁদলাগা আমেজ নিয়ে দীর্ঘ সময়ব্যাপী ভাবাবেগে আবদ্ধ হয়ে থাকেন|

মণিপুর রাজদুহিতা স্বয়ং চিত্রাঙ্গদা যে গভীর তাপসিনী ছিলেন, তা মহাভারত থেকেই পাওয়া যায়| এই তাপসিনীকে রবীন্দ্রনাথ চিনতে পেরেছিলেন তাঁর কল্পলোকের কাব্যে| তাই তিনি নতুনভাবে মানসপটে এঁকেছেন চিত্রাঙ্গদাকে| আর সে কারণেই ব্যাসদেবের ‘চিত্রাঙ্গদা’ এবং রবীন্দ্রনাথের ‘চিত্রাঙ্গদা’ এক নয়| কবিগুরু চিনতেন বলেই প্রাবন্ধিক ইন্দ্রজিৎ সেনগুপ্তের লেখায় দেখা যায়, “১৮৯২ সালে অর্জুন ও মণিপুর-দুহিতার প্রেমকাহিনী তাঁর কাব্যে ‘চিত্রাঙ্গদা’ রূপে ধরা দিয়েছিল|” কাব্যের সেই স্মৃতিবিজড়িত স্থানকে দর্শন করার আগ্রহ জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ প্রমথ চৌধুরীকে এক চিঠি লিখেন| ১৩ কার্তিক (৩০ অক্টোবর ১৯১৯) বৃহস্পতিবারের সে চিঠিতে তিনি লিখেছেন— “কাল আমি শিলঙ ছেড়ে গৌহাটি যাব— তার পরে সেখান থেকে আমাদের মণিপুরে যাবার কথা চলচে| তাহলে আরো দিন দশেক পরে আমরা ফিরব|” প্রকৃতপক্ষে মণিপুর ভ্রমণের আহ্বানটা এসেছিল শ্রীহট্ট থেকে (সিলেট)| ‘শ্রীহট্টে রবীন্দ্রনাথ’ শীর্ষক প্রবন্ধে সুধীন্দ্রনারায়ণ সিংহ লিখেছেন যে রবীন্দ্রভক্ত তাঁর পিতা গোবিন্দনারায়ণ সিংহ সিলেটের ব্রাহ্মসমাজের পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ জানিয়ে টেলিগ্রাম করলে দীর্ঘ ক্লান্তিকর যাত্রাপথের জন্য রবীন্দ্রনাথ প্রথমে আসতে চাননি| কিন্তু গোবিন্দবাবু ছিলেন নাছোড়| ‘আঞ্জুমান ইসলাম’, ‘মহিলা সমিতি’ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ জানালে অগত্যা তিনি রাজি হন| চলার পথ তখন অতটা সহজ ছিল না| কেননা শিলঙ-সিলেট মোটরপথ নির্মিত হয়নি| তখনকার বনেদী বাবুরা চেরাপুঞ্জি পর্যন্ত গাড়িতে এসে খাসিয়া কুলিদের পিঠে-বাঁধা চেয়ারে বসে সিলেটে আসতেন| কিন্তু এরকম ভ্রমণ কবিগুরুর পছন্দ না হওয়ায় গৌহাটি হয়ে রেলপথে সিলেটে আসার পথই বেছে নেন তিনি|

১৯ কার্তিক (৫ নভে¤^র) বুধবার সকালে সিলেট স্টেশনে পদার্পণ করলে সমবেত জনতার হর্ষধ্বনির সাথে বাজি পুড়িয়ে কবিকে স্বাগত জানানো হয়| সেদিন তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে সিলেটের অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন| সুসজ্জিত বোট ও বজরায় রবীন্দ্রনাথ ও প্রতিমা দেবী সুরমা নদী পার হয়ে চাঁদনীঘাটে উপস্থিত হন| ঘাটটি ছিল পত্র-পুষ্প-পতাকায় মঙ্গলঘটে সাজানো| ঘাটের সিঁড়িগুলো ছিল লাল সালুতে মোড়ানো| রবীন্দ্রনাথ মৌলবী আব্দুল করিমকে (১৮৬৩-১৯৪৩) সঙ্গে নিয়ে একটি সুসজ্জিত ফিটনে ওঠেন| সরল ও কোমলমতি ছাত্রদের এমন অতি উৎসাহে একজন মানুষকে ভারবাহী জীবের মতো বুকেপিঠে টেনে নিয়ে যাওয়াটায় কবির ঘোর আপত্তি ছিল| কিন্তু উৎসাহের আতিশয্যে ছাত্রেরা তা কর্ণপাত করেনি|

আগেই বলেছি, ‘চিত্রাঙ্গদা’ গীতিনৃত্যনাট্য দেশে-বিদেশে বহুল আলোচিত ও প্রদর্শিত কী নাট্যে, কী সঙ্গীতে কিংবা কাব্যে এ সৃষ্টির মধুরস যেন অমর অক্ষয়| আমার মনে আছে, ১৯৭২ সাল, বাংলাদেশ সবে সদ্য স্বাধীন দেশ| আমাদের স্কুলে বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনায় রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী উদযাপন করা হবে| যথারীতি বক্তৃতা, গান ও কবিতা আবৃত্তির বিচিত্রানুষ্ঠান| সেদিন রবীন্দ্রনাথেরই একটি কবিতা আবৃত্তি করে আমি যে পুরস্কারটি পেয়েছিলাম, সেটি ছিল রবীন্দ্রনাথের ‘চিত্রাঙ্গদা’ কাব্য| সেই থেকে এই রচনাটা যেন আমার মনকে গভীরভাবে আবেগাপ্লুত করে আছে| শুরুতেই যে সঙ্গীতটি দিয়ে ‘চিত্রাঙ্গদা’কে সামনে নিয়ে বসেছিলাম, তেমনি কাব্যে মণিপুরদুহিতা নিজেই মদন ও বসন্তকে বর্ণনা দিচ্ছেন—

                         একদিন

গিয়েছিনু মৃগ-অন্বেষণে একাকিনী

ঘন বনে, পূর্ণানদীতীরে| তরুমূলে

বাঁধি অশ্ব দুর্গম কুটিল মৃগপদচিহ্ন অনুসরি|

ঝিল্লিমন্দ্রমুখরিত নিত্য-অন্ধকার 

লতাগুল্মে-গহন-গম্ভীর মহারণ্যে

কিছুদূর অগ্রসরি দেখিনু সহসা—

রুধিয়া সংকীর্ণ পথ রয়েছে শয়ান

ভূমিতলে চীরধারী মলিন পুরুষ|

হ্যাঁ, কতিপয় বালক বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে রাজকুমারী হরিণ শিকারে গিয়েছিলেন| আর সেটা ছিল চিত্রাঙ্গদার বারো বছর বয়স| নারীরা বালিকার বেশে নয়, বালকের বেশেই| এ ইতিহাস ব্যাসদেবের মহাভারতেই আছে| মদন ও বসন্তের সঙ্গে চিত্রাঙ্গদার এ কথোপকথনের প্রেক্ষিতেই ফিরে আসি-’চিত্রাঙ্গদা’ গীতিনৃত্যনাট্যের স্রষ্টা রবীন্দ্রনাথের প্রসঙ্গে| সিলেট শহরের একটি ছোট টিলার ওপর পাদরী টমাস সাহেবের বাংলোর পাশের বাড়িটি ছেড়ে দেয়া হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের জন্য| সেখানে তাঁকে অভ্যর্থনা দেয়া হয় শঙ্খধ্বনির সঙ্গে মালাচন্দন দিয়ে প্রাচ্যরীতিতে| সন্ধ্যা সাতটায় শ্রীহট্ট ব্রাহ্মসমাজ  মন্দিরে তিনি উপাসনা করেন| সেখানে সমাজ-সম্পাদকের অনুরোধে রবীন্দ্রনাথ গেয়ে শোনান “বীণা বাজাও হে মম অন্তরে” গানটি| 

ইতোমধ্যে কবিকে আমন্ত্রণ জানালেন অধ্যাপক নলিনীমোহন শাস্ত্রী| সেমতে পরদিন দুপুরে অর্থাৎ ৬ নভেম্বর ১৯১৯, রবীন্দ্রনাথ আসেন শাস্ত্রী মহাশয়ের বাড়ি| সেদিন বেলা দুটোয় ব্রাহ্মসমাজ গৃহে তাঁকে অভিনন্দিত করেন সেখানকার মহিলা সমিতি| এশিয়ার প্রথম নোবেল লরিয়েট বাঙালি কবি, সাহিত্য ও গীত-নৃত্যে যিনি ভুবনজয়ী দিকপাল, তাঁকে অভ্যর্থনা দেয়া বলে কথা; কবির সম্মানে একটি সুন্দর রৌপ্যাধারে অভিনন্দনপত্র প্রদত্ত হয়| সেদিন অর্থাৎ ১৬ অগ্রহায়ণ তত্ত্ব-কৌমুদিতে লেখা মতে জানা যায় শ্রীহট্ট মহিলাগণের পক্ষ হতে শ্রীযুক্তা নলিনীবালা চৌধুরী অভিনন্দনপত্রটি পাঠ করেন|

ফিরে আসি চিত্রাঙ্গদার কথায়| সেই বারো বছর বয়সে চিত্রাঙ্গদা তার বন্ধুদের নিয়ে শিকারে বেরিয়েছিলেন| মহাভারত থেকেই চিত্রাঙ্গদার অনেকটা দম্ভভরা অভিব্যক্তির কথা রবীন্দ্রনাথ নিজ কাব্যরীতিতে প্রকাশ করেছিলেন যেভাবে— “মোর পিতৃবংশে কভু পুত্রী জন্মিবে না—/ দিয়াছিলা হেন বর দেব উমাপতি/ তপে তুষ্ট হয়ে| আমি সেই মহাবর/ ব্যর্থ করিয়াছি| অমোঘ দেবতাবাক্য/ মাতৃগর্ভে পশি দুর্বল প্রারম্ভে মোর/ পারিল না পুরুষ করিতে শৈব তেজে,/ এমনি কঠিন নারী আমি|”...

এই রসই মণিপুর রাজকন্যা, আর এ অভিব্যক্তি প্রকাশে কবির কী অনুপম ছন্দ! 

কবিকে দেয়া আতিথেয়তার কথায় এলাম আবার| মণিপুুরীদের বস্ত্রবরণ নৈপুণ্য দেখে এ অঞ্চলের তাঁত ও তাদের জীবনযাত্রা দেখার ইচ্ছায় রবীন্দ্রনাথ মাছিমপুর পরিদর্শনে যান| এই শিল্পনৈপুণ্যের একটু বর্ণনা দিয়েছেন সুধীন্দ্রনারায়ণ সিংহ, “বাংলোর বহির্দ্বারে টাঙানো ছিল মণিপুরীদের তৈরি প্রায় পঞ্চাশ বছরের পুরনো একখানা আচ্ছাদন বস্ত্র|... ঐ আচ্ছাদন বস্ত্রে মণিপুরীদের শিল্পনৈপুণ্যের পরিচয় পেয়ে কবি মুগ্ধ হলেন| ইচ্ছে হলে পর্দাটি শান্তিনিকেতনের জন্য নিয়ে যেতে পারেন, এ কথা বলায় কবি বললেন, ‘এ যে দিনেদুপুরে ডাকাতি|’” মাছিমপুরে কলানিপুণ মণিপুরীরা কবির প্রবেশপথে সারি সারি কলাগাছ পুঁতে কাগজের ঝালর দিয়ে সুন্দর তোরণ নির্মাণ করে| মণিপুরী মেয়েদের তাঁতে-বোনা কাপড় দেখে কবির পছন্দ হয়| তিনি কিছু কাপড় কিনে নিলেন| রাখালনৃত্যে মণিপুরী ছেলেরা বেশ পারদর্শী| এ নৃত্য দেখার পর রাতে মেয়েদের নাচ দেখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বিকেলে বাংলোয় ফিরে আসেন| ছেলে ও মেয়েদের এই দু’ধরনের নাচের প্রয়াস কবিকে বিমোহিত করে| তাঁর শান্তিনিকেতনের নৃত্যকলায় মণিপুরী নৃত্য-ভঙ্গি যে বিশিষ্ট স্থান লাভ করেছিল, তা কেবলই রবীন্দ্রনাথের মস্তিষ্কপ্রসূত| পরবর্তীকালে তিনি সেখান থেকে ফিরেই শান্তিনিকেতনের পাঠ্যতালিকায় যে এ নৃত্যের প্রচলন করেন তা অনেকটা মানসপটে এর শিল্পমুগ্ধতার প্রভাব-তাড়িত হয়েই| তাই কবি ত্রিপুরার মহারাজার আমন্ত্রণে আসেন ৯ নভেম্বর| মহারাজা বীরেন্দ্রকিশোরকে তিনি অনুরোধ করেন একজন অভিজ্ঞ মণিপুরী নৃত্যগুরুকে শান্তিনিকেতনে পাঠাবার জন্যে| মহারাজা উৎসাহিত হয়ে অনতিবিলম্বে নৃত্য ও মৃদঙ্গ বাদনপটু, বিচক্ষণ কারুশিল্পশিল্পী ও যন্ত্রবিদ রাজকুমার বুদ্ধিমন্ত সিংহকে পাঠিয়ে দিলেন-মাঘ মাসের প্রথম দিকে| 

এদিকে মণিপুরী নৃত্যের মধ্যমণি রাজতনয়া চিত্রাঙ্গদা যে বারো বছর পর্যন্ত নিজেকে নারী হিসেবে উপলব্ধিই করেননি, তা তার চলার ভঙ্গি ও আচরণেই প্রকাশ পায়| মহাভারতের বর্ণনানুযায়ী রবীন্দ্রনাথ শুরু করলেন যেভাবে, তা মণিপুররাজের ভক্তিতে তুষ্ট হয়ে শিব বর দিয়েছিলেন যে তাঁর বংশে কেবল পুত্র সন্তানই জন্মাবে| তৎসত্ত্বেও যখন রাজকুলে চিত্রাঙ্গদার জন্ম হলো তখন রাজা তাকে পুত্ররূপেই পালন করলেন| রাজকন্যা অভ্যাস করলেন ধনুর্বিদ্যা, শিক্ষা করলেন যুদ্ধবিদ্যা, রাজদণ্ডনীতি| রবীনদ্রনাথের ‘চিত্রাঙ্গদা’ কাব্যে তিনি যেভাবে রাজকুমারীকে রূপায়ন করেছেন, সেটা এমন— বনে হরিণ শিকারে গিয়ে চিত্রাঙ্গদা যখন রাস্তা রুদ্ধ করা অর্জুনকে প্রথম দেখলেন, পাণ্ডব বংশীয় অর্জুনের সৌর্য-বীর্যের বিক্রম তাকে কেমন যেন নমনীয়া নারীত্বের উপলব্ধি এনে দিল তার দেহমনে| চিত্রাঙ্গদা মদনকে অবহিত করে— “শিখে পুরুষের বিদ্যা, প’রে পুরুষের/ বেশ, পুরুষের সাথে থেকে, এতদিন/ ভুলেছিনু যাহা, সেই মুখে চেয়ে, সেই/ আপনাতে-আপনি-অটল মূর্তি হেরি’/ সেই মুহূর্তেই জানিলাম মনে, নারী/ আমি| সেই মুহূর্তেই প্রথম দেখিনু/ সম্মুখে পুরুষ মোর|”

...কী দারুণ মনোদৈহিক অচলায়তনভাঙা পরিবর্তন! এই সেই রণকৌশলী সুপুরুষ অর্জুন| বহুদেশ ভ্রমণ করে এসে অর্জুন যখন গঙ্গাদ্বারে বাস করতে লাগলেন, একদিন সে গঙ্গায় স্নান করতে নদীতে নামলেন তিনি| তখন নাগরাজকন্যা উলপী তাঁকে টেনে নিয়ে গেলেন| অর্জুন তার পরিচয় জানতে চাইলে উলপী বললেন, আমি ঐরাবত-কুলজাত কৌরব্য নামক নাগের কন্যা, আপনি আমাকে ভজনা করুন| আপনার ব্রহ্মচর্যের যে নিয়ম আছে তা কেবল দ্রৌপদীর সম্বন্ধে| আমার অনুরোধ রাখলে আপনার ধর্ম নষ্ট হবে না, কিন্তু আমার প্রাণরক্ষা হবে| অর্জুন উলপীর প্রার্থনা পূরণ করেন| উলপী তাঁকে বর দিলেন, আপনি জলে অজেয় হবেন, সকল জলচর আপনার বশ হবে|

অতঃপর উলপীর কাছে বিদায় নিয়ে অর্জুন নানা তীর্থ পর্যটন শেষে মহেন্দ্র পর্বত দেখে সাগরতীর ধরে মণিপুরে পৌঁছান| সেখানকার রাজা চিত্রবাহনের কন্যা যিনি তপস্যায় পরমাসুন্দরী হলেন, তাঁর পাণিপ্রার্থী হলেন তিনি| অর্জুনের পরিচয় জেনে অর্জুনকে রাজা নিজেদের বংশের প্রভঞ্জন নামক এক রাজার কথা বললেন| সেই রাজা পুত্রের জন্য তপস্যা করলে মহাদেব তাঁকে বর দিয়ে বলেন, তোমার বংশে প্রতি পুরুষের একটিমাত্র পুত্রসন্তানই হবে| কিন্তু আমার পুত্র না হয়ে কন্যা হয়েছে| তাকেই আমি পুত্রবৎ গণ্য করি|

মহাভারত থেকে পাওয়া চিত্রাঙ্গদা ছিলেন বিষ্ণুপ্রিয়া জাতি| এ তথ্য প্রাবন্ধিক মিঃ সেনগুপ্তের লেখাতেও বিধৃত আছে| উল্লেখ্য যে, বিষ্ণুপ্রিয়া ˆমতৈ, কুকি আর পাঙান-এই তিন গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের বাস মণিপুর রাজ্যে| মৈতৈ আর কুকিদের মধ্যে সাম্প্রতিক কয়েক বছর ধরে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় এ রাজ্যে সংঘাত লেগে রয়েছে| বহু হতাহতের দুঃসহ ভার বহন করতে হচ্ছে মণিপুরকে| মৈতৈ জাতিরা ছিল রাজধানী ইম্ফল সংলগ্ন উপত্যকার বাসিন্দা; আর কুকি জনজাতিদের বাস ছিল পাহাড়ে| স্থান-পাত্রের এ বৈষম্য বহুকাল ধরে, ভঙ্গুর ও সমস্যাসঙ্কুল| একেই বলে ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! ভাগ্যিস রবীন্দ্রনাথ আজ ইহজগতে নেই; থাকলে এই হিংসা-বিদ্বেষ, হানাহানি তাঁকে যে কত গভীরভাবে আহত করতো, তা সহজেই অনুমেয়|

মণিপুর রাজ্য পরিভ্রমণে গিয়ে গন্ধর্ব রাজকন্যা চিত্রাঙ্গদার আরাধনাপ্রসূত রূপে মুগ্ধ হয়ে যান অর্জুন| এবং তা অবশ্যই রূপ পাবার পরই| সেখানে অর্জুনের সঙ্গে অন্যান্য ক্ষত্রিয় যোদ্ধা গিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই গন্ধর্বকন্যাদের বিয়ে করে সে রাজ্যেই স্থিত হয়ে গেলেন| অর্জুনও চিত্রাঙ্গদার সঙ্গে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন| এক সময় অর্জুন ও চিত্রাঙ্গদার পুত্র বভ্রুবাহন মণিপুরের অধিপতি হন| তখন থেকেই গন্ধর্বদের শাসনের  অবসান হয়ে শুরু হয় আর্য-ক্ষত্রিয়দের শাসন| 

‘চিত্রাঙ্গদা হলো রবীন্দ্রনাথের প্রথম নৃত্যনাট্য| মহাভারতের আদিপর্বে বর্ণিত অর্জুন ও চিত্রাঙ্গদার প্রণয়োপাখ্যান অবলম্বনে নির্মিত এ নৃত্যনাট্যে ১৯৩৬ সালে কলকাতায় অভিনয় প্রয়াসের সঙ্গে ১৮৯২ সালে রচিত চিত্রাঙ্গদা কাব্যনাট্যের বিষয় ও তত্ত্বে অনেকটা ভিন্ন| তিনি এ নৃত্যনাট্য ˆতরি করার সময় লিখেছিলেন— অনেক বছর আগে রেলগাড়িতে যাচ্ছিলুম শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতার দিকে| তখন বোধকরি চৈত্রমাস হবে| রেললাইনের ধারে ধারে আগাছার জঙ্গল| হলদে বেগুনি সাদা রঙের ফুল ফুটেছে অজস্র| দেখতে দেখতে এই ভাবনা এলো মনে যে আর কিছুকাল পরেই রৌদ্র হবে প্রখর, ফুলগুলি তার রঙের মরীচিকা নিয়ে যাবে মিলিয়ে—’

চলতে চলতে কবি তাঁর ভাবনাটা এক শিল্পাগারে প্রবেশ করালেন| তাঁর মাথায় মহাভারতের চিত্রাঙ্গদার কাহিনী নিয়ে একটা সফল ও মনোমুগ্ধকর গীতি নৃত্যনাট্য রচনা করার উপজীব্য স্বরূপ যা পেলেন, তা সেদিনকার প্রকৃতিতে রূপক নাট্যরূপ দেবার উপযোগী| বর্ণনা করলেন— তখন পল্লীপ্রাঙ্গণে আম ধরবে গাছের ডালে ডালে, তরুপ্রকৃতি তার অন্তরের নিগূঢ় রসসঞ্চয়ের স্থায়ী পরিচয় দেবে আপন প্রগলভ ফলসম্ভারে| সেই সঙ্গে কেন জানি হঠাৎ আমার মনে হলো সুন্দরী যুবতী যদি অনুভব করে যে সে তার যৌবনের মায়া দিয়ে প্রেমিকের হৃদয় ভুলিয়েছে তাহলে সে তার স্বরূপকেই আপন সৌভাগ্যের মুখ্য অংশে ভাগ বসাবার অভিযোগে সতীন বলে ধিক্কার দিতে পারে| এ যে তার বাইরের জিনিস, এ যেন ঋতুরাজ বসন্তের কাছ থেকে পাওয়া বর, ক্ষণিক মোহ-বিস্তারের দ্বারা ˆজব উদ্দেশ্য সিদ্ধ করবার জন্যে যদি তার অন্তরের মধ্যে যথার্থ চরিত্রশক্তি থাকে তবে সেই মোহমুক্ত শক্তির দানই তার প্রেমিকের পক্ষে মহৎ লাভ, যুগল জীবনের জয়যাত্রার সহায়| সেই দানেই আত্মার স্থায়ী পরিচয়, এর পরিণামে ক্লান্তি নেই, অবসাদ নেই, অভ্যাসের ধূলিপ্রলেপে উজ্জ্বলতার মালিন্য নেই| এই চরিত্রশক্তি জীবনের ধ্রুব স¤^ল, নির্মম প্রকৃতির আশু প্রয়োজনের প্রতি তার নির্ভর নয়| অর্থাৎ এর মূল্য মানবিক, এ নয় প্রাকৃতিক|

অবশেষে লেখবার উদ্বেলিত অবকাশ পাওয়া গেল উড়িষ্যার এক নিভৃত পল্লী পাণ্ডুয়াতে| নৃত্যনাট্যের মূল আখ্যানটির সংক্ষিপ্ত বর্ণনায়: ...একদা চিত্রাঙ্গদা যখন সখিদের নিয়ে শিকারের সন্ধানে বেরিয়েছিলেন, অরণ্যের গভীরে অর্জুনের সঙ্গে তাঁর দেখা হলো| চিত্রাঙ্গদা নিজের বীরত্ব প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে অর্জুনকে যুদ্ধের আহ্বান করলেন| কিন্তু অর্জুন সকৌতুকে তাঁকে অবজ্ঞা করলেন| নাছোড় রাজকন্যা অর্জুনকে হৃদয় মনপ্রাণ নিবেদন করতে গেলে অর্জুন তাঁর প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ব্রহ্মচর্য ব্রতের দোহাই দিয়ে প্রত্যাখ্যান করলেন| এ উপাখ্যানের নাট্যরূপ দেখাতেই চিত্রাঙ্গদা নৃত্যনাট্যের প্রদর্শনী দেশে-বিদেশে বহু মঞ্চায়ন হয়| তাই দেখা যায়— প্রত্যাখ্যাত হয়ে চিত্রাঙ্গদা নিদারুণ দুঃখে অর্জুনের হৃদয় হরণ করার জন্য মদনের আরাধনা করলে মদন দেবতা তাঁকে এক বছরের জন্য অপরূপা লাবণ্যময়ী রূপ দান করলেন| অর্জুন তো সেই রূপমুগ্ধে পাগলপারা| মায়ালব্ধ এ সৌন্দর্যের স্থায়ীত্বকাল যে বেশি ছিল না, অর্জুন সে ব্যাপারে অজ্ঞাত| চিত্রাঙ্গদার মনে তাই অদ্ভুত দ্বন্দ্ব| তিনি অর্জুনকে সতর্ক করে বললেন— “কিন্তু মনে রেখো,/ কিংশুকদলের প্রান্তে এই— যে দুলিছে/ একটু শিশির¬— তুমি যারে করিছ কামনা/ সে এমনি শিশিরের কণা/ নিমেষের সোহাগিনী|”

কিন্তু অর্জুন তাঁর সর্বস্ব সমর্পণ করেন সেই প্রহেলিকাময় মিথ্যার পায়ে| চিত্রাঙ্গদার ভীষণ শোভায় উদ্বেলিত অর্জুন| সুরূপা ছদ্মবেশী চিত্রাঙ্গদা প্রকৃত রাজকুমারীর রূপের দৈন্যের কথা উল্লেখ করলেও অর্জুন তাতে কর্ণপাত করেননি|

পরদিন চিত্রাঙ্গদা তাঁর রূপের সৌন্দর্য ফিরিয়ে নেয়ার জন্য মদনকে অনুরোধ করলে মদন প্রার্থনা পূরণ করেন; চিত্রাঙ্গদা অবয়বের পূর্বাবস্থা ফিরে পান| এই বেশেই তিনি অর্জুনের সম্মুখে এসে ঘোষণা করলেন: “আমি চিত্রাঙ্গদা, আমি রাজেন্দ্রনন্দিনী|/নহি দেবী, নহি সামান্যা নারী|/পূজা করি মোরে রাখিবে ঊর্ধ্বে সে নহি নহি|/হেলা করি মোরে রাখিবে পিছে সে নহি নহি|/যদি পাশের্^ রাখ মোরে সঙ্কটে সম্পদে,/ 

সম্মতি দাও যদি কঠিন ব্রতে সহায় হতে/পাবে তবে তুমি চিনিতে মোরে|”

অর্জুন ধন্য হলেন চিত্রাঙ্গদাকে পেয়ে| আর এই উপাখ্যানকে উপজীব্য করেই রবীন্দ্রনাথ ‘চিত্রাঙ্গদা’ নৃত্যনাট্য ˆতরি করার প্রারম্ভেই তিনি পেলেন মণিপুরী নাচের শিক্ষক রাজকুমার বুদ্ধিমন্ত সিংহকে| তাঁরই দৌলতে কবিগুরুর নির্দেশনায় কলকাতার নিউ এম্পায়ার থিয়েটারে ১৯৩৬ সালের মার্চে প্রথম মঞ্চস্থ হয় ‘চিত্রাঙ্গদা’| এহেন হৃদয়গ্রাহী নাট্যের বর্ণনা করতে গিয়ে প্রসঙ্গ আসে ‘চণ্ডালিকা’, ‘শাপমোচন’, ‘মায়ার খেলা’ ও ‘ঋতুরঙ্গ’ নাটকগুলোতেও মণিপুরী নৃত্যের সংযোজনের কথা| সেটা ছিল ১৭ জুন, ১৯৩৬ সাল| কবির সঙ্গে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে সাক্ষাৎ করতে গেলেন নলিনীকুমার ভদ্র| কবি মিঃ ভদ্রের সঙ্গে যেভাবে মণিপুরী নাচ দেখার অনুভূতি ব্যক্ত করলেন— ‘তুমি তো সিলেট থেকে আসছ| চৌদ্দ-পনেরো বছর আগে যখন সিলেটে যাই, তখন দেখেছিলাম মণিপুরী নাচ| সে নাচ আমার মনকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল সুদূর কল্পলোকে, মনে জেগেছিল নৃত্যনাট্যের পরিকল্পনা, সে যেন আমার মনকে পেয়ে বসেছিল|’

অতঃপর কবি ১৩২৬ থেকে ১৩৩৬ বঙ্গাব্দ, এই দশ বছরের মধ্যে তিন তিনবারে ত্রিপুরা রাজ্য থেকে ছয় জন মণিপুরী নৃত্য শিক্ষককে আনিয়েছিলেন শান্তিনিকেতনের ছাত্রছাত্রীদের মণিপুরী নাচ শেখাবার উদ্দেশ্যে| সম্প্রতি ‘নটরাজ’ অভিনয়ে নৃত্যশিক্ষক নবকুমারই  প্রথম সংযোজন করেন একটু অদল-বদল করে মণিপুরী নাচ| কবিগুরুর মাধ্যমেই বিশে^র দরবারে আজ মণিপুরের মেয়েদের রাসনৃত্য স্থান লাভ নিয়েছে| মহাভারতের চরিত্র মণিপুর রাজেন্দ্রনন্দিনী চিত্রাঙ্গদার যুবরাজবেশ থেকে প্রথম নিজেকে আবিষ্কার করা আর মণিপুর নৃত্যের যে সংযোজিত রূপকল্প কবি সৃষ্টি করে গেছেন, তা যে যুগ যুগ ধরে গীতিনৃত্যট্য পিপাসু দর্শকদের মনকে মুগ্ধ করে আসছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না| এ সমৃদ্ধ বিনোদনমূলক শিল্পের কলাˆনপুণ্য কখনও পুরনো হবার নয়, চির শাশ্বত|

***

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬


মণিপুর-রাজেন্দ্রনন্দিনী, ওগো তাপসিনী

প্রকাশের তারিখ : ১১ জুন ২০২৬

featured Image

‘গুরু গুরু গুরু গুরু ঘন মেঘ গরজে পর্বতশিখরে,/ অরণ্যে তমশ্ছায়া|/ মুখর নির্ঝরকলকল্লোলে/ব্যাধের চরণধ্বনি শুনিতে না পায় ভীরু হরিণদম্পতি|/চিত্রব্যাঘ্র পদনখচিহ্নরেখাশ্রেণী/রেখে গেছে ওই পথপঙ্ক-পরে,/দিয়ে গেছে পদে পদে গুহার সন্ধান॥’

শুরুটা এমনভাবেই করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ| বলছিলাম তাঁর কালজয়ী গীতিনৃত্যনাট্য  ‘চিত্রঙ্গদা’র কথা| বহুবার মঞ্চায়িত ও বিশ^ময় পরিচিত এ গীতিনৃত্যনাট্যটি নাটক ও নাচ-গান পিপাসু কার না চিত্ত পরিতৃপ্তিতে ভরে দিয়েছে? যদিও কবিগুরুর ‘চণ্ডালিকা’ ও ‘শ্যামা’র মতো গীতিনৃত্যনাট্যও রয়েছে, তবু ‘চিত্রাঙ্গদা’ যেন অধিকতর রসগ্রাহী তা নিঃসন্দেহে বলার অপেক্ষা রাখে না| আমরা কখনো কখনো কোনো নাটক বা চলচ্চিত্রে ‘চিত্রাঙ্গদা’র কিছু অংশ পরিবেশিত হতে দেখি, যা নাটক সিনেমা এমনকি রবিসৃষ্টিরও সৌন্দর্য এবং মহিমা বৃদ্ধি করে আসছে|... এ প্রসঙ্গে প্রয়াত ঔপন্যাসিক শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘দাদার কীর্তি’ চলচ্চিত্রে রূপায়ন করতে গিয়ে প্রয়াত শক্তিমান পরিচালক তরুণ মজুমদার অত্যন্ত নান্দনিক মননেই ‘চিত্রাঙ্গদা’ গীতিনৃত্যনাট্যের অনেকটাই প্রদর্শন করিয়েছেন, যে প্রয়াসে দর্শক-শ্রোতাগণ এক অদ্ভুত বুঁদলাগা আমেজ নিয়ে দীর্ঘ সময়ব্যাপী ভাবাবেগে আবদ্ধ হয়ে থাকেন|

মণিপুর রাজদুহিতা স্বয়ং চিত্রাঙ্গদা যে গভীর তাপসিনী ছিলেন, তা মহাভারত থেকেই পাওয়া যায়| এই তাপসিনীকে রবীন্দ্রনাথ চিনতে পেরেছিলেন তাঁর কল্পলোকের কাব্যে| তাই তিনি নতুনভাবে মানসপটে এঁকেছেন চিত্রাঙ্গদাকে| আর সে কারণেই ব্যাসদেবের ‘চিত্রাঙ্গদা’ এবং রবীন্দ্রনাথের ‘চিত্রাঙ্গদা’ এক নয়| কবিগুরু চিনতেন বলেই প্রাবন্ধিক ইন্দ্রজিৎ সেনগুপ্তের লেখায় দেখা যায়, “১৮৯২ সালে অর্জুন ও মণিপুর-দুহিতার প্রেমকাহিনী তাঁর কাব্যে ‘চিত্রাঙ্গদা’ রূপে ধরা দিয়েছিল|” কাব্যের সেই স্মৃতিবিজড়িত স্থানকে দর্শন করার আগ্রহ জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ প্রমথ চৌধুরীকে এক চিঠি লিখেন| ১৩ কার্তিক (৩০ অক্টোবর ১৯১৯) বৃহস্পতিবারের সে চিঠিতে তিনি লিখেছেন— “কাল আমি শিলঙ ছেড়ে গৌহাটি যাব— তার পরে সেখান থেকে আমাদের মণিপুরে যাবার কথা চলচে| তাহলে আরো দিন দশেক পরে আমরা ফিরব|” প্রকৃতপক্ষে মণিপুর ভ্রমণের আহ্বানটা এসেছিল শ্রীহট্ট থেকে (সিলেট)| ‘শ্রীহট্টে রবীন্দ্রনাথ’ শীর্ষক প্রবন্ধে সুধীন্দ্রনারায়ণ সিংহ লিখেছেন যে রবীন্দ্রভক্ত তাঁর পিতা গোবিন্দনারায়ণ সিংহ সিলেটের ব্রাহ্মসমাজের পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ জানিয়ে টেলিগ্রাম করলে দীর্ঘ ক্লান্তিকর যাত্রাপথের জন্য রবীন্দ্রনাথ প্রথমে আসতে চাননি| কিন্তু গোবিন্দবাবু ছিলেন নাছোড়| ‘আঞ্জুমান ইসলাম’, ‘মহিলা সমিতি’ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ জানালে অগত্যা তিনি রাজি হন| চলার পথ তখন অতটা সহজ ছিল না| কেননা শিলঙ-সিলেট মোটরপথ নির্মিত হয়নি| তখনকার বনেদী বাবুরা চেরাপুঞ্জি পর্যন্ত গাড়িতে এসে খাসিয়া কুলিদের পিঠে-বাঁধা চেয়ারে বসে সিলেটে আসতেন| কিন্তু এরকম ভ্রমণ কবিগুরুর পছন্দ না হওয়ায় গৌহাটি হয়ে রেলপথে সিলেটে আসার পথই বেছে নেন তিনি|

১৯ কার্তিক (৫ নভে¤^র) বুধবার সকালে সিলেট স্টেশনে পদার্পণ করলে সমবেত জনতার হর্ষধ্বনির সাথে বাজি পুড়িয়ে কবিকে স্বাগত জানানো হয়| সেদিন তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে সিলেটের অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন| সুসজ্জিত বোট ও বজরায় রবীন্দ্রনাথ ও প্রতিমা দেবী সুরমা নদী পার হয়ে চাঁদনীঘাটে উপস্থিত হন| ঘাটটি ছিল পত্র-পুষ্প-পতাকায় মঙ্গলঘটে সাজানো| ঘাটের সিঁড়িগুলো ছিল লাল সালুতে মোড়ানো| রবীন্দ্রনাথ মৌলবী আব্দুল করিমকে (১৮৬৩-১৯৪৩) সঙ্গে নিয়ে একটি সুসজ্জিত ফিটনে ওঠেন| সরল ও কোমলমতি ছাত্রদের এমন অতি উৎসাহে একজন মানুষকে ভারবাহী জীবের মতো বুকেপিঠে টেনে নিয়ে যাওয়াটায় কবির ঘোর আপত্তি ছিল| কিন্তু উৎসাহের আতিশয্যে ছাত্রেরা তা কর্ণপাত করেনি|

আগেই বলেছি, ‘চিত্রাঙ্গদা’ গীতিনৃত্যনাট্য দেশে-বিদেশে বহুল আলোচিত ও প্রদর্শিত কী নাট্যে, কী সঙ্গীতে কিংবা কাব্যে এ সৃষ্টির মধুরস যেন অমর অক্ষয়| আমার মনে আছে, ১৯৭২ সাল, বাংলাদেশ সবে সদ্য স্বাধীন দেশ| আমাদের স্কুলে বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনায় রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী উদযাপন করা হবে| যথারীতি বক্তৃতা, গান ও কবিতা আবৃত্তির বিচিত্রানুষ্ঠান| সেদিন রবীন্দ্রনাথেরই একটি কবিতা আবৃত্তি করে আমি যে পুরস্কারটি পেয়েছিলাম, সেটি ছিল রবীন্দ্রনাথের ‘চিত্রাঙ্গদা’ কাব্য| সেই থেকে এই রচনাটা যেন আমার মনকে গভীরভাবে আবেগাপ্লুত করে আছে| শুরুতেই যে সঙ্গীতটি দিয়ে ‘চিত্রাঙ্গদা’কে সামনে নিয়ে বসেছিলাম, তেমনি কাব্যে মণিপুরদুহিতা নিজেই মদন ও বসন্তকে বর্ণনা দিচ্ছেন—

                         একদিন

গিয়েছিনু মৃগ-অন্বেষণে একাকিনী

ঘন বনে, পূর্ণানদীতীরে| তরুমূলে

বাঁধি অশ্ব দুর্গম কুটিল মৃগপদচিহ্ন অনুসরি|

ঝিল্লিমন্দ্রমুখরিত নিত্য-অন্ধকার 

লতাগুল্মে-গহন-গম্ভীর মহারণ্যে

কিছুদূর অগ্রসরি দেখিনু সহসা—

রুধিয়া সংকীর্ণ পথ রয়েছে শয়ান

ভূমিতলে চীরধারী মলিন পুরুষ|

হ্যাঁ, কতিপয় বালক বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে রাজকুমারী হরিণ শিকারে গিয়েছিলেন| আর সেটা ছিল চিত্রাঙ্গদার বারো বছর বয়স| নারীরা বালিকার বেশে নয়, বালকের বেশেই| এ ইতিহাস ব্যাসদেবের মহাভারতেই আছে| মদন ও বসন্তের সঙ্গে চিত্রাঙ্গদার এ কথোপকথনের প্রেক্ষিতেই ফিরে আসি-’চিত্রাঙ্গদা’ গীতিনৃত্যনাট্যের স্রষ্টা রবীন্দ্রনাথের প্রসঙ্গে| সিলেট শহরের একটি ছোট টিলার ওপর পাদরী টমাস সাহেবের বাংলোর পাশের বাড়িটি ছেড়ে দেয়া হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের জন্য| সেখানে তাঁকে অভ্যর্থনা দেয়া হয় শঙ্খধ্বনির সঙ্গে মালাচন্দন দিয়ে প্রাচ্যরীতিতে| সন্ধ্যা সাতটায় শ্রীহট্ট ব্রাহ্মসমাজ  মন্দিরে তিনি উপাসনা করেন| সেখানে সমাজ-সম্পাদকের অনুরোধে রবীন্দ্রনাথ গেয়ে শোনান “বীণা বাজাও হে মম অন্তরে” গানটি| 

ইতোমধ্যে কবিকে আমন্ত্রণ জানালেন অধ্যাপক নলিনীমোহন শাস্ত্রী| সেমতে পরদিন দুপুরে অর্থাৎ ৬ নভেম্বর ১৯১৯, রবীন্দ্রনাথ আসেন শাস্ত্রী মহাশয়ের বাড়ি| সেদিন বেলা দুটোয় ব্রাহ্মসমাজ গৃহে তাঁকে অভিনন্দিত করেন সেখানকার মহিলা সমিতি| এশিয়ার প্রথম নোবেল লরিয়েট বাঙালি কবি, সাহিত্য ও গীত-নৃত্যে যিনি ভুবনজয়ী দিকপাল, তাঁকে অভ্যর্থনা দেয়া বলে কথা; কবির সম্মানে একটি সুন্দর রৌপ্যাধারে অভিনন্দনপত্র প্রদত্ত হয়| সেদিন অর্থাৎ ১৬ অগ্রহায়ণ তত্ত্ব-কৌমুদিতে লেখা মতে জানা যায় শ্রীহট্ট মহিলাগণের পক্ষ হতে শ্রীযুক্তা নলিনীবালা চৌধুরী অভিনন্দনপত্রটি পাঠ করেন|

ফিরে আসি চিত্রাঙ্গদার কথায়| সেই বারো বছর বয়সে চিত্রাঙ্গদা তার বন্ধুদের নিয়ে শিকারে বেরিয়েছিলেন| মহাভারত থেকেই চিত্রাঙ্গদার অনেকটা দম্ভভরা অভিব্যক্তির কথা রবীন্দ্রনাথ নিজ কাব্যরীতিতে প্রকাশ করেছিলেন যেভাবে— “মোর পিতৃবংশে কভু পুত্রী জন্মিবে না—/ দিয়াছিলা হেন বর দেব উমাপতি/ তপে তুষ্ট হয়ে| আমি সেই মহাবর/ ব্যর্থ করিয়াছি| অমোঘ দেবতাবাক্য/ মাতৃগর্ভে পশি দুর্বল প্রারম্ভে মোর/ পারিল না পুরুষ করিতে শৈব তেজে,/ এমনি কঠিন নারী আমি|”...

এই রসই মণিপুর রাজকন্যা, আর এ অভিব্যক্তি প্রকাশে কবির কী অনুপম ছন্দ! 

কবিকে দেয়া আতিথেয়তার কথায় এলাম আবার| মণিপুুরীদের বস্ত্রবরণ নৈপুণ্য দেখে এ অঞ্চলের তাঁত ও তাদের জীবনযাত্রা দেখার ইচ্ছায় রবীন্দ্রনাথ মাছিমপুর পরিদর্শনে যান| এই শিল্পনৈপুণ্যের একটু বর্ণনা দিয়েছেন সুধীন্দ্রনারায়ণ সিংহ, “বাংলোর বহির্দ্বারে টাঙানো ছিল মণিপুরীদের তৈরি প্রায় পঞ্চাশ বছরের পুরনো একখানা আচ্ছাদন বস্ত্র|... ঐ আচ্ছাদন বস্ত্রে মণিপুরীদের শিল্পনৈপুণ্যের পরিচয় পেয়ে কবি মুগ্ধ হলেন| ইচ্ছে হলে পর্দাটি শান্তিনিকেতনের জন্য নিয়ে যেতে পারেন, এ কথা বলায় কবি বললেন, ‘এ যে দিনেদুপুরে ডাকাতি|’” মাছিমপুরে কলানিপুণ মণিপুরীরা কবির প্রবেশপথে সারি সারি কলাগাছ পুঁতে কাগজের ঝালর দিয়ে সুন্দর তোরণ নির্মাণ করে| মণিপুরী মেয়েদের তাঁতে-বোনা কাপড় দেখে কবির পছন্দ হয়| তিনি কিছু কাপড় কিনে নিলেন| রাখালনৃত্যে মণিপুরী ছেলেরা বেশ পারদর্শী| এ নৃত্য দেখার পর রাতে মেয়েদের নাচ দেখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বিকেলে বাংলোয় ফিরে আসেন| ছেলে ও মেয়েদের এই দু’ধরনের নাচের প্রয়াস কবিকে বিমোহিত করে| তাঁর শান্তিনিকেতনের নৃত্যকলায় মণিপুরী নৃত্য-ভঙ্গি যে বিশিষ্ট স্থান লাভ করেছিল, তা কেবলই রবীন্দ্রনাথের মস্তিষ্কপ্রসূত| পরবর্তীকালে তিনি সেখান থেকে ফিরেই শান্তিনিকেতনের পাঠ্যতালিকায় যে এ নৃত্যের প্রচলন করেন তা অনেকটা মানসপটে এর শিল্পমুগ্ধতার প্রভাব-তাড়িত হয়েই| তাই কবি ত্রিপুরার মহারাজার আমন্ত্রণে আসেন ৯ নভেম্বর| মহারাজা বীরেন্দ্রকিশোরকে তিনি অনুরোধ করেন একজন অভিজ্ঞ মণিপুরী নৃত্যগুরুকে শান্তিনিকেতনে পাঠাবার জন্যে| মহারাজা উৎসাহিত হয়ে অনতিবিলম্বে নৃত্য ও মৃদঙ্গ বাদনপটু, বিচক্ষণ কারুশিল্পশিল্পী ও যন্ত্রবিদ রাজকুমার বুদ্ধিমন্ত সিংহকে পাঠিয়ে দিলেন-মাঘ মাসের প্রথম দিকে| 

এদিকে মণিপুরী নৃত্যের মধ্যমণি রাজতনয়া চিত্রাঙ্গদা যে বারো বছর পর্যন্ত নিজেকে নারী হিসেবে উপলব্ধিই করেননি, তা তার চলার ভঙ্গি ও আচরণেই প্রকাশ পায়| মহাভারতের বর্ণনানুযায়ী রবীন্দ্রনাথ শুরু করলেন যেভাবে, তা মণিপুররাজের ভক্তিতে তুষ্ট হয়ে শিব বর দিয়েছিলেন যে তাঁর বংশে কেবল পুত্র সন্তানই জন্মাবে| তৎসত্ত্বেও যখন রাজকুলে চিত্রাঙ্গদার জন্ম হলো তখন রাজা তাকে পুত্ররূপেই পালন করলেন| রাজকন্যা অভ্যাস করলেন ধনুর্বিদ্যা, শিক্ষা করলেন যুদ্ধবিদ্যা, রাজদণ্ডনীতি| রবীনদ্রনাথের ‘চিত্রাঙ্গদা’ কাব্যে তিনি যেভাবে রাজকুমারীকে রূপায়ন করেছেন, সেটা এমন— বনে হরিণ শিকারে গিয়ে চিত্রাঙ্গদা যখন রাস্তা রুদ্ধ করা অর্জুনকে প্রথম দেখলেন, পাণ্ডব বংশীয় অর্জুনের সৌর্য-বীর্যের বিক্রম তাকে কেমন যেন নমনীয়া নারীত্বের উপলব্ধি এনে দিল তার দেহমনে| চিত্রাঙ্গদা মদনকে অবহিত করে— “শিখে পুরুষের বিদ্যা, প’রে পুরুষের/ বেশ, পুরুষের সাথে থেকে, এতদিন/ ভুলেছিনু যাহা, সেই মুখে চেয়ে, সেই/ আপনাতে-আপনি-অটল মূর্তি হেরি’/ সেই মুহূর্তেই জানিলাম মনে, নারী/ আমি| সেই মুহূর্তেই প্রথম দেখিনু/ সম্মুখে পুরুষ মোর|”

...কী দারুণ মনোদৈহিক অচলায়তনভাঙা পরিবর্তন! এই সেই রণকৌশলী সুপুরুষ অর্জুন| বহুদেশ ভ্রমণ করে এসে অর্জুন যখন গঙ্গাদ্বারে বাস করতে লাগলেন, একদিন সে গঙ্গায় স্নান করতে নদীতে নামলেন তিনি| তখন নাগরাজকন্যা উলপী তাঁকে টেনে নিয়ে গেলেন| অর্জুন তার পরিচয় জানতে চাইলে উলপী বললেন, আমি ঐরাবত-কুলজাত কৌরব্য নামক নাগের কন্যা, আপনি আমাকে ভজনা করুন| আপনার ব্রহ্মচর্যের যে নিয়ম আছে তা কেবল দ্রৌপদীর সম্বন্ধে| আমার অনুরোধ রাখলে আপনার ধর্ম নষ্ট হবে না, কিন্তু আমার প্রাণরক্ষা হবে| অর্জুন উলপীর প্রার্থনা পূরণ করেন| উলপী তাঁকে বর দিলেন, আপনি জলে অজেয় হবেন, সকল জলচর আপনার বশ হবে|

অতঃপর উলপীর কাছে বিদায় নিয়ে অর্জুন নানা তীর্থ পর্যটন শেষে মহেন্দ্র পর্বত দেখে সাগরতীর ধরে মণিপুরে পৌঁছান| সেখানকার রাজা চিত্রবাহনের কন্যা যিনি তপস্যায় পরমাসুন্দরী হলেন, তাঁর পাণিপ্রার্থী হলেন তিনি| অর্জুনের পরিচয় জেনে অর্জুনকে রাজা নিজেদের বংশের প্রভঞ্জন নামক এক রাজার কথা বললেন| সেই রাজা পুত্রের জন্য তপস্যা করলে মহাদেব তাঁকে বর দিয়ে বলেন, তোমার বংশে প্রতি পুরুষের একটিমাত্র পুত্রসন্তানই হবে| কিন্তু আমার পুত্র না হয়ে কন্যা হয়েছে| তাকেই আমি পুত্রবৎ গণ্য করি|

মহাভারত থেকে পাওয়া চিত্রাঙ্গদা ছিলেন বিষ্ণুপ্রিয়া জাতি| এ তথ্য প্রাবন্ধিক মিঃ সেনগুপ্তের লেখাতেও বিধৃত আছে| উল্লেখ্য যে, বিষ্ণুপ্রিয়া ˆমতৈ, কুকি আর পাঙান-এই তিন গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের বাস মণিপুর রাজ্যে| মৈতৈ আর কুকিদের মধ্যে সাম্প্রতিক কয়েক বছর ধরে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় এ রাজ্যে সংঘাত লেগে রয়েছে| বহু হতাহতের দুঃসহ ভার বহন করতে হচ্ছে মণিপুরকে| মৈতৈ জাতিরা ছিল রাজধানী ইম্ফল সংলগ্ন উপত্যকার বাসিন্দা; আর কুকি জনজাতিদের বাস ছিল পাহাড়ে| স্থান-পাত্রের এ বৈষম্য বহুকাল ধরে, ভঙ্গুর ও সমস্যাসঙ্কুল| একেই বলে ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! ভাগ্যিস রবীন্দ্রনাথ আজ ইহজগতে নেই; থাকলে এই হিংসা-বিদ্বেষ, হানাহানি তাঁকে যে কত গভীরভাবে আহত করতো, তা সহজেই অনুমেয়|

মণিপুর রাজ্য পরিভ্রমণে গিয়ে গন্ধর্ব রাজকন্যা চিত্রাঙ্গদার আরাধনাপ্রসূত রূপে মুগ্ধ হয়ে যান অর্জুন| এবং তা অবশ্যই রূপ পাবার পরই| সেখানে অর্জুনের সঙ্গে অন্যান্য ক্ষত্রিয় যোদ্ধা গিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই গন্ধর্বকন্যাদের বিয়ে করে সে রাজ্যেই স্থিত হয়ে গেলেন| অর্জুনও চিত্রাঙ্গদার সঙ্গে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন| এক সময় অর্জুন ও চিত্রাঙ্গদার পুত্র বভ্রুবাহন মণিপুরের অধিপতি হন| তখন থেকেই গন্ধর্বদের শাসনের  অবসান হয়ে শুরু হয় আর্য-ক্ষত্রিয়দের শাসন| 

‘চিত্রাঙ্গদা হলো রবীন্দ্রনাথের প্রথম নৃত্যনাট্য| মহাভারতের আদিপর্বে বর্ণিত অর্জুন ও চিত্রাঙ্গদার প্রণয়োপাখ্যান অবলম্বনে নির্মিত এ নৃত্যনাট্যে ১৯৩৬ সালে কলকাতায় অভিনয় প্রয়াসের সঙ্গে ১৮৯২ সালে রচিত চিত্রাঙ্গদা কাব্যনাট্যের বিষয় ও তত্ত্বে অনেকটা ভিন্ন| তিনি এ নৃত্যনাট্য ˆতরি করার সময় লিখেছিলেন— অনেক বছর আগে রেলগাড়িতে যাচ্ছিলুম শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতার দিকে| তখন বোধকরি চৈত্রমাস হবে| রেললাইনের ধারে ধারে আগাছার জঙ্গল| হলদে বেগুনি সাদা রঙের ফুল ফুটেছে অজস্র| দেখতে দেখতে এই ভাবনা এলো মনে যে আর কিছুকাল পরেই রৌদ্র হবে প্রখর, ফুলগুলি তার রঙের মরীচিকা নিয়ে যাবে মিলিয়ে—’

চলতে চলতে কবি তাঁর ভাবনাটা এক শিল্পাগারে প্রবেশ করালেন| তাঁর মাথায় মহাভারতের চিত্রাঙ্গদার কাহিনী নিয়ে একটা সফল ও মনোমুগ্ধকর গীতি নৃত্যনাট্য রচনা করার উপজীব্য স্বরূপ যা পেলেন, তা সেদিনকার প্রকৃতিতে রূপক নাট্যরূপ দেবার উপযোগী| বর্ণনা করলেন— তখন পল্লীপ্রাঙ্গণে আম ধরবে গাছের ডালে ডালে, তরুপ্রকৃতি তার অন্তরের নিগূঢ় রসসঞ্চয়ের স্থায়ী পরিচয় দেবে আপন প্রগলভ ফলসম্ভারে| সেই সঙ্গে কেন জানি হঠাৎ আমার মনে হলো সুন্দরী যুবতী যদি অনুভব করে যে সে তার যৌবনের মায়া দিয়ে প্রেমিকের হৃদয় ভুলিয়েছে তাহলে সে তার স্বরূপকেই আপন সৌভাগ্যের মুখ্য অংশে ভাগ বসাবার অভিযোগে সতীন বলে ধিক্কার দিতে পারে| এ যে তার বাইরের জিনিস, এ যেন ঋতুরাজ বসন্তের কাছ থেকে পাওয়া বর, ক্ষণিক মোহ-বিস্তারের দ্বারা ˆজব উদ্দেশ্য সিদ্ধ করবার জন্যে যদি তার অন্তরের মধ্যে যথার্থ চরিত্রশক্তি থাকে তবে সেই মোহমুক্ত শক্তির দানই তার প্রেমিকের পক্ষে মহৎ লাভ, যুগল জীবনের জয়যাত্রার সহায়| সেই দানেই আত্মার স্থায়ী পরিচয়, এর পরিণামে ক্লান্তি নেই, অবসাদ নেই, অভ্যাসের ধূলিপ্রলেপে উজ্জ্বলতার মালিন্য নেই| এই চরিত্রশক্তি জীবনের ধ্রুব স¤^ল, নির্মম প্রকৃতির আশু প্রয়োজনের প্রতি তার নির্ভর নয়| অর্থাৎ এর মূল্য মানবিক, এ নয় প্রাকৃতিক|

অবশেষে লেখবার উদ্বেলিত অবকাশ পাওয়া গেল উড়িষ্যার এক নিভৃত পল্লী পাণ্ডুয়াতে| নৃত্যনাট্যের মূল আখ্যানটির সংক্ষিপ্ত বর্ণনায়: ...একদা চিত্রাঙ্গদা যখন সখিদের নিয়ে শিকারের সন্ধানে বেরিয়েছিলেন, অরণ্যের গভীরে অর্জুনের সঙ্গে তাঁর দেখা হলো| চিত্রাঙ্গদা নিজের বীরত্ব প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে অর্জুনকে যুদ্ধের আহ্বান করলেন| কিন্তু অর্জুন সকৌতুকে তাঁকে অবজ্ঞা করলেন| নাছোড় রাজকন্যা অর্জুনকে হৃদয় মনপ্রাণ নিবেদন করতে গেলে অর্জুন তাঁর প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ব্রহ্মচর্য ব্রতের দোহাই দিয়ে প্রত্যাখ্যান করলেন| এ উপাখ্যানের নাট্যরূপ দেখাতেই চিত্রাঙ্গদা নৃত্যনাট্যের প্রদর্শনী দেশে-বিদেশে বহু মঞ্চায়ন হয়| তাই দেখা যায়— প্রত্যাখ্যাত হয়ে চিত্রাঙ্গদা নিদারুণ দুঃখে অর্জুনের হৃদয় হরণ করার জন্য মদনের আরাধনা করলে মদন দেবতা তাঁকে এক বছরের জন্য অপরূপা লাবণ্যময়ী রূপ দান করলেন| অর্জুন তো সেই রূপমুগ্ধে পাগলপারা| মায়ালব্ধ এ সৌন্দর্যের স্থায়ীত্বকাল যে বেশি ছিল না, অর্জুন সে ব্যাপারে অজ্ঞাত| চিত্রাঙ্গদার মনে তাই অদ্ভুত দ্বন্দ্ব| তিনি অর্জুনকে সতর্ক করে বললেন— “কিন্তু মনে রেখো,/ কিংশুকদলের প্রান্তে এই— যে দুলিছে/ একটু শিশির¬— তুমি যারে করিছ কামনা/ সে এমনি শিশিরের কণা/ নিমেষের সোহাগিনী|”

কিন্তু অর্জুন তাঁর সর্বস্ব সমর্পণ করেন সেই প্রহেলিকাময় মিথ্যার পায়ে| চিত্রাঙ্গদার ভীষণ শোভায় উদ্বেলিত অর্জুন| সুরূপা ছদ্মবেশী চিত্রাঙ্গদা প্রকৃত রাজকুমারীর রূপের দৈন্যের কথা উল্লেখ করলেও অর্জুন তাতে কর্ণপাত করেননি|

পরদিন চিত্রাঙ্গদা তাঁর রূপের সৌন্দর্য ফিরিয়ে নেয়ার জন্য মদনকে অনুরোধ করলে মদন প্রার্থনা পূরণ করেন; চিত্রাঙ্গদা অবয়বের পূর্বাবস্থা ফিরে পান| এই বেশেই তিনি অর্জুনের সম্মুখে এসে ঘোষণা করলেন: “আমি চিত্রাঙ্গদা, আমি রাজেন্দ্রনন্দিনী|/নহি দেবী, নহি সামান্যা নারী|/পূজা করি মোরে রাখিবে ঊর্ধ্বে সে নহি নহি|/হেলা করি মোরে রাখিবে পিছে সে নহি নহি|/যদি পাশের্^ রাখ মোরে সঙ্কটে সম্পদে,/ 

সম্মতি দাও যদি কঠিন ব্রতে সহায় হতে/পাবে তবে তুমি চিনিতে মোরে|”

অর্জুন ধন্য হলেন চিত্রাঙ্গদাকে পেয়ে| আর এই উপাখ্যানকে উপজীব্য করেই রবীন্দ্রনাথ ‘চিত্রাঙ্গদা’ নৃত্যনাট্য ˆতরি করার প্রারম্ভেই তিনি পেলেন মণিপুরী নাচের শিক্ষক রাজকুমার বুদ্ধিমন্ত সিংহকে| তাঁরই দৌলতে কবিগুরুর নির্দেশনায় কলকাতার নিউ এম্পায়ার থিয়েটারে ১৯৩৬ সালের মার্চে প্রথম মঞ্চস্থ হয় ‘চিত্রাঙ্গদা’| এহেন হৃদয়গ্রাহী নাট্যের বর্ণনা করতে গিয়ে প্রসঙ্গ আসে ‘চণ্ডালিকা’, ‘শাপমোচন’, ‘মায়ার খেলা’ ও ‘ঋতুরঙ্গ’ নাটকগুলোতেও মণিপুরী নৃত্যের সংযোজনের কথা| সেটা ছিল ১৭ জুন, ১৯৩৬ সাল| কবির সঙ্গে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে সাক্ষাৎ করতে গেলেন নলিনীকুমার ভদ্র| কবি মিঃ ভদ্রের সঙ্গে যেভাবে মণিপুরী নাচ দেখার অনুভূতি ব্যক্ত করলেন— ‘তুমি তো সিলেট থেকে আসছ| চৌদ্দ-পনেরো বছর আগে যখন সিলেটে যাই, তখন দেখেছিলাম মণিপুরী নাচ| সে নাচ আমার মনকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল সুদূর কল্পলোকে, মনে জেগেছিল নৃত্যনাট্যের পরিকল্পনা, সে যেন আমার মনকে পেয়ে বসেছিল|’

অতঃপর কবি ১৩২৬ থেকে ১৩৩৬ বঙ্গাব্দ, এই দশ বছরের মধ্যে তিন তিনবারে ত্রিপুরা রাজ্য থেকে ছয় জন মণিপুরী নৃত্য শিক্ষককে আনিয়েছিলেন শান্তিনিকেতনের ছাত্রছাত্রীদের মণিপুরী নাচ শেখাবার উদ্দেশ্যে| সম্প্রতি ‘নটরাজ’ অভিনয়ে নৃত্যশিক্ষক নবকুমারই  প্রথম সংযোজন করেন একটু অদল-বদল করে মণিপুরী নাচ| কবিগুরুর মাধ্যমেই বিশে^র দরবারে আজ মণিপুরের মেয়েদের রাসনৃত্য স্থান লাভ নিয়েছে| মহাভারতের চরিত্র মণিপুর রাজেন্দ্রনন্দিনী চিত্রাঙ্গদার যুবরাজবেশ থেকে প্রথম নিজেকে আবিষ্কার করা আর মণিপুর নৃত্যের যে সংযোজিত রূপকল্প কবি সৃষ্টি করে গেছেন, তা যে যুগ যুগ ধরে গীতিনৃত্যট্য পিপাসু দর্শকদের মনকে মুগ্ধ করে আসছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না| এ সমৃদ্ধ বিনোদনমূলক শিল্পের কলাˆনপুণ্য কখনও পুরনো হবার নয়, চির শাশ্বত|

***


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত